somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শ্যামা'র ইতিকথা

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ১১:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে মশারীর একটি কোণা হাত লেগে ছিঁড়ে গেলো । মা দেখলে নির্ঘাত চেঁচাবে ! ‘এতো বড় হয়েছো অথচ কাজ করো বাচ্চাদের মত । মশারীর সঙ্গে কি যুদ্ধ করেছিলে ? মশারীর সাথে যে যুদ্ধ করা যায় সেটির প্রমাণ আজ তুমি রাখলে’ ! নাহ্ অসহ্য । মা দেখার আগেই যে করে হোক পালাতে হবে । সামনে পড়লে আজ রক্ষে নেই ! দেরী হয়ে যাবে । ওদিকে শ্যামা বেচারী একা একা ক্যাম্পাসে অপেক্ষা করবে । আজ বলতেই হবে কথাটি । যে করেই হোক । আর ভাবতে পারে না নিনাদ ।

বাইরে বেড়িয়েই মনসুর আলীর দোকানের ছেলেটাকে ইশারায় ডাকে নিনাদ । ‘একটা সিগ্রেট নিয়ে আয় । খোলা ম্যাচটা আনিস’ । সিগারেট ধরিয়ে রিকশায় চাপে নিনাদ । ‘মামু একটু টাইনা যাও, তোমার মামী কলেজে একলা দাড়ায়ে আছে’ । সেলফোনটি আলগোছে বের করে সে । ‘হ্যালো- শ্যামা, তুমি বোর হচ্ছনা তো ? এইতো আরেকটু । ম্যাক্সিমাম দশ মিনিট, আমি চলে আসছি । প্লিজ রাগ করো না’ । শ্যামা’কে আজ বলতেই হবে । যে করেই হোক । এভাবে দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হবে । শেষে পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে । আনমনে ভাবে নিনাদ ।

কলেজের গেটে পৌঁছে রিকশা বিদায় করে দেয় নিনাদ । গেট টপকে ভিতরে ঢুকে এদিক সেদিক তাঁকায় । হটাৎ করেই ওর মুখ উজ্জল হয়ে যায় । কলেজ লাগোয়া দিঘীর ধারের মস্ত কদম গাছের নিচে একা দাঁড়িয়ে আছে শ্যামা । ওর দৃষ্টি দিঘীর দিকে । একহারা গড়নের উজ্জল শ্যামবর্ণা শ্যামা ! গায়ের রঙ্গের সাথে ওর নামের মিল আছে । একবার জিজ্ঞেস করেছিল নিনাদ, ‘তোমার এমন নাম কে রেখেছিল বলো তো’ ? মিষ্টি হেসে শ্যামা উত্তর দিয়েছিল, ‘আমার ঠাকুমা’ । শ্যামা জাতিগত ভাবে হিন্দু । ব্রাম্মণ ।

‘তুমি কি কোনো কারণে রাগ করেছো শ্যামা’ ? নিনাদ প্রশ্ন করে ।
- নাহ্ । রাগ করার মত কিছু তো ঘটেনি ! এই প্রশ্ন কেনো করছো ?
- না, আসলে তোমার মুখটি কেমন যেন ভার ভার লাগছে ! তবে কি মন খারাপ ?
- না, আমার মন খারাপ নয় । মন ভাল আছে । কিন্তু একটি ব্যাপার বুঝতে পারছি না ঠিক । খটকা লাগছে । কি অমন জরুরী কথা বলবে যে আজ বন্ধের দিন আমাকে তুমি অনেকটা ফোর্স করেছো আসতে ?
নিনাদ এর মুখটি মূহুর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে যায় । ও ইতস্তত বোধ করতে থাকে । কিভাবে শুরু করবে সেটি ভাবতে থাকে । ‘আছে, জরুরী একটি কথা বলার আছে তোমাকে’ ।
- ও আচ্ছা । ঠিক আছে বলো । আমাকে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে । ঠাকুমার শরীরটা ভাল নয় ।
- হুম । তুমি কি কিছু খাবে ? নিয়ে আসব বাইরে থেকে ?
- না না ! এখন আমি কিছুই খাবোনা । তুমি বলো কেন আসতে বলেছো ।

এই কদম গাছটির তলাতেই ওদের দু’জনার প্রথম পরিচয় । ক্লাস বিরতির এক ফাঁকে ফাহাদ এখানে নিয়ে এসেছিলো নিনাদ কে । উর্মি, শ্যামা, রঞ্জু, রোজেন বসে গল্প করছিলো । রোজেন শ্যামাকে পরিচয় করিয়ে দেয় নিনাদের সঙ্গে । সেই শুরু । এরপর কিভাবে যে কি হয়ে গেছে তা ওদের দু’জনের কেউই বলতে পারবে না । কতদিন সদর হাসপাতালের রোড ধরে বেখেয়ালে গল্প করতে করতে একসাথে হেঁটে গেছে দু’জন ! কখনও চিতাখোলা রোডে আবার কখনও ছায়াবিথী আবাসিক এলাকার শেষমাথায় কৃষ্ণচুঁড়া আর রাধাচুঁড়া’র যে প্রকান্ড দু’টি গাছ আছে, তাদের মাঝখানের গুঁড়িতে বসে কত দুপুর পাড়ি দিয়েছে ওরা তার হিসেব কেউ রাখেনি । ওরা তো নয়ই ! শুধু হঠাৎ করে ধেয়ে আসা বাসন্তি বাতাস সে সময়ের ঘ্রাণটুকু হয়তো উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে নিজের কাছে জমা করে রেখে দিয়েছে ! পলকে ভাবে এসব নিনাদ । ওর মনটি বিষন্ন হয়ে যায় ।

- শ্যামা ?
- হুম ।
- আমাকে ভুল বুঝনা প্লিজ ।
- এ কথা কেনো বলছ ?
চুপ করে থাকে নিনাদ । ভিতরে বয়ে যাওয়া ঝড়টিকে আপ্রাণ চেষ্টা করে থামাতে । ‘বলছি’ ।
- তোমাকে এমন লাগছে কেনো দেখতে ? মনে হচ্ছে ভিষন ক্লান্ত !
- না, আমি ঠিক আছি । শোন, আমার মনে হয় আমাদের সম্পর্কটার এখানেই ইতি টানা উচিৎ । আমি অনেক ভেবে দেখেছি ।
- মানে ? শ্যামা সোজা হয়ে বসে । কি বলছো তুমি ? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না !
- আমাদের রিলেশনটি ক্যারী করা আর ঠিক হবে না । অনেক বাঁধা আসবে চতুর্দিক থেকে । আমার মা একটু অন্য ধরণের । উনি কিছুতেই আমাদের রিলেশন মেনে নেবেন না । আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি ।

অবাক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে থাকে শ্যামা । এমন কথা শোনার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিল না শ্যামা । মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকে । পুরো পৃথিবীটা যেন দুলছে ওর চোখের সামনে । পাথড়ের মূর্তির মত নিথর বসে থাকে শ্যামা । কিছু বলে না । শুধু চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝড়তে থাকে ওর । নিনাদ আবারও বলে, ‘তুমি কিছু বলছ না যে’ ? ব্যাগটি হাতে নিয়ে আস্তে করে দাঁড়ায় শ্যামা । ‘আচ্ছা চলি । তুমি ভালো থেকো নিনাদ । খুব ভাল’ । অবাক হয়ে শ্যামার চলে যাওয়া দেখে নিনাদ । ওর সাহস হয় না শ্যামাকে পিছু ডাকতে । হঠাৎ করে খুব কষ্ট হতে থাকে ওর বুকে । ভুল করলো কিনা বুঝতে পারে না নিনাদ ।

বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিল এক পশলা । মেঘ কেটে গেছে । ঝকঝক করছে তাঁরায় তাঁরায় খঁচিত আকাশ । তারই মাঝে ঝুলে আছে একফালি চাঁদ । যেন, আকাশের কপালে টিপ ! মৃদু হাওয়া বইছে দক্ষিণ থেকে । ছাদে পাঁটি বিছিয়ে চুপ করে বসে আছে শ্যামা । ওর কষ্ট হচ্ছে না, শুধু অদ্ভুৎ এক এক অবসাদ পুরো শরীর জুড়ে রিফুজ্যির মত জেঁকে বসে আছে । শ্যামার ছোট বোন নিলীমা এসে পাশে বসে । ‘কি হয়েছে রে দিদি ? বাসায় ফেরার পর থেকে দেখছি তুই যেন কেমন গম্ভীর হয়ে আছিস’ ।
- ন্ননা ! কিছু হয় নি ।
- তুই মিথ্যে বলছিস ।
- আরে কি শুরু করেছিস ! মিথ্যে বলব কেন শুধু শুধু ।
- হ্যাঁ, মিথ্যে বলছিস । তোকে চিনি আমি । নিনাদ দা’র সাথে কি কিছু হয়েছে ?
- নিলী তুই নিচে যা । আমি কিছুক্ষন একা থাকবো ।

‘একটাই তো মাত্র জীবন আমাদের । শুধুমাত্র একটা । অথচ এই আমাদের নিয়তি ও বটে । তবু আমরা বাঁচতে জানিনা নিনাদ । এই সমাজে এই সময়ে আমরা বাঁচতে জানিনা । বাঁচতে ভুলে গেছি আমরা নিনাদ । দোষ আসলে তোমার নয় । আমরা দাসত্ব করি অভ্যাসের, ভয় আর সংস্কার এর । প্রেমকে খুন করি অবহেলায় অতঃপর তার রক্ত ছানি রাতের আঁধারে । অপত্যস্নেহের পুতুলদের নিয়ে পুতুলের ঘর করি । শুধুই প্রশ্বাস নিই আর নিঃশ্বাস ছাড়ি । ছিঃ । ছিঃ । আমি আশা করেছিলাম তুমি বলবে । খুব আশা করেছিলাম, ‘চলো পালাই শ্যামা । সবকিছু ছেঁড়ে-ছুড়ে । দিন দ্রত ফুরিয়ে যাচ্ছে । আঁধার ঘনিয়ে আসছে দেখো । পালাই, বহিরঙ্গ থেকে অন্তরঙ্গে । আপাত থেকে সত্যের দিকে । সব বাঁধন ছিঁড়ে চলো দু’জন পালাই । পারবে ? সাহস হবে পালাবার’ ?

ভালো থেকো নিনাদ । খুব ভাল থেকো । শ্যামা’রা তো পাখি ! তোমাদের পৃথিবীতে শ্যামা’দের জন্য সবুজ কোনো ডাল নির্ধারিত থাকে না বাসা বাঁধতে । শ্যামা পাখিদের জন্মই হয় উড়ে বেড়াবার জন্য । শ্যামা’রা উড়েই বেড়ায় । আজন্ম ।

© নীল প্রলয় নিপু
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ১২:০০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চন্দ্রপ্রভা

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

চন্দ্রপ্রভা
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

তোমাকে দেখে মোহিত হই চন্দ্রপ্রভা
রোদ পড়লে চকচক করে
এতই সুন্দর লাগে
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি।
তোমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে
কিন্তু পাই না যে সাহস।
তুমি নাই বলে কি এত ঝড়?
তুমি পাশে নাই বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি কি পেলেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬



বাংলার দুই নোবেল জয়ী রবি ঠাকুর আর ডঃ ইউনুসের পিছনে অনেক কথাই তো বললেন।
ব্লগ লেখায় ভরিয়ে ফেললেন!
খোদা তাঁদেরকে যে জায়গা দিয়েছেন, তা থেকে এক চুল কি নিচে নামাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমরা নেহা বোরা কে বাংলাদেশের কথা বোলো না

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২


নেহা বোরাকে তোমরা বাংলাদেশের কথা বোলো না। বোলো না যে, তিনি যখন বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করছেন, তখন বাংলাদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুনেরা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে জেয়াফত খাওয়ার আন্দোলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×