আমরা পাচ বন্ধু নির্বাচন করেছিলাম বান্দরবনকে-যে ভ্রমনের সময়কাল ছিল 11 দিন। পাহড়ি এলাকা ভ্রমণে আছে নানা প্রতিবন্ধকতা। শুরু থেকে শেষ অবাধি শুধুই হাঁটতে হবে। কখনো পাহাড়, কখনো নদী, খাল কিংবা ঘন নলখড়ার জঙ্গলঘেরা পথ। এটুকু শোনার পর যারা ভয় পাননি তারা হয়তো সাপ ও জোঁকও ভয় পাবেন না। সারা পথে এতটাই জোঁকের অত্যাচার যে, আমরা এক সময় ভয়ে ভ্রমন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তারপর সাহসই আমাদের নতুন নতুন ঝরনাগুলোর সন্ধান পেতে সাহায্য করেছে। যাত্রা শুরু বান্দরবনের রুমা থাকা থেকে। উদ্দেশ্য রুমা থেকে বগালেক, কেওক্রাডাং, সুনসুংপাড়া, বাকত্নাইপাড়া, তেজিনটং দেখে পুকুরপাড়া হয়ে এনংপাড়া। তারপর আবার রুমায় ফিরে আসা। এবার দেখা যাক বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের ঝরনাগুলো আমরা কোথায় কীভাবে পেলাম, কেমনইবা তাদের রুপ?
রিজুক ঝরনাঃ রুমা বাজার থেকে ট্রলারে এক ঘন্টার পথ। এ ঝরনাটির উচ্চতা প্রায় 60-70 ফুট। অসাধারন এ ঝরনাটিকে মাধবকুন্ডের সঙ্গে তুলনা করা চলে। রুমা খালের তীরে পাহাড় থেকেই ঝরনাটির উৎপত্তি। রুমা খাল থেকে ঝরনার পতন স্থলের দুরত্ব 25 গজ। শুধু রিজুক দেখেই মনে হয়েছিল যে বান্দরবন আসা সার্থক হলো। কোনো বির্তক ছাড়াই বলা যায়, রিজুক বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঝরনা। এ ঝরনাতে 12 মাসই পানির স্রোত থাকে। মার্চ থেকে জুলাই মাসে কিছুটা কমে যায়।
চুম্পি ঝরনাঃ সুনসাংপাড়া থেকে বাকহত্দাইয়ের পথে টাকা চার ঘন্টা হাঁটার পর একটি ঝিরি দেখা গেল। বড় পাথরের খাঁজ দেখে কৌতুহল িহয়ে সামনে গেলাম। কিছুদুর যেতেই ঝরনার শব্দ শোনা গেল। দুই মিনিট এ পথে হাঁটার পর চমৎকার এ ঝরনাটি পাওয়া গেল।উচ্চতায় ঝরনাটি 25 ফুট হবে, তবে পচন্ড স্রোতে পানি পড়ছিল। কয়েক মিনিট তাকিয়ে থেকে আবার পথ চলা শুরু করলাম।
বাকত্দাই ঝরনাঃ বাকত্দাই থেকে 30 মিনিটের পথ হাঁটতে হবে সুনসাংপাড়ার দিকে, তারপর চোরাপথ পেরিয়ে একটি খাল। খালটিতে কখনো হাঁটু জল কখনো কোমর পানি, ঝোপঝাড় অপরিচ্ছন্ন কাদা এমন পানি পথে 15 মিনিট হেটে পাথরের পাহাড়, কিছুদুর পিচ্ছিল পথ হেটেই বাকত্দাই ঝরনা। উচ্চতা প্রায় কয়েকশ ফুট। মাধবকুন্ড কিছুই না এ ঝরনার উচ্চতার কাছে। পানি খুবই কম, তবে স্রোত প্রচন্ড। আকাবাকা পাহাড়ের খাঁজে পানি ছিটকে পড়ছে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যত দুর যাওয়া যায় যেতে থাকলাম। তবুও ঝরনার ছবি তোলা যাচ্ছে না। আমাদের এ ঝরনার সন্ধান দেন বাকত্দাইপাড়ার প্রধান শিক জাও লিয়ান। তিনি বললেন, ঝরনার নীচে নামার কোন বলে নামা যায় না। কিন্তু ছবি তোলা যাচ্ছিল না তই একজন অন্যজনের হাত ধরে চেইন বানালাম। আমি ক্যামেরা হাতে সামনে। আর গাইড শেষে থেকে শক্ত করে পাথর চেপে ধরল। আমার পা থেকে পাহাড়ের শেষ অংশের দুরত্ব দুই ফুট হবে। একবার ছিটকে পড়লে নিশ্চিত মৃতু্য। তবুও হা বাড়িয়ে ক্যামেরা কিক করলাম, দুভাগ্য ছবি ভালো হয় নি।
তালবং ঝরনাঃ সুনসাংপাড়া থেকে 30 মিনিটের পথ। বিশাল আকৃতির পাথরের পাহাড়, দুদিক থেকে দুটি ঝরনা এক সঙ্গে পড়ছে। উচ্চতা দুটিরই সমান। তবে একটি প্রায় মৃত, চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ছে। অন্যটি প্রচন্ড স্রোতে ঝড়ে পড়ছে অবিরাম। এটিই তালবং নামে পরিচিত। উচ্চতা প্রায় 50-60ফুট। প্রবাহিত পানির প্রশস্ততা রিজুকের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। উচ্চতার দিক থেকে এই ঝরনাটি বাংলাদেশের তৃতীয় ঝরনা।
রুমানা পাড়া ঝরনা ঃ সুনসাংপাড়া থেকে পুকুরপাড়া সাড়ে 6 ঘন্টার পথ। 30 মিনিট হাটার পর হঠাৎ ঝরনার শব্দে মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। চারদিকে তাকিয়ে কোন ঝরনা দেখলাম না, কিন্তু শব্দ ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলাম। একটু এগিয়ে গেলাম পেছনের অভিযাত্রীরা কাছাকাছি ছিল, হঠাৎ একটি চোরাপথ দেখতে পেলাম, প্রচন্ড সঁ্যাতসেঁতে পথ, পা ফেলতেই কাঁটাযুক্ত লতায় পা জড়িয়ে চিৎপটাং।পেছনে থেকে অন্যরা চিৎকার করে ডাকছে। কিন্তু আমি তো পথ খুজছি ঝরনার। ইতিমধ্যে ডান পায়ে ব্যথার অস্তিত্ব টের পেলাম। পায়ের গোড়ালীর বেশ খানিকটা অংশ কাঁটার আঁচড়ে ছিঁড়ে গেছে। রক্ত ঝরছে বিন্দু বিন্দু। তবুও পা বাড়ালাম। দুই মিনিট পর ঝরনার শব্দ স্পষ্ট হলো। সেই সঙ্গে চোখ স্থির হলো। কতদিন ধরে ঝরছে এর পানি কেই হয়তো জানেন না। উচ্চতা 20-2 ফুট হবে। পানির পরিমানও যথেষ্ট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


