somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শুকিয়ে যাওয়া গাছে মালি বদলালেই ফুল ফোটে না

১৫ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২০২৩ সালের আগস্ট মাস। আওয়ামী লীগ সরকার সবে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, "আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের পকেট থেকে টাকা চুরি করার নতুন কৌশল বের করেছে। এই পেনশন স্কিম হলো মানুষের পকেট থেকে টাকা লুটের নতুন ফন্দি। এই টাকা তারা ভোটে ব্যবহার করবে।" কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল এই মানুষটা সত্য বলছেন। আসলে তিনি সত্যিই বলেছিলেন। কিন্তু সত্যটা ছিল অন্য কারণে, যেটা তিনি নিজেও তখন পুরোপুরি বুঝতেন না এবং এখন বুঝলেও স্বীকার করার সুযোগ নেই।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে বিশাল প্রতিশ্রুতির ডালা নিয়ে। সেই ডালায় ছিল সর্বজনীন পেনশনের স্বপ্ন। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, লেখা হয়েছিল ইশতেহারে, মানুষ শুনেছিল। তারপর কেটে গেল এক বছর, দুই বছর, পাঁচ বছর, দশ বছর। পেনশনের খবর নেই। কারণটা সহজ, তখন বিদেশ থেকে টাকা আসছিল, ঋণ পাওয়া যাচ্ছিল সহজে, জনগণের পকেটে হাত দেওয়ার দরকার ছিল না। যখন বাইরের উৎসে একটু টান পড়তে শুরু করল, যখন মেগাপ্রজেক্টের ঋণ শোধের চাপ বাড়ল, তখন হঠাৎ ২০২২ সালে স্মৃতি ফিরে এলো। ১৪ বছর পর মনে পড়ল যে জনগণের বৃদ্ধ বয়সের কথা ভাবতে হবে।

অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বললেন, "এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতির জন্য উপহার।" উপহার। জনগণের নিজের টাকা জমা রাখার স্কিম, সেটা একজন মানুষের ব্যক্তিগত উপহার। এই ভাষা ব্যবহারের মধ্যেই বোঝা যাচ্ছিল এই স্কিমটাকে কীভাবে দেখা হচ্ছে। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল মোমেন একদিন এমন একটা কথা বলে ফেললেন যেটা রাজনীতিবিদরা সাধারণত মুখ ফসকে বলেন, বললেন যে এই স্কিম সফল হলে সরকারের টাকা রাখার জায়গা থাকবে না। একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনশন স্কিম নিয়ে এই কথা কেন বলবেন? কারণ উপরের মহলে এই ফান্ডকে সরকারের নিজস্ব reserve হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। মানুষের মুখ থেকে সত্য বের হয়ে যায় যখন মন বেসামাল থাকে।

শেখ হাসিনা স্কিম উদ্বোধনের দিন নিজেই বললেন, "আমরা ক্ষমতায় থাকতে থাকতেই করতে চেয়েছিলাম, কারণ অন্য কোনো সরকার এই কাজ করবে না।" এই একটা বাক্যে ১৪ বছরের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। জনগণের জন্য চিন্তা থাকলে ২০০৮ সালেই করা যেত। কিন্তু করা হয়নি কারণ তখন দরকার ছিল না। ২০২৩ সালে করা হলো কারণ তখন দরকার পড়ল এবং সেইসাথে ক্ষমতা হারানোর আগে fund-এর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখার তাড়াও ছিল।

কিন্তু মানুষ বোকা না। বাংলাদেশের মানুষ ব্যাংকে টাকা রেখে দেখেছে সেই টাকা এস আলমের মতো মানুষ তুলে নিয়ে গেছে। ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা দেখেছে টাকা আটকে যেতে। সরকারি গ্যারান্টি থাকার পরেও মানুষ টাকা ফেরত পায়নি। তাহলে সরকার পরিচালিত পেনশন ফান্ডে ৩০ বছরের জন্য টাকা রাখবে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি। দেওয়ার সাহস ছিল না।

এরই মধ্যে সরকার আরেকটি কাজ করল যেটা তাদের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াল। প্রত্যয় স্কিম নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আলাদা পেনশন ব্যবস্থা জোর করে চাপানোর চেষ্টা হলো। শিক্ষকরা বললেন এটা বৈষম্যমূলক, তাদের পুরনো সুবিধা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু হলো। তখন মির্জা ফখরুল বললেন শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক এবং ন্যায়সংগত, তিনি সমর্থন দিলেন এবং বললেন বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই স্কিম বাতিল করে দেবে। ক্যাম্পাস উত্তাল হলো। শিক্ষকদের অসন্তোষ থেকে আগুন ছড়াল, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সাথে মিলে সেই আগুন এমন রূপ নিল যে আগস্টের ৫ তারিখে হাসিনা সরকারের পতন ঘটল। পেনশন সংস্কার করতে গিয়ে সরকার পতন, ইতিহাসে এটা বিরল।

এরপর বিএনপি এলো ক্ষমতায়। যে ফখরুল সাহেব বলেছিলেন এই স্কিম জনগণের টাকা লুটের ফন্দি, যে ফখরুল সাহেব বলেছিলেন ক্ষমতায় এলে বাতিল করবেন, তার দলের সরকার এখন কী করছে? এডিবি থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে একই স্কিমকে আরো বড় করার পরিকল্পনা করছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ কোটি পরিবারের একজন করে সদস্যকে এই স্কিমে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এখানে একটু থামা দরকার। এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত এই স্কিমে মোট নিবন্ধিত হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ। মোট জমা ২৫৫ কোটি টাকা। আর সেই ২৫৫ কোটি টাকার বিপরীতে এডিবি থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে ১১০০ কোটি টাকারও বেশি, শুধু "প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে" এবং "ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নত করতে।" ফান্ডের চেয়ে চার গুণ বেশি ঋণ নিয়ে ফান্ড পরিচালনার কাঠামো বানানো হচ্ছে। এটা ব্যবসায়িক বুদ্ধি না, এটা অন্য কিছু।

আসল সমস্যা হলো বাংলাদেশ এখন একটি ঋণের ফাঁদে আছে। মোট বৈদেশিক ঋণ ৭৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। শুধু সুদ পরিশোধে বাজেটের ১৭ শতাংশ চলে যাচ্ছে। রুপপুরের কিস্তি শুরু হবে শীঘ্রই। এই পরিস্থিতিতে পেনশনের নামে এডিবির সস্তা ডলার এনে আসলে বাজেটের চাপ সামলানো হবে । জনগণের পেনশন নিরাপত্তা এই সমীকরণে গৌণ বিষয়।

এখন প্রশ্ন হলো কী করা উচিত ছিল। উত্তর জটিল না। প্রথমে ব্যাংকিং সেক্টরের ফরেনসিক অডিট করো, হোয়াইট পেপার বের করো, মানুষকে দেখাও যে আগে কী হয়েছিল এবং দোষীদের বিচার হচ্ছে। তারপর সার্বজনীন পেনশনের নাম বদলাও, কাঠামো বদলাও, সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করো। তারপর ছোট করে শুরু করো, মানুষকে দেখাও যে তোমার হাতে যে টাকা দেবে সেটা নিরাপদ, আগামী ৩০ বছর পরেও পাবে। তারপর বড় করো। "চার কোটি পরিবার ২০৩০-এর মধ্যে"-এই ধরনের কথা মানুষ বিশ্বাস করে না।

কিন্তু এটা করলে স্বীকার করতে হতো আগে কী ভুল হয়েছে। স্বীকার করলে প্রশ্ন উঠত যে তখন কেন চুপ ছিলে। সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস বা সদিচ্ছা কারো নেই। তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে। আওয়ামী লীগ বলেছিল এটা লুটের প্রকল্প নয়, জনগণ বিশ্বাস করেনি। বিএনপি বলেছিল এটা লুটের প্রকল্প, জনগণ বিশ্বাস করেছিল। এখন বিএনপি বলছে এটা লুটের প্রকল্প নয়, জনগণ বিশ্বাস করবে না। চক্রটা সম্পূর্ণ হলো ।

****বিএনপির উচিত আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ জানানো।এডিবি থেকে লোন এর প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগ আমলেই শুরু হয়েছিল। আর পেনশন স্কিম থেকে লোন নেয়ার যে মাস্টার প্ল্যান তারও মাস্টার মাইন্ড আওয়ামী লীগ ছিল। ****

সর্বজনীন পেনশন চাঙ্গা করতে নেওয়া হচ্ছে এডিবির ঋণ -সমকাল ।

‘পেনশন স্কিমের নামে টাকা চুরির নতুন ফন্দি করেছে সরকার-সোনালি নিউজ

photo credit: fintech ibrahim

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধূসর ওয়ালেট

লিখেছেন মোহাম্মদ সজল রহমান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪৭

একটা ধূসর রংয়ের ওয়ালেট
সবুজাভ ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বের হলো নীরবে
তার শান্ত হাতের উপর চেপে ধরতেই প্রশ্ন -
এটা আমার জন্য ?
ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেখেই চঞ্চলতা ছুঁয়ে গেলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১

কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×