somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লুঙ্গি কাহিনী

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ১০:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লুঙ্গি কাহিনী

এম এল গনি | বিজনেস বাংলাদেশ ডটকম
প্রকাশিত: আগ ২৭, ২০১৯

লুঙ্গি আবিষ্কার নিয়েও একটা গল্প প্রচলিত আছে।

এক রাজা গেছেন প্রজাদের সভায়। পরনে ছিল পাজামা। সভার মাঝখানে পেট মোচড় দিয়ে উঠলে গেলেন টয়লেটে। কিন্তু, পাজামার কোমরের বন্ধনী তাড়াতাড়ি খুলতে না পারায় ঘটে গেলো বিপত্তি। পাজামার পেছনটা ভিজে হয়ে গেলো হলুদ। এতে রাজা ক্ষেপে আগুন। তাৎক্ষণিক রাজ্যের প্রধান উজিরকে ডেকে পাজামার বন্ধনী সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার কঠোর নির্দেশ দিলেন। যেহেতু পাজামার গিট্ এতো বড়ো দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, রাজার ইচ্ছে, বাকি জীবনে তিনি আর পাজামা পড়বেন না।

রাজার নির্দেশ বলে কথা! যেই কথা সেই কাজ। প্রধান উজির তাৎক্ষণিক রাজ্যের সব বিশেষজ্ঞ এক করে পাজামার এক বিকল্প খুঁজে বের করলেন। সেই বিকল্পের আধুনিক নাম ‘লুঙ্গি’, যাতে কোনো বন্ধনী বা রশি নেই।

ভাবছেন হয়তো, পৃথিবীতে এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকতে আমি হঠাৎ গ্রাম বাংলার পোশাক লুঙ্গি নিয়ে মেতে উঠেছি কেন?
কারন অবশ্যই আছে। সেদিন কানাডার শ্বেতাঙ্গ এক লোক লুঙ্গির ব্যাপারে যেভাবে আগ্রহ দেখালেন তাতে লুঙ্গি নিয়ে দু’কলম না লিখে পারছি না। শুনুন এবার সেই লুঙ্গি কাহিনী।

জিমনেসিয়ামের (ব্যায়ামাগার) লকার রুমে আমিসহ কয়েকজন। সবাই ব্যস্ত কাপড়চোপড় বদলাতে। কেউ গোসল সেরে এলেন, কেউবা যাচ্ছেন বাথরুমে, এমনই পরিবেশ। এ অবস্থায় সচরাচর কেউ কারো দিকে তাকায় না; কেউ নগ্ন, কেউ অর্ধনগ্ন।

আমি জিমের কাপড় বদলিয়ে লুঙ্গি পড়েছি; কাঁধে একটা তোয়ালে। গোসল সারতে বাথরুমের দিকে পা বাড়াবো। এমন সময় দেখি শ্বেতাঙ্গ এক সুঠামদেহী লোক লকার রুমের আরেক কোন থেকে আমার দিকে আসছেন।

তাঁর গায়ে কোন কাপড় নেই। লকার রুমে বেশিরভাগ মানুষ এমনই। এরা একে তো সাদা, তার উপর আবার বুকের লোম শেভ করা। মস্তক, পুরুষাঙ্গের আশপাশের কিছু জায়গা, আর দুই বগল বাদে আগাগোড়া সাদা। ধবধবে সাদা ঠিক নয়, কিছুটা লালচে সাদা বলাই ভালো। লোকটা ছ’ফুটের উপরে লম্বা, পেশল। ছোটবেলা থেকেই জিমে আসে অনুমান করি। ওর বিশেষ অঙ্গটাও অসম্ভব রকমের মোটা-লম্বা, যেন সাদা বর্ণের মাইক টাইসন আমার সামনে দাঁড়িয়ে; ওতে মর্দামী শক্তি কতটা আছে বা নেই সে ভিন্ন প্রশ্ন যদিও।

বুঝিবা আমাকে লুঙ্গি পড়া দেখেই উনি বাঁ হাতে তাঁর পুরুষাঙ্গের আংশিক আবৃত করে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন: কেমন আছেন? আপনি কি শ্রীলংকা থেকে?

– না, বাংলাদেশ থেকে। তো, কেন জানতে চাইলেন বলবেন?

আমি শ্রীলংকায় গেছিলাম কয়েক বছর আগে। ওখানে (আমার লুঙ্গি দেখিয়ে) এই কাপড়টা পুরুষদের পড়তে দেখেছি।

– তাই? শুধু শ্রীলংকা নয়, এশীয় উপমহাদেশের আরো অনেক দেশ, যেমন, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড-এও এই কাপড়টা অনেকে পরেন। এর নাম কি জানেন?

জানি না।

– লুঙ্গি।

ওহ তাই! লুঙ্গি কানাডায় কোথায় কিনতে পাওয়া যায়? আমি একটা কিনবো।

– মনে হয়না এখানে কোথাও পাওয়া যায়, আমি বরং বাংলাদেশে গেলে আপনার জন্য একটা নিয়ে আসবো। তবে, কেন আপনার লুঙ্গি ভালো লাগে জানতে পারি?

আমি মূলতঃ জিমে এটা ব্যবহার করবো, আপনার মতো। দেখতে ভালো লাগে।

কথার ফাঁকে তাঁর হাতে আমার ইমিগ্রেশন কনসালটেন্সি কোম্পানি, এমএলজি ইমিগ্রেশনের একটা ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বললাম, এই ইমেইল এড্রেসে আমাকে আপনার ঠিকানা জানাবেন। দেখবেন, একখানা লুঙ্গি ঠিক ঠিক আপনার কাছে পৌঁছে গেছে একদিন।

আমার কথায় খুশি হলেন ভদ্রলোক। হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিলেন তারপর।

আমাদের দেশের লুঙ্গি একজন শ্বেতাঙ্গ বিদেশী পছন্দ করেছেন দেখে যারপরনাই ভালো লাগলো। হয়তোবা বিদেশে বাংলাদেশের লুঙ্গি রফতানির বড়ো ধরণের সুযোগ রয়েছে; দেশের কাপড় ব্যবসায়ীরা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন।

এবার শুনুন আমার নিজ জেলা চট্টগ্রামের এক কলেজ অধ্যক্ষের কাহিনী।

বছর বিশেক আগের কথা। ভদ্রলোক এতদিন বেঁচে নেই হয়তো। লুঙ্গি পরেই যেতেন যে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে।

কেউ তাঁকে বিয়েশাদীতে দাওয়াত দিতে গেলে তিনি প্রথমেই জানতে চাইতেন লুঙ্গি পরে দাওয়াতে গেলে তাঁদের মানসম্মানের কোনো হানি হবে কিনা। যাঁরা দাওয়াত দিতে যেতেন তাঁরা আগে থেকেই বিষয়টা জানতেন। তাই, হেসেই তাঁর এ প্রশ্ন উড়িয়ে দিতেন। জনশ্রুতি আছে, এক সামাজিক অনুষ্ঠানে হঠাৎ লুঙ্গি খুলে গিয়ে তিনি খুব বিব্রত অবস্থায় পরে গিয়েছিলেন; তারপরও নাকি লুঙ্গি ছাড়েননি। লুঙ্গি তাঁর এতটাই প্রিয় ছিল।

প্রিন্সিপ্যাল সাহেবের লুঙ্গির ব্যবহার আমার মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে নেদারল্যান্ডে পড়াশোনার শেষদিকে ইউট্ক্ট ইউনিভার্সিটি থেকে নগর পরিকল্পনায় মাস্টার্স ডিগ্রির সার্টিফিকেট গ্রহণের অনুষ্ঠানে আমি লুঙ্গি পরেই হাজির হয়েছিলাম।

এদিকে আমার দেখাদেখি লুঙ্গিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে কানাডায় আমার পরবর্তী প্রজন্মও। আমাদের দুই ছেলে আর আমি বাসায় লুঙ্গি পড়ি। লুঙ্গির উপরের কিনারার দুই পয়েন্ট দুদিকে টেনে কিভাবে নাভির দুধারে কোমরে গুঁজে দিতে হয় তাও বেশ শিখে গেছে কানাডায় জন্ম নেয়া বাচ্চারা।

দু’ছেলের ছোটজন, ১০ বছরের আয়মানকে সেদিন প্রশ্ন করলাম: বলতো বাবা, তুমি লুঙ্গি পছন্দ করো কেন?

– কারণ, লুঙি পড়লে মনে হয় আসলে কিছুই পড়ি নাই; প্যান্ট তো শরীর চেপে ধরে রাখে।

ওর উত্তর শুনে পরিবারের সবাই হেসে খুন। আমরা হাসলেও আয়মান কিন্তু অযৌক্তিক কিছু বলেনি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে বাতাসের আর্দ্রতা খুব বেশি, সেখানে প্যান্টের চেয়ে লুঙ্গি বা তেমন কোন ঢিলেঢালা পোশাক অনেক বেশি আরামদায়ক, বলার অপেক্ষা রাখে না।

যাক, হাসি থামিয়ে বড়ছেলে, মানে, ১৭ বছরের সাঈদ-এর কাছে জানতে চাইলাম সে কেন লুঙ্গি পছন্দ করে।

তার উত্তর আরো মজার। ও বললো, লুঙ্গির উপরের কিনারা ভাঁজ করে লুঙ্গিকে সহজেই খাটো বা লম্বা করা যায়; প্রয়োজনে আধাআধি ভাঁজ করে হাফ প্যান্টের মতোও বানিয়ে ফেলা যায়। তাছাড়া, বাথরুম করে মুছতেও সুবিধা।

বাহ্!, জন্ম থেকে লুঙ্গি ব্যবহার করলেও এই লুঙ্গির যে এতো গুণ তা কানাডীয় এই দুই বালকের মতো করে কখনো ভেবেছি মনে হয় না।

খানিক দম নিয়ে সাঈদ বললো, আব্বু, আমার মনে একটা প্রশ্ন আসছে, জিজ্ঞেস করবো?

– অবশ্যই।

আচ্ছা, বাংলাদেশে মানুষেরা লুঙ্গি পরে কি কাজে (অফিসে) যায়?

– না, আমি তেমনটি দেখিনি।

কেন?

– ওটা অফিশিয়াল পোশাক না, মানুষ বাসার ভেতরেই পড়ে।

অফিসে পড়ে না কেন?

যুতসই কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে শুধু বললাম, জানিনা কেন পরে না, তবে পরে না এটা ঠিক। ওকে কি আর বলতে পারি, লুঙ্গি পরে অফিসে গেলে লোকে বলবে এই লোকটা অমার্জিত, গেঁয়ো; যে কারণে আধুনিক বাঙালি মেয়েরাও বাঙালির ঐতিহ্য, শাড়ি ছুঁড়ে ফেলে শার্ট-প্যান্ট বেছে নিয়েছে আজ।

লুঙ্গি কাহিনী

[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ১০:৪২
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×