ও জলকুমারী,
সাগরের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা আছে। সাগরের নীল জল, লোনা পানি, সাগর তীরের শো শো শব্দের ঝাপটা বাতাস, দূরের ঢেউ খেলানো জল, জলের উপর ভাসতে থাকা দুদোল্যমান ছোট নৌকা কিংবা মাছ ধরা ট্রলারের পেছনে ছুটতে থাকা একঝাক গাংচিল, সব মিলে যে চিত্রটা তৈরি হয় তার সাথে আমার অদ্ভূত প্রেম। আমি সমুদ্র ভালবাসি। সমুদ্রের প্রতি এ ভালবাসা হতে পারে আমার দেহে একজন নাবিকের রক্ত বইছে এজন্য, কিংবা ছোটবেলা থেকে নাবিক হওয়ার যে অদম্য ইচ্ছা, তা থেকে সৃষ্ট। সাগরের প্রতি আমার আগ্রহ আরও বেড়ে যায় যখন আমি জানতে পারি কোন এক সাগরের গভীর থেকে গভীরতর জলে বাস করে কল্প নারী জলকুমারী। অস্বাভাবিক দুঃসাহসিকতায় নাকি তাদের দেখা পাওয়া যায়। সেবার যখন সেন্টমার্টিন থেকে ফিরছিলাম, সকল বন্ধুবান্ধব থেকে নিজেকে আড়াল করে নিঃশ্চুপ বসেছিলাম জাহাজের পেছনে পাটাতনের এক কোণায়। সূর্যাস্তের বেলায় স্থির তাকিয়ে ছিলাম সূর্য বিদায়ের আলো চিকচিকে জলের দিকে। অথৈ পানিতে বিভ্রমেও যদি দেখতে পাই একটা একলা জলকুমারীর ক্ষণিক ঝাপটামি। আশাহত আমি সেদিন কোন জলকুমারী দেখিনি, আমি সমুদ্র থেকে ফিরে এসে দেখিছিলাম তোমায়। ডাঙ্গায় বাস করা আস্ত এক জলকুমারী।
আমার চোখে তুমি একটা জলকুমারী। তোমাকে দেখেছি তবু প্রকৃত জলকুমারীর সন্ধান আমার থামে না। নাবিক হবার নেশাটা আমার থেকেই যায়। তবু বলি যদি তুমিই আমার জলকুমারি হও তবে সাগরের জলকুমারীর মোহ আমি ছেড়ে দিব। সমুদ্রপ্রেমিক আমি সাগরের দিকে আর মুখ ফেরাব না। তবে একথা বিঃশ্বাস করি নাবিক হয়ে প্রকৃত জলকুমারী উদ্ধারের চেয়ে তোমাকে উদ্ধার করা কঠিন। আমি তোমাকে পাই না, তোমাকে পাবার কৌশল আমি জানিনা। তবু তোমাকে পাবার আভিযান আমার থামে না কিছুতে।
জলকুমারী, আজ তোমাকে বলি- কল্পনার তুমি বাস্তবে আমার মাঝে কিভাবে জড়িয়ে আছো-----
এই সিলেট শহরটাকে আমার অসম্ভব ভাল লাগে। নদী পাহাড়ের এক মিশেল, পরিস্কার আকাশে নীল সাদা মেঘ, মুখে ঝাপটা লাগানো দমকা বা হিমেল বাতাস, জনমানবপূর্ণ ঘিঞ্চি দোকানপাটে মানুষের পায়তারা, ফুটপাতে নির্বেগে হেটে চলা আর আকাশে সাদা ধূয়া তোলা ঝমঝম বৃষ্টি আমার মনে সাড়া জাগায় সবসময়। সিলেটের এই অদ্ভূত অথচ সহনশীল প্রকৃতি আমার মনকে নিয়ন্ত্রণ করে সবসময়। বেশ কিছুদিন আগে ঝলমলে বিকেলে হাটতে শুরু করেছিলাম একা। বেশ খানিকটা হেটে আবাসিক এলাকাগুলো ছাড়িয়ে আমি যখন শহরের মধ্যখানে, হঠাৎ চিমশিলে গরমে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির পর আকাশ জুড়ে ঢল নামতে শুরু করল বিনা নোটিশে। ঝাপটা বৃষ্টিতে আমি তখন আঁধো ভেজা, দৌড়ে গিয়ে উঠেছিলাম কাঁচ ঘেরা এক ছোট্ট রেস্টুরেন্টে। ভেজা শরীর মুছতে মুছতে রেস্টুরেন্টের আশপাশটা তাকিয়ে যা দেখলাম তাতে ওটাকে রেস্টুরেন্ট বলা চলে না। ছোট্ট একটা কাঁচঘেরা ঘরে টবের মধ্যে সাজানো অনেক ছোট ছোট গাছগাছালির মাঝে বসার জন্য একটি টেবিল আর দু'টি চেয়ার, মুখোমুখি বসানো। আমি একটা চেয়ারে বসলাম গিয়ে। কাঁচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে বাইরের ঝাপসা বৃষ্টি দেখতে থাকলাম। ওয়েটার মারফত জানতে পারলাম, সেখানে ভালো ফালুদা আর ফলের জুস পাওয়া যায়। এক বাটি ফালুদার অর্ডার দিয়ে বসে রইলাম বৃষ্টি থামার অপেক্ষায়। কিন্তু সেই বৃষ্টির আর থামার নাম নেই। আমি বসে থাকলাম একা। মস্তিষ্ক অলস তাই নানান ভাবনা মনে এসে জড়ো হতে লাগলো। একটি টেবিল আর দু'টি চেয়ারের একটিতে আমি একা বসে ভাবতে লাগলাম- কী হতো যদি সামনের চেয়ারে অপর লিঙ্গের কেউ একজন বসে আমার চোখে অপলক চেয়ে থেকে বিরামহীন কথা বলে যেতো ? কল্পনাপ্রবন আমার মেধা সেদিন কল্পনাপ্রসূত অনেক বাক্যলাপন আর কথার ফুলছড়ির মালা সাজিয়েছিল। সেদিন আমার কল্পনায় হয়ত তুমি কিংবা কোন জলকুমারী ছিল না। তবে এমন কেউ একজন ছিল যাকে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ভেবে অবাধে সময় পার করা যায়। রাত দশটা অব্দি বৃষ্টি হলো আর আমি বসেই থাকলাম সেখানে। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় ফিরতে আমার কোন আপত্তি ছিল না তবে সেখানে একা বসে যে কল্পনায় আমি জড়িয়ে গিয়েছিলাম মনের মানুষকে নিয়ে তা ফেলে বেরুনো দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। তারপর বাসায় ফিরতে হবে এই তাড়নায় যখন ভিজে ছিপছিপে রাস্তা দিয়ে হাটতে শুরু করলাম, তখনও মাথায় ঐ একই চিন্তা। সেদিন হাটতে হাটতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যদি কোন দিন আমি আমার মনের মানুষ কিংবা আমার কল্প নারী পেয়ে যাই, যেখানেই থাকি না কেন- এই ছোট্ট ছিমছাম রেস্টুরেন্টে দু'জন মুখোমুখি বসে ঠান্ডা বরফ মেশানো ফালুদা খেতে খেতে জীবনের গল্প করব। এরপর বেশ কিছুদিন সময় করে আমি সেই রেস্টুরেন্টে একা বসেছিলাম, ভাবনা ঐ একটাই, কবে আমি দু'জন মিলে এখানে আসতে পারব। তোমাকে দেখার পর সেই ভাবনা আরও তীব্রতর হয়েছে, কিন্তু কিছু করতে পারিনি। আমি যে তোমাকে পাই না। জলকুমারী তুমি কী অধরা???
জলকুমারী, আজ তোমাকে বলি। যে টঙ্গটায় বসে তুমি চা খেতে তার অল্প কিছু দূর থেকে আমি প্রতিনিয়ত তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তুমি হাসতে, গল্প করতে, আড্ডা দিতে, আমি দেখতাম। আমার মুখের কোন ভাষা ছিল না সে সময়গুলোতে। চেয়ে থাকাতেই অজানা সুখ নিহীত ছিল। একদিন আমি তোমার পা জোড়ার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তোমার সুন্দর পা দু'টিতে সেদিন কোন নুপুর ছিলনা। কল্পনাপ্রবন আমার মন সেদিন কল্পনায় নুপুর জড়িয়েছিল তোমার পায়। তারপর থেকে একজোড়া নুপুর আমার মাথার ঢুকে গেলো। একজোড়া নুপুর আর একজোড়া পা। তোমার পা। আমি স্বপ্ন সাজালাম। "একদিন আমি তোমায় নিয়ে গেলাম ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারে। উদ্দেশ্য তোমার পায়ে নুপুর পড়াবো। উচু সিঁড়িটায় তোমাকে বসালাম, বললাম পা দু'টো দাও। তুমি বললে- কেন? আমি বললাম- নুপুর পড়াব। শুনে তুমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলে আমার দিকে। আমি স্বযত্নে তোমার পায়ে নুপুর পড়ালাম।" সবই কল্পনা। কল্পনার কোন সীমানা নেই জলকুমারী। পরবর্তীতে অতি উৎসাহী হয়ে এক জুয়েলারী দোকানে গিয়ে এক জোড়া নুপুরের খোঁজ নিয়েছিলাম আমি। ভেবেছিলাম পা জোড়া না থাক একজোড়া নুপুর আমার কাছে থাকুক। কোনদিন যদি পড়াতে পারি। অতি উৎসাহেরও একটা শেষ আছে। তোমার জন্য সে নুপুর জোড়া আর কেনা হয়নি। তবে তা কিনে নিতে আমি উদগ্রীব। জলকুমারী, তুমি তো এখন ডাঙ্গায় হেটে বেড়াও। তোমার পা জোড়া দেবে???
সিলেট শহরের অদূরে সারিখাল নামে একটি ছোট নদী আছে। তুমি চেন নিশ্চয়? এই সারিনদীটা আমার ভীষণ প্রিয়, বহুবার গিয়েছি। ছোট, শান্ত, আঁকাবাঁকা, পাহাড়ঘেষা আর নীল জলের নদীটায় তোমাকে নিয়ে নৌকায় চড়ে বেরাব বলে আমার কল্পনার আর শেষ নেই। একটি নৌকায় তুমি আর আমি। নৌকার মাঝিকে পাত্তা না দিয়ে তুমি আর আমি ভীষণ রোমান্টিসিজমে অবলোকন করব জলের ধারা আর প্রকৃতির মায়া। তোমার দৃষ্টি সুদূরে আর আমার দৃষ্টি শুধুই তোমার দিকে। নৌকার সামনের অংশে বসা তুমি আলতো করে পা ভিজিয়ে রাখবে নদীর জলে। তোমার চিরল চুল একপাশের কাঁধ বেয়ে নেমে যাবে সামনে। এই সামনে বসা তুমি ছাড়া সেই মুহুর্তে আমার কাছে বাকীসব মিছে। জলকুমারী সময় বেশি নেই। তুমি কী যাবে আমার সাথে সারিনদী???
আমি আড্ডা প্রিয় মানুষ। বন্ধুবান্ধব, সিনিয়র কি জুনিয়রদের নিয়ে আড্ডায় মশগুল থাকতে ভালবাসি। নিয়মিত আড্ডা চলে। এই তুমি আমাকে কতবার যে আড্ডার প্রাসঙ্গিকতা থেকে বাইরে টেনে নিয়ে যাও তার হিসেব নেই। তোমার কথা মনে পড়তেই উদাস হয়ে যাওয়াটা আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। বন্ধুবান্ধব বা অন্যদের কেউ জানেনা যে আমি কী নিয়ে ভাবি। তাদের চোখে আমি শুধুই একজন ভাবুক, একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ। আমি তাদের বলি আমি ভাবুক বা চিন্তাবিধ নই, আমি একজন ডুবুরী, একজন কল্পনার নাবিক। ভাবনার অথৈ সাগরে জাহাজ ভাসিয়ে কিংবা সাগরের গভীর থেকে গভীরতর তলে জলকুমারীকে খুঁজে বেড়াই। তোমাকে খুঁজে বেড়াই। তোমার চোখদুটো খুঁজে বেড়াই। কোন একদিন মধ্যরাতের আড্ডার আসরে মশগুল ছিল সবাই। কিছুটা ব্যতিক্রম ছিলাম আমি। গল্পের অপ্রাসঙ্গিকতায় প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম-
‘একজন মানুষ কিভাবে আরেকজন মানুষের ভেতরে প্রবেশ করে??’ এই অপ্রাসঙ্গিক ও উদ্ভট প্রশ্ন নিয়ে ঠাট্টা চলল কিছুক্ষণ। তারপরেই জ্ঞানগর্ভপূর্ণ আলোচনা শুরু হলো বিষয়টি নিয়ে। দীর্ঘ বিতর্ক শেষে এর জবাব এল- "শুধুমাত্র স্থির দৃষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমেই একজন মানুষ আরেকজন মানুষের মাঝে প্রবেশ করতে পারে।" উত্তরটি আমার পছন্দ হল। আমি নিজেও তাই ভাবি। কেবল মাত্র চোখে চোখেই মানুষ মানুষের ভেতরটা দেখতে পারে। জলকুমারী আমি তোমার চোখে অসংখ্যবার তাকিয়েছি। তুমি জান। তবে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ আমি পাই নি। জলকুমারী, আমি তোমার ভেতরে প্রবেশ করতে চাই। যদিও জানি, তোমার ভেতরে এতটুকু জায়গা আমার জন্য নেই। তারপরও অন্তত একবার তোমার ভেতরে প্রবেশের সুযোগ আমায় দাও।
জলকুমারী, সবকিছুরই শেষ আছে। অলি গলি, রাজপথ, সড়ক-মহাসড়কে সাঁ সাঁ দৌড়ানো গাড়িগুলোর শেষ গন্তব্য আছে, ফুটপাত দিয়ে হাটা সহস্র মানুষের চলার শেষ আছে, আকাশে উড়া সাদা মেঘগুলোর গন্তব্যের শেষ আছে, নতুন জন্ম নেয়া একটি শিশুর জীবনভর চড়াই-উৎরাই করা জীবনেরও শেষ আছে, প্রতিটা গল্পের শেষ আছে, প্রতিটা শুরুর শেষ আছে। তোমাকে নিয়ে আমার সকল জল্পনা-কল্পনাও একদিন শেষ হয়ে যাবে। কখনো কোন সময়ে জীবনের অতিষ্ট চাপে হয়ত জলকুমারীর কথাও ভুলে যাব। তোমাকেও হয়ত ভুলে যাব। কিন্তু ক্ষণিক অনুভূতিগুলোর কথা হয়ত ভুলতে পারব না। তোমায় নিয়ে অনুভূতিগুলো হয়ত শেষ হবে না। সাগরের জলে নেমে তোমাকে অনুভব করেছি, নদীর জলে পা ভিজিয়ে তোমায় অনুভব করেছি, আলতো পায়ের নুপুরের শব্দে তোমায় অনুভব করেছি, বৃষ্টিতে ভিজে তোমায় অনুভব করেছি, বন্ধুদের ভিড়ে আড্ডার স্থলে, চায়ের চুমুকে তোমাকে অনুভব করেছি। এই অনুভূতিগুলোর মত্যু হবে কিভাবে???
জলকুমারী, তোমাকে লিখা এই খোলা চিঠির শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। পরিশেষে আর একটু বলতে চাই, তোমাকে পাওয়া আমার অসাধ্য ব্যাপার। তবে জীবনে অসংখ্য অসাধ্য আমি সাধন করেছি। বাংলা কবিতা পড়তে ভাল লাগে। তবে লিখতে পারিনা মোটে। এই কবিতা লিখাটা আমার জন্য অসাধ্য। তারপরেও এই অসাধ্য কাজটা আমি তোমার জন্য সাধ্য করেছি। তোমাকে সম্মোধন করে খুব ছোট্ট একটা কবিতা আমি লিখেছি। এটিই আমার জীবনের একমাত্র কবিতা। কারণ, আমি তোমার জন্য কবি হতে চাই না বরং এক জলকুমারীর জন্য নাবিক হতে চাই।
কবিতাটা তুমি একবার পড়ে নিও----------
"সমুদ্রে নামি আমি, জল মাখি গায়ে /
জলকুমারী ছুবে কী জল, নুপুর দেব পায়ে"
জলকুমারী, সিলেটে আমি আর বেশী দিন থাকছি না। এই বিশ্ববিদ্যালরের ক্যাম্পাসে আমি আর বেশি দিন থাকছি না। তোমার ক্লাসরুমের সামনে দিয়ে আমায় তুমি আর দেখতে পাবে না। করিডোরে সদা অপেক্ষমান আমাকে আর তুমি দেখতে পাবে না। তবুও------------------------------
যদি কখনও মনে পড়ে, সমুদ্রে চলে এসো।
বিদায় !

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


