somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুই ইয়ার কথা

২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ২:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'ল' ফার্ম অথবা চার্টাড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অফিস হলে বলা যেত, জয়াবর্ধনে-সাঙ্গাকারা অ্যান্ড এসোসিয়েটস। স্রেফ ক্রিকেটের খাতিরে, তাদের পরিচয়- শ্রীলংকা !
সমসাময়িকদের মর্যাদাহানির প্রশ্নই ওঠেনা। জাতীয় দলে ভাগ আছে সবারই। কিন্তু জেল্লা ব্যাক্তির ভেতরকার রসায়নের ফসল। যেমন ধরুন, জিওফ মার্শ একবার বলেছিলেন,'মাহেলা ড্রেসিংরুমে কথা বলার সময় পিন পড়ার শব্দও শুনতে পাবেন।' কিংবা, সাঙ্গাকারার কাভার ড্রাইভের থেকেও নন্দিত তার 'কাউড্রে স্পিচ।
শ্রীলংকান ক্রিকেট দর্শনের সারবস্তু বোধহয় একটি মাত্র শব্দ-‘পরিমিত’ ? জয়াসুরিয়ার জন্মভূমি মাতারার জেলে পাড়ার রাস্তায়, যে কেউই এক পলকে চিনে ফেলবে দুই ইয়ারকে। হাতনেড়ে হাত নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা, কিংবা চোখে চোখ পড়লে সর্বোচ্চ হাসি বিনিময়। কিন্তু মৌমাছির চাকের মতো তাদের চারপাশে ভিড় জমবে না কখনোই।
কান্ডির রাস্তায় এভাবেই বেরিয়ে আসেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস। চকোলেট দুধ কেনেন ! গল-এর রথগামা সুমদ্র সৈকতে নজর কাড়তে পারেন লাসিথ মালিঙ্গা। তার ছুটি কাটানোর আদর্শ জায়গা। লেকের পানিতে ঝাঁপ দিতে ভালবাসেন। অথচ, পাশেই লাইফজ্যাকেট হাতে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকেন জীবনরক্ষাকর্মীরা ।
শ্রীলংকানদের কাছে ক্রিকেট বড়জোর জীবনের ‘অংশ’ কিন্তু ভারতীয়দের মতো 'জীবন' নয় কখনোই।
কলম্বো তাদের ক্রিকেট ঘর। কিন্তু গল গোটা ভারত মহাসাগরের কপালে নীলকান্তমণি ! পূবদিকের সুমদ্র কিনারে ৫০ মিটার উঁচু পাহাড়ের ওপর বুদ্ধের প্রার্থনাগৃহ । উত্তরপশ্চিমে ১০০ মিটার দুরে কৈলদের স্বর্ণমন্ডিত গোপুরাম। কেল্লার প্রতিরক্ষা দেয়ালের ওপর দিয়ে উঁকি দেয় সাদা ও হলুদ রংয়ের দুটি চার্চ টাওয়ার। কেল্লার ভিত্তি পর্তুগিজদের হাতে। ওলন্দাজদের ছোঁয়ায় ‘প্রকান্ড’ চেহারা পায়। ফাইন টিউনিং ইংরেজদের। আশেপাশে কোথাও মসজিদও আছে। মাঠ থেকে চোখে না পড়লেও, রোজ শুক্রবার দুপুরে আযানের ধ্বনি ভেসে আসে উপকূলের দখিনা বাতাসে। গত বছর পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে জয়াবর্ধন-সাঙ্গাকারা জুটির ব্যাটিং দেখতে স্কুলপড়ুয়াদের এখানে নিয়ে আসেন শিক্ষকেরা। ক্ষুদেদের তারা ইতিহাস দেখার সুযোগ করে দেন। লংকান ক্রিকেটের সেরা যুগলবন্দী টেস্টে একসঙ্গে ব্যাট করছেন- এমন সুযোগ রোজ রোজ আসেনা।


সামনের মে মাসে আটত্রিশে পা দেবেন জয়াবর্ধনে। বন্ধুর 'আয়ু ফলক' ছুঁতে অক্টোবর লেগে যাবে সাঙ্গাকারার। বিশ্বকাপে মনোযোগি হবে বলে আগেই টেস্ট আর টি২০-কে বিদায় বলেছেন জয়াবর্ধনে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপই লংকান জার্সিতে জয়াবর্ধনের লেট কাট কিংবা রেশমি কাভার ড্রাইভ দেখার শেষ সুযোগ। টেস্টে আরও কিছুদিন ব্যাট করার কথা ভাবতে পারেন সাঙ্গাকারা। লংকান জার্সিতে ১৫ বছর পথ চলার পর,বিশ্বকাপ শেষেই ভেঙ্গে যাবে এ জুটি। সেটা, শুধুই ক্রিকেটের মাঠে। বন্ধুত্বের উইকেটে তারা বাইশ বছর ধরে অপরাজিত। গড় অসীম।
আগের আসরে লংকান অধিনায়ক ছিলেন সাঙ্গাকারা। ফাইনালে পরাজিত বীর মাহেলা। সেঞ্চুরি করেও দলকে জেতাতে পারেননি। তার আগের আসরের ফাইনালে ঠিক একই স্বাদ পেয়েছিলেন সাঙ্গাকারা। কেনিংসটন ওভালের সেই বিতর্কিত ফাইনালে মাহেলা লংকান অধিনায়ক। সাঙ্গাকারার ৫৪ রান দলের জয় এনে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলনা। ডি সিলভা-রানাতুঙ্গাদের জেতানো বিশ্বকাপটা তাই এখনো লংকান ক্রিকেটের সবেধন নীলমনি। ইতিহাসটা কি নতুন করে লেখাতে পারবেন তারা ?
জয়াবর্ধনের ব্যাট শিল্পির তুলি। টি২০’র কসাইখানাতেও তার রুপ-রস চুঁইয়ে পড়ে। অনেকটা গলের অফুরন্ত সৌন্দর্য্যের মতো। মুগ্ধ চোখে বাউন্ডারি হজম করেছেন কত বোলার ! হাত এবং চোখের সমন্বয় কতটা নিখুঁত হলে ওরকম আলসে সুষমামন্ডিত কাভার ড্রাইভ খেলা যায় ! কি স্পিন, কি পেস- লেট কাট থাকবেই। জয়াবর্ধনে নিঃসন্দেহে তার প্রজšে§র সবচেয়ে অভিজাত ব্যাটসম্যানদের একজন। পক্ষান্তরে, সাঙ্গাকারার ব্যাট অনেক বেশি পরিণত এবং টেকনিক্যালি নিঁখুত। তুলনাহীন স্কিলকে আরও ধারাল করার চেস্টা-এটাই সাঙ্গাকারা। কাউড্রে স্পিচে তার বক্তৃতা এখনো উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করে অনেক দৈনিক। লংকানরা বাস্তবে তাদের জীবনকে যেভাবে সাজাতে চায়, ব্যাট হাতে সাঙ্গাকারা-ঠিক তাই।


দেশটিতে রাজনীতিবিদদের প্রভাব ব্যাপক। বেশিরভাগ বিলবোর্ড প্রেসিডেন্টের দখলে। এ নিয়ে লংকানদের কোন বিকার নেই। প্রেসিডেন্ট তাদের কাছে পরিবারের মতোই আপনজন। কিন্তু পার্লামেন্টের কেউই আজ পর্যন্ত ‘ব্রোমান্স’ জুটির প্রতি তাদের ভালবাসাকে টপকে যেতে পারেনি। ভারতীয় ক্রিকেটে দেবত্বদান চলে। ইতিমধ্যে কয়েকজন দাঁড়িয়েও গেছেন সেখানে। কিন্তু লংকান ক্রিকেটে ব্যক্তিপূজো একেবারেই অচল পয়সা। কোন মন্দিরের নামই ‘মাহেলা জয়াবর্ধনে’ নয়, কিংবা সাঙ্গাকারার নামে পূজো দেয়না কেউ। মানুষ বলেই হয়তো তারা ‘পূজো’র আদর্শ নন। কিন্তু মানুষ বলেই হয়তো তাদেরকে দেখে শিখতে চেষ্টা করে বাকিরা। মাঠের লেট কাট-কাভার ড্রাইভের নেপথ্যে যে বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ঘটে, সেটাই চাহিদা লংকানদের। গত বছর আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে শ্রীলংকার অন্যতম সেরা একটি অ্যাপারেল প্রতিষ্ঠান নিমন্ত্রন করে দুই বন্ধুকে। জয়াবর্ধনে-সাঙ্গাকারাকে তারা পণ্যদূত বানাতে চায়নি। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজের চাপ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। শ্রমিকদের কাউন্সিলিং করানোর প্রস্তাব দেয়া হয় জয়াবর্ধনে-সাঙ্গাকারাকে। ক্রিকেটের উইকেটে লংকানদের জীবনের মানদন্ড চুড়ান্ত সৌন্দর্য্য পেয়েছে তো তাদেরই হাতে !
অবসর জীবনে অনেক ক্রিকেটারই রাজনীতিকে বেছে নেন। এখানেও তারা ব্যতিক্রম। ‘কখনো রাজনীতি নয়’-এমন ঘোষনা দেয়া হয়েছে অনেক আগেই। লংকান রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু তাদের মনেপ্রাণে কামনা করে থাকে। তারা কোন ভেলকিবাজি না দেখালে ‘বন্ধুত্ব’ শব্দে লংকানদের আস্থা হয়তো চিরকালিন ভিত্তি পেয়ে যাবে, জয়াবর্ধনে-সাঙ্গাকারাকে দেখে।
গলেতে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই টেস্টে নিজেদের জুটিকে ১৮তম বারের মতো তিন অংকের ঘরে পৌঁছে দেন দুই ইয়ার। দুর্গে ওপর থেকে তাই দেখছিল নয় বছর বয়সি এক স্কুলপড়–য়া। ‘ক্লাসে ফিরতে হবে’-শিক্ষক তাড়া দেন। ছেলেটি দরজামুখী হওয়ার আগে একবার ফিরে তাকায় মাঠে। একশো মিটার খানেক দুরত্ব থেকে যত জোরে সম্ভব চেঁচিয়ে বলে-‘বিদায় মাহেলা, বিদায় সাঙ্গা।’ গোটা পৃথীবিতে দুই বন্ধুকে সবাই আলাদা করে চেনে তাদের ব্যাটিং সৌন্দর্য্য, আদর্শ, পরিসংখ্যান, স্টাইল এবং ব্যক্তিত্বের জন্য। কিন্তু লংকানদের কাছে তারা এসবের থেকেও বেশিকিছু। নায়ক ? বন্ধু ? নাকি দেশী ?
ধোনী একবার বলেছিলেন-‘শ্রীলংকা তো বটেই, স্বয়ং ক্রিকেটই তাদের মিস করবে।’ বাস্তবতা হলো, কারো জন্য কোনকিছুই থেমে থাকেনা। বিকল্প- হয়তো ইতিমধ্যেই খুঁজে বের করেছে লংকান ক্রিকেট। কিন্তু যে বাঁধন তাদের হৃদয়ে, তা ক্রিকেটের ব্যাকরণ বর্জিত। একাডেমি কিংবা ড্রেসিংরুমেও এ বিদ্যার খোঁজ পাওয়া যাবেনা। জীবনের সুখ-দুঃখ, অভিজ্ঞতা, শত্রু-মিত্র, জয়-পরাজয় একসঙ্গে ভাগাভাগি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ যেটা-‘অপরের সফলতায় তুষ্টির হাসি’ দিতে পারলেই কেবল এমন ‘বিদ্যা’ অর্জন করা সম্ভব।
কিন্তু,একবার খোঁয়া গেলে, শূন্যতা পূরন অত সহজ নয়।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ২:৪৫
৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে আমি কয়েকটা জিনিস বুঝতে পারলাম।

প্রথমত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×