somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দাদির জায়নামাজ

০৫ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বারান্দার কোনায় দাদি যেখানে ঘুমান, সেখানেই তিনি সারাদিন বসে থাকেন।

বসে থাকতে তার বিরক্ত লাগে বলে মনে হয় না। অথচ একদণ্ড কোথাও বসে থাকা কত বিরক্তিকর।

ইদানিং দাদি নতুন এক অভ্যাস শুরু করেছেন। রমজান মাস আসার পর থেকে তিনি ওই জায়গাতেই নামাজের পাটি বিছিয়ে বসেন। সকালে ফজরের পর তিনি সাধারণত ঘুমান না। ঝিম ধরে বসে থাকেন। মনে মনে কী যেন বলেন। শব্দ করে কিছু বললেও সেগুলো পরিষ্কার বোঝা যায় না।

দাদিকে একটা জায়নামাজ দেওয়া হয়েছে ব্যবহারের জন্য। জায়নামাজে সম্ভবত তার বসতে ভালো লাগে না। জায়নামাজ তার মাথায় গোড়ায়ই সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা থাকে। অনেক অনুরোধ করেও তাকে জায়নামাজ ব্যবহার করানো যাচ্ছে না। পাটিতেই তার ভালো লাগে।

দিনের আলো ফুটলে বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে লোকজনের যাতায়াত শুরু হয়।

বাড়ির বউয়েরা কাজে ব্যস্ত হন।

সারাদিন কত কাজ! গরু, ছাগল গোয়াল থেকে বের করা। গোয়াল পরিষ্কার করা। থালাবাটি মাজা। উঠান ঝাড়ু দেওয়া। বাচ্চাদের শাসন করা। আরো কত কী!

এসব কাজে দাদির কোন চঞ্চলতা দেখা যায় না। দাদি শুধু তাকিয়ে থাকেন, দেখেন।

পাঁচ ছেলে, পাঁচ মেয়ে জন্ম দিয়েছেন। সবার বিয়ে হয়েছে, নাতি পুতি হয়েছে। সবাই হয়েছে সাংসারিক।

সামনের ঈদে কোন মেয়েকে দাওয়াত করা হয়েছে বা হয় নাই, নাতি পুতি সবার কাপড় কেনা হয়েছে কিনা এসব ব্যাপারেও তার কোন মাথা ব্যথা নেই।

অথচ এই সংসাররূপী রাজত্ব তিনি একসময় দোর্দণ্ডপ্রতাপে শাসন করেছেন। বউয়েরা কোন কাজই তার অনুমতি ব্যতিরেকে করতে পারতো না। তারা সব সময় থাকতো শ্বাশুড়ির ভয়ে তটস্থ।

যেদিন দাদা মারা গেলেন, সেদিন থেকেই দাদি এসব দুনিয়াবি চঞ্চলতা বিসর্জন দিয়েছেন।

দাদা মারা যাওয়ার পর দাদির রাজত্ব কেড়ে নেওয়া হয়নি। বউয়েরা পরস্পর ফিসফাস করেনি। তারা সবসময়ই শ্বাশুড়িকে বরাবরের মতই গুরুত্ব দিয়েছেন।

দাদিকে নিজেকে নিজেই গুটিয়ে নিয়েছেন।

দাদার সাথে তার তো আর দুয়েক বছরের সংসার না। দীর্ঘ সত্তর বছরের সংসার। যখন দাদার ঘরে এসেছিলেন তখন দাদি হাফপ্যান্ট পরা খুকি।

এই দীর্ঘ সময় একজন মানুষের সাথে সংসার করলে তিনি আলাদা কোন মানুষ থাকেন না। তিনি হয়ে যান শরীরের অঙ্গ। দাদা মারা যাওয়াতে দাদীর অঙ্গহানি হয়েছে।

আজ সকাল থেকেই দাদি শুধু এদিক ওদিক তাকিয়ে উসখুস করছেন। তার মেজো ছেলের ছোট মেয়েটা প্রায় সময়ই দাদির পাশে ঘুরঘুর করে। সে পড়ে ক্লাস ওয়ানে। সম্ভবত দাদি তার ফেরার অপেক্ষা করছেন।

বাড়ির অন্য বাচ্চারাও দাদির আদুরে। তারা কেউ কেউ দাদির কাছে এসে খেলে আবার উঠান পার হয়ে মাঠে চলে যায় খেলতে।

ঈদ যেহেতু আসন্ন বাড়ির সবাই ব্যস্ত। তারউপর রমজান মাস। সকালে সংসারের স্বাভাবিক কাজ, বিকাল হলেই রান্নাবান্না।

দাদা মারা যাওয়ার পর দাদি এভাবে পাঁচটা রমজান পার করেছেন।

আজ সকালে ছোট চাচা ঢাকা থেকে এসে পৌছবেন স্টেশনে। আমি ফজরবাদ বাইক নিয়ে বের হলাম তাকে আনতে।

বেরোনোর সময় দেখি দাদি ফজর পড়ে নামাজের স্থানেই শুয়ে আছেন। আশ্চর্য ব্যাপার আজ তিনি জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়েছেন। তার শোয়ার ভঙ্গিটা কেমন যেন অস্বাভাবিক।

জায়নামাজে আমি তাকে দেখে অভ্যস্ত না, তারউপর তার শোয়ার ভঙ্গি দেখে আমার কেমন যেন একটা অস্বস্তি লাগলো।

ওদিকে ছোট চাচা ফোন দিয়েছেন, স্টেশনে দ্রূত যেতে হবে। পৌঁছতে অন্তত বিশ মিনিট লাগবে।

দাদির কাছে আর যাওয়া হলো না। দ্রুত বাইক নিয়ে রওনা দিলাম স্টেশনের দিকে।

চাচাকে নিয়ে ফিরলাম প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে।

বাড়ি ঢোকার মুখেই দেখি অনেক লোকজন। উঠানে অনেক ভিড়। সেখানে অনেক লোকজনের ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ।



গল্পটি এর আগে আমার সাবস্ট্যাকে প্রকাশ করেছিলাম। আমার সব লেখা সেখানে আছে।

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জলে স্থলে শূন্যে আমি যত দূরে চাই

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৫৩



আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ভুলেই গেছো!
লম্বা সময় ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। আমিও নানান ব্যস্ততায় যোগাযোগ করতে পারিনি। তুমিও যোগাযোগ করনি! অবশ্য তুমি যোগাযোগ অব্যহত না রাখাতে আমি বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মানবাধিকার' (অণু গল্প)

লিখেছেন আবু সিদ, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪

'মানবাধিকার' একটা এনজিও। তারা বিদেশী সহায়তা নিয়ে মানুষ, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করে। আজ তারা একটা বড় সমাবেশ করছে প্রেসক্লাবে। সমাবেশে সাংবাদিকসহ নানান পেশার মানুষ অংশ নিয়েছে। টিভি সাংবাদিকেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নদী তীরের ইমাম থেকে গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সার: একটি অনুপ্রেরণার গল্প

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০৬




নদী তীরের ইমাম থেকে গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সার: একটি অনুপ্রেরণার গল্প

একটি বিশাল নদীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা শান্ত এক জনপদ, আর ঠিক নদীর ঘাট ঘেঁষেই ছিল একটি সুন্দর মসজিদ। সেই মসজিদের ইমাম সাহেব... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু দ্বিতীয় রিফাইনারি (ERL-2) টা করে দেখান , সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গতকাল নাটকীয়তায় ভরা একটা দিন আমরা পার করলাম । রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন ঝড় বয়ে গেল। পুরো সোশ্যাল মিডিয়া যেন দুই ভাগে ভাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×