
কারও কারও জন্য হঠকারিতা হলেও ঈমানদারদের জন্য এগুলো পরিক্ষাঃ করোনার এই আবদ্ধ দিনগুলোতে করণীয় কিছু আমলঃ
করোনা ভাইরাস কেন? বিশ্বব্যাপী করোনার কেন এই আক্রমন? দিশেহারা মানুষ মৃত্যুভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। দেশে দেশে মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে ক্রমশঃ। গাণিতিক হারে বেড়ে চলেছে আক্রান্তের সংখ্যা। ইতালি, স্পেন, আমেরিকা, ইরানসহ অনেক দেশে মৃত্যু আতঙ্ক মানুষকে উদভ্রান্ত করে তুলেছে। মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই আশি হাজার ছুঁই ছুঁই করছে। অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন না ঘটলে অতি অল্প সময়ে এই সংখ্যা লক্ষের ঘর পেরিয়ে যাবে। মূলতঃ আমাদের বুঝা প্রয়োজন, কেন এই মহামারি? নিঃসন্দেহে আল্লাহ পাক এগুলো দিয়ে মানবজাতিকে পরিক্ষা করেন। তাদের বিশ্বাসকে যাচাই করেন। পবিত্র আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوفْ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الأَمَوَالِ وَالأنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
'এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।' সূরাহ আল বাক্কারাহ, আয়াত ১৫৫
এই পরিক্ষায় সবরকারী তথা, ধৈর্য্যধারণকারীদের জন্য উপরোক্ত আয়াতে সুসংবাদের ঘোষনা দেয়া হয়েছে। আর পরের আয়াতে সবরকারী তথা, ধৈর্য্যধারণকারীদের পরিচয় বিবৃত হয়েছে যে, তারা বিপদাপদে ধৈর্য্যধারণ করে। কোনোরূপ হঠকারিতায় লিপ্ত হয় না। আল্লাহ তাআ'লার ফায়সালার প্রতি সর্বাবস্থায় সবর এখতিয়ার করে এবং প্রকৃত প্রত্যাবর্তনস্থল যে আল্লাহ তাআ'লারই নিকট সে কথা স্মরণ করে-
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُواْ إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ
'যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।' সূরাহ আল বাক্কারাহ, আয়াত ১৫৬
বিপদাপদের এমন ঘনঘটা দেখেও যারা বিচলিত হয় না, দিশেহারা দিগভ্রান্ত হয় না, ধৈর্য্যের সাথে আল্লাহ তাআ'লার নিকট ফিরে যাবার আকুতি অন্তরে লালন করে তাদেরকে আল্লাহ তাআ'লা হেদায়েতপ্রাপ্ত ঘোষনা করেছেন। শুধু তা-ই নয়, তাদেরই জন্য আল্লাহ পাক পরবর্তী আয়াতে প্রদান করেছেন অফুরন্ত দয়া এবং অবারিত নেআমতের সুসংবাদ-
أُولَـئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَـئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
'তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েত প্রাপ্ত।' সূরাহ আল বাক্কারাহ, আয়াত ১৫৭
এসব বিপর্যয় আমাদেরই হাতের কামাইঃ
অন্য আয়াতে জলে-স্থলে সংঘটিত এসকল বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে আমাদের কৃতকর্ম। আজকের বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষতার দিনে এই আয়াতের ব্যাখ্যা বুঝা খুবই সহজ, এই কারণে যে, আমরা মানবজাতি আমাদের নিত্যনতুন প্রয়োজনে-আবিষ্কারে, সভ্যতার ধাপে ধাপে নানাবিধ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে পৃথিবী নামক গ্রহটিকে নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছি। পারমানবিক বোমা থেকে শুরু করে শক্তিমান নানান প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক জীবানু অস্ত্রসহ পৃথিবীর জলবায়ু, আবহাওয়া এবং স্বাভাবিক অবস্থাকে পাল্টে দেয়ার মত নিত্যনতুন আবিষ্কারে মেতে উঠে প্রকারান্তরে আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব নিজেরাই দিনকে দিন মারাত্মক হুমকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি। আল্লাহ পাক বলেন-
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
'স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।' সূরাহ আর রূম, আয়াত ৪১
ঝড়, ঝঞ্জা, খরা, বন্যা, ক্ষুধা, অনটন, মহামারি ইত্যাদি মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহ তাআ'লার পক্ষ হতে একেকটি পরিক্ষা। পক্ষান্তরে উদভ্রান্ত অবিশ্বাসী পাপাচারে লিপ্ত সম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোকদের জন্য এগুলো তাদের হঠকারিতা বৃদ্ধিরই শুধু কারণ। এসব বিপদাপদ দেখে তারা দাঁত কেলিয়ে হাসে। আরও উল্লাসিত হয়। আরও বিভ্রান্তির অন্ধকারে হাবুডুবু খায়। আরও বেশি অবাধ্যতায় মেতে ওঠে। হার কিসিমের পাপাচারে আরও অধিক পরিমানে লিপ্ত হয়ে তারা পারকালিন মর্মন্তুদ শাস্তিকে তাদের নিজেদের উপর অবধারিত করে নেয়।
এর বিপরীতও রয়েছে। এসব পাইকারি শাস্তিদর্শনে তাদেরই কিছু মানুষ হেদায়েতের আলোকশিখায় আলোকিত হয়ে ওঠে। নিজেদের কৃত অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করে জীবন ও জগতসমূহের মহান মালিকের নিকট। তারা খাঁটি করে নেয় তাদের বিশ্বাসকে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি মসজিদে আগের তুলনায় মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। এর কারণ হয়তো তারা বিশ্বাস করেন যে, রোগ মহামারি যিনি দেন, তিনিই এগুলো দূর করবেন। তবে তাদের 'জানা' ও 'বিশ্বাসের' ভেতরে কিছু ঘাটতি রয়েছে। তারা হয়তো জানেন না, মহামারির সময়ে ইসলামের কি নির্দেশনা রয়েছে।
এসব অবস্থায় ইসলামের দৃষ্টিতে করণীয়ঃ
এই মুহূর্তে নামাজের জামাআত, তাবলীগের উদ্দেশ্যে মসজিদে একত্রিত হওয়া, দোয়া মাহফিলসহ সব ধরণের লোকসমাগম এড়িয়ে চলাই ইসলামের নির্দেশ। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) মহামারি সম্পর্কে তার অনবদ্য গ্রন্ত্র ‘বিযলুল মাউন ফি ফাযলুত ত্বাউন’ এ দু'টি ঘটনা উল্লেখ করেছেন।
প্রথম ঘটনাঃ দামেস্কে একবার মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তারা হাজারো মানুষ সমবেত হয়ে ভাইরাস থেকে রক্ষার জন্য দোয়া করেছিলেন। আগে প্রতিদিন ৫০ জন করে মারা যেত দোয়া মাহফিলের পর হাজার মানুষ মারা যেতে লাগল।
দ্বিতীয় ঘটনাঃ একইরকমভাবে ৮৩৩ হিজরি সনে মিশরের রাজধানী কায়রোতে ব্যাপক আকারে মহামারি সৃষ্টি হয়েছিল। তখন সেই মহামারির হাত থেকে বাঁচতে কায়রোবাসী সকলে তিন দিন রোযা রেখে মরুভূমিতে গিয়ে দোয়া করেছিলেন। কিন্তু এই সম্মিলিত দোআ এবং জমায়েতের ফল হল হিতে বিপরীত। মৃত্যুর সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দৈনিক হাজারে পৌঁছে গেল।
দোয়া মাহফিল, ইসলামী আলোচনার মসলিস ভালো নি:সন্দেহে। কিন্তু মহামারির সময় ঘরে অবস্থান করা ইসলামের নির্দেশ। আর এ কারণে ভয়াবহ ‘আমওয়াস’ মহামারির সময় আমর বিন আস (রা) বললেন- ‘হে লোকসকল, এ মহামারি হল আগুনের মত। যখন আসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই তোমরা পাহাড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়।'
তখন সকলে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যেককে এখন সরকারি নির্দেশনা মেনে ঘরমুখী হতে হবে এবং ঘরকে মসজিদে রূপান্তর করতে হবে।
এর পাশাপাশি ঘরে থেকে যে আমলগুলো করে প্রতিদিনের সময় অতিবাহিত করা যায় বিজ্ঞ পাঠকদের জন্য তার কিছু আলোকপাত করছি-
১। ফজরের নামাজ ওয়াক্ত মতো পড়ার মধ্য দিয়ে দিনের সূচনা করুন। সারা দিন আল্লাহ তাআ'লার জিম্মায় থাকুন।
২। সকাল সন্ধ্যায় আয়াতুল কুরসী পাঠ করুন।
৩। সূরা ফাতিহা ও চার কুল নিয়মিত পড়ুন।
৪। বালা মুসিবত, রোগবালাই এবং মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মসনূন দোয়া দরূদ নিয়মিত পাঠ করুন।
৫। সাধ্যমত দান সদকা করতে থাকুন।
৬। আত্মীয় স্বজনের খোঁজ খবর নিন।
৭। অভাবী অনাহারিদের সম্ভব হলে খাবার দিন।
৮। মহামারীতে মৃত্যু হলেও শহীদী মর্যাদার জন্য দোয়া করুন।
৯। আপাতত মুসাফাহা ও সাক্ষাৎ বর্জন করুন।
১০। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সব সুন্নত, ইচ্ছেমতো যত বেশি সম্ভব নফল নামাজ আদায় এবং জরুরী অধ্যয়নে সময় কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন।
১১। মৃত্যু এলে হাসিমুখে চলে যাওয়ার জন্য তৈরি থাকুন।
১২। বান্দার হক দিয়ে দিন, কারো হক নষ্ট করে থাকলে তা দ্রুত আদায় করে ফেলার চেষ্টা করুন, সম্ভব না হলে যে কোনো ক্ষতিপূরণ অথবা ক্ষমাপ্রার্থনা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে বান্দাকে খুশী করার ব্যবস্থা করুন।
১৩। আল্লাহ তাআলাকে বেশি বেশি স্মরণ করুন। সর্বাবস্থায় জিকিরের হালতে থাকুন।
১৪। নিজেকে সব মানুষ হতে আলাদা রাখা এবং মানুষকেও আলাদা ও দূরে থাকতে দিতে সচেষ্ট হোন।
১৫। সবসময় ওজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করুন।
১৬। ছোটো বড় সব গুনাহ বর্জন করায় সচেষ্ট হোন।
১৭। অসহায়ের খোঁজ খবর রাখা এবং যথাসাধ্য তার সহায়তা করায় ব্রতী হোন।
১৮। ইশার নামাজ পড়ে সারারাত আল্লাহর দায়িত্বে থাকুন।
১৯। সারাক্ষণ আল্লাহর জিকির, তিলাওয়াত ও আখিরাতের ফিকিরে থাকুন।
২০। খাতিমাহ বিল খায়রের জন্য দোয়া করুন।
২১। আগে আগে ঘুমিয়ে শেষরাতে খুব সুন্দর করে ৮/৬/৪ অথবা ২ রাকাআত তাহাজ্জুদ পড়ুন।
২২। খুব আবেগ ও মহব্বত নিয়ে মৃত্যুর মোরাকাবা আর রোনাজারি করুন।
২৩। অধিক পরিমাণে দুরূদ ও সালাম পাঠ করুন।
২৪। দুনিয়ার মহব্বত অন্তর থেকে দূর করার চেষ্টা করুন এবং আল্লাহবিমুখ ও বিভ্রান্ত লোকদের সঙ্গ থেকে আল্লাহ তাআলার আশ্রয় গ্রহন করুন।
২৫। ইসলাম ও দীন রক্ষার্থে যে কোনো কাজে শরীক হওয়ার প্রত্যাশা অন্তরে লালন করা এবং যথাসাধ্য ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ প্রতিরোধ করতে থাকুন।
২৬। ইমাম মাহদীর সৈনিক হিসেবে তার সাথে যোগদানের তামান্না দিলে পোষণ করুন ও খাসভাবে দোয়া করুন।
২৭। দাজ্জালসহ শেষ জামানার সকল ফিতনা তথা জীবনে মরণে প্রতিটি ফিতনা থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাইতে থাকুন।
২৮। নবী রাসূল, ইমাম উলামা মাশায়েখ উস্তাদ মুরব্বি পিতামাতা আত্মীয় পরিজন পাড়াপ্রতিবেশীসহ সকল জীবিত ও মৃত ঈমানদার নারী পুরুষের জন্য ইসালে সওয়াবের নিয়্যাতে বেশি বেশি দোয়া ইস্তেগফার করতে থাকুন।
শেষের ফরিয়াদঃ
আল্লাহ পাক আমাদের খাতিমাহ বিল খায়ের করুন। ঈমানের সাথে মৃত্যু নসিব করুন। শহিদী মৃত্যু দান করে তাঁর প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল হওয়ার তাওফিক দান করুন। জান্নাতে আমাদেরকে প্রিয় নবিজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথী হওয়ার সৌভাগ্য দান করুন।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০২০ দুপুর ২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




