
রসকষহীন জীবন কাহাতক আর? চলুন, ঝাপ দিয়ে আসি নাসিরুদ্দিন হোজ্জার হাসির গল্পেঃ
একটু আধটু বিনোদনেরও প্রয়োজন রয়েছে মাঝেমধ্যে। রসকষহীন জীবন কাহাতক আর? চলুন, পুরাকালের প্রখ্যাত হাস্য রসিকতার গল্পের বিখ্যাত ব্যক্তি নাসিরুদ্দিন হোজ্জার কয়েকটি হাসির গল্প পাঠে একটু বিনোদন লাভ করে আসি। তাহলে প্রথমেই তো জেনে নিতে হয়, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা সম্মন্ধে। তিনি লোকটা আসলে কে?
তাই হোক, চলুন, আগে জেনে নিই, কে ছিলেন নাসিরুদ্দিন হোজ্জা?
যত দূর জানা যায়, নাসিরুদ্দিন হোজ্জার জন্ম তুরস্কে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে তার জন্ম। নানা চরিত্রে ও পেশায় তাঁকে হাজির হতে দেখা যায় তাঁর শত শত গল্পে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এখন আর শুধুই তুরস্কের নন, তিনি সারা বিশ্বের। ইউনেসকো তাঁর গল্পগুলোকে বিশ্বসাহিত্যিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। হোজ্জা অবশ্য একেক অঞ্চলে একেক নামে অভিহিত। যেমন- উজবেকিস্তান ও চীনে তিনি আফেন্দি বা এফেন্দি নামে পরিচিত। তাঁর গল্প কখনো নির্মল হাস্যকৌতুকে, কখনো বুদ্ধির ঝলকে, কখনো বা নৈতিক শিক্ষার দ্যুতিতে উজ্জ্বল। কখনো নিজেকে নিজেই ব্যঙ্গ করেছেন তিনি। আর এসবের মাধ্যমে মানুষকে আনন্দ বিনোদন দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষনীয় অনেক কিছুও তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি।
গল্প-০১. রোগা হতে চেয়েছিলেন রোগা করে দিয়েছি, তো পারিশ্রমিকটা দিয়ে দেন হুজূরঃ
একসময় চিকিৎসক হিসেবে নাসিরুদ্দিনের বেশ সুনাম ছিল। একদিন গ্রামের জমিদার এলেন তাঁর কাছে। বললেন, ‘বড় মুটিয়ে যাচ্ছি নাসিরুদ্দিন, মেদ কমাতে চাই। একটু ওষুধ দাও।’
নাসিরুদ্দিন অনেকক্ষণ ধরে তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘ওষুধ আমি দেব না। দিন আপনার ফুরিয়ে এসেছে। দিন পনেরোর মধ্যেই আপনি মারা যাবেন।’
ভয়ে-ভাবনায় জমিদার টলতে টলতে বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। খাবারে তাঁর রুচি নেই। চা অত ভালোবাসতেন, সেই চা-ও আর ভালো লাগে না। ঘুম আসে না। চোখে সামান্য একটু তন্দ্রামতো এলেও ক্ষণে ক্ষণে চমকে ওঠেন দুঃস্বপ্নে। মোসাহেব-ইয়ার-বন্ধুপরিবৃত হয়ে আড্ডা মারা, গল্পগুজব করাতেও তাঁর আর অভিরুচি নেই। তাড়াতাড়ি হারিয়ে গেল সেই উজ্জ্বল দিনগুলো! দেহখানা শুকিয়ে প্রায় কাঠ।
পনেরোটা দিন কাটিয়ে, বিপৎসীমা অতিক্রম করে জমিদার এলেন নাসিরুদ্দিনের কাছে। বললেন, ‘এদিকে আয় ব্যাটা হাতুড়ে ডাক্তার, দ্যাখ, বহাল তবিয়তে আমি তোর সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। পনেরো দিন পরে আপনি মারা যাবেন—কী আমার গণক ঠাকুর রে!’
নাসিরুদ্দিন বললেন, ‘রাগ করবেন না, জমিদার হুজুর। নিজের শরীরের দিকে চেয়ে দেখুন। রোগা হতে চেয়েছিলেন, রোগা করে দিয়েছি। এখন চিকিৎসাবাবদ পারিশ্রমিকের টাকাটা দিয়ে দিন।’
গল্প-০২. স্বয়ং বাদশাহ যখন এক নম্বর বেকুবঃ
পারস্য দেশের কয়েকজন ব্যবসায়ী এসেছেন দরবারে বাদশাহর পছন্দসই ঘোড়া বিক্রি করতে। বাদশাহ বেশ কিছু ভালো ঘোড়া কিনলেন। এর চেয়েও ভালো ঘোড়া তাঁদের দেশে আছে শুনে বাদশাহ তাঁদের এক শ মোহর অগ্রিম দিলেন। এ ঘটনার দিন কয়েক পর বাদশাহ নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে হুকুম দিলেন, তাঁর রাজ্যে যত বোকা, কম বুদ্ধির লোক আছে, তাদের একটা তালিকা প্রস্তুত করতে। দুদিন প্রচণ্ড খেটেখুটে হোজ্জা ছাব্বিশ পাতার একটা তালিকা প্রস্তুত করলেন। সেই তালিকার ওপর চোখ বোলাতেই বাদশাহ দেখলেন, তাতে সবার প্রথমে তাঁর নিজের নাম।
‘সে কী মোল্লা, আমার নাম সবার প্রথমে কেন?’
‘বাহ্ রে, অজানা-অচেনা ইরানি ব্যবসায়ীদের সম্বন্ধে কোনো কিছু না জেনেই এককথায় এতগুলো মোহর যিনি অগ্রিম দেন, তাঁকে তো বেকুবদের তালিকায় প্রথমেই রাখতে হবে।’
‘আর, তারা যদি সত্যি সত্যি ভালো ঘোড়া নিয়ে হাজির হয়, তাহলে?’ বাদশাহ আশান্বিত হয়ে বলেন।
‘হুজুর, তাহলে আর কি, তাহলে ওই তালিকার প্রথম বেকুব আপনার নাম কেটে, তাদের নামই বসিয়ে দেব’, মোল্লা নাসিরুদ্দিন বললেন।
গল্প-০৩. হোজ্জা বন্ধুদের বললেন, দাঁড়াও বিবিকে বলে আসিঃ
একদিন সন্ধ্যাবেলা কয়েকজন বন্ধুবান্ধব গল্প করতে করতে এসে নাসিরুদ্দিনকে বললেন, ‘ভাই, আজ তোমার বাড়িতে আমরা সকলে খেতে চাই, খুব ইচ্ছে করছে তোমার বাড়িতে খেতে। অনেক দিন হলো ভালোমন্দ খাওয়া হয়নি।’
‘সে তো খুব ভালো কথা। চলো আমার বাড়ি। যে যত খেতে চাও আজ তোমাদের পেট ভরে খাওয়াব।’
তারপর বাড়ির দোরগোড়ার কাছে এসে তিনি বললেন, ‘ভাই, তোমরা একটু অপেক্ষা করো, আমি বিবিকে বাড়ির ভেতর গিয়ে বলে আসি খাওয়াদাওয়ার সব ব্যবস্থা করতে, যাতে তাড়াতাড়ি হয়।’ এ কথা বলে মোল্লা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন।
মোল্লার বিবি সব শুনে তো খেপে আগুন। বললেন, ‘আমি এখন এই রাতে তোমার এসব বেআক্কেলে দোস্তদের জন্য রান্না করতে যাব, চালাকি পেয়েছে? যাও, এখনই গিয়ে বলো, এখানে ওসব হবে-টবে না। সবাইকে যে যার বাড়িতে গিয়ে মনের সাধ মিটিয়ে খেতে বলে দাও। যা-ই বলো, আমাকে দিয়ে এখন কোনো কাজই হবে না।’
এদিকে বন্ধুরা অনেকক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করে শেষটায় কড়া নেড়ে হাঁক দিল, ‘ভাই নাসিরুদ্দিন, আমরা আর দাঁড়াতে পারছি না, দরজা খোলো। অনেকক্ষণ দাঁড়াতে দাঁড়াতে পায়ে খিল ধরে গেল যে!’
‘ছিঃ ছিঃ বিবি, ওসব কথা বলা যায় বন্ধুদের? ভীষণ লজ্জায় পড়ে যেতে হবে। ওদের প্রত্যেকের বাড়িতে আমি ভালোমন্দ খাবার অনেকবার খেয়েছি। আমি যদি আজ ওদের এভাবে ফিরিয়ে দিই, তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াবে বলো তো? না করার কথা আমি ভাবতেই পারছি না।’
‘তাহলে তুমি ওপরের ঘরে গিয়ে চাদরমুড়ি দিয়ে বসে থাকো। ওরা এলে যা বলার আমিই বলব।’
এদিকে বন্ধুরা অনেকক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করে শেষটায় কড়া নেড়ে হাঁক দিল, ‘ভাই নাসিরুদ্দিন, আমরা আর দাঁড়াতে পারছি না, দরজা খোলো। অনেকক্ষণ দাঁড়াতে দাঁড়াতে পায়ে খিল ধরে গেল যে!’
বিবি দরজা না খুলেই ভেতর থেকে বললেন, ‘উনি বেরিয়ে গেছেন। বাড়িতে নেই।’
‘সে কি, আমরা তো দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, ওকে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দেখেছি; কিন্তু ওকে তো বেরিয়ে যেতে আমরা দেখিনি?’
গিন্নির সাফ জবাব, ‘আমি কিন্তু বলছি উনি বেরিয়ে গেছেন। বাড়িতে নেই। আজ আর উনি বাড়ি ফিরবেন না বলে জানিয়ে গেছেন। কাল এলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।’ এ কথায় নাসিরুদ্দিন আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। তিনি দোতলার ঘরের জানালা থেকে চেঁচিয়ে বললেন, ‘সে খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে গেছে। সামনের দিক দিয়ে বের হলে তো আপনারা দেখতেই পেতেন।’
গল্প-০৪. চোরকে দেয়ার মত ঘরে কিছু না থাকায় লজ্জায় নিজেই সিন্দুকে লুকোলেন হোজ্জাঃ
একদিন মোল্লা দেখলেন যে এক চোর তাঁর বাড়িতে ঢুকেছে। ব্যাপারটা টের পেয়ে খুবই সাবধানে-সন্তর্পণে মোল্লা তাঁর বিরাট সিন্দুকটার ভেতরে গিয়ে লুকালেন। এদিকে চোর ঘরময় ঘুরে বেড়াল, বাক্সপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করল। কিন্তু কিছুই মিলল না।
রেগেমেগে যেই না চোর ব্যাটা সিন্দুকের মুখ খুলেছে, অমনি মোল্লা মাথা তুলে বলে উঠলেন, ‘চোর বাবাজি, আপনার নেওয়ার মতো কোনো জিনিসই নেই। তাই লজ্জায় আমি সিন্দুকে এসে লুকিয়েছি।’
গল্প-০৫. তার চেয়ে ছেলেদের দারোয়ানি শেখানঃ
তার চেয়ে ছেলেদের দারোয়ানি শেখান
একবার মোল্লা নাসিরুদ্দিনের বাড়িতে টাকাপয়সার খুব টানাটানি চলছিল। একদিন গিন্নির তাড়া খেয়ে নাসিরুদ্দিন তাঁর স্বল্পবিদ্যা ভাঙিয়ে শিক্ষকতা করার জন্য হাজির হলেন এক ধনীর বাড়িতে।
গৃহকর্তারও তখন তাঁর ছোট ছেলেদের পড়ানোর জন্য একজন শিক্ষকের খুব প্রয়োজন ছিল। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, কাল থেকেই ওদের পড়ানো শুরু করুন।’
‘মাইনে কত দিতে পারবেন’, মোল্লা প্রশ্ন করেন।
‘কত আর দেব! আগের শিক্ষকের মাইনে ছিল মাসে পঞ্চাশ টাকা। আপনিও তা-ই পাবেন।’
‘কিন্তু এত কম মাইনে দিলে চলে কী করে?’
‘বেশ, তাহলে পঁচাত্তর টাকাই পাবেন।’
কথাবার্তা যখন চলছে, সেই সময় বাড়ির দারোয়ান কী একটা খবর দিতে ঢুকল।
দারোয়ানকে দেখিয়ে নাসিরুদ্দিন গৃহকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, এর মাইনে কত?’
‘ওকে দিই মাসে তিন শ টাকা।’
‘বেশ তো, তাহলে এক কাজ করুন, এবার থেকে এই দারোয়ানের কাছে ছেলেদের দারোয়ানি শেখান। দারোয়ানি শিখলেই তো আপনার ছেলে শিক্ষকের চেয়েও ভালো আয়-উপার্জন করতে পারবে।’
গল্প-০৬. রোগটা আসলে চোখেঃ
মোল্লা নাসিরুদ্দিন তখন চিকিৎসার কাজ করতেন। একদিন একটা লোক তাঁর বাড়ির কাছে এসে চিৎকার করতে লাগল, ‘বাবা গো, মা গো, মরে গেলাম গো!’
মোল্লা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে, চেঁচাচ্ছ কেন?
‘পেটের যন্ত্রণায় মরে গেলাম।’
‘খেয়েছিলে কী,’ জিগ্যেস করলেন নাসিরুদ্দিন।
‘খেয়েছিলাম একটু পচা পিঠা’, জবাব দেয় লোকটা।
মোল্লা এ কথা শুনে লোকটার চোখে ওষুধ দিতে গেলেন। লোকটা বলল, ‘করছেন কী? আমার চোখে তো কিছু হয়নি, পেটে ব্যথা। চোখে ওষুধ দিচ্ছেন কেন?’
মোল্লা বললেন, ‘আসল রোগটা তোমার চোখে। চোখ খারাপ না হলে কেউ কি পচা পিঠা খায়!’
সূত্রঃ গল্পগুলো নাসিরুদ্দিন হোজ্জার ১০০ গল্প বই থেকে সংগৃহীত।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০২১ সকাল ১১:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




