somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জন্মকথন-০১

২৭ শে মে, ২০১৪ রাত ১২:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.

দ্বি-প্রহর!
বাতাসে অলস দুপুরের ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে। ক্লাসের জানালাগুলোয় শরতের স্নিগ্ধ সাদা মেঘ ছড়াছড়ি।
এই সময়টাতে দুনিয়ার তাবৎ ক্লাসরুমের প্রাণগুলো এক লৌকিক অলসতায় মগ্ন হয়ে যায়।
আজকেও তাই হবার কথা ছিলো। ঘুম ঘুম ক্লাসের বদলে ক্লাসটা একটা গুমোট পরিবেশে পরিনিত হয়েছে। ইতিহাসের বোরিং লেকচার শুনতে শুনতে অভ্যস্ত ছেলে মেয়েরা ক্লাসের পিনপতন নিরবতায় অসহ্য ফিল করছে।
হল কি আজ প্রফেসর সাহেবের!
প্রফেসর মফিজুল হকের প্লাস পাওয়ারের চশমাটা টেবিলের উপর রাখা। ছোট বাচ্চাটার মত কোলের উপর দুহাত রেখে থ মেরে বসে আছেন।
অনেকক্ষণ পর প্রফেসর উঠে দাঁড়ান। চোখেমুখে একগাদা জড়তা নিয়ে সবার দিকে তাকান। ছেলেমেয়েরা আগ্রহ নিয়ে তাকায় প্রফেসরের দিকে। মনে হচ্ছে আবার কিছু বলবেন তিনি।

--আচ্ছা তোমরা কি কেও জেসমিন ফুল চেনো? আই মিন, জেসমিন ফুল পাওয়া যাবে এমন কোন যায়গার খোঁজ দিতে পারবে?

ইতিহাসের প্রফেসরের মুখে ফুলের আলাপ শুনে ক্লাসে হাসির একটা হলকা বয়ে যায়। মেয়েরা কানাকানি শুরু করে। কিন্তু প্রফেসরের মুখটা দেখে হাসাহাসি- কানাকানি মুহূর্তেই থেমে যায়।

একটা ছেলে উঠে। বলল,
--“স্যার, বোটানি ডিপার্টমেন্ট এ খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। তাদের গার্ডেন এ জেসমিন ফুল পেলে পেতেও পারেন”।
-- ও আচ্ছা। আজকে তোমাদের আর ক্লাস নিচ্ছি না।
এই বলে প্রফেসর সাহেব বের হয়ে যান।
ক্লাসের সবাই ভাবতে বসলো হলটা কি প্রফেসরের!

২.

প্রফেসর সাহেব জন্মের পর আদর করে ছোট মেয়েটার নাম রেখেছিলেন “জেসমিন”। প্রিয় ফুলের নামটা মেয়েকে দিয়ে সংসারে জেসমিন ফুলের ঘ্রানে ভরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। হয়েছিলও ঠিক তাই।
আজ অনেক বছর পর মেয়েটার সময় এসেছে নতুন করে ফুলের ঘ্রাণ ছড়ানোর।
তাই চেয়েছিলেন দিনটাতে মেয়েটাকে সত্যিকারের জেসমিন ফুল গিফট করবেন।
হাতে সদ্যছেড়া জেসমিন ফুলটা নিয়ে মাঠের এপাশে কটকটে রোদের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন।রাস্তাটা পেরুলেই বাসায় যাবার মেঠো পথটা। অইতো দেখা যাচ্ছে হলুদ বিল্ডিংটা!
তবু প্রফেসরের মন সায় দিচ্ছে না বাসার দিকে একপা এগুতে। আদরের ছোট মেয়েটার কু কু করে কান্না টা তো তার একদম বুকে গিয়ে লাগে। দুদিন ধরে মেয়েটার পেইন বেড়েছে। বাচ্চা হবার শেষ সময়টা ঘনিয়ে এসেছে। কথামতে কিছুক্ষণের মধ্যেই সু-সংবাদ টা পাবেন। ছেলেটাকে বলে এসেছেন নাতি জন্মালেই যেন তাকে খবরটা দেয়া হয়।

সবমিলিয়ে তাই আপাতত দূরে থাকাই নিজের জন্য নিরাপদ মনে করছেন। বাসা ভর্তি মানুষ। সবার সামনে কি বাচ্চাটার মত চোখের পানি ফেলা যায়?

৩.

ওই তো!
ওই তো দেখা যায় ছোট ছেলেটা তার দিকেই তিড়িং বিরিং করে ছুটে আসছে।

মুহূর্তে থম ধরে থাকা প্রফেসরের দেহটা আশ্চর্য এক গতি পায়। বুড়ো বয়সের হিসেবটা হঠাত ভুলে পায়ের গতিটা আশ্চর্য রকম বেড়ে যায়। এক ছুট লাগান মেঠো পথটা ধরে।
লজ্জা ভুলে ততক্ষণে চোখের দু-কুল ছাপিয়ে আসে জল। জগতের বিসুদ্ধতম আনন্দ দুচোখে নিয়ে মানুষটার হাতে নেচে বেড়ায় একটা জেসমিন ফুল!

৪.

সেই দিনটা থেকে ২৪ বছর পর..

আজ জেসমিনের সেই ছেলেটার জন্মদিন। তাই রান্নাঘরে ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। হাসিমুখে বানাচ্ছেন ছেলের প্রিয় ডিশগুলো।
রান্না ঘরে ব্যাস্ত মাকে দেখতে আসে ছেলে। টুপ করে মায়ের পাশে বসে থেকে চুপচাপ রান্না করা দেখতে থাকে।
ছেলেটা সামনে বসে থাকা মা আর প্রফেসরের সেই ছোট মেয়েটার সাথে একটা তুলনায় মগ্ন হয়। প্রফেসরের সেই ছোট মেয়েটা এখন আর ছোট্টটি নেই। সংসারের বাঁধা নিয়মে চেহারা থেকে জেসমিন ফুলের সুবাশটা অনেকটাই উধাউ হয়ে গিয়েছে।

রান্না ঘরের বাতাসে মউ মউ করছে পোলাউ-কোরমার গন্ধ।
মায়ের খুব কাছে বসে থাকা ছেলেটার নাকটা পোলাউ-কোরমার গন্ধ পায় না। পায় সারাদিন ধরে রান্না ঘরে বসে সিদ্ধ হতে থাকা ঘর্মাক্ত মায়ের গন্ধ।
আশ্চর্য! ঘামের গন্ধ এতো সুবাশ ছড়ায়!

ছেলেটা আর পারে না! দু চোখে পানির ধারা ছুটিয়ে জড়িয়ে ধরে মায়ের শরীরটা।
ছেলেটা বুঝতেই পারে না পৃথিবীর শুদ্ধতম সম্পর্কের সৃষ্টিকর্তা এই মাকে কি বলে কৃতজ্ঞতা জানাবে।
পেছনে থাকা বাবাটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখে দুটি প্রিয় মানুষের সুখের কান্না। ভেতরে থাকা উপচানো ভালোবাসাটুকু নিজের ভেতরে চেপে রেখে আশ্চর্য এক সুখ পায়। বাবা’রা মনে হয় এমনি হয়!

৫.
আচ্ছা...বেহেশতে নানা জাতের ফুল থাকবে। জেসমিন ফুল থাকবে তো?

জেসমিন ফুল থাকুক আর না থাকুক আমার ঘরে সুবাশ ছড়ানো প্রফেসর সাহেবের সাধের জেসমিন ফুলটা থাকলেই চলবে।
:)
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তোমার মুখের রেখা আঁকতে চেয়েছি।

লিখেছেন জায়েদ হোসাইন লাকী, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০



রাতটি ছিল নিকোটিনে ভেজা
ধোঁয়ার ভেতরে তোমার অবয়ব হঠাৎ উধাও হয়ে গেল
চাঁদ তখন লাল আর ঠিক আমার ফুসফুসের মতোই ক্লান্ত।
তুমি আলো হয়ে রইলে, আমি অবাধ্য আলোর ফসিল

আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ - ছোঁয়া

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৭

আজ বৃষ্টি তাকে প্রথম ছুঁয়েছে। ওর স্পর্শে তার সমস্ত সত্তা যেন হীরের মত স্বচ্ছ স্ফটিকে ছেয়ে গেছে। বৃষ্টি বলেছে, সে আকাশের কাছে গিয়েছিল। মেঘের কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কলকাতায় নিয়মিত যারা যাতায়ত করেন তারা এই প্রশ্নের মূখোমুখি হবেন প্রায়ই।

লিখেছেন ইমরান আশফাক, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৩

আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে যারা কলকাতায় যাতায়ত করে থাকেন তারা স্হানীয়দের কাছেকি এই প্রশ্নটির মূখোমুখী হয়েছেন নিয়মিতভাবে: দেশভাগের সময় বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ আর ভারতকে দেয়া হয়েছিলো খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৯


আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

×