
ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মদিন, মৃত্যুদিন ইত্যাদি পালনের যৌক্তিকতা ও বিধান
ইসলামে জন্মদিন (Birthday), মৃত্যুদিন, বিবাহ বার্ষিকী, ভালোবাসা দিবস, বাবা দিবস, মাতৃ দিবস ইত্যাদি পালনের আদৌ কোন বিধান আছে বলে জানা যায় না। বস্তুত: যারা এগুলো পালন করে থাকেন, তারা এই বিষয়ে ইসলাম ধর্মের আচরণবিধি ও নির্দেশনা সঠিকভাবে অবহিত না থাকার কারণে এবং দিবস পালনে ইসলামী মূল্যবোধ এবং মর্ম যথাযথভাবে উপলব্ধি না করার ফলেই হয়তো করে থাকেন।
বার্থ-ডেসহ অন্যান্য দিবস পালন করা ইহুদি খৃষ্টানদের আদর্শ:
বার্থ-ডে বা জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী, বিবাহবার্ষিকী ইত্যাদি পালন করাকে কেউ কেউ সুন্নত বলে চালিয়ে নিতে চান। তাদের সদয় জ্ঞাতার্থে বলে রাখা প্রয়োজন যে, বার্থ-ডেসহ এই জাতীয় অন্যান্য দিবস পালন করাকে যদি সুন্নত বলতেই চান তাহলে বলুন, কিন্তু এটা জেনে রাখুন, এগুলো ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক আখেরী নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নয়, বরং ইহুদি খৃষ্টানদের সুন্নত। ইসলাম ও মুসলিমদের দিবস পালনের এসব প্রথা ও রেওয়াজের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। যেহেতু সম্পর্ক নেই, কোন যোগসূত্র নেই, কোন নির্দেশনা নেই, কোন প্রমান নেই, সুতরাং, এমন কাজকে গ্রহণ করে নেয়া মুসলমানদের জন্য কিভাবে শোভনীয় হতে পারে?
নষ্টামো ও চরিত্রহীনতার স্থান নেই ইসলামে:
ইদানিং ‘জন্মদিন’ পালনের প্রবণতা একটু বেশিই পরিলক্ষিত হচ্ছে। ধনী হোক আর গরিব হোক, জন্মের দিনটা ঘটা করে পালন না করলে যেন মনে শান্তি আসে না, এ রকম একটা ভাব অনেকের মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছে। শুধু মানুষের কথা বলি কেন? বর্তমান বিশ্বে অতি আধুনিকতার বাহারি মোহে অন্ধ এমন কিছু বিত্তশালীও তো রয়েছেন যারা তাদের পোষা কুকুরটিরও জন্মদিন পালন করে থাকেন! এদিন তারা নানা আয়োজন করে বন্ধু-বান্ধবকে নিমন্ত্রণ করেন, আনন্দ-উল্লাস করেন, মদ্যপান করেন, নর্তকি নাচিয়ে উদযাপন করার নামে বৈধ অবৈধ কোন প্রকারের অপকর্মে লিপ্ত হতে পিছপা না হয়ে নিয়ন্ত্রণহীন উদ্যম আমোদ প্রমোদ আর ফুর্তি করে দিনটা পার করে দেন। এই জাতীয় মাতলামীপূর্ণ আনন্দের অনুষ্ঠান এবং আসরগুলোর অন্তরালের অবস্থা যে কি পরিমান ভয়ঙ্কর হতে পারে তার অতি সামান্য বর্ণনা কদাচিত জনসমক্ষে এসে থাকে ধর্ষন, সংঘবদ্ধ ধর্ষন কিংবা এই প্রকারের জঘন্যতম কিছু কিছু ঘটনা কোন কারণে ফাঁস হয়ে পড়ার কারণে, কিংবা ধর্ষিতার বিচারপ্রার্থী হওয়ার মাধ্যমে। আমরা ২০১৭ সালে বনানীর ২৭ নম্বর রোডের রেইনট্রি হোটেলে দেশের জনৈক সম্পদশালী ব্যক্তির সন্তানের জন্মদিন পালনের অনুষ্ঠানের পীড়াদায়ক পরিনতি প্রত্যক্ষ করেছি। সাম্প্রতিক সময়ে জন্মদিন পালনের সে অনুষ্ঠানে ধর্ষিত দুই শিক্ষার্থীর করা মামলার ব্যাপক আলোচিত রায়ও প্রত্যক্ষ করেছি। জন্মদিন পালনের নামে এইসব নষ্টামো ইসলামে চিন্তারও অতীত।
কেক কেটে জন্মদিন পালনের সূচনা:
কেক কেটে জন্মদিন পালনের উদ্ভবটা সম্ভবত: সর্বপ্রথম পশ্চিমা দেশগুলোতেই ঘটে। আর জন্মদিনের সূচনা হয় ফিরাউন থেকে। বাইবেলের বুক অব জেনেসিসে এসেছে, ‘তৃতীয় দিনটা ছিল ফিরাউনের জন্মদিন। ফিরাউন তার সব দাসদের জন্য ভোজের আয়োজন করলেন। সেই সময় ফিরাউন রুটিওয়ালা ও খাদ্যদ্রব্য পরিবেশককে কারাগার থেকে মুক্তি দিলেন।’ -আদি পুস্তক : ৪০২
সুতরাং বুঝা গেল, জন্মদিন পালনের উদ্ভব ঘটেছে ফিরাউন থেকে। ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই।
এই উম্মতের পূর্ববর্তী মহান ব্যক্তিদের কেউ জন্মদিন পালন করেননি:
জন্মদিন পালনের গুরুত্ব যদি ইসলামে থাকতো, তা হলে সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহুম, তাবেয়িগণ এবং তাবে তাবেইনসহ পূর্ববর্তী মহান ব্যক্তিদের থেকে এটি পালনের প্রমাণ থাকার কথা। কিন্তু আদৌ তা নেই। তারা জন্মদিন পালন করবেন তো দূরের কথা, কারও কারও জন্মসন জানা গেলেও কোন মাসের কোন তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন তা অবধি জানা যায়নি।
অনর্থক কাজ এবং অপচয় এর কোনটাই ইসলামে অনুমোদিত নয় বিধায় জন্মদিন পালনেরও সুযোগ নেই:
এমনকি আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসের কত তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন এটা নিয়েও রয়েছে মতভেদ। সঙ্গত কারণে জন্মদিন পালন নিঃসন্দেহে একটি অনর্থক কর্ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইসলামে এর কোন স্থান নেই। এদিন ফেসবুকে কাউকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো, আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধব জমায়েত হয়ে উৎসব করা, অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, বিশেষ দোয়া, সালাম বা উপহার পেশ করা, বয়স অনুপাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে তা ফুঁ দিয়ে নেভানো, কেক কেটে খাওয়া প্রভৃতি কাজ এসব অপচয় কোনো ধার্মিকের হতে পারে না।
হাদিসে এসেছে, আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حذو القذة بالقذة حَتَّى لَوْ دخلوا جُحْرَ ضَبٍّ لَدخلتتُمُوهُ قالوا: يَا رسول الله الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى. قَالَ: فَمَنْ؟»
“অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির [ইহুদি নাসারাদের] সুন্নত (তরিকাহ) অনুসরণ করবে বিঘত বিঘত এবং হাত হাত পরিমাণ (অর্থাৎ, সম্পূর্ণরূপে)। এমনকি তাঁরা যদি সাণ্ডার (গো-সাপ জাতীয় এক প্রকার হালাল জন্তুর) গর্তে প্রবেশ করে, তবে তোমরাও তাকে অনুসরণ করবে (এবং তাঁদের কেউ যদি রাস্তার উপর প্রকাশ্যে স্ত্রী-সঙ্গম করে তবে তোমরাও তা করবে!)” সাহাবাগণ বললেন, “আল্লাহ্র রাসূল ইয়াহুদ ও খ্রিস্টানরা?” তিনি বললেন, “তবে আবার কারা?” -সহিহ বুখারি : ২৬৬৯
অন্য একটি হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত হিসেবে গণ্য হবে।” -সুনানে আবু দাউদ, হা/৪০৩১-হাসান সহিহ, সহিহুল জামে : ৬০২৫
নবী করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, ‘সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয়, যে আমাদের ছেড়ে অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে। তোমরা ইহুদিদের সাদৃশ্য অবলম্বন কর না, খ্রিস্টানদেরও সাদৃশ্য অবলম্বন কর না।’ -সিলসিলাহ সহিহা : ২১৯৪
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ ۗ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার অনুসরণ কর। তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কারও অনুসরণ কর না। তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ কর।’ -সূরা আল আরাফ : আয়াত ৩
তা ছাড়া জন্মদিনে খুশি হয়ে আনন্দ-উৎসব করা নেহায়েতই বোকামি। কেননা, জীবন থেকে একটি বছর ঝরে গেলে তার জন্য আক্ষেপ ও দুঃখ করা উচিত, খুশি নয়।
যা হোক, ইসলামে যেহেতু জন্ম-মৃত্যু দিবস পালন করার অস্তিত্ব নেই সেহেতু অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বনে জন্মদিবস (Birth Day) পালন করার সুযোগ মুসলিম তথা আমাদের নেই।
কোন মুসলিম ব্যক্তি জন্মদিন পালন করলে সেক্ষেত্রে করণীয়:
কোন মুসলিম ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত: এমনটি করলে তার সামনে এ বিষয়টি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হবে এবং এ সম্পর্কে ইসলামের বিধান এমনভাবে তাকে অবহিত করতে সচেষ্ট হতে হবে যাতে তিনি সঠিকভাবে ইসলাম ধর্মে জন্মদিন, মৃত্যুদিন ইত্যাদি পালনের অসারতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন।
এতদ্ব্যতিত কখনো যদি আপনি এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হন যে, কোন শুভাকাঙ্খী যদি আপনার জন্মদিবস মনে রেখে সেই তারিখে উপহার নিয়ে আপনার কাছে চলে আসেন অথবা আপনাকে উইশ করে বসেন তখন আপনার করণীয় কি? এই ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ তাকে তার এই কাজের জন্য তিরষ্কার না করাই উচিত। তার নীত উপহার তাকে ফেরত দেয়াও ঠিক নয়। বরং এমনটা করা হলে যদি তার এবং আপনার সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে (সম্পর্ক নষ্ট হলে দাওয়াতের পথও রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে)। সেই কারণে এমনটা অনুভূত হলে দাওয়াতের বৃহত্তর স্বার্থে আপাতত: তার উপহার গ্রহণ করাই শ্রেয়। তবে সুবিধা মত সময়ে তার কাছে ইসলামের এই বিষয়ক বিধান সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে তাকে বুঝাতে হবে যে, ইসলামে জন্ম দিবস পালন করা বা এ উপলক্ষে কোনো অনুষ্ঠান-আয়োজন করা, উইশ বা উপহার বিনিময় করা বৈধ নয়। তাকে এটাও বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে যে, ভবিষ্যতে আর কখনো তিনি যদি এমনটি না করেন তাহলে আপনি তার প্রতি অধিক খুশি থাকবেন। এতে করে একইসাথে দু'টি কাজ হবে, তিনি মন খারাপও করবেন না, আবার ভবিষ্যতের জন্য বিষয়টি তার জানার সুযোগও হয়ে যাবে, যাতে করে তিনি সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবেন।
ইসলামে প্রতিটি দিনই অপরের কল্যান কামনায়:
জন্মের দিনটিতে বা বছরের বিশেষ একটি দিনে শুভেচ্ছা জানানোর নীতিতে ইসলাম বিশ্বাস করে না। সত্যিাকারার্থে এই ধরণের নীতি থাকার সুযোগ আদৌ ইসলামের মূলনীতির সাথেও যায় না। কারণ, ইসলাম এমন এক শ্বাশত আদর্শের নাম যেখানে প্রতিটি দিনই ভরে থাকে অপরের কল্যান এবং শুভকামনায়। কারণ, হাদিসে এসেছে, অপরের কল্যান কামনাই দ্বীন। অতএব, এখানে বিশেষ বিশেষ দিনে অনুষ্ঠান করে শুভকামনা জানানোর প্রয়োজন তাই মোটেই পড়ে না। আর সর্বোপরি, প্রিয়নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহুম, তাবেয়িগণ এবং তাবে তাবেইনসহ পূর্ববর্তী আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন, মুহাদ্দিসীন ও মুফাসসিরীনে ইজাম প্রমুখ মহান ব্যক্তিদের থেকে এটি পালনের কোন প্রমাণ কিংবা নির্দেশনা যেহেতু কোনভাবেই প্রমানিত নেই, সুতরাং এই কর্মকান্ড থেকে সযত্নে বিরত থেকে নিজেদের ধর্মীয় স্বকীয়তা বজায় রাখা মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেকের একান্ত দায়িত্ব হওয়া উচিত।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সহিহ বুঝ দান করুন। আমিন।
উৎসর্গ: ব্লগার রাজীব নুর ভাইকে পোস্টটি উৎসর্গ করছি। মূলত: অন্য এক পোস্টে তার একটি প্রশ্নের প্রেক্ষিতে দেয়া উত্তরটিই এখানে সংশোধিত আকারে পোস্ট আকারে উপস্থাপন করা হলো। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০২১ দুপুর ১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



