
জুলাই চার্টার বা জুলাই সনদ কেবল একটি আইনি দলিল নয়; এটি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের রক্তস্নাত প্রেক্ষাপটে রচিত একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract)। জ্যঁ-জ্যাক রুশো তার দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট গ্রন্থে বলেছিলেন, “Man is born free, and everywhere he is in chains” (মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত)।
জুলাই চার্টার সেই শৃঙ্খল ভাঙার দলিল। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের পূর্ববর্তী সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্র যথাক্রমে পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ ব্যবহৃত হয়েছিল ভিন্নমত দমনে, যা একটি ভয়ের সংস্কৃতি (Culture of Fear) তৈরি করেছিল। জুলাই পরবর্তী সময়ে, হাজারো ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ ও হত্যার মাধ্যমে যে ট্রমা বা মানসিক আঘাত সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরাময়ের একমাত্র পথ হলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আমূল সংস্কার।
এই সনদের প্রতিটি প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া মানে সেই শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করা এবং ভবিষ্যৎ ফ্যাসিবাদের পথ চিরতরে রুদ্ধ করা।
প্রস্তাব ১: রাষ্ট্রভাষার সম্প্রসারণ
বর্তমান সংবিধানের ৩(১) অনুচ্ছেদে কেবল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিধান ভাষাগত সংখ্যালঘুদের মনে ‘হীনম্মন্যতা’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ তৈরি করে। প্রস্তাবটি হলো চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতালসহ অন্যান্য মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
চার্লস টেলর তার Politics of Recognition তত্ত্বে বলেন, "Non-recognition or misrecognition can inflict harm, can be a form of oppression" (স্বীকৃতি না দেওয়া বা ভুল স্বীকৃতি নিপীড়নের একটি রূপ হতে পারে)। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি পিয়ের বোর্দিউর মতে, ‘সিম্বলিক পাওয়ার’ বা ‘প্রতীকী ক্ষমতা’। যখন রাষ্ট্র একটি ভাষাকে স্বীকৃতি দেয় না, তখন সেই ভাষাগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় সেবার বাইরে ঠেলে দেয়।
প্রশ্ন: এতে কি বাংলা ভাষার গুরুত্ব কমবে এবং প্রশাসনিক ব্যয় বাড়বে না?
উত্তর: এটি একটি ‘জিরো-সাম গেম’ (Zero-sum game) নয় যে, একটার লাভ মানে অন্যটার ক্ষতি। কানাডায় ইংরেজি ও ফরাসি এবং ভারতে ২২টি ভাষা থাকার পরেও তাদের ঐক্য অটুট আছে। বরং বহুভাষিকতা বাংলাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। প্রশাসনিক ব্যয় মানবসম্পদ উন্নয়নের (ঝরে পড়া রোধ) দীর্ঘমেয়াদী লাভের তুলনায় নগণ্য।
প্রস্তাব ২: নাগরিক পরিচয়—‘বাঙালি’ বনাম ‘বাংলাদেশি’
সংবিধানে নাগরিকদের ‘বাঙালি’ বলা একটি জাতিগত (Ethnic) পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার শামিল, যা আদিবাসীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে। প্রস্তাবটি হলো ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় গ্রহণ করা।
আর্নেস্ট রেনান তার “What is a Nation?” প্রবন্ধে বলেন, "A nation is a daily plebiscite" (জাতি হলো একটি দৈনন্দিন গণভোট)। জাতি রক্ত বা ডিএনএ দিয়ে তৈরি হয় না, এটি তৈরি হয় নাগরিকদের সম্মিলিত ইচ্ছায়। ‘বাঙালি’ পরিচয়টি এক্সক্লুসিভ (বর্জনীয়), কিন্তু ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়টি ইনক্লুসিভ (অন্তর্ভুক্তিমূলক) বা ‘সিভিক ন্যাশনালিজম’।
প্রশ্ন: এটি কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী নয়?
উত্তর: মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’। ১৯৭১ সালে অনেক উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ যুদ্ধ করেছিলেন। তাদের ‘বাঙালি’ হতে বাধ্য করা কি সেই সাম্যের চেতনার লঙ্ঘন নয়? ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরও সর্বজনীন করে।
প্রস্তাব ৩: বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি
রাষ্ট্রকে ‘এককেন্দ্রিক’ সংস্কৃতির বদলে ‘বহু-সাংস্কৃতিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
উইল কিমলিকা তার “Multicultural Citizenship”-এ যুক্তি দেন যে, সংখ্যালঘু অধিকার নিশ্চিত করা উদার গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র যখন একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়, তখন অন্যরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ হয়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।
প্রস্তাব ৪-৫: জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি ও শহীদদের সম্মান
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান।
জর্জ সান্তায়ানা বলেছিলেন, "Those who cannot remember the past are condemned to repeat it" (যারা অতীত মনে রাখে না, তাদের অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটে)। আবু সাঈদের মতো নিরস্ত্র ছাত্রের বুকে গুলি চালানোর ঘটনা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতীক। এই স্বীকৃতি কেবল সম্মান নয়, এটি একটি ‘ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা’ যে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস।
প্রশ্ন: এটি কি জাতিকে বিভক্ত করবে না?
উত্তর: না, বরং এটি সত্য ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’র মতো এটি ক্ষোভ প্রশমনে সাহায্য করবে।
প্রস্তাব ১১: প্রধানমন্ত্রীর কার্যকাল সীমা—সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ
মানে হলো, এক ব্যক্তি আজীবন বা দীর্ঘকাল প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
লর্ড অ্যাক্টনের সেই বিখ্যাত উক্তি, "Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely" (ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে)। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতা (Long-term incumbency) একজন শাসককে ‘নার্সিসিস্টিক’ বা আত্মমুগ্ধ করে তোলে, যেখানে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রের চেয়ে বড় এবং অপরিহার্য ভাবতে শুরু করেন।
প্রশ্ন: উন্নয়নের ধারাবাহিকতার জন্য কি দীর্ঘমেয়াদী শাসন দরকার নেই?
উত্তর: এটি একটি স্বৈরাচারী প্রপাগান্ডা। উন্নয়ন ব্যক্তির ওপর নয়, প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে। জাপানে বা যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত শাসক পরিবর্তন হলেও উন্নয়ন থামেনি। বরং দীর্ঘমেয়াদী শাসন দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে, যা সুষম উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।
প্রস্তাব ১৬: তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন বাতিলের প্রস্তাব।
স্যামুয়েল হান্টিংটনের Third Wave of Democratization অনুযায়ী, নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা গণতন্ত্র টিকে থাকার পূর্বশর্ত। বাংলাদেশে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, দলীয় সরকার কখনো নিরপেক্ষ হতে পারে না।
প্রশ্ন: অনির্বাচিত সরকার কি গণতান্ত্রিক?
উত্তর: একটি ‘নির্বাচিত স্বৈরাচার’ (Elected Dictatorship) যারা দিনের ভোট রাতে করে, তাদের চেয়ে স্বল্পমেয়াদী অনির্বাচিত সরকার যারা জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়, তারা শতগুণ বেশি গণতান্ত্রিক। এটি জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন বা রুশোর ‘জেনারেল উইল’ নিশ্চিত করে।
প্রস্তাব ২৬: দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ
জাতীয় সংসদ (নিম্নকক্ষ) এবং সিনেট (উচ্চকক্ষ) গঠন।
মন্টেস্কু তার “The Spirit of the Laws” গ্রন্থে ক্ষমতার বিভাজন তত্ত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "To prevent this abuse, it is necessary from the very nature of things that power should be a check to power" (ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে ক্ষমতার দ্বারা ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক)।
এককক্ষ বিশিষ্ট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যা খুশি আইন পাস করে (যেমন: পঞ্চদশ সংশোধনী)। উচ্চকক্ষ থাকলে তড়িঘড়ি করে স্বৈরাচারী আইন পাস করা কঠিন হবে এবং সমাজের গুণীজন ও সংখ্যালঘুরা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিতে পারবেন।
প্রস্তাব ৫৬: নির্বাচন কমিশন নিয়োগে সংস্কার
প্রধানমন্ত্রীর পকেটের লোক দিয়ে কমিশন গঠনের পরিবর্তে সাংবিধানিক পদাধিকারীদের সমন্বয়ে সার্চ কমিটি।
জন রলসের “Veil of Ignorance” বা “অজ্ঞতার পর্দা” তত্ত্ব অনুযায়ী, ন্যায়বিচারের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। বহুপক্ষীয় কমিটি নিশ্চিত করবে যে কমিশন কোনো দলের অনুগত নয়। বিগত তিনটি নির্বাচনে রকিবউদ্দীন বা নুরুল হুদা কমিশনের মতো ‘মেরুদণ্ডহীন’ কমিশন জাতির সাথে প্রতারণা করেছে।
প্রস্তাব ৪১-৪৪: বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা
বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ পৃথক করা।
আলেকজান্ডার হ্যামিলটন “Federalist No. 78”-এ বিচার বিভাগকে "Least Dangerous Branch" বললেও এর স্বাধীনতা আইনের শাসনের রক্ষাকবচ। বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার জোরপূর্বক পদত্যাগ প্রমাণ করে বিচার বিভাগ কতটা পরাধীন ছিল। বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে নাগরিকের শেষ আশ্রয়স্থল থাকে না।
প্রস্তাব ৬৬-৬৭ ও ৭৬: স্থানীয় সরকার ও পুলিশ সংস্কার
পুলিশকে রাজনৈতিক লাঠিয়াল বাহিনী থেকে জনবান্ধব বাহিনীতে রূপান্তর এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।
২০২৪-এর জুলাই মাসে পুলিশ যেভাবে পাখির মতো মানুষ মেরেছে, তা প্রমাণ করে পুলিশ রাষ্ট্রীয় বাহিনী থেকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন পুলিশকে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করবে। জন স্টুয়ার্ট মিলের মতে, স্থানীয় সরকার হলো গণতন্ত্রের প্রাথমিক বিদ্যালয়; এর স্বায়ত্তশাসন দুর্নীতি কমায় এবং জবাবদিহিতা বাড়ায়।
প্রস্তাব ৮১-৮৪: দুর্নীতি দমন ও সুশাসন
স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সেবার অটোমেশন।
দুর্নীতি কেবল নৈতিক সমস্যা নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান বাধা। বিশ্বব্যাংকের মতে, দুর্নীতি কমালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।
সর্বশেষ, ‘হ্যাঁ’ ভোটের অপরিহার্যতা
এই চার্টারের প্রতিটি প্রস্তাব কোনো খামখেয়ালি চিন্তা নয়; এগুলো ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং মানব মনস্তত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণের ফসল।
যথাক্রমে ১৯৫২, ১৯৭১ এবং ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের পর আমরা রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছিলাম বলেই ২০২৪-এ আমাদের রক্ত দিতে হয়েছে।
আজ যদি আমরা এই সংস্কারগুলোতে ‘না’ বলি বা নীরব থাকি, তবে আমরা পরোক্ষভাবে আরেকটি স্বৈরাচারের পথ প্রশস্ত করব।
জুলাই চার্টারে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া মানে:
১. শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা: তাদের রক্ত বৃথা যেতে না দেওয়া।
২. ন্যায়বিচার: রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও বৈষম্যের অবসান।
৩. নিরাপত্তা: এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে পুলিশ রক্ষক হবে, ভক্ষক নয়।
৪. মর্যাদা: যেখানে প্রতিটি নাগরিক, সে যে ধর্মের বা যে ভাষারই হোক, সমান মর্যাদা পাবে।
অতএব, চতুর রাজনৈতিক অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে, নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই সনদের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



