
আগেই যদি জানা যায় যে ভ্রুণে ধর্ষণ করার প্রবৃত্তির জিনেটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে তখন তার ডিএনএ থেকে ক্রিসপ্রাপ কাস-নাইন প্রযুক্তি দিয়ে ওই বৈশিষ্ট্য কেটে বাদ দেয়া কি সম্ভব হবে? হয়তো কোনদিন হবে, তবে যেটা হয়েছে তা হল জিনেটিক রোগ থেকে মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়েছে। এই প্রযুক্তি আবিষ্কার করে রসায়নে ২০২০ সালের নোবেল পুরস্কার পেলেন দুই নারী গবেষক এমানুয়েল শারপন্টিয়ের এবং জেনিফার ডাউডনা৷ ফরাসি আণবিক জীববিজ্ঞানী এমানুয়েল শার্পঁতিয়ের বার্লিনের মাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট ফর ইনফেকশন বায়োলজির অধ্যক্ষা৷ তাঁর আবিষ্কৃত একটি ‘টুল' ডিএনএ কাটাছেঁড়া করার মূল পন্থা হয়ে উঠেছে৷ যন্ত্রটির নাম হল ক্রিসপ্রার কাস-নাইন যাকে কাঁচির সাথে তুলনা করা হচ্ছে। ক্রিসপ্রার-কাস-নাইন হল সেই বস্তু, যা ডিএনএ-র উপাদানগুলোকে অতি সহজে, দ্রুত ও নিখুঁতভাবে বদলে দিতে পারে৷ এটি ৬/৭ বছর আগের আবিষ্কার। এই গবেষণার ফলে ক্যানসার বা বংশানুক্রমিক অসুখবিসুখ সারানো সম্ভব হবে। শস্য উৎপাদনে যুগান্তরকারী সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যেমন চীনাবাদাম থেকে অ্যালার্জি উৎপাদনকারক বৈশিষ্ট কেটে বাদ দিলে ওই চীনাবাদামে অ্যালার্জি উৎপাদক কিছু থাকবে না৷ ক্রিসপ্রার-কাস-নাইন যেরকম ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, এ ধরনের একটি বড় আবিষ্কার করা সহজ ছিল না। সেজন্য সেই ২০১৪ সাল থেকেই মনে করা হচ্ছিল- এ আবিষ্কারক নোবেল পাওয়ার দাবি রাখে।

যদি কোনদিন বাস্তবিকই আসে মানুষের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য বদলে দেয়ার কাঁচি তখন নৈতিক অনৈতিক সব বিতর্ক বাদ দিয়ে যত্রতত্র এই কাচি চালানো দরকার হবে। ধর্ষক, নেশাগ্রস্থ, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ, দুষ্টু শীর্ষ কর্মকর্তা, মিথ্যাবাদী নির্বাচন কমিশনার, ভ্রষ্ট সংসদ সদস্য- যে কারো মধ্য থেকেই চাইলেই দোষত্রুটিগুলো দূর করা সম্ভব হয় না। তাদের দুষ্টু ডিএনএগুলো চলে যায় সন্তানদের মধ্যে। তাদের সন্তানরাও হয়ে উঠে নষ্টভ্রষ্ট মানুষ। সমাজ আর বদলাতে চায় না। এই কাঁচি চালিয়েই নষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোকে কাঁচি কাটা করা সম্ভব হলেই কেবল পৃথিবী সভ্য হবে। এগুলো এখনো সুদূরে! তাহলে এই আবিষ্কারে কি ঘটবে?

জিন ঘটিত বহু রোগ আছে এখনও পর্যন্ত যার চিকিৎসাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই নয়া চিকিৎসা পদ্ধতিতে মানব জাতির উন্নয়নে বিশাল একধাপ এগোনো যাবে। ডিএনএ পরিবর্তন করে সারিয়ে ফেলা সম্ভব হবে বিরল সব জিন ঘটিত রোগ। এই আণবিক কাঁচি দিয়ে মানুষের জিনোমে অবাঞ্ছিত অংশগুলি বাদ দিয়ে সেখানে নতুন ডিএনএ প্রতিস্থাপন করতে পারবে। মানুষের ক্ষেত্রে কতকগুলি অটোজোমাল ও সেক্স ক্রোমোজোমাল জিন ঘটিত রোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে। এমন কয়েকটি জিন ঘটিত রোগ হলো- থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া, ব্লাউ সিনড্রম, বর্ণান্ধতা, সিকল সেল এনিমিয়া, ডাওন সিনড্রোম, ডায়াবেটিস, মাসকুলার ডিসট্রফি (মাংসপেশিতে একধরনের দুর্বলতা), সিস্টিক ফাইব্রোসিস, ব্রেস্ট ক্যানসার, ফুসফুসের ক্যানসার, কোলন ক্যানসার ইত্যাদি। বিজ্ঞানীরা ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো মানব ভ্রূণ থেকে একটি ত্রুটিপূর্ণ ডিএনএ সরিয়ে নিতে সক্ষম হন। ওই ডিএনএটির কারণে প্রাণঘাতী একটি হৃদরোগ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একজনের কাছ থেকে আরেকজনের শরীরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে ওই রোগ থেকে মুক্ত শিশুর জন্ম হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অগ্রগতির ফলে এরকম বংশ পরম্পরায় চলে আসা ১০ হাজারেরও বেশি ত্রুটি বা স্বাস্থ্য সমস্যা সংশোধন করার দরজা খুলেছে। এই নোবেল বিজয় এই গবেষণাকে আরো ত্বরান্বিত করবে, আরো সুখবর বয়ে আনবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

