
বাংলাদেশে “মব জাস্টিস” বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি এক ভয়ঙ্কর সামাজিক প্রবণতায় রূপ নিয়েছে। আদালতের রায়ের অপেক্ষা না করে মানুষ কেন নিজের হাতে বিচার করছে—এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে ফেলে আসা দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিচার বিভাগের দলীয় নিয়ন্ত্রণের দুঃসহ অতীতে।
গত ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার একচ্ছত্র ক্ষমতায় থেকে আইন-প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে দলীয়করণ করেছে। সরকারদলীয়দের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, খুন, দুর্নীতি বা সহিংসতার অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি। অনেক মামলাই গায়েব হয়ে গেছে, অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীরাই হয়রানির শিকার হয়েছে। ফলে মানুষের আইনের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়েছে।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, তনু হত্যা, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড কিংবা দুর্নীতির মামলায় শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠদের রক্ষা—এসব ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের জন্য এ দেশে বিচার প্রক্রিয়া প্রায় অকার্যকর। তখন সরকার বিরোধী আন্দোলনকারীদের উপরে একযোগে হামলে পড়তো ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং পুলিশ। প্রতিটি মারামারি, খুনোখুনির পর্ব শেষে দেখা যেত, নির্যাতিতদের নামেই মামলার পরে মামলা রুজু করা হতো। এটাই ছিল সারা দেশের অলিখিত আইন।
এই বিচারহীনতার সুযোগেই মানুষ আজ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, থানায় অভিযোগ নিতে গড়িমসি এবং প্রভাবশালীদের রক্ষা করা—এসবই মব জাস্টিসের বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। এখানে অভিযোগই রায় হয়ে যাচ্ছে, ভুল-সঠিক যাচাইয়ের কোনো সুযোগ থাকছে না।
মব জাস্টিস একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি—এটি কোনোভাবেই সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এই অসভ্যতার জন্ম হয়েছে রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি থেকে। সমাধানের পথ একটাই: বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে, পুলিশ-প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং অপরাধী যেই হোক, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের মনে রাখা জরুরি—একটি বিচারহীন রাষ্ট্রে শেষ পর্যন্ত কেউ-ই নিরাপদ থাকে না, এমনকি শাসকরাও না। এখনই সময় আত্মসমালোচনার—“আমরাও কি এই মব জাস্টিসের অংশ কি না?”
জুলাই বিপ্লব: ছাত্র-জনতার ক্ষোভ ও গণপ্রতিরোধ 'মব' নয়
ইদানিং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দোসরদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ক্ষোভ ও গণপ্রতিরোধকে ঢালাওভাবে ‘মব’ আখ্যা দেওয়ার প্রবনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র। এটি ফ্যাসিবাদের একটি কৌশল, যার লক্ষ্য ছাত্র-জনতার ক্ষোভ ও গণপ্রতিরোধকে কলুষিত করা। অপরাধীদের আড়াল করে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর অপচেষ্টা।
অন্তর্বর্তী সরকার ফ্যাসিবাদ নির্মূলের চেষ্টা করলেও অনেক অপরাধী এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাই ছাত্র-জনতা চুপ করে নেই। তারা সরকার-প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সামনে এসে দায়িত্ব নিচ্ছে। ভবিষ্যতের কোনো ফ্যাসিস্ট তৎপরতার বিরুদ্ধে তারা এক অশনিসংকেত।
তবে ষড়যন্ত্রও থেমে নেই। জুলাই বিপ্লব এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তাই প্রয়োজন সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার ঐক্য। বিভেদ ভুলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণপ্রতিরোধই হবে আগামীর পথ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুন, ২০২৫ সকাল ১০:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





