বাংলাদেশের উপজাতি/আদিবাসীদের মাঝে একটা বড় ধরনের বৈষম্য করা হয়,তা হল আমরা আদিবাসী বলতে শুধু পাহাড়ি আদিবাসীদের(মঙ্গলয়েড/চৈনিক বংশোদ্ভূত) বুঝি এবং তারাই প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রীয়(কোটা) সুবিধা ভোগ করে থাকে;কিন্তু সমতলেও যে আদিবাসী আছে তা অনেকেই জানে না এবং তারা সকল প্রকার আধুনিক সুবিধা বঞ্চিত।বাংলাদেশের সমতলের আদিবাসীদের বাস উত্তরবঙ্গে এবং তাদের মধ্যে বেশিরভাগই সাঁওতাল।এছাড়া তাদের বড় অংশের বাস পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলসহ ঝাড়খণ্ড,বিহার,উড়িষ্যায়।এই সাঁওতালদের রয়েছে বর্ণিল ইতিহাস-ঐতিহ্য,যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন যা তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারত সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।সাঁওতাল সহ আরো অন্যান্য কৃষ্ণবর্ণের সমগোত্রীয় জাতের (যেমন-মুন্ডা)পূর্বপুরুষ হল অস্ট্রিক জাতি বা প্রোটো-অস্ট্রালয়েড যাদের বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন আরিয়ান,দ্রাবিড়,অ্যারাবিয়ান তো বটেই পাহাড়ি আদিবাসীদের পূর্বপুরুষ তিব্বতীয়/মঙ্গলয়েড-দের চেয়েও অনেক পুরনো।আমরা বাঙ্গালিরা সংকর জাতি এ কথা সারাজীবন শুনে এসেছি কিন্তু কাদের মিশ্রনে আজকে আমরা একটা জাতি তা কি জানি? বাঙালি বা বেশিরভাগ ভারতীয় জাতি গঠনের প্রধান উপাদান হল এই অস্ট্রালয়েড জাতি,সাঁওতালরা যাদের বংশধর।আমাদের জনসংখ্যার বেশিরভাগের মধ্যে এই অস্ট্রিক জাতির সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।সেই আদি অস্ট্রিক জাতির মধ্যে যারা বহিরাগত শক্তির কাছে মাথানত করে মূলধারার মধ্যে মিশে যায় নি বরং নিজেদের স্বতন্ত্রভাবে স্বকীয়তা বজায় রেখে(এই কারনে আমি আদিবাসীদের উপজাতি না বলে স্বতন্ত্রজাতি বলার পক্ষপাতি) আলাদা জাতি হিসেবে সুপ্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত “সারভাইভ” করে যাচ্ছে তারাই আজ আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের হাতে নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার।রাজশাহী,রংপুর,দিনাজপুর,বগুড়া সহ আমার নিজ জেলা নওগাঁতেও সাঁওতালরা ব্যাপক বঞ্চনার শিকার বিশেষ করে ভূমি অধিকারের প্রশ্নে।যেই সাঁওতালরা আদিকাল থেকেই এ অঞ্চলে বসবাস করে যাচ্ছে আমরা তাদেরকেই জমির মালিক করতে রাজি নই!শুধু জমি-জমা নয় সেই হাজার বছর ধরেই আমরা তাদের সাথে সকল বিষয়ে বৈষম্য করে যাচ্ছি,বৈষম্য করেছিল ৫ হাজার বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে আগত আরয্য বা আরিয়ানরা(উচ্চবর্ণের হিন্দু),বৈষম্য করেছিল ১ হাজার বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে আগত অ্যারাবিয়ান-ইরানিয়ান/মুসলিমরা সহ বিভিন্নসময়ে আগত আরো নানা বহিরাগত জাতি,আর এখনো তাদের সাথে বৈষম্য করে যাচ্ছি এইসকল জাতির মিশ্রণ বা সংকর এই বাঙালি জাতি।অথচ হাজার বছরের এই বঞ্চিত জাতিটি যে কি অসাধারণ সরল মনের অধিকারী তা আমাদের চিন্তারও বাইরে।আমার গ্রামের বাড়ি নওগাঁর বদলগাছি এলাকাতে যেখানে প্রচুরসংখ্যক সাঁওতালের বাস,এমনকি আমার গ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী সাওতাল।গ্রামে মাঝে মধ্যে বেড়াতে গেলে এদের নামে শুনেছি নানা বদনাম যেন সৃষ্টিকর্তা এদের সৃষ্টি করে ভুলই করে ফেলেছেন!সত্যি কথা বলতে আমিও এদেরকে দেখে ভয়ই পেতাম ছোট বেলায় আর ভাবতাম না জানি কোন এলিয়েন এরা!!বাঙালি সমাজ এদেরকে একরকম একঘরে করে রেখেছে,রেস্টুরেন্ট গুলোতে পর্যন্ত খাবার অধিকার তাদের নেই(আর আমরা নিজেদের আধুনিক দাবি করি!)একসময়ের ছোট আমি বড় হয়েছি,সত্য জেনেছি আর চিনেছি এইসব অসাধারণ সহজ সরল মানুষদের,আর অবাক হয়েছি আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালিদের মূর্খতা আর ভন্ডামি দেখে।
উন্নতবিশ্বে আদিবাসীদের অভিহিত করা হয় indigenous হিসেবে যার মানে যারা কিনা নিজেদের স্বাতন্ত্র বজায় রেখে মূলধারার সাথে মিশে যায় নি,আর এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমাদের সরকার তাদের বলছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী(যা অপমানজনক)।শেষ করতে চাই সরকারের কাছে এই আবেদন জানিয়ে যে সাঁওতাল সহ উত্তরবঙ্গ তথা সমতলের সকল আদিবাসীদের জন্য চাই পাহাড়ি আদিবাসীদের মত সমান সুযোগ-সুবিধা।আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হোক প্রতিটি মানুষের সমান মর্যাদা।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



