somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্পঃ কালো দুটি চোখ

১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ রাত ৯:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই গল্পটাও হাজারটা গল্পের মত। ঐ একই কাহিনী। ছেলেতে মেয়েতে ভাব। তারপর প্রেম ভালবাসা। অতঃপর পিতামাতা নাখোশ, নারাজ। তারপর বিচ্ছেদ, বিরহ। ছেলের অন্যত্র বিয়ে করণ, মেয়ের অন্যত্র বিয়ে প্রদান। দুই মন মিলে যে এক মন, তারপর ঐ এক মন ভেঙ্গে আবার দুই মন। যুগ যুগ ধরে হাজার কোটি মানুষের যেন একই ইতিহাস। তারপরও পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ যেহেতু আলাদা, তাদের জীবন, তাদের স্বত্বা যেহেতু আলাদা সেহেতু এক্ষেত্রেও কিছুটা আলাদা হবে বৈকি।

মেয়েটা লাজুক। জীবনে কখনও প্রেম করবে কি, এক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা দেখলেই তার দুই গাল লাল। প্রকৃতির নিয়মে হলেও দুই চারটা প্রেমিক পুরুষও যে তার মনে কখনো কড়া নাড়েনি তা হলফ করে বলা যায়। আর নিজে যে উৎসাহী হবে তাতো নজিরবিহীন। তারপরেও ঘটনা ঘটে। প্রেম আসে। তারই সদ্য পরিচিত কতকজনের মধ্যে একজন আলাদা হয়ে যায়। হৃদয়ে কড়া নাড়ে। বলে ‘ভালবাসি’। সে চোখ বুজে বলে দেয় ‘না, সম্ভব না, কিছুতেই না’। কিন্তু মুখেতো বলা গেল, অন্তরের কী হবে? মনকে সে আর আটকাতে পারলোনা। মন বেরিয়ে গেল, ছুটে গেল সেই ছেলেটার কাছে। খোঁজ খবর করলো ভালমত। যা জানলো তাতে এই সিদ্ধান্তে এল যে এতে তার চলবে। প্রেম হলো। অনায়াসে।

মেয়েটা সরলমনা। প্রেম কী জিনিস তা সে জানেনা। ছেলেটা কাছে আসতে লাগলো, সেও কাছে যেতে থাকলো। লেকের ধার বেয়ে একসাথে হাটলো। সবুজ গাছের নিচে বসে সময় কাটালো। হাত ধরে বসে থাকলো। রিক্সায় চড়ে বেড়ালো। সকাল দুপুর বিকাল রাত গভীর রাতে ফোনালাপ করলো। একসাথে চাইনিজে গেলো। জন্মদিনের উপহার কিনলো। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে পলিথিন মোড়ানো হুড তোলা রিক্সায় বসে চুমু খেলো। প্রেম কী জিনিস শিখলো বটে। সময় বয়ে গেল অনেক।

মা বাবার একমাত্র মেয়ে। বয়স যখন তেইশের ঘরে মা জানান দিল ‘চব্বিশের ঘরের আগেই কিন্তু তোমার বিয়ে দেব মা’। মেয়ে নির্বাক। অতঃপর মুখ কিড়মিড় করে, কানের দুই ছিদ্র বন্ধ করে, হাতে বজ্রমুষ্ঠি এঁটে, মুখের কথা বন্ধ করে, দুই তিন বেলা আহার প্রত্যাহার করে বুঝিয়ে দিল বিয়েতে সে রাজি নয়। মা বাবা বুঝলেন। আর কিছুটা দিন যাক তাহলে। বছর না ঘুরতেই আবার একই আলাপ। মা বললেন ‘ভাল প্রস্তাব এসেছে এবার, তুমি কিন্তু আর না করতে পারবেনা মা।’ মেয়েটি এখন কি করে? ঐ আগের মতই মুখ কিড়মিড়, কানের দুই ছিদ্র বন্ধ, বজ্রমুষ্ঠি হাত, কথা বন্ধ, দুই তিন বেলা অনাহার। তবে এবার তা করতে হয় দুই গুণ করে। মা বাবা বুঝলেন ঘটনা কিন্তু স্বাভাবিক নয়, কোন কারণ আছে নিশ্চয়। মা এসে বললেন ‘কী ঘটনা? আমাকে সব খুলে বলতো মা’। তারপর মেয়েটা লজ্জা শরম বাতিল করে, বুকে কিছুটা সাহস যোগাড় করে বলেই ফেললো ‘আমি একজনকে পছন্দ করি, তাকে ছাড়া আর কাউকেই বিয়ে করবোনা’। মেয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। পিতামাতাতে আলোচনা চলে। তারা ভাবে ‘মেয়ে যেহেতু আমাদের ঐ একটাই, তারমধ্যে আবার কত নিরীহ, নিশ্চুপ, জীবনে মুখ ফুটে কোনদিন কিছু চায় নাই। তাকে আর বাঁধা না দেই। তার নিজ পছন্দের পাত্রের সাথেই বিয়ে দেয়া যাক’। একদিন মা ডেকে বললেন ‘চিন্তা করোনা মা, তোমার পছন্দ অনুযায়ীই বিয়ে হবে’। মেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। রাতে ঘুমোতে গেলো। সেই ঘুমের মধ্যে কত যে স্বপ্ন। ঘুম শেষ হয়। স্বপ্ন শেষ হয়না। প্রথম ও প্রধান ফাঁড়াটা তো কেটে গেল। আর কোন বাঁধা নাই।

কিন্তু ছেলেটা মনে হয় একটু অস্বস্তিতে পড়লো। পড়াশোনা শেষ। চাকরি নাই। সামনে দু চার ছয় মাসের মধ্যে চাকরি পাবে তার নিশ্চয়তা নাই। কী করে? মনে অশান্তি। এদিকে বয়স বাড়ন্ত। সময় লাগাম ছাড়া। ডাক পড়লো হবু শ্বশুরালয়ে। তারা বলে দিলেন ‘চিন্তার কী আছে? বিয়ের আগে ভালো চাকরি পেতে যেটুকু সময় লাগে লাগুক। মন দিয়ে লেখাপড়া করো, কেমন।’

তাহলে আর কী বাঁধা? শুধু ঐ চাকরিটাই, কিন্তু সেটাতো সে পাবেই। তাহলে? তাহলে কী?

বাঁধ সাধে তার পিতামাতা। তারা নারাজ, নাখোশ। এবার ছেলেটার ফাঁড়া কাটানোর পালা। কিন্তু সে না পারলো মুখ কিড়মিড় করতে, না পারলো কানের দুই ছিদ্র বন্ধ করতে, না পারলো বজ্রমুষ্ঠি আঁটতে, না পারলো মুখ বন্ধ স্তব্ধ হতে, না পারলো দু একটি বেলা আহার পরিহার করতে, না পারলো আঁছাড় মেরে দু একটি জিনিস ভাঙতে। ফাঁড়া আর কাটলো না।

তারপর বিচ্ছেদ। বিরহ। মন ভেঙ্গে দুই টুকরো। স্বপ্ন বিনাশ। কষ্ট। যন্ত্রণা। অনিদ্রা। - কেবল মেয়েটিরই।

কেন এমন হল? এ প্রশ্নের উত্তর কী? মেয়েটা জানেনা। সে আকাশকে প্রশ্ন করে, খোলা বাতাসকে প্রশ্ন করে, বাগানের ফুল, প্রজাপতি, পাখিকে প্রশ্ন করে। উত্তর নেই।

সে ছেলেটাকে প্রশ্ন করে।

কিন্তু সে প্রশ্নের জবাব আর কোনদিন আসে না।

বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসে। অন্যত্র বিয়ে। নিজের পছন্দের বালাই নাই, পিতামাতার পছন্দ।

তার কালো দুটি চোখ, এখন দু'চোখে যা দেখে সবই কালো। নতুন কারো সাথে ঘর বাঁধবে কিন্তু নতুন কাউকে কী ভালবাসবে তা সে জানে না।
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×