
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর চেপে বসা নিকৃষ্ট ফ্যাসিবাদী শাসন ও স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির অবসানের পর এই নির্বাচন সামনে এসেছে। সিন্দাবাদের ভূতের মতো জাতির কাঁধে চেপে বসা একদলীয় আধিপত্য ও ভোটাধিকার হরণকারী শাসনের অবসান ঘটেছে, এবং তারই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে অবস্থান করছে। এটি এখন কোনো অনুমান নয়; বরং একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু একটি নিয়মিত সংসদ নির্বাচন নয়; এটি জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার, ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের রাজনৈতিক প্রতিফলন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফলে এই নির্বাচন দেশের জোট রাজনীতি, ক্ষমতার কাঠামো এবং ভোটার আচরণে মৌলিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই প্রতিবেদনে অতীত নির্বাচনী প্রবণতা, দলীয় সাংগঠনিক সক্ষমতা, ভোটব্যাংকের প্রকৃতি এবং বিদ্যমান জোট কাঠামোর আলোকে একটি বাস্তবতা-নির্ভর আসন বণ্টনের দৃশ্যপট উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়; বরং ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ।
প্রেক্ষাপট ও মৌলিক বাস্তবতা
জাতীয় সংসদের মোট আসন ৩০০টি। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে, যেখানে ভোটাধিকার হরণ, নিশিরাতের ভোট কিংবা প্রশাসনিক প্রকৌশলের পুনরাবৃত্তির সুযোগ সংকুচিত। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং ভোটার উপস্থিতি মাঝারি থেকে উচ্চ পর্যায়ে থাকার সম্ভাবনাই প্রবল। এই বাস্তবতায় অ্যান্টি-ফ্যাসিবাদী ভোট, অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি মনোভাব, জোট রাজনীতি এবং আঞ্চলিক প্রভাবই নির্বাচনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান
বিএনপি (একা বা জোটের নেতৃত্বে):
দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়ন, মামলা, গুম ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার বিএনপি এই নির্বাচনে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সারাদেশে, বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় দলটির বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী ভোটের স্বাভাবিক একীভবন তাদের এগিয়ে রেখেছে। সম্ভাব্য আসন সংখ্যা ১৬০ থেকে ২০০। তবে দীর্ঘ আন্দোলন-পরবর্তী রাজনীতিতে প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল দলটির জন্য ঝুঁকি হয়ে থাকতে পারে।
জামায়াতে ইসলামী:
দীর্ঘ সময় নিষেধাজ্ঞা, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচনে তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। সংগঠিত আদর্শিক ভোটব্যাংক, ফ্যাসিবাদবিরোধী সহানুভূতিশীল জনমত এবং শহর ও নির্দিষ্ট মফস্বল এলাকায় দৃঢ় উপস্থিতির কারণে দলটির সম্ভাব্য আসন ৭০ থেকে ৮০। বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা তাদের সাফল্যের মাত্রা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি):
ফ্যাসিবাদবিরোধী তরুণ রাজনীতি, নগরভিত্তিক সচেতন ভোটার এবং সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক সক্রিয়তার কারণে এনসিপি কিছু আসনে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। অ্যান্টি-ইস্টাবলিশমেন্ট ও কর্তৃত্ববাদবিরোধী বক্তব্য দলটিকে দৃশ্যমান করেছে। সম্ভাব্য আসন ১০ থেকে ২০। তবে গ্রামাঞ্চলে সংগঠন দুর্বল থাকায় বিস্তৃত সাফল্য সীমিত।
গণঅধিকার পরিষদ:
স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে দলটি ৫ থেকে ১০টি আসন পেতে পারে। তবে শক্তিশালী জোট ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে টেকসই অবস্থান তৈরি করা তাদের জন্য কঠিন।
খেলাফত মজলিস ও অন্যান্য ইসলামি দল:
মাদরাসাভিত্তিক অঞ্চল ও আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে এসব দল সমষ্টিগতভাবে ৫ থেকে ১০টি আসন অর্জন করতে পারে, বিশেষত ফ্যাসিবাদবিরোধী বৃহত্তর জোট কাঠামোর মধ্যে কার্যকর দর কষাকষির মাধ্যমে।
ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলন:
কওমি ও ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করে দলটির সম্ভাব্য আসন ৩ থেকে ৭টি হতে পারে। মূলধারার রাজনীতিতে সীমিত গ্রহণযোগ্যতা এখনো তাদের প্রধান সীমাবদ্ধতা। জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচনী জোট করার পরে আবার বেরিয়ে যায় দলটি।
স্বতন্ত্র ও অন্যান্য প্রার্থী:
দীর্ঘদিন একদলীয় আধিপত্যের বাইরে থাকা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রার্থীদের মাধ্যমে ৫ থেকে ১০টি আসন স্বতন্ত্রদের দখলে যেতে পারে।
সম্ভাব্য সরকার গঠনের দৃশ্যপট
এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনটি প্রধান দৃশ্যপট সামনে আসে। প্রথমত, বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিএনপি সমর্থিত ইসলামপন্থী জোট সরকার গঠন করে সংসদে একটি শক্তিশালী ফ্যাসিবাদবিরোধী ব্লক তৈরি হতে পারে। তৃতীয়ত, তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাব্য হলেও একটি ঝুলন্ত সংসদ গঠিত হতে পারে, যেখানে ছোট দলগুলোর দর কষাকষি রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
উপসংহার
২০২৬ সালের নির্বাচন ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী বাস্তবতায় কার্যত একটি ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের নির্বাচন। এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়; বরং ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির প্রত্যাখ্যান এবং গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার একটি গণরায়। মূল প্রতিযোগিতা বিএনপি ও বিভিন্ন বিরোধী শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ইসলামপন্থী দলগুলো, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, এই নির্বাচনে নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে। চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে জোট সমঝোতা, প্রার্থী নির্বাচনের দক্ষতা, ভোটার উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক আচরণের ওপর। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নির্বাচন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
নিকৃষ্ট ফ্যাসিবাদ হটানোর পরে দেশে হতে যাচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? ফলাফল কেমন হতে পারে বলে আপনার কাছে প্রতীয়মান হয়? মন্তব্যে আপনার মতামত জানাতে পারেন।

সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

