
আমি গভীর ঘুমে। ঘুম আসে ক্লান্তি থেকে।
সাধারনত অপরিচিত জায়গায় আমার একেবারেই ঘুম আসে না। অথচ এই জঙ্গলের মধ্যে পুরোনো বাড়িতে কি সুন্দর ঘুমিয়ে গেলাম। পাহাড় ঘেষে ঠান্ডা বাতাস আসছে! পাহাড় ঘেষে গিয়েছে সোমেশ্বরী নদী। আরেকটা নদী আছে আত্রাখালি নদী। আত্রাখালি মিশে গিয়েছে সোমেশ্বরী নদীর সাথে। নদী নদীর সাথে মিশে যায়। তাদের ঝগড়া হয় না। জায়গাটার নাম সুসং দুর্গাপুর। অতি দুর্গম এলাকা। এখানে একটা বহু পুরোনো জমিদার বাড়ি আছে। এই বাড়িতেই আমি উঠেছি। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আমাকে এখানেই থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ম্যাজিস্ট্রেটের নাম মাহতাব। তিন তলা বাড়ি। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বাড়িটি যে কোনো সময় ভেঙ্গে পড়ে যাবে। অথচ বছরের পর বছর ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
কোনো একটা শব্দে আমার ঘুম ভাঙল।
কিন্তু আমি চোখ খুললাম না। একটা হারিকেন জ্বলছে মিটিমিটি। এখানে কেউ যদি আমাকে মেরে ফেলে, তাহলে কেউ জানতে পারবে না। শুনেছি বেশ কিছু বন্য প্রানী রাতে বের হয়। শিয়াল তো সারারাত ঢাকে। শিয়ালের ডাকের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশের অনেক গ্রামে শিয়াল আছে। দিনের বেলা লুকিয়ে থাকে রাতে বের হয়। এই সুসং দুর্গাপুরে আছে হাতি। আমার প্রিয় প্রানী। কি বিশাল! অথচ কোনো অহংকার নেই। আমি অনুভব করলাম- কেউ একজন আমার বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালো। সুন্দর বেলী ফুলের ঘ্রান আসছে। বেলী আমার প্রিয় ফুল। সুরভি আমাকে বলেছিলো, বেলি ফুলের আরেক নাম মল্লি। আমাদের সাথে পড়তো মল্লিকা নামের এক মেয়ে। মল্লিকা আমাকে বলেছিলো- বেলি ফুলের আরেক নাম- মল্লিকা। যাইহোক, বেলি ফুলের গন্ধ পেয়ে আমি কিছুটা চিন্তিত হলাম। এখন বেলি ফুলের সিজন নয়। এই অসময়ে বেলি ফুলের ঘ্রান কেন!
আমি বিছানায় উঠে বসলাম।
হারিকেনের আবছায়া আলোয় দেখলাম একটা মেয়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বিষন্ন মুখ! আমার প্রচণ্ড ভয় পাওয়ার কথা। চিৎকার দিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার কথা। অথচ আমি কিছুই বললাম না। যেন এটা সহজ স্বাভাবিক বিষয়। আমি হাত বাড়িয়ে টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস নিলাম। ঢকঢক করে পানি খেলাম। মেয়েটা ভীত চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে! বললাম, ভয় পেও না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না। আমি ভালো মানুষ। তোমার ঘটনা কি বলো? মেয়েটা বলল, আসলে আমি একজন মৃত মানুষ। আমাকে রেপ করে হত্যা করা হয়েছে। মেয়েটার কথা শুনে আমি মোটেও অবাক হইনি। কারণ, মেয়েটার মানসিক অবস্থা হয়তো ভালো নয়। তাই ভুলভাল বকছে। মেয়েটা বলল, আমার লাশ খাটের নিচে বড় একটা বাক্সে রাখা হয়েছে। বিশ্বাস না হলে খাট থেকে নেমে দেখুন।
আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে।
আমার ঘুম ভাঙল। অবচেতন থেকে আমি চেতনে এলাম। আমার মেয়েটার কথা মনে পড়লো। স্বপ্ন দেখেছি! স্বপ্ন এত স্বচ্ছ হয়! কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে- খাটের নিচে আসলেই একটা বাক্স আছে। এবং বাক্সের মুখ খুললেই আমি মেয়েটাকে দেখতে পাবো। মেয়েটাকে খুন করা হয়েছে। খুন করার আগে ধর্ষন করা হয়েছে। আমার মন বলছে, মেয়েটার নাম নীলা হবে। সুসং দুর্গাপুর জাগুক। তারপর মেয়েটার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জেনে নিব। আমার ঘরের দরজায় টোকা পড়লো। কে এসেছে বুঝতে পেরেছি। ম্যাজিস্ট্রেট মাহতাব এসেছে। সে আমার জন্য সকালের নাস্তা নিয়ে এসেছে। গতকাল রাতে মাহতাব আমাকে জোর করে ধরে ভদকা খাইয়েছে। বলেছে, নতুন এবং অপরিচিত জায়গা কয়েক চুমুক ভদকা না খেলে ঘুম হবে না। সারারাত জেগে থাকতে হবে। রাতে ঘুম না হলে, ভৌতিক কিছু ঘটতে পারে!
আমি মাহতাবকে জিজ্ঞেস করলাম-
নীলা কে? আমার মুখে নীলা নামটা শুনে মাহতাবের মুখ শুকিয়ে যায়। কিন্তু সে বলল, এই নামে তো কাউকে চিনি না। আমি দারুন আত্মবিশ্বাসসের সাথে বললাম, মেয়েটাকে রেপ করা হয়েছে। তারপর গলা টিপে হত্যা করা হয়। হতে পারে তার লাশ ঘরেই আছে। আমি যে ঘরে ছিলাম, সে-ই ঘরে! মাহতাবের চোখে মুখে দিশেহারা ভাব। আমি নিশ্চিত মাহতাব রেপ করেছে এবং নীলাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। লাশ মাটি চাপা দেওয়ার সময় পায়নি। হুট করে আমি এসে পড়ায়। অথচ মাহতাব ভালো ছেলে। বিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। সে একজন ম্যাজিস্ট্রেট। যাইহোক, আমার চলে যেতে হবে। হাতে সময় কম। ঢাকা আমার অনেক কাজ জমে আছে। ময়মনসিংহ থেকে ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস ধরতে হবে। বাসের চেয়ে ট্রেনের জার্নি আমার জন্য বেশি আরামদায়ক।
কিছুক্ষনের মধ্যে ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস ছেড়ে দিবে।
আমি ট্রেনে ওঠার আগে এক কাপ চা খেয়ে নিবো। চায়ের কাপ হাতে নিতেই দেখি, মাহতাব দৌড়ে-দৌড়ে আমার দিকে আসছে। মাথা নিচু করে মাহতাব আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বললাম, কি সিদ্ধান্ত নিলি? মাহতাব বলল- হ্যা আমি এখন থানায় যাবো। আত্মসমর্পণ করবো পুলিশের কাছে। আমি বিরাট অন্যায় করেছি। শাস্তি আমাকে পেতেই হবে। আমি দেখলাম, মাহতাবের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। কাঁদতে কাঁদতে মাহতাব বলল, আসলে আমি নীলাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু নীলা আমার ভালোবাসা কিছুতেই মেনে নিচ্ছিল না। তার পরিবার থেকে নীলার বিয়ে ঠিক করেছে। আমার ভালোবাসার মানুষ অন্যের হাত ধরে চলে যাবে, এটা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। আমি নীলাকে ভালোবাসি বলেই- রেপ করতে চাইনি, কিন্তু করে ফেললাম। খুন করতে চাইনি। কিন্তু খুনও করে ফেললাম। তাই প্রায়শ্চিত্ত আমি করবো।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


