রমজান মাস, ২০১২
______________________
সময় টা ছিলো ১৯৯৯ সাল।
বাবার চাকরিসূত্রে থাকতাম জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলায়।
জন্মের পর থেকে সেখানেই বড় হওয়া...ছিলাম সেখানে ক্লাস ৪ অবধি।
মোটামুটি মফস্বল এলাকা ।
স্কুল,পড়াশোনা আর বিকেলে ঘণ্টা দেড়েকের ছুটি ছাড়া বাইরে বেরুনোর খুব একটা সুযোগ হতো না।
কিছুটা বাঁধাধরা নিয়মে ছিলাম বলেই কিছু কিছু জিনিস খুব আকর্ষণ করত।
বকশীগঞ্জ ছিলো ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ বর্ডার এলাকা।
আর আমরা শেষ যে বাসাটায় থাকতাম সেখান থেকে ভালো করে খেয়াল করলে বর্ডার এলাকার পাহাড় দেখা যেত।
কতদিন যে ইচ্ছে হয়েছিলো একলা একলা অই দূরের পাহাড়টা জয় করার টা গুনে শেষ করা যাবে না।
বাসার সামনের রাস্তাটা ধরে চলতাম আর দূর দিগন্তের দিকে হতাশ ভাবে চেয়ে থাকতাম।
অনেক চেয়ে-চিন্তে অবশেষে একদিন পাহাড়টায় যাওয়া হয়েছিলো বটে... কিন্তু আশা মিটে নাই।
বাবা-মা সাথে ছিলো ।
সেই বয়সে বাবা-মা সাথে থাকলে নিজের ইচ্ছে মত আর যাই হোক পাহাড়ে চড়া হয় না।
আর সবার মত সন্ধ্যার পর বাইরে থাকার ব্যাপারে ছিলো চরম restriction.
সেই বয়সে সেটাই ছিলো স্বাভাবিক।
তবু গোধূলি শেষে প্রায়ই ঘরটাতে ফিরে আসতে চরম অনিহা যাগতো।
রাতের আকাশ টা চষে বেরাতে ইচ্ছে করতো।
যথারীতি মাগরিবের আযানের আগে বাসায় ঢুকার নিয়মটা পালন করতাম বলে এই কাজটা খুব কমই করতে পারতাম
তখনকার আর একটা অভ্যাস ছিলো।
সম্পূর্ণ নিজ থেকে গড়ে উঠা...
বই পড়া।
এই "বই" প্রচলিত অর্থে বুঝায়মান "textbook" নয় (:p)।
"textbook" বিষয়টায় আমার চিরকালের এলারজি...
হাবিজাবি যাই পেতাম দম বন্ধ করে গিলে ফেলতাম।
ছাঁদে গিয়ে কিংবা টেবিল এ বসে বড় বইয়ের ভেতর বই লুকায়ে চিল্লায়ে চিল্লায়ে(!) কত দিন পড়ালেহা(!) করছি তার সিমা নাই।
ঝড় জিনিসটা আমার চিরকালই প্রিয় (বি.দ্র. পাকা ঘর উঠাইয়া নেওনের মতন ঝড় না(:p))।
সদ্য চলে যাওয়া বৈশাখ মাসেও এনজয় করার মত খুব কম ঝড়ই মিস করেছি।
কিন্তু সেই ছোটবেলায় যখন ঝুম বৃষ্টি বা ঝড়ো হাওয়ায় উদাস করা এলোমেলো বৃষ্টি নামতো তখন জানালার গ্রিল ধরে দেখে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিলো না।
মনে হচ্ছে আমি আমার ছোটবেলার restriction গুলোর বর্ণনা দেওয়ার জন্য এই কথাগুলো বলছি?
ব্যাপারটা কিছুটা সত্য হলেও আজকের উদ্দেশ্য ভিন্ন।
সেই ১৯৯৯ সালের শেষ দিকে আমাদের ঘর আলো করে এসেছিলো আমার একমাত্র বোন "নাবা"...
আব্বু-আম্মুর একমাত্র মেয়ে ছিলো বলে মাঝে মাঝে আদর টা একটু বেশিই পেত ও (:O)।
অনেকে বলে জামালপুরের মানুষ রা একটু বিদঘুটে!
কিন্তু এখনো পর্যন্ত যত প্রতিবেশী পেয়েছি তার মধ্যে সেই বকশীগঞ্জের প্রতিবেশীদের মতন প্রতিবেশী পাই নাই।
নাবা হবার পর প্রায় একমাস পাড়া-প্রতিবেশীদের বাসায় দাওয়াত খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছিলাম।
নাবা হবার পর প্রথম যে রমজান মাস আসে তখন হাড়কাঁপানো শীত ছিল।
সেই ছোট্ট পুতুলটাকে একটু গরম রাখতে সবার চেষ্টার কমতি ছিলো না...
তখন আমার এত seriously রোজা রাখা হতো না।
আজ ২০১২ সালের রমজান মাস...
সবাই মিলে সেহেরি খাচ্ছি...
সবার সাথে সেই "পিচ্চি" নাবাও আছে।
যদিও এখন তারে পিচ্চি বললে ক্ষেপে ভূত হয়ে যায় ।আর বলে "এই আমাকে পিচ্চি বলবানা, আমি কিন্তু ক্লাস ফাইভে পড়ি"।
আজ সেহেরিতে সবার খাওয়া শেষে দেখলাম সে এক গ্লাস পানি আর আম্মুর ওষুধ নিয়ে আম্মুকে বলতেছে..."আম্মু তোমার ওষুধ খাইসো?"
আমি চুপ করে যখন এটা খেয়াল করছি তখন সে আমার দিকে ফিরে বললো "ভাইয়া, নামাজ পইড়া ঘুমায়ো কিন্তু !"
পিচ্চিটা আসলেই যে একটু হলেও বড় হইসে তা দেখায়ে দিল...
কিছুক্ষণ ভেবে অনেক আগের নেওয়া ডিসিশনটা আবার মনে করলাম।
ছোটবেলায় যে মুহূর্ত গুলো মনে হতো খুব মিস করছি সেগুলো কোনটাই তাকে মিস করতে দিবো না...
পাগলীটাকে মাঝে মাঝে সূর্যোদয় দেখাতে নিয়ে যাই, রাতে বাইরে নিয়ে গিয়ে মাঝে মাঝে বুঝাই কেমন করে জ্বলে জোনাকি কিংবা চাঁদের বুকে কালো ছাপই বা কেন আছে, পরীক্ষা শেষ হলে পছন্দের বই এনে দেই, আম্মুর প্রবল নিষেধ সত্তেও ঝড়-বৃষ্টি তে ভিজতে নিয়ে যাই...
আর পাশে দাঁড়িয়ে অনুভব করি ছেলেবেলার হারানো সেই দিনগুলি আর আপন কেও কে সত্যিকারের কিছু দেবার আনন্দ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


