

১৮ই জুলাই রাত ৮টার কিছু পরেই সমগ্র বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়। এর আগেই সমগ্র দেশে মুঠোফোনের ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়। দেশের মানুষ গুলিবিদ্ধ পাখির মতো ছটফট করতে থাকে আন্দোলনের খবরের জন্য। তাঁদের প্রিয়জনের খবরের জন্য। তাঁরা নিরাপদে আছে কিনা, কোনো বিপদ হলো কিনা। কিন্তু নির্মম সত্য তখন মোবাইলে সিম্পল কল ও যাচ্ছিল না। সকল ধরনের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়, বন্ধ হয় সকল ব্যাংক এর এটিএম বুথ। জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য যেসব রুগীদের টাকার প্রয়োজন ছিল তাঁরা উম্মাদের মতো ছুটতে থাকে এটিএম বুথ থেকে এটিএম বুথ। বারবার চেষ্টা করতে থাকে মোবাইলে কোনো টাকার ব্যবস্থা করার প্রিয়জনের কাছ থেকে, কিন্তু টাকা আসবে কীভাবে! সব কিছু বন্ধ করে দিয়ে চুপ করে বসে ছিল ডাইনি রানি, ওর আগে দেয়া হুমকি সত্য হয়। পুরো দেশে নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মানুষ প্রিপেড মিটারে টাকা রিচার্জ করতে না পেরে বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে পড়ে। দুর্বিষহ ৫দিন কাটে বাংলাদেশের মানুষের।
এরপর রাজপথে নামে ডাইনি রানির হায়না বাহিনী। পৈশাচিক তাণ্ডব চালায় পুরো দেশ জুড়ে। এদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি নিষ্পাপ শিশুরাও। ঘরের মধ্যে থাকা বাবা-মায়ের কোলেও কোনো শিশু নিরাপদ ছিল না যেটার প্রমাণ দেশের সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ দেখেছে। এই গণ আন্দোলনকে দমাতে পৈশাচিক হয়ে ওঠে ডাইনি রানি। হেলিকপ্টারে করে অজানা স্থানে পালিয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। পরে গর্ত থেকে বের হয়ে আবারও নারকীয় তাণ্ডব শুরু করে। তরুণদের তাজা রক্তের বন্যা বইয়ে দেয় পুরো দেশ জুড়ে।
ডাইনি রানির হায়না বাহিনী এই গণআন্দোলন দমাতে একাত্তরের হানাদার বাহিনী থেকেও বর্বর-নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করে! নিরস্ত্র মানুষের ওপর বেআইনি অস্ত্র দিয়ে বেআইনি ভাবে গুলি চলায়। কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ে।
হায়নার পাল গুলো এতটাই নির্মম বর্বর ছিল যে; ওদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি নিষ্পাপ ফুলের মতো শিশু গুলো। গুলি-বন্দুক শব্দ গুলো বোঝার আগেই শহিদ হয় মাথায় গুলি বিদ্ধ হয়ে।
ছোট শিশুটি ছাদে খেলছিল, তাঁর মাথায় এসে লাগে গুলি। তাঁর বাবা হাজার কোটি চেষ্টা করেও শিশুটিকে বাঁচাতে পারেনি। রাস্তায় গুলি, গ্রেনেড এর শব্দে ভয় পেয়ে জানাল বন্ধ করতে আসা শিশুটি কী বুঝেছিল তাঁর চোখে গুলি বিদ্ধ হয়ে সেই গুলি মাথা ভেদ করে অপর পাশ থেকে বেরিয়ে যাবে? বাসা থেকে বেরিয়ে খেলতে যাওয়া শিশুটি হয়ত জানত না তাঁর আর ঘরে ফেরা হবে না। তাঁর লাশ পাওয়া যাবে মেডিক্যালের মর্গে। বুক থাকবে বেআইনি অস্ত্রের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত। যে শিশু গুলো প্রাণ দিয়েছে ওদের কী দোষ ছিল? ওরা তো হিংসা-বিদ্দেষ, রাজনীতি বোঝে না!
১৮ জুলাই সকালের দিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের জন্য জড়ো হয় নিরস্ত্র শিক্ষার্থীরা। সেখানে অতর্কিতভাবে আক্রমণ করে ডাইনি রানির হায়না বাহিনী। নিরস্ত্র শিক্ষার্থীরা যখন ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থান নেয় তখন হায়না বাহিনী ক্যাম্পাসের ভেতর বেশ কিছু কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এটা United Nations Basic Principle on the Use of Force and Firearms by Law Enforcement Officials অনুযায়ী সম্পূর্ণ রূপে বেআইনি। কোনো অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানুষের ওপর অপ্রয়োজনীয় বল প্রয়োগ করতে পারেন না। এবং কোনো বদ্ধ জায়গাতে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করতে পারেন না। কারণ; বদ্ধ জায়গাতে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করা হলে সেটা প্রাণঘাতী হতে পারে। হয়েছিলও তাই; ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু নিরস্ত্র শিক্ষার্থী, হায়না বাহিনীর কাঁদুনে গ্যাসনের প্রভাবে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ভয়াবহভাবে শ্বাসকষ্ঠ শুরু হয় নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের। নিজের চোখের সামনে নিজের বন্ধুদের এভাবে কাতরাতে দেখলে কার মাথা ঠিক থাকে? নিরস্ত্র শরণার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে আসে; তখন হায়না বাহিনী তাঁদের ওপর নির্বিচারে-নির্দয়ভাবে গুলি চালায়। বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী শহীদ হন। এখানে হায়না বাহিনী ব্যবহার করে বেআইনি পাখি মারার (সররা) গুলি। যেগুলো এইম করে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক থেকে শিক্ষার্থীদের বুকে ও চোখে ফায়ার করা হয়।
১৮ই জুলাই "এমআইএসটি" বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেইখ আসাবুল ইয়ামিন সাভারে আন্দোলনরত অবস্থায় হায়না বাহিনীর বেআইনি গুলি বিদ্ধ হয়। গুলি বিদ্ধ অচেতন ইয়ামিনকে এপিসি এর ওপর উঠিয়ে রাখে হায়না বাহিনী। পরে এপিসি এর ওপর থেকে গুলিবিদ্ধ অচেতন ইয়ামিনকে টেনেহিঁচড়ে সরাসরি রাস্তায় ফেলে দেয়। এসময় ইয়ামিনের মাথা সরাসরি রাস্তায় আঘাত করে। নির্দয়-নির্মম হায়না বাহিনী এভাবেই ফেলে রেখে চলে যায় আহত-গুলিবিদ্ধ ইয়ামিনকে। পরবর্তীতে ইয়ামিন শহীদ হন। তাঁর বুকের বামপাশে পাওয়ায় সেই বেআইনি পাখি মারা (সররা) গুলির ক্ষতবিক্ষত আঘাত। United Nations Basic Principle on the Use of Force and Firearms by Law Enforcement Officials এর ধারা-৫(সি) অনুযায়ী হায়না বাহিনীর এই নির্মাণ আচরণ অবৈধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তব্য হলো দ্রুততম সময়ে আহত ব্যক্তিকে সাহায্য করা এবং তাঁকে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স দেয়া। কিন্তু ওরা তো হায়না বাহিনী! যাকে ওরাই গুলি করেছে তাঁকে আবার কীসের সাহায্য? কীসের হসপিটালে নেয়া!
এছাড়াও অসংখ্য ভিডিওতে দেখা যায়; ডাইনি রানির হায়না বাহিনী যুদ্ধের সমরাস্ত্র নিয়ে রাজপথে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেমেছে। নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে "একে সিরিজ এর আস্যাল্ট রাইফেল, চাইনিজ টাইপ ৫৬-১ অসল্ট রাইফেল, ১২ গেইজ শর্ট গান, ৩৭/৩৮এমএম এর গ্রেনেড লঞ্চার" প্রয়োগ করতে। এই অস্ত্রগুলো যুদ্ধের অস্ত্র। সম্মুখ সমরে এগুলো ব্যবহার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কখনোই এই যুদ্ধ অস্ত্র নিরস্ত্র মানুষের ওপর প্রয়োগ করতে পারেন না।
এছাড়া ডাইনি রানীর হায়না বাহিনী অবৈধ ভাবে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষার জন্য দেয়া "UN" লোগো সম্বলিত সাদা রং এর এপিসি এবং হেলিক্যাপ্টর ব্যবহার করেছে বর্বর গণহত্যা পরিচালনা করার জন্যে। জাতিসংঘের ম্যানডেট চড়া এসব এপিসি, হেলিক্যাপ্টর কোনো ভাবেই বিএসএসবহর করার নিয়ম নেই। পরবর্তীতে জাতিসংঘ বিবৃতি দিয়ে এই নেক্কার জনক কর্মের নিন্দা জানিয়ে এই নিন্দনীয় কর্মের এক্সপ্লানেশন চেয়েছে।
ডাইনি রানির হায়না বাহিনীর বৈধ-অবৈধ, ভালো-মন্দ জ্ঞান নেই। থাকবে কী করে? ওদের তো এ বিষয়ে কোনো ট্রেনিংই হয়নি। এরা গোলামির চাকরি পেয়েছে অবৈধ কোটার জোরে, মেধার জোরে না। এদের ডাইনি রানি বলেছে; যে যত লাশ ফেলতে পারবে তার প্রমোশন তত বেশি। ডাইনি রানিকে খুশি করতে পারলেই বেনজিরের মতো হায়নার পালের গদা হওয়া যাবে; তখন দেশের বুকে যত ইচ্ছা তত অন্যায় অবিচার করা যাবে। কালো টাকার পাহাড় গড়া যাবে। ডাইনি রানির শুধু লাশ চাই! লাশ পড়লেই ও পেটপুরে বেশি ভাত খায়!
দেশের বর্তমান অবস্থা ও আসন্ন পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে কিছু সেয়ানা গিরগিটি খুবই ধীরে ধীরে রং বদলানো শুরু করেছে। ধীরে ধীরে রং বদলিয়ে সভ্য হওয়ার চেষ্টা করছে। কোথাও-কোথাও থেকে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে; এরা নিজেরা নিজেদের সাথে কামড়া-কামড়ি করছে। মূলত ডাইনি রানি ওর হায়নার পাল গড়ে তুলেছে যাদের দিয়ে ওদের একটাও নরমাল হিউম্যান বিং না। এদের সব গুলোই অমানুষ; সাইকোপাথ, সেলফিশ, লোভী, স্বার্থান্বেষী, হিতহিতজ্ঞানহীন, চাটুকার, নারী লিপ্সু, মেন্টালি ইল! এরা এতটাই নীচ এতটাই নীচ যে; নিজের মা কে পর্যন্ত বিক্রি করবে ধর্ষকের কাছে! ডাইনি রানি খুঁজে খুঁজে সমগ্র দেশ থেকে এগুলোকে বের করে ওর পালতু হায়না বানিয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষ ডুকরে কাঁদছে! তরুণ শিক্ষার্থীরা ছটফট করছে কাটা কবুতরের মতো! শত মায়ের কান্না প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাড়া মহল্লার দেয়ালে দেয়ালে! ছোট্ট নিষ্পাপ শিশুগুলো ঠোঁট ফুলিয়ে-ফুলিয়ে বিচার দিচ্ছে বিধাতার কাছে; আমি অনেক ব্যথা পেয়েছিলাম, এএমআর মাথায় মেরেছে, বোকে দাও! প্রতিদিনই লাশ এর সংখ্যা বাড়ছে। সেই ২০২০ এর করোনার সময় প্রতিটা টিভি চ্যানেলে কতজন করনা আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে তার লাইভ আপডেট দেয়া হতো। সব সময় ডেথ কাউন্ট ভাসতে থাকত টিভি স্ক্রিন এ। কে-কার আগে নতুন ডেথ কাউন্ট করবে সেই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিল চ্যানেল গুলো। ২০২৪ এর ভয়াবহ সময়ে; যখন টিভি মিডিয়াকে জাতির সব থেকে বেশি প্রয়োজন যে সময় একটি টিভি চ্যানেলেও সেই লাইভ আপডেট, ডেথ কাউন্ট তো দূরে থাক একটি নন-বাইঅ্যাসড নিউজ করতে দেখা যায়নি। এভরি সিঙ্গেল টিভি চ্যানেলস ডাইনি রানির নাটক মঞ্চস্থ করছে। রুমালে গ্লিসারিন দিয়ে যে কুমির কান্না করছে সেটা বারবার দেখাচ্ছে! আন্তর্জাতিক মিডিয়াও যেখানে ওর এই কান্নাকে "ক্রোকোডাইল টিয়ার্স" বলছে সেখানে এই দেশের চাটুকার টিভি চ্যানেল, মিডিয়া গুলো ডাইনি রানি রচিত নাটক মঞ্চস্থ করতে ব্যস্ত।
যে দেশে মানুষের জীবন থেকে জড়ো বস্তুর দাম বেশি হয়ে যায়, সে দেশ নরক জ্বালায় জ্বলতে থাকে অবিরাম। মানুষ হয় সেই জ্বলন্ত নরকের জ্বালানি! যতদিন মানুষগুলো জ্বলে-জ্বলে খাটি সোনা না হয়, এই নরক অনল জ্বলতে থাকে।
সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই আবেদন তিনি যেন এই আন্দোলনে শহীদ পরিবার প্রিয়জনের এই বিচ্ছেদ সহজ করে দেন। তাদের মনোবল বাড়িয়ে দেন। সকল আহত যারা ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে কাতরাচ্ছে; তাদের যন্ত্রণা লাঘব করেন।
এই পৃথিবীর সকল সংগ্রামে পরিশেষে সত্যের জয় হয়েছে। বাংলাদেশেও চলমান সংগ্রামে সত্যের জয় হবেই! তিমির রাতের পরই রদ্রৌজ্জ্বল সকালের সূচনা হবে।






সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুলাই, ২০২৪ বিকাল ৩:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



