
আমার তায়াম্মুম: ইসলামী শরীয়তের সহজীকরণ নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ পোস্টটি প্রকাশের পরে ব্লগার সৈয়দ কুতুবকে উদ্দেশ্য করে ব্লগার রাজীব নুর -এর ভৌতিক নয় গোয়েন্দা কাহিনী বলা যেতে পারে পোস্টে ব্লগার কলিমুদ্দি দফাদার একটি মন্তব্যে তায়াম্মুমের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মন্তব্য মনোযোগ সহকারে পড়েছি এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তা গ্রহণ করছি। ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং তা থেকেই সুস্থ আলোচনা এগিয়ে যায়।
ব্লগার কলিমুদ্দি দফাদার তার মন্তব্যে বুঝাতে চেয়েলেছিলেন যে, তায়াম্মুমের নিয়ম কানূন ইত্যাদি তো কেবলমাত্র মরু অঞ্চলের সেইসব লোকদেরই জেনে রাখা প্রয়োজন যাদের কাছে পানি দুষ্প্রাপ্য। বাংলাদেশে যেহেতু পানির অভাব নেই, সেহেতু এখানে তায়াম্মুমের আলোচনার দরকার কী? তার ধারণা, পানি যেহেতু আমাদের দেশে যথেষ্ট পরিমানে রয়েছে, সেহেতু তায়াম্মুমের প্রসঙ্গটি আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তার কমেন্টটি প্রিয় পাঠক বন্ধুদের বুঝার সুবিধার্থে এখানে তুলে ধরছি। তিনি লিখেছেন:
@কুতুব সাহেব: নতুন নকিব ভাইকে নিয়ে আমার একটা পর্যবেক্ষণ আছে। তিনি শিক্ষিত যথেষ্ট ভদ্র-মার্জিত, কাউকে কটু কথা বা গালমন্দ করেন না। ইসলামীক বিষয়াবলির উপর পান্ডিত্যের আছে তার। কিন্তু আমার মনে হয় ওনার ধর্মীয় বিষয়বস্তু নিয়ে ব্লগে পোষ্ট করা ইসলামের ব্যপারে অডিয়েন্সেদের আকৃষ্ট করতে পারছে না।
যেমন আজকে তিনি তায়াম্মুম নিয়ে লিখেছেন, কিন্তু ইহার সাথে বাংলাদেশ তথা আরব বিশ্বের ও এখন আর তেমন প্রয়োজনীয়তা নাই। বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে নদী মাতৃক দেশ খাল-বিলের অভাব নেই; মধ্যে প্রাচ্যের এখন আর পানির সমস্যা নেই। আমাদের দেশে তায়াম্মুম থেকে ও বেশি প্রয়োজন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। উনি যদি গড় বাধা মোল্লা বা হুজুরের মতো "জীবন দিয়েছেন যিনি, আহারো দিবেন তিনি" পরিবর্তে "২টি সন্তানের বেশি নয় একটি হলে আরো" ভালোর সাথে ইসলামিক যোগসূত্র স্থাপন করতে পারতেন তাহলে মনে হয় ইসলামের মাহাত্ম্য ও সত্য জীবন-বিধান উপস্থাপন হতো। সাথে উদাহরণ হিসেবে রাজীব নূর ও তার ছোট পরিবারের সুখের জীবন বিত্তান্ত দিতে পারতেন।

ব্লগার কলিমুদ্দি দফাদার তার উপরোল্লিখিত একই কমেন্টে দ্বিতীয়তঃ বলতে চেয়েছেন যে, আমাদের দেশে তায়াম্মুম থেকেও বেশি প্রয়োজন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ।
বস্তুতঃ এই দুইটি বিষয়েরই উত্তর দেওয়া প্রয়োজন ইসলামের মৌলিক উৎস কুরআন ও সহিহ হাদিস তথা ইসলামী শরিয়তের মূলনীতির আলোকে।
ধন্যবাদ জানাচ্ছি ব্লগার কলিমুদ্দি দফাদারকে, তিনি তার মূল্যবান পর্যবেক্ষণে প্রশ্নগুলো তুলে ধরার জন্য। আসলে আলোচনার ধারাবাহিকতাই সঠিক বিষয় জানার সুযোগ করে দেয়।
এক. তায়াম্মুমের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে
তায়াম্মুমকে শুধু মরুভূমি বা পানিহীন অঞ্চলের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেখা ইসলামী শরিয়তের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন:
“আর যদি তোমরা অসুস্থ হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ শৌচাগার থেকে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর।” -সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪৩
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, তায়াম্মুমের কারণ শুধু পানি না পাওয়া নয়। অসুস্থতা এমন একটি কারণ, যেখানে পানি থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করা ক্ষতিকর হতে পারে। আবার তীব্র শীত, পানির ব্যবহারজনিত রোগের আশঙ্কা, ক্ষত বা অস্ত্রোপচারের পরিস্থিতিতেও ফকিহগণ তায়াম্মুমের অনুমতি দিয়েছেন।
বাংলাদেশে পানির প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, হাসপাতাল পরিস্থিতি, পানি ব্যবহারে ক্ষতির আশঙ্কা কিংবা দুর্যোগকালীন সময়ে তায়াম্মুম বাস্তব প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াতে পারে। কাজেই এটি কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে নয়, বরং মানবিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিধান।
এর পাশাপাশি তায়াম্মুম ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে তুলে ধরে, আর তা হলো সহজীকরণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠোরতা চান না।” -সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৫
এই দৃষ্টিকোণ থেকে তায়াম্মুমের আলোচনা কেবল ফিকহি জ্ঞান নয়, বরং ইসলামের মানবিক ও বাস্তবমুখী দর্শনের পরিচয় বহন করে।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
কলিমুদ্দি দফাদার মন্তব্যে বলেছেন, আমাদের দেশে তায়াম্মুমের চেয়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বেশি প্রয়োজন। বাস্তবিক অর্থে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যু হলেও, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে খুব সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ।
ইসলাম সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দেয়, তবে একই সঙ্গে দায়িত্ববোধ, সক্ষমতা ও ন্যায়সংগত লালন-পালনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমি তাদেরও রিযিক দিই এবং তোমাদেরও।” -সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩১
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে সন্তানকে বোঝা হিসেবে দেখা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নয়। তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে সাহাবায়ে কেরাম সন্তান জন্মের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণ নিষেধ আরোপ করেননি। সহিহ হাদিসে আজল অর্থাৎ সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির অনুমোদনের প্রমাণ রয়েছে।
অতএব, ইসলাম অন্ধ জন্মবৃদ্ধি কিংবা অমানবিক চাপ সৃষ্টি করে এমন জনসংখ্যা বৃদ্ধির পক্ষপাতী নয়। আবার পশ্চিমা ধাঁচের কেবল সংখ্যাভিত্তিক জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকেও ইসলাম চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখে না। ইসলামের মূল লক্ষ্য হলো নৈতিক মানুষ গড়ে তোলা, যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হবে। সর্বোপরি, সন্তান কম বা বেশি হওয়া নয়, বরং সন্তানদের সঠিক শিক্ষা, আদর্শিক গঠন ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ইসলামের মূল দৃষ্টি।
উপসংহার
তায়াম্মুমের মতো বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে ইসলামের সহজতা, মানবিকতা ও বাস্তবমুখী চরিত্র তুলে ধরা যায়। একই সঙ্গে জনসংখ্যা, পরিবার ও সামাজিক দায়িত্বের মতো বিষয়গুলোও ইসলামের আলোকে আলোচনা করা জরুরি। একটি বিষয়কে অপ্রয়োজনীয় বলে বাতিল করে দেওয়ার আগে শরিয়তের সামগ্রিক কাঠামো ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করা প্রয়োজন।
ব্লগার কলিমুদ্দি দফাদারের মন্তব্য আলোচনা সমৃদ্ধ করেছে। ভিন্নমত ও প্রশ্নই চিন্তার দ্বার উন্মুক্ত করে। সে জন্য তাঁর প্রতি আবারও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




