সরাসরি রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে কখনো লিখি না। কিন্তু বিষয়টা মুক্তিযুদ্ধ-জড়িত হলে তখন আর খেয়োখেয়ির 'রাজনৈতিক' থাকে না।
রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এবং এ বিষয় নিয়ে কথা বলা যায়।
ঠিক রাজনৈতিক 'সচেতন' ও নই এবং রাজনৈতিক নৈতিকতাও বুঝে উঠিনি বলেই মনে হল, আমাদের মত আটপৌরে অবস্থানের মানুষেরও এই ধরনের বই নিয়ে কিছু বলা দরকার। নয়তো শুধু পক্ষ নিয়ে কথা বলারাই দেদার বলে যাবেন, আমরা শুধু কনফিউজড হব, তা হবার নয়।
এই রিভিউ মাত্র দুই অধ্যায়ের। দুটা অধ্যায় কাল রাতে পড়েছি। মার্চ মাস এবং স্বাধীনতার ঘোষণা বিষয়ক।
মহান মুক্তিযুদ্ধের উপসেনাপতি অবসরপ্রাপ্ত এয়ারভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার বীর উত্তম- এই নামটার সাথে একটা বিপুল ঝংকার উপস্থিত। আমরা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষেরা এই ধরনের কিংবদন্তী নামের সাথে সব সময় ঝংকার অনুভব করে এসেছি, যেমন বিপুল ঘৃণা অনুভব করে এসেছি যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনা ও এদেশে জন্মানো রাজাকারদের বিষয়ে।
বীরশ্রেষ্ঠরা বিতর্কিত হবেন না, কারণ তাঁরা মৃত বিপ্লবী। দেশ মৃত বিপ্লবী চায়। যারা মরে গিয়ে অমর হবেন। যাঁদের নিয়ে টানা হেঁচড়া করা যাবে, কিন্তু মৃতের সুবিধা প্রাপ্তির মাধ্যমে যারা আর কোন টুঁ শব্দ করতে পারবেন না। কিন্তু সারা পৃথিবীতেই দেখি, দেশ আসলেই জীবিত বিপ্লবী চায় না। দেশ অনেকাংশেই স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে চায়নি। চায়নি স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকারের পরিচালনায় থাকা মহামহিমদের। চায়নি মহান মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতিদের, বিভিন্ন বাহিনীর সেনাপতি, বিভিন্ন সেক্টরের প্রায় বিশজন সেনাপতিকে, স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারকারী জিয়াউর রহমান বীরউত্তমকেও। তাই দেশ আসলে অনেকাংশেই পদবীপ্রাপ্ত বা পদবীবিহীন বীর উত্তমদের ঠিক চায় না। মূল্যায়ন করা তো পরের বিষয়।
পড়তে গিয়ে যা মনে হয়েছে সরল ভাষায় তাই বলব।
নামকরণ
১৯৭১:ভেতরে বাইরে নামটা ঠিকই আছে। তবে মনে হয়েছে নামটা এমনো হতে পারতো, '১৯৭১:রাজনৈতিক নেতৃত্ব-ব্যর্থতা ও সামরিক-বেসামরিক স্বত:স্ফূর্ত উত্থান'... মানে, দুটা চ্যাপ্টার, ঠাসা ২২ টা পৃষ্ঠা পড়ে যতটুকু মনে হল, এই বই লেখাই হয়েছে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের 'প্রকৃত' অবস্থা চিত্রায়ণের উদ্দেশে। বা, বলা ভাল রাজনৈতিক নেতৃত্বের যত ভুল আছে, তা তুলে ধরার উদ্দেশে।
লেখার গতিপ্রকৃতি
প্রচুর অনুবাদের অভিজ্ঞতা থাকায় বলতে পারি, বইটা সম্ভবত বাংলা ভাষায় লেখা হয়নি। ইংরেজিতে হয়েছে। আাংশিক হলেও। একমাত্র ভাষান্তর করলেই লেখা এমন নিরাবেগ এবং অতি-প্রবন্ধসুলভ হতে পারে। দ্বিতীয়ত যা হতে পারে, লেখক কখনো ইংরেজি কখনো বাংলায় কথা বলেছেন, সেগুলো রেকর্ড করা হয়েছে এবং লেখার রূপ দেয়া হয়েছে। অথবা, লেখকের বাংলা ভাষায় লেখার অভিজ্ঞতা কম থাকাতে এমন হয়েছে- এই শেষ সম্ভাবনাটাকে আমি সবচে দুর্বল সম্ভাবনা ধরছি।
প্রথম দুটা সম্ভাবনা খুবই সাধারণ সম্ভাবনা। বিখ্যাত মানুষদের বেলায় এমনটাই হয়। তবে এক্ষেত্রে লেখার একটা অপূরণীয় ক্ষতি হয়। মাতৃভাষায় নিজহাতে লেখা আর ভিন ভাষায় লেখা অথবা কথা রেকর্ড করায় গভীরতার আকাশ পাতাল তফাত।
টিয়াপাখি, ময়নাপাখি, অচিনপাখি ও কাকপাখির বাইরে
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের কথা আমরা শুনি চার ধরনের পাখির মুখ থেকে। যত বড় মানুষই হোন না কেন, তাদের আলাপ হবে এই চার ক্যাটাগরির যে কোন একটায়। টিয়াপাখির বুলি স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক দলের বুলি। ময়নার বুলি স্বাধীনতা প্রচারের দর্শন-বুলি। অচিনপাখির বুলি হল সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীদের বুলি যা পরপর স্বাধীন বাংলাদেশের দুই সরকার বিলুপ্ত করেছে সিভিল এবং সামরিক উভয় শ্রেণী থেকে। প্রথম তিনটা পক্ষই স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল অথবা যুদ্ধ করার চেতনায় উদ্বুদ্ধ। চতুর্থ কাকপাখি শুধু কা কা ছাড়া আর কিছু করতে জানে না। এটা রাজাকার শ্রেণী।
লেখায় টোল থাকবেই, ডোল থাকবেই। লেখা হেলানো থাকবেই। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের উপসেনাপতির লেখা হওয়াতে এতে টোলটা এই চারদিকের কোনদিকেই যায়নি সম্পূর্ণরূপে।
জয় পাকিস্তান বিষয়ক
মূলত বহুবার যা শুনেছি তা হল, বঙ্গবন্ধু সাত মার্চে পুরো বক্তব্যের শেষে অনুচ্চস্বরে জিয়ে পাকিস্তান বলেছিলেন। এবং বহুবার এর বিপক্ষেও শুনেছি। আমার বাবাও সেখানে ছিলেন, একেবারে সামনেই ছিলেন। তাঁকে জিগ্যেস করার পর তিনি যা বললেন, তা হল, এই শব্দটা বলা হয়েছে কিনা, তা মনে নাই।
আসলেই, এই কথাটা বেশিরভাগ মানুষের। কারণ, এই কথার দিকে কারো মনোযোগ যাবার যো ছিল না, যদি বলাও হয়ে থাকে। কেন? কারণ এই শেষ কথাটা যদি অনুচ্চস্বরে বলাও হয়ে থাকে, এটাকে জগতের সব মানুষ কথার কথা হিসাবেই ধরে নিয়েছে। অন্তত সেই সময়।
সাত মার্চের ভাষণ বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষের মুখস্ত। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। এখনতো মনে হচ্ছে এটা মুখস্ত করানো দরকারই ছিল। সেই কথাগুলোর পর স্বাধীনতার কোন্ ঘোষণা দিতে বাকি রইল- এটা বোধগম্য নয়।
'এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম', 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম', 'প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল' 'তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে' 'শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে'- এই ভাষণে অন্তত পাঁচবার স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
সত্য সত্যই। সত্য সত্যই ছিল, সত্যই থাকে, সত্যই থাকবে। এ নিয়ে ত্যানা প্যাচানোর গু-রুত্ব থাকতে পারে, গুরুত্ব নেই। তা তিনি জিয়ে পাকিস্তান টেকনিক্যাল কারণে বলে থাকুন বা নাই থাকুন।
কাকের মত বললে চলবে না, যে মুজিব আসলে স্বাধীনতা চায়নাই। পাকিসেনা আর রাজাকাররা আসলে ফেরেস্তা ছিল।
স্বাধীনতার প্রচার বা ঘোষণা বিষয়ক
অনেক অজানা বিষয় খোলাসা হয়েছে। অজানা এই কারণে যে, এইসব তথ্য সবখানেই ছিল, কিন্তু এলোমেলো ছিল। এখানে খুবই স্পষ্টভাবে একত্রিত হয়েছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার জেড ফোর্সের অধিনায়ক সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম করেননি, তাঁর আগে ওইখান থেকেই অনেকে করেছেন। এমনকি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ-প্রচার-কৌশলের কারণে নিজেকে প্রেসিডেন্টও ঘোষণা করছিলেন পরবর্তীতে তিনি ইউনিফাইড প্রচার পাঠ করেন।
একজন মিড-সিনিয়র সামরিক অফিসারের এই কন্ঠ দেশে নতুন করে বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিল, যা খাটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই।
স্বাধীনতার প্রথম পদক্ষেপ বাঙালিদের নেয়া বিষয়ক
একজন সিনিয়র সামরিক অফিসার এ কে খন্দকার যেভাবে দেখবেন, কোন রাজনৈতিক নেতা কখনো বিষয়গুলোকে সেভাবে দেখবেন না। তিনি সামরিক অফিসার ছিলেন, তাঁর প্রথম দৃষ্টিই যাবে সামরিক সমাধান এবং তার টেকনিকের দিকে। সামরিক অফিসাররা আজীবন রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করে যেতে পারবেন, কিন্তু অসামরিক রাজনৈতিক নেতাদের কর্মপদ্ধতির সাথে কখনোই তাদের কর্মপদ্ধতি মিলবে না।
বাংলাদেশে সাত মার্চের পর থেকে কার্যত স্বাধীনতা চলছিল, এটা তিনি বারবার স্বীকারও করেছেন। সারা বাংলায় বাংলার পতাকা উড়ছিল। প্রশাসন এক প্রকার ছিলই না।
এরপর শুধু একটা পদক্ষেপই বাকি ছিল, আর তা হল প্রথম আক্রমণ। এটা কেন বাংলাদেশ করেনি, সেই দায় বাংলাদেশকে দেয়া যায় না। যদি প্রথম আক্রমণ বাংলাদেশ করতো, তবে হয়ত আজকে বাংলাদেশে এবং সারা বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আরো বড় করে প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যেত এবং একটা দোষারোপ রয়েই যেত বাংলার উপর।
স্বাধীনতার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে তিনি বারবার বারবার তুলে এনেছেন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ শুরু করার কথা। এবং বিশাল মৃততুর জন্য দায়ী করেছেন তৎকালীন আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক নেতাদের। একটা কথা মনে রাখতে হবে, এই হত্যাকান্ডগুলি তখনকার আওয়ামীলীগের নেতারা করেনি, বরং পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা করেছিল।
হত্যাকান্ডের দায় হত্যা পরিকল্পনাকারীর এবং বাস্তবায়নকারীর, হত্যার শিকারের কখনোই নয়। অথচ এই একটা বিষয় এতবার তিনি তুলে এনেছেন যে, যে কোন স্বচ্ছ্ব চোখের মানুষের চোখে এটা লাগবেই। বইয়ের উদ্দেশ্যই যেন এই কথাগুলো। রাজনৈতিক নেতৃত্বের 'ভুল' ও 'অদূরদর্শীতা' গুলো।
মুক্তিযুদ্ধে একক সামঞ্জস্য এবং একক কমান্ডের অভাব বিষয়ক
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হল জগতের সবচে স্বত:স্ফূর্ত বিষয়গুলোর অন্যতম। এই মুক্তিযুদ্ধ কখনোই এককভাবে আওয়ামীলীগের নয়। একাত্তরের আগে যারা আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়েছিলেন, তারা মূলত বাঙালিকে ভোট দিয়েছিলেন, আওয়ামীলীগকেই শুধু নয়। আর এখানে আওয়ামী-অ আওয়ামী সবাই একযোগে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সুবিধাবাদী, ভীরু এবং রাজাকার বাদে।
তাই, এ যুদ্ধ যারা করেছেন তারা পরবর্তীতে সবাই যে আওয়ামী ঘরানার হবেন, এমন কোন কথা নেই।
পরিশেষে বলার এটুকুই, মুক্তিযুদ্ধের উপসেনাপতি চিরকালই উপসেনাপতি থাকবেন। তাঁর অনন্যতা তাঁর অসামান্যতা কোনদিন ক্ষয় হবে না, কেননা একাত্তর চলে গেছে। একাত্তরে যে পাকিখুনি ও রাজাকার হয়েছিল সে আজীবন ধীকৃত, একইভাবে যিনি অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন, একাত্তরের পর তার সমস্ত ভূমিকা স্বাধীনতার প্রেক্ষিতে গৌণ।
এই বইটি ওইসব ক্ষুদ্র ডিটেইলসের জন্য অসাধারণ, যা হয়ত মুক্তিযুদ্ধের উপসেনাপতি ছাড়া আর কেউ জানাতে পারতেন না। অনেক বেশি সংখ্যক বিষয় উঠে এসেছে এতে। বিশেষ করে ক্ষণে ক্ষণে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা ব্যাক্তিদের দারুণ স্বীকৃতি উঠে এসেছে, যারা হয়ত ইতিহাসে আর কখনো স্মরিত হতেন না।
লেখকের যেন চোখে পড়েনি, সারা বাংলাদেশে আওয়ামী এবং প্রো-আওয়ামীরা যুদ্ধ করেছিল। প্রতিটা থানায়, এমনকি প্রতিটা গ্রামে। আবার আওয়ামী প্রো আওয়ামী ছাড়াও অন্যেরা এতে শামিল হয়েছিল।
যে দুটা চ্যাপ্টার পড়লাম, তাতে বোঝা যায় লেখকের হয়ত রাজাকার শ্রেণীর প্রতি বিন্দুমাত্র নজর নেই। এবং এটা খুবই স্পষ্ট যে, তিনি এক ধরনের রাগ অথবা এক ধরনের পরিকল্পনা থেকে বইটি লিখেছেন। তাঁর মত অবস্থানের ব্যক্তির জন্য এক দর্শনে বই লেখাটা যৌক্তিক হয়নি।
এই বই থেকে ফায়দা লুটবে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজাকারশ্রেণী। এটা যদি বইয়ের পরিণতি হয়ে থাকে, তবে নির্দ্বিধায় বই মুক্তিযুদ্ধের বই হতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভাবনার সহায়ক হিসাবে সফল হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




