
গল্প - দুনিয়াতেই এক টুকরো জান্নাতের মালিক বনে যাওয়ার অনুভূতি!
মুআজ। পচিশ বছরের সুদর্শন আদর্শবান এক যুবক। পড়াশোনা শেষ করেছেন মাত্র। জীবিকা নির্বাহের জন্য বংশানুক্রমে চলে আসা পুরনো ব্যবসার দিকেও মনযোগী হচ্ছেন ধীরে ধীরে। মুআজকে বিয়ে করানোর জন্য পাত্রীর সন্ধান করা হচ্ছে। শর্ত, পাত্রীকে দ্বীনদার হতে হবে। অনেক খোঁজাখুজির পরে এক স্থানে দ্বীনদার এক পাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেল। আসমা। হ্যাঁ, পাত্রীর নাম আসমা।
শরয়ী' বিধান মেনে আসমাকে দেখতে তাদের বাড়ি গেলেন মুআজ।
আসমার সাথে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা হল মুআজের। যা যা জানা দরকার আসমাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলেন তিনি। আসমারও কিছু জানার ছিল যে! একপর্যায়ে আসমা মুআজকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলেন- 'আপনি কুরআনের কতটুকু মুখস্ত করেছেন?'
মুআজ বললেন- 'তেমন বেশি কিছু করা হয়নি। তবে সর্বদা চেষ্টা করি, যেন আল্লাহ তাআ'লার একজন সৎকর্মশীল বান্দা হতে পারি'।
'আপনি কতটুকু মুখস্ত করেছেন?' - মুআজের পাল্টা প্রশ্ন।
আসমা বললেন- 'আমি আমপারা মুখস্ত করেছি।'
আনুষ্ঠানিকভাবে পরস্পরকে দেখা-শোনার পরে বর-কনে একে অপরকে পছন্দ করায় অবশেষে উভয় ফ্যামিলির অভিভাবকদের সম্মিলিত উদ্যোগে আসমার সাথে বিয়ে হয়ে গেল মুআজের। তারা হয়ে গেলেন স্বামী-স্ত্রী।
মুআজ-আসমা। কিছু দিন আগেও ছিলেন একে অপরের অচেনা। অথচ এ দু'জনই আজ আবদ্ধ হয়ে গেলেন পরস্পর হৃদ্যতার বন্ধনে।
মুআজের সংসার চলছিল বেশ ভালোভাবে। একজন আদর্শ স্ত্রী হিসেবে যেসব গুনাবলী থাকা প্রয়োজন, একজন দ্বীনদার নারী হিসেবে যে ধরণের উপযুক্ততা দরকার তার সবই ছিল আসমার ভেতরে।
সংসার জীবনের প্রাথমিক অবস্থায় কিছু দিন পার করেই মুআজ অনুভব করতে সক্ষম হলেন যে, তিনি সত্যি সত্যি একজন আদর্শ এবং দ্বীনদার মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন। আসমার হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ, অনন্য গুনাবলী এবং উত্তম দ্বীনদারী দেখে তার কাছে মনে হতো- দুনিয়াতেই যেন এক টুকরো জান্নাতের মালিক বনে গেছেন তিনি।
অবশ্য মুআজের দিকটিও আসমার মোটেই নজর এড়ায়নি। দিনে দিনে আসমাও অনুভব করলেন যে, তার স্বামী তখন সত্য কথাই বলেছিলেন, সত্যিই তিনি একজন সৎকর্মশীল বান্দা। সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, ন্যায়-ইনসাফ কোনো দিকেই পিছিয়ে নেই মুআজ। কল্যানকর সকল কাজেই স্বামীর সরব ভূমিকা আসমাকে আনন্দিত করে।
দু'জনের পরিবারে শান্তির সুবাতাস বইছিল যেন। দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল স্বপ্নের মত। একজন অন্যজনকে নেক আমলের জন্য উতসাহ দিতেন। একে অন্যকে সাওয়াবলাভের কাজে উদ্বুদ্ধ করতেন। কে বেশি তাহাজ্জুদগুজার হতে পারেন, তাদের ছিল সেই প্রতিযোগিতা। কে বেশি কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন, তাদের ছিল সেই প্রচেষ্টা। কে বেশি নফল আমল করতে পারেন, তাদের ছিল সেই প্রত্যাশা।
এভাবেই চলে যাচ্ছিল মুআজ-আসমার মধুময় দিনগুলো।
আসমা একদিন মুআজকে বললেন- 'এই, আসুন না, আমাকে কিছু কুরআন মুখস্ত করিয়ে দেন না'!
মুআজ বললেন- 'হ্যাঁ, চলো, এটা খুবই ভালো হবে। তবে তুমি একা কেন মুখস্ত করবে? আমরা উভয়েই বরং মুখস্ত করব। একে অপরকে মুখস্ত করাতে সাহায্য করবো'। যেই কথা সেই কাজ। তারা একে অপরকে কুরআন মুখস্ত করিয়ে দিতে শুরু করলেন। উভয়ে একের পর এক সুরা মুখস্ত করতে থাকলেন একে অপরকে শোনানোর মাধ্যমে।
অনেক শ্রমের বিনিময়ে অবশেষে এভাবে একদিন তারা উভয়েই কুরআনের হাফেজ ও হাফেজা হয়ে গেলেন! কিছু দিন পরে মুআজ স্ত্রী আসমাকে নিয়ে শ্বশুরালয়ে গেলেন। শ্বশুরকে আনন্দিত চিত্তে জানালেন- 'আব্বু, আপনার মেয়ে কোরআনে হাফেজা হয়ে গেছেন'!
এমন একটি সুখবর শুনে যে কোনো বাবারই খুশি হবার কথা। কিন্তু মুআজের শ্বশুরের চেহারা দেখে মনে হল না, মেয়ের এই মহা সাফল্যের সংবাদে তিনি খুশি হয়েছেন! মনে হল, তিনি বরং এ সংবাদে যারপরনাই আশ্চর্য হয়েছেন!
মুআজের কপালে চিন্তার ভাঁজ, আচ্ছা, এতবড় সুসংবাদ শুনেও কেন আশ্চর্য হলেন তার শ্বশুর?
আদরের জামাতাকে কিছু না বলে তিনি উঠে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। মেয়ের রুমে গিয়ে কিছু কাগজপত্র নিয়ে আবার ফিরে আসলেন প্রায় সাথে সাথেই। মুআজের সামনে রাখলেন সেগুলো। কাগজগুলো পড়ে তো মুআজের চোখ ছানাবড়া! হায়! হায়! এ যে তার স্ত্রীর কুরআন হিফজের প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট! তার মানে তার স্ত্রী বিয়ের আগে থেকেই কুরআনের হাফেজা ছিলেন!
এবার মুআজ তার শ্বশুরের আশ্চর্য হওয়ার রহস্য বুঝতে পারলেন।
আসলে তার স্ত্রী এত দিন তার সাথে সাথে কুরআন মুখস্ত করার ভান করে মূলত: তাকেই হাফেজ বানানোর কৌশল অবলম্বন করেছিলেন!
স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল মুআজের অন্তরটা। তিনি নির্বাক। আনন্দে আত্মহারা। এমন গুনী একটি মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে নিজেকে ধন্য এবং ভাগ্যবান মনে করলেন। মুখ ফুটে তিনি কিছু বলতে পারলেন না শুধু 'আলহামদুলিল্লাহ' শব্দটি ছাড়া।
শেষ বিকেলের নিস্তেজ সূর্যের মোলায়েম আলো ঘরে এসে পড়েছে জানালার ফাঁক গলে। সে আলোয় উদ্ভাসিত মুআজের চেহারা। পাশে উপবিষ্ট ধৈর্য্যের অতলস্পর্শী প্রেরণা স্ত্রী আসমা এবং পিতৃতুল্য শ্বশুর। মুআজ লক্ষ্য করলেন, তার দু'চোখ বেয়ে তার অজান্তেই গড়িয়ে পড়ছে তপ্ত ক'ফোটা অশ্রু.....! তিনি মুছে ফেললেন না সে অশ্রু ফোটাগুলো........!! এগুলো আনন্দ অশ্রু যে........!!!
আল্লাহ্ পাক প্রত্যেক যুবক যুবতীকেই মুআজ-আসমার মত এমন দ্বীনদার, নেককার স্ত্রী এবং স্বামী দান করে ধন্য করুন তাদের জীবন।
সংগৃহীত এবং সংশোধিত।
ছবি: অন্তর্জাল।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০১৯ দুপুর ২:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



