somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কুশন
আলো –অন্ধকারে যাই- মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়,- কোন এক বোধ কাজ করে! স্বপ্ন নয়- শান্তি নয়-ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়! আমি তারে পারি না এড়াতে, সে আমার হাত রাখে হাতে; সব কাজ তুচ্ছ হয়,-পণ্ড মনে হয়। -জীবনানন্দ দাশ

মকিম গাজী ভাই

২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ২:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমি এখন বাফেলো শহরে থাকি।
আমেরিকার সেরা দশ শহরের তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাফেলো। এখানে হালাল মার্কেট, হালাল রেস্তোরাঁ আর অনেক মসজিদ। এই শহরে বাঙ্গালীদের অভাব নেই। অনেক বাঙ্গালীকে লুঙ্গি পড়ে হেঁটে যেতে দেখেছি। পান খেয়ে পিক ফেলতে দেখেছি। বাঙ্গালীদের সাধারনত আমি এড়িয়ে চলি। প্রবাসী জীবনে সবচেয়ে কষ্ট হয়তো একাএকা খেতে বসা। অবশ্য আমি ঘরে থাকলেই সব সময় টিভি ছেড়ে রাখি। এবং আমার ফ্রিজে সব সময় বিয়ার থাকেই। লিন্ডার জন্য আমাকে ফ্রিজে বিয়ার রাখতেই হয়। আলু ভাঁজা লিন্ডা খুব পছন্দ করে। এজন্য ফ্রিজে আলুও রাখি সব সময়। শুক্র ও শনিবার সপ্তাহে দুই দিন আমার ছুটি। এই দুই দিন লিন্ডা আমার সাথেই থাকে। মাঝে মাঝে আমরা বেড়াতে যাই। এ সপ্তাহে লিন্ডা আসে নি। সে তার মায়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছে ফ্লোরিডায়।

আমি খুব অল্পতেই বিষন্ন হয়ে পড়ি।
ছুটির দিন। বাসায় আছি একা। বৃষ্টি হচ্ছে। আমি বিষন্ন হয়ে গেলাম। দেশের কথা মনে পড়লো। মা বেঁচে নেই। তবু বারবার মায়ের কথাই মনে পড়ে। নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে পড়েছি। ভালো রেজাল্ট করেছি। এখন ভালো চাকরী করছি। অথচ এই আমি বাবার সাথে অন্যের জমিতে চাষ করেছি দিনের পর দিন। মা দুপুরবেলা আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসতো। পাট শাক বাজি, আলু ভর্তা। আমাদের বাড়ির উঠানে তিনটা বড় আম গাছ ছিলো। সেই আম গাছ বিক্রি করে আমি ঢাকা আসি। ঢাকায় খাজা ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয়- মকিম ভাইয়ের সাথে। তার পুরো নাম মকিম গাজী। আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। যদিও তিনি আমার বাবার বয়সী। তবু তাকে ভাই বলে ডাকতাম। মকিম ভাই একবার আমার সাথে আমাদের গ্রামে বাড়ি এসেছিলেন। চার দিন থেকে গেছেন।

আজ বলব মকিম ভাইয়ের গল্প।
আমার দেখা অসাধারণ একজন মানুষ মকিম ভাই। মকিম ভাই কি করতেন আমি জানি না। তিনি আমাদের মেসে থাকতেন। আমার পাশের ঘরেই থাকতেন। কোনো কারন ছাড়াই আমাকে স্নেহ করতেন। নানান বিষয় নিয়ে আমার সাথে গল্প করতেন। তার সাথেই জীবনে প্রথম সোনার গাও হোটেলে যাই। পুরান ঢাকার রেস্টুরেন্ট গুলোতে খাওয়াতে নিয়ে যেতেন আমাকে। আমার মনে আছে একবার রাত দুটায় তার সাথে কলতাবাজারে হাজী বিরানী খেতে গিয়েছিলাম। আরেকদিন নিয়ে গিয়েছিলেন মামুন বিরানীক খেতে বোরহান উদ্দীন কলেজের সামনে। এমন কি আমাকে দুটা টিউশনিও যোগাড় করে দিয়েছিলেন। অসংখ্যবার আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। কিন্তু সেসব টাকা তিনি কখনও ফেরত নেন নি। মানুষটার কাছে আমার অনেক ঋণ।

মকিম ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা হয় ঢাকা এয়ারপোর্টে।
আমি আমেরিকা চলে যাচ্ছি। আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্না করেছিলেন। তার কান্না দেখে আমার চোখেও পানি চলে এসেছিলো। রক্তের আত্মীয় না হয়েও তিনি আত্মার কাছাকাছি ছিলেন। আজ মকিম ভাই কেমন আছেন আমি জানি না। অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো খোঁজ পাইনি। মাঝখানে কত বছর পার হয়ে গেলো! কফির মগ হাতে নিয়ে বৃষ্টি দেখছি দূর দেশে বসে। কতদিন প্রিয় মানুষদের দেখি না। মকিম ভাই বলেছিলেন- সব সময় আমার সাথে যোগাযোগ রাখবেন। কখনও হারাবেন না। মকিম ভাই কথা রাখেন নি। তিনি হারিয়ে গেছেন। নাকি মরে গেছেন! আমি আমার প্রিয় মানুষদের কথা ভুলি নি। ভুলে যাওয়া সম্ভব না আমার পক্ষে। এবার দেশে গেলে তাকে ঠিকই খুঁজে বের করবো।

গতকাল খিচুরী রান্না করেছিলাম।
কিছু বেঁচে গিয়েছিলো। বেঁচে যাওয়া খিচুরী ফ্রিজে তুলে রাখতে ভুলে গিয়েছিলাম। নষ্ট হয়ে গেছে। বেশ ক্ষুধা পেয়েছে। বাসার কাছেই এক হালাল রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। সেখানে ভাত আর গরুর মাংস খেলাম। বিল দিতে গিয়ে দেখি ক্যাশ কাউন্টারে বাংলাদেশের পত্রিকা। বাসী পত্রিকা। কি মনে করে সেই পত্রিকা আমি চেয়ে নিয়ে এলাম। পত্রিকায় শেষে পাতায় চোখ বুলাতে গিয়ে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। অবিশ্বাস্য! মকিম ভাইয়ের ছবি। তিনি একদম বুড়ো হয়ে গেছেন। তবে মাথা ভর্তি চুল, বলিষ্ঠ চেহারা। চোখে মুখে কি তেজ ভাব! কত বছর পর মুকিম ভাইকে দেখলাম! নিউজ পড়ে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। এটা কিভাবে সম্ভব! আমি ভাবতেই পারছি না। হায় হায়!

পত্রিকার শিরোনাম এই রকমঃ
'ডাকাত মকিম গাজী'। আমি পাগলের মতো পড়ে গেলাম নিউজটা। পরপর তিনবার পড়লাম। পত্রিকায় যা লিখেছে তার সারমর্ম হলো- মকিম ভাই ভয়াবহ একজন ডাকাত। কমপক্ষে দুই শ' ডাকাতি সে করেছে। চার বছর তালাশ করেও পুলিশ মকিম গাজীকে ধরতে পারেনি। তার নামে বিভিন্ন থানায় ১১৩ টা মামলা আছে। মকিম ঢাকাসহ রাজশাহী, চিটাগং এবং খুলনায় ডাকাতি করেছে। পুলিশ তাকে দুইবার ধরতে গিয়েও ধরতে পারেনি। পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে মকিম পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। শেষে তাকে ঢাকার মগবাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। একবার সে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকেও পালিয়ে যায়। তারপর তিন বছর পর আবার তাকে সিআইডি গ্রেফতার করে। গত তেরো বছর ধরে মকিম গাজী কারাগারে। তার সাজা কোনো দিন মাফ হবে না। কারন তিনি কারাগার থেকে পালিয়েছেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ২:০৫
১২টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ৮৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১২:৪২


ছবিঃ আমার তোলা।

মন মেজাজ ভালো নেই।
তাই ব্লগে কম আসি। কম লিখি। যদিও বেশ কিছু লেখা মাথায় জমে আছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে ব্লগে আসলে ঝামেলা হয়ে যাবে। দেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাতাস বুঝে ছুইটেন !

লিখেছেন স্প্যানকড, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১:৪১

ছবি নেট।

হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেনঃ "মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, তবে বাঙালির ওপর বিশ্বাস রাখা বিপদজনক! " 

আসলেই তাই! খবরে দেখলাম ইকবাল নামের একজন ব্যক্তি পবিত্র কুরআন মুর্তির কাছে রেখে চলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন ভবঘুরে ইকবাল হোসেন জন্য সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ল

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৩৫



গত বুধবার ভোরে শারদীয় দুর্গাপূজার মহা অষ্টমীর দিন কুমিল্লা শহরের নানুয়া দীঘির উত্তর পাড়ে দর্পণ সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন দেখা যায়। ব্যস আর যায় কোথায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি ও আমার পৃথিবী......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৫১

আমি ও আমার পৃথিবী......

আজও খুব ভোরে উঠেছি প্রতিদিনের মতো। আকাশে তখনও আলগোছে লেগে রয়েছে রাত্রির মিহি প্রলেপ। আমার চেনা পাখিরা জেগে ওঠেনি তখনও। মনটা কেমন যেন একটু বিস্বাদে ভরে আছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পেডাগোজিকাল ট্রানজিশন- শিশু শিক্ষনে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কি ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায়

লিখেছেন শায়মা, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ বিকাল ৩:৪৪


করোনাকালীন চার দেওয়ালে বন্দী জীবন ও অনলাইনের ক্লাসরুমের মাঝে গত বছর নভেম্বরে BEN Virtual Discussion "শিশুদের নিয়ে সব কথা" একটি টক শো প্রোগ্রাম থেকে ইনভিটেশন এলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×