somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

Home in the World: A Memoir – Amartya Sen

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

Home in the World: A Memoir – Amartya Sen, Penguin India, 1st Edition 2021

না, এটি আত্মজীবনী নয়, শুধু আত্মকথাও নয়; স্মৃতিকথা। স্মৃতিকথায় লেখক একজন চরিত্র। যার চোখ দিয়ে আমরা তাঁর সময়কালকে বুঝতে চেস্টা করি। সুতরাং লেখক কে, তিনি কোথা থেকে আসলেন, কোথায় বেড়ে উঠলেন, কাদের সান্নিধ্যে পেলেন ইত্যাদি জানতে পারলে তাঁর সময়কাল ও পরিবেশকে বোঝা যায়। অমর্ত্য সেন নিজের সম্পর্কে ততটুকুই বলেছেন যতটা তাঁর সময় ও পরিপার্শ্ব বুঝতে জানা প্রয়োজন। স্মৃতিকথায় গতানুগতিক লেখায় সময়কে ছাপিয়ে লেখক ‘আমি’ অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। এক নিঃশ্বাসে বহুল পঠিত কতগুলি বইয়ের নাম নেওয়া যাবে যেখানে সময়কে অতিক্রম করে লেখক ‘আমি’ বড় হয়ে উঠেছেন। কিন্তু এ বইটি ব্যতিক্রম। অমর্ত্য সেনের জন্ম ১৯৩৩ সালে। ১০ বছর পড়াশুনা করেছেন শান্তিনিকেতনে, তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজে, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়িয়েছেন যাদবপুর, কেমব্রিজ, হার্ভাড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড, দিল্লী সহ বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ সালে তিনি কেমব্রিজের শিক্ষকতা ছেড়ে দিল্লী স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াতে ভারতে ফিরে আসেন। মাত্র ৩ বছর বয়সে মায়ানমারের মান্দালয় শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রার স্মৃতি থেকে শুরু করে ১৯৬৩ সালে ভারতে ফিরে আসা পর্যন্ত সময়ের স্মৃতিকে অমর্ত্য সেন তুলে ধরেছেন তার স্মৃতিকথায়। এর মাঝে তিনি ইউরোপ, আমেরিকা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন, প্রখ্যাত বহু মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন (হাল আমলের আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস পর্যন্ত। কমলার মা শ্যামলা গোপালান (ভারত), বাবা ডোনাল্ড হ্যারিসের সাথে বন্ধুত্বের কথা, কমলার জন্মের পর হাসপাতালে তাকে দেখতে যাওয়ার ঘটনার বর্ণনা আছে), পড়িয়েছেন বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বাড়ি করেছেন আমেরিকায় ও ইংল্যান্ডে, তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্ব নাগরিক। তাই রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ (Home and the World) উপন্যাসের নামকরণে স্মৃতিকথার নাম দিয়েছেন Home in the World। যখন বিবিসির সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘Where do you consider to be your home?’ তিনি নির্ধিধায় বলতে পারেন, ‘I fee very much at home here right now. I had had a long association with Trinity, having been an undergraduate, a research student, a research fellow and then a teacher there. I also felt much at home in our old house near Harvard Square at the other Cambridge, and I very much feel at home in India, particulary at our little house in Santiniketan where I grew up and to which I love going back regularly.’

অমর্ত্যের পিতা আশুতোষ সেন, মাতা অমিতা সেন। আশুতোষ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রফেসর ছিলেন। অমর্ত্য সেনের ঠাকুরদা সারদা প্রসাদ সেন পেশায় ছিলেন বিচারক। তার পৈতৃক বাড়ি ছিল মানিকগঞ্জ জেলায়। পরে পুরান ঢাকার ওয়ারিতে তিনি বাড়ি করেন। অমিতা সেনের পিতা বিখ্যাত সংস্কৃত পন্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন। যিনি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের যোগ্য সহযোগী ছিলেন। লিখেছেন কয়েকটি মৌলিক বই। অমিতা সেন রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথের নির্দেশনায় ‘আধুনিক নৃত্য’ মঞ্চে রূপায়ন করেন। যখন তথাকথিত ভালো পরিবারের মেয়েরা জন সম্মুখে পারফর্ম করতে কুণ্ঠিত ছিলেন। এমনকি অমিতাকে সমাজের ‘ঝাণ্ডাধারী’দের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। শান্তিনিকেতনে দাদু ক্ষিতিমোহন সেনের বাড়িতেই অমর্ত্য সেনের জন্ম। ঢাকায় পরিবারের সাথে বসবাসকালীন ৩ বছর বয়সে পিতার কাজের সূত্রধরে তিনি মায়ানমারের মান্দালয়ে যান। সেখানে ১৯৩৯ পর্যন্ত অবস্থান করেন। আশুতোষ সেন এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লিভ নিয়ে Mandalay Agricultural College-এ visiting professor হিসেবে কাজ করেন। অতটা ছোট বয়স হওয়া সত্ত্বেও অমর্ত্য সেন মান্দালয়ের নানা স্মৃতি তুলে ধরেছেন। এরপর ঢাকায় ফিরে সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে পড়াকালীন ১৯৪১ সালের অক্টোবরে অমর্ত্য সেন দাদু-দিদিমার কাছে থেকে শান্তিনিকেতনে পড়াশুনার জন্য স্থায়ীভাবে চলে যান। এর কয়েক মাস আগেই রবীন্দ্রনাথ মারা গেছেন। ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কয়েকজন শিক্ষককের মত আশুতোষ সেনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান। শান্তিনিকেতন, সেখানকার বিদ্যাভ্যাস, ক্ষিতিমোহন সেন ও অন্যান্য শিক্ষক ও সহপাঠীরা অমর্ত্য সেনের মেধা ও মনন গঠনে কিভাবে সহায়তা করেছে, সেখানকার পারিপার্শ্বিকতা কেমন ছিল ইত্যাদি ফুঁটে উঠেছে তার এ পর্বের লেখায়। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের কথাও বাদ যায়নি। স্কুল জীবন থেকেই সেন ছিলেন অনুসন্ধিৎসু, জিজ্ঞাসু ও বইপোকা। তিনি তাঁর বই ‘argumentative indian’ শিরোনামের মতই তর্কপ্রিয়। তাঁর দাদু ক্ষিতিমোহন সেন তার জীবনে ব্যাপক প্রভাব রেখেছেন। তাঁর অসম্প্রদায়িক চেতনা কিভাবে অমর্ত্য সেনকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি যেকোন বিষয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করতেন। প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করতেন, নতুন ভাবে বিষয়বস্তুকে দেখার সহজাত স্পৃহা তাঁর ভিতরে কাজ করত। শান্তিনিকেতন ছাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও অতঃপর শিক্ষক পেশায় নিযুক্ত হয়েও তাঁর জ্ঞানানুসন্ধান তীব্র থেকে আরো তীব্রতর হয়েছে। তাঁর লেখা পড়লেই বোঝা যায় পড়াশুনার গভীরতা কতটা। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষক, সহপাঠীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যে আলোচনা করেছেন সেগুলি অনেকটা কথোপকথন আকারে তুলে দিয়েছেন। একটা বিষয় এখানে লক্ষণীয়, ২০১১ সালের থেকে অমর্ত্য সেন এই বইটি লেখার কাজ শুরু করেন। সেই হিসেবে স্মৃতিকথার শেষ সময় ১৯৬৩ সাল বই লেখা শুরু করার সময় থেকে প্রায় ৪৮ বছর আগের অতীত ঘটনা। অথচ যেভাবে তিনি বর্ণনা করছেন মনে হচ্ছে এইতো গত মাসের ঘটনা। এতে তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। ক্যানসার তাঁর শাণিত মেধাকে অবদমিত করতে পারেনি, ক্যানসারকে তিনি জয় করেছেন। কেমব্রিজ যাওয়ার পর তাঁর সহপাঠী ও শিক্ষকদের সাথে আলোচনার একটা দীর্ঘ অংশের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। তবে সেখানকার আরো নানা বিষয় আছে যেমন ১৯৫৩ সালে তিনি যখন কেমব্রিজে পদার্পন করেন তখনও ইউরোপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ফলে সে সময়কার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছেন, ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের বাঙালি বিচারক রাধানাথ পালের ডিসেন্টিং রায়ের কথাও বলেছেন। নতুন নতুন জায়গায় ভ্রমণের কথাও লিখেছেন। এই দীর্ঘ সময়ের বর্ণনায় সবকিছু ছাপিয়ে একটি বিষয় পরিস্ফুট হয়েছে তা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে স্মৃতিকথার সময়কালে কি নিয়ে কথা হচ্ছিল, তিনি কিভাবে সেই আলোচনার অংশীদারী হলেন, তিনি বিষয়বস্তু সম্পর্কে কি ভাবতেন ইত্যাদি। সুতরাং ভাবনার জগৎ আলোড়িত হওয়ার ক্ষেত্র কিভাবে প্রস্তুত হয় এই স্মৃতিকথা আমাদের সে কথাই জানায়। পাঠ করুন আনন্দে। ধন্যবাদ।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:৩৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন সমগ্রঃ পর্ব ২

লিখেছেন গিয়াস উদ্দিন লিটন, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪



আকবর শেঠ।



'বৈঠকি খুনের জনক' আকবর শেঠ এর জন্ম ১৯৫০ এর দশকে। আকবরের প্রথমদিককার জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না। আকবর শেঠ প্রথম লাইমলাইটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ মুজিব হল → ওসমান হাদি হল: নতুন বাংলাদেশের শুরু ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৩


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে দেশের শিক্ষাঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে ডাকসু নেতারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাত কোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি‼️রবিন্দ্র নাথ সঠিক ছিলেন বঙ্গবন্ধু ভুল ছিলেন। বাঙালি আজও অমানুষ!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:১৩


১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের জনগন সহ সমগ্র বিশ্বের প্রতি যে নির্দেশনা। তা এই ভাষণে প্রতিটি ছত্রে ছত্রে রচিত করেছিলেন। ৭ই মার্চের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো ভাষণের নির্দেশনাগুলো! কি অবলীলায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মের শুভেচ্ছা হে রিদ্ধী প্রিয়া

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:০১



জন্মের শুভেচ্ছা নিও হাজার ফুলের
শৌরভে হে রিদ্ধী প্রিয়া, তোমার সময়
কাটুক আনন্দে চির।স্মৃতির সঞ্চয়
তোমার নিখাঁদ থাক সারাটা জীবন।
শোভাতে বিমুগ্ধ আমি তোমার চুলের
যখন ওগুলো দোলে চিত্তাকর্ষ হয়
তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

=হাঁটি, আমি হাঁটি রোজ সকালে-মনের আনন্দে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭

রোজ সকালে খুব হাঁটার অভ্যাস আমার, সকালটা আমার জন্য আল্লাহর দেয়া অনন্য নিয়ামত। হাঁটা এমন অভ্যাস হয়েছে যে, না হাঁটলে মনে হয় -কী যেন করি নাই, কী যেন হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×