somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার স্বভাব, যেখানে অভাব

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০২৩ বিকাল ৪:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ছোটবেলা থেকেই অভাবের তাড়নায় অনেক কিছু না পেয়ে বড় হওয়া মানুষ আমি। তবে সব পরিস্থিতিতেই দুইটা অবস্থা বিরাজ করে—সুখ এবং দুঃখ। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এই মনে করেন, ভালো খাবার, পোশাক খুব কমই জুটত। বাবার আর্থিক অবস্থা যেমন ছিল, আমাদের চলাফেরাও তেমন ছিল। নিম্নবিত্ত পরিবারে যা হয় আরকি।

এবার আসি মূল ঘটনায়।
তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। আমাদের এক বিত্তবান আত্মীয়ের বাড়িতে ঘন ঘন যেতাম, যেন তারা ভালো কিছু খাওয়ার সময় আমাকেও কিছু দেয়। মার অবশ্য এসব ভীষণ অপছন্দ ছিল। আমি সেটা আমলে নিতাম না। আমার খাওয়া হলেই হতো।
তা, সেদিন ছিল পহেলা বৈশাখ। সকাল থেকেই আমি তাদের বাড়িতে ঘুরঘুর করছি। হঠাৎ তাদের বড় কর্তার নজরে এলাম। ডাক দিল আমায়। ভাবলাম, আজ তবে খেতে পারব ভালোভাবে। একটা কাগজ ধরিয়ে দিল হাতে। বলল, “এটা নিয়ে সুমনের দোকানে যা। বলবি, খালু পাঠিয়েছে।”
আমি সেটা নিয়ে ভোঁ-দৌড় দিলাম আমার দুই পায়ের হুন্ডা নিয়ে। দোকানে গিয়ে লিস্টটা দিলাম আর বললাম, “মামা, খালু পাঠিয়েছে।”
সে লিস্টটা নিয়ে আমায় দুইটা চকোলেট দিয়ে বলল, “একটা ছোট মামুনিকে দিবি, আর একটা বড় মামুনিকে। আর যদি তুই খেয়ে ফেলিস, তবে তোর খবর আছে। এখন বাড়ি থেকে বড় চটের ব্যাগ নিয়ে আয়।”
আবার দৌড়ে এসে খালাকে বললাম, “ব্যাগ দাও।” আর চকোলেটগুলো দুই রাজরানীর হাতে দিলাম। তারা চকোলেটগুলো নিয়ে আমায় বলল, “তুই তো চকোলেট খাস না, তাই না?” বলেই সজোরে হেসে উঠল।
ব্যাগ নিয়ে আবার দোকানে গেলাম। দোকানদার এতক্ষণে সব সদাইপাতি গুছিয়ে ফেলেছে। ব্যাগ হাতে নিয়েই সব ভরে ফেলল ভেতরে। প্রায় সাত থেকে আট কেজি হবে সব মিলিয়ে।
ব্যাগটা মাথায় নেওয়ার আগে বললাম, “মামা, আমাক একটা চকোলেট দিবা? ট্যাকা পরে দিয়ে দিমু, আব্বুর থেকে লিয়ে।”
সে বলল, “তোর বাপ কোনোদিন চকোলেট কিনছে? শালা ফকির, যা ভাগ।”
বলে তার পানি খাওয়ার গ্লাস থেকে কিছু পানি আমার গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে ব্যাগটা মাথায় তুলে দিল, আর বলল, “দূর হ।”
ওরে কিছু অস্বাভাবিক গালি দিয়ে দৌড়ে চলে এলাম।
ব্যাগটা বাড়ির উঠোনে রাখতেই খালা দৌড়ে এসে বলল, “এত সময় লাগে কেরে? তোরে পাঠানোই ভুল হইছে।”
বললাম, “সুমন মামা দেরি করছে।”
আর কেউ আমার দিকে ফিরে তাকাল না। আমি উঠোনেই কিছু মাটির খোলা নিয়ে খেলতে থাকলাম।
শুরু হলো রান্নাবান্নার আয়োজন। মা এসে কয়েকবার ডেকে গেল নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য। গেলাম না। ঘাড় কাত করে সেখানেই খেলতে লাগলাম।
ইলিশ মাছ ভাজা হচ্ছে। ওই বয়সে জীবনে সর্বোচ্চ পাঁচ কি ছয়বার খেয়েছিলাম, মনে হয়। সঙ্গে পোলাও, মুরগির রোস্ট, কাবাব, আর পান্তা তো আছেই।

দুপুর প্রায় হয়েই এলো। মা এসে জোরাজুরি করে বাড়িতে নিয়ে গেল। গোসল করিয়ে দিল, গায়ে-গলায় পাউডার লাগিয়ে দিল। ভাত খেতে দিল ছোট মাছের চচ্চড়ি আর ডাল দিয়ে।
হঠাৎ বলে বসলাম, “মা, আজ খালা ওদের ওখানে খেতে বলছে।”
মা বলল, “সত্যি তো?”
আমিও বললাম, “হ, সত্যি কচ্ছি। আজ সকালে আমাক দিয়ে দোকান থেকে সদাই নিয়ে আসিছে, আর তখন কৈছে এখানে আজ দুপুরে খাস।”
মা ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে ঈদের নতুন পাঞ্জাবিটা বের করে পরিয়ে দিল। নিজে হাতে ধরে মাথার চুল আঁচড়ে দিয়ে বলল, “যা, আর কারও সঙ্গে কোনো শয়তানি যেন করিস না।”
আমি দিলাম জোরসে দৌড়, যেন ওদের খাওয়া শেষ না হয়ে যায়।
যেয়ে দেখি, ওরা খেতে বসে গেছে। আমি কুত্তার মতো দরজার সামনে দাঁড়ালাম।
খালা বলল, “এই জগটা নিয়ে কলেরপাড় থেকে পানি নিয়ে আয় তো।”
বিন্দুমাত্র দেরি না করে দৌড় দিয়ে এক জগ পানি নিয়ে এসে দিলাম। সবাই খাওয়ায় ব্যস্ত।
কর্তা, মানে আমার শ্রদ্ধেয় খালু, বলল, “কিরে, আজ কী দিয়ে খাইছিস দুপুরে?”
বললাম, “খাইনি এখনো। খামু একটু পরে, আব্বু আসলে।”
খালা বলল, “তোর মা কী দিয়ে রান্দিছে?”
বললাম, “ছোট মাছের চচ্চড়ি আর ডাল।”
খালা বলল, “সারাজীবন তোর মা এইডাই খাওয়ালো, আর কিছু চোখে পড়ে না? তোর পায়ে ময়লা অনেক। যা, বাড়িতে যেয়ে ধুয়ে নে।”
আমিও অভিমান নিয়ে বললাম, “হ, খালি এগুলাই খিলায় আমার মাও। আর কিছু চোখেত পড়ে না।”
ফিরে আসছিলাম, তখন খালা ডাক দিল আবার।
ঝড়ের গতিতে ফিরে তাকালাম।
বলল, “বিকেলে একবার আসিস, তোরে দিয়ে ডাব পারামু।”
“আচ্ছা,” বলে চলে গেলাম খেলার মাঠে।
সেদিন মাঠটাও অনেক দূর দূর মনে হচ্ছিল।
মা আজও জানে, সেদিন আমি খেয়েছিলাম তাদের ঘরে।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩
১৪টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদীরের জুলাই আন্দোলন: কারণটা কি একান্ত ব্যক্তিগত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০১


সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮



ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



যে কেউ যে কোনো ধরনের পোশাক পরে যে কোনো সমাজে যেতে পারেন, সাধারণত কেউ বাধা দেয় না। তবে সর্বসাধারণের ক্ষেত্রে “দৃষ্টিকটু” বলে একটি বিষয় উল্লেখ্যযোগ্য। যা সময় স্থান কাল পাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×