somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কারবালার আলোকে: যে কারণে মাজহাব ও তরিক্বাহ্'র ইমামগণকে সন্ত্রাসবাদী ও সালাফিরা ছুঁড়ে ফেলেছে

০৪ ঠা নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৪:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নিশ্চই সালাফিদের এইসব টিভি প্রোগ্রাম বাংলা হিন্দি উর্দু এবং বিশেষ করে ইংরেজিতে দেখে আমরা অভ্যস্ত, আবু হানিফাকে আমি দেয়ালে ছুড়ে মারলাম। মালিক, শাফিয়িকে দেয়ালে ছুঁড়ে মারলাম... এই দেয়ালে ছুড়ে মারার দেয়ালের ওপাশের ইতিহাস নিয়ে অতি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা-

ইমাম আবু হানিফা রা. (৮০-১৫০ হি.)-

সবচে বড় জনবিস্তৃত মাজহাবের ইমাম, বর্তমান পৃথিবীতেও জীবিত ৩১% মুসলিমের সরাসরি ইমাম, স্বয়ং তাবিয়ি, ২৭ সাহাবার ছাত্র এবং ৩,৫০০ তাবিয়ির ছাত্র। হাদীস শাস্ত্রের সবচে বড় ইমাম (দ্র. ড. তাহির উল ক্বাদরীর প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার বই বাংলায় অনূদিত সাঞ্জারী পাবলিকেশন্স)। রাসূলে খোদা দ.'র প্রতি যে আক্বিদা রাখতেন, তার প্রমাণ ক্বাসিদায়ে নু'মান এ লিখেছেন, 'হে আল্লাহর রাসূল দ.! আপনি ছাড়া এই সৃষ্টিজগতে আমার আর কেউ নেই।' ইনি আহলে বাইতে রাসূলিল্লাহ দ.'র (নবী দ. পরিবার) এমন অনুরক্ত ছিলেন, যে পরপর তিন পুরুষের আনুগত্য করে শিক্ষা লাভ করেছেন একই পরিবারের এবং ইমাম জাফর আস সাদিক রা.'র দুই বছর আনুগত্য ও ছাত্রত্ব করার পর বলেছেন, 'রাসূল দ.'র সন্তান মহান জাফরের মত কোন জ্ঞানী আমি ভূপৃষ্ঠে দেখিনি। জাতির সর্বাধিক জ্ঞানী তিনিই। আমি নু'মান ধ্বংস হয়ে যেতাম, যদি না আপন শাইখ ও ইমাম জাফরের বাসায় দুই বছর ছাত্রত্ব করতাম।'
নবী পরিবার দ. গণকে খলিফা নামধারী রাজা প্রবঞ্চনা করছিলেন, ইমাম আবু হানিফা রা.'র তখন শেষ বয়স। তিনি খলিফার সাথে রাষ্ট্রীয় সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং বারংবার একাধিক খলিফার রাজকীয় দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানান। আহলে বাইত রা. গণের আনুগত্যের কারণে তাঁকে কারাবন্দী করা হয়, সেখানে অন্তরীণ অবস্থায় বিষয় প্রয়োগ করা হয় এবং শহীদ করা হয়।

ইমাম মালিক ইবনে আনাস রা. (৮০-১৮৯ হি.)-

২৫% মুসলিমের সরাসরি ইমাম, মালিকি মাজহাবের দিকনির্দেশক, হাদীসের ইমাম, মদিনায় জন্মগ্রহণকারী এই মহামানবকে শাসকগোষ্ঠী বশে আনতে না পেরে পথে হিঁচড়ে নিয়ে যায় এবং সবার সামনে চাবুক মারে। তাঁর সম্পত্তি ক্রোক করা হয়। তাঁরও দোষ ওই একটা, তিনিও আহলে বাইতে রাসূলিল্লাহ দ.'র প্রতি সর্বতো সমর্পিত ছিলেন।
তিনিও ছিলেন মহানবী দ.'র মহান সন্তান জাফর রা.'র ছাত্র ও অনুগত। তৎকালে রাসূল দ.'র বংশধরদের ইবনে রাসূল বা রাসূল দ.'র সন্তান নামে সম্বোধন করা হতো যেহেতু রাসূল দ. হাসান ও হুসাইন রা.কে নিজ দৌহিত্র না বলে বারংবার পুত্র সম্বোধন করেছেন।
অথচ আব্বাসীয় খলিফারা ইমাম মালিককে হাদীস শাস্ত্রে এত সুউচ্চে জ্ঞান করতেন যে, ভূপৃষ্ঠে ইমাম মালিকের হাদীসের গ্রন্থের মত বিশুদ্ধ কুরআন ছাড়া আর দ্বিতীয় গ্রন্থ নেই- একথা পুরো মুসলিম জাতিতে প্রবাদপ্রতীম ছিল।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদ্রিস আশ শাফিয়ি রা. (১৫০-১৯৮)-

হিজাজ (মক্কা মদিনার মূল ভূমি) তে জন্মে তাঁর মাজহাবের বিকাশস্থল হয় মিসরে। ১৬% মুসলিমের ইমাম বিষয়ে কোন কথা বলব না। শুধু তাঁর লেখা থেকে এইটুকু-

ﻳﺎ اهل ﺑﻴﺖ ﺭﺳﻮﻝ ﻟﻠﻪ ﷺ ﺣﺒﻜﻢ
ﻓﺮﺽ ﻣﻦ ﻟﻠﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥ ﺍﻧﺰﻟﻪ
ﻳﻜﻔﻲ ﻛﻢ ﻣﻦ ﻋﻆﻴﻢ ﺍﻟﻔﺨﺮ ﻋﻨﻜﻢ
ﻣﻦ ﻟﻢ ﻳﺼﻞ ﻋﻠﻴﻜﻢ ﻟﺎ ﺻﻠﺎ ت له

হে নবী ﷺ এর বংশধররা,আপনাদের ভালোবাসা
আল্লাহ কুরআনে আয়াত নাযিল করে ফরয করেছেন।
আপনাদের মর্যাদা বোঝার জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে
কারো নামায হবে না যদি আপনাদের উপর দরুদ না পড়ে।

তাঁকেও আহলে বাইতে রাসূলিল্লাহ ﷺ র পথে শহীদ করা হয়।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রা. (১৬৪-২৪১ হি.)-

সালাফি/আহলে হাদীস এরা এটা ভয়ংকর বাজে কথা বলে বেড়ায়, যেটুকু তারা অনুসরণ করার, মহান হাম্বলী মাজহাব অনুসরণ করে। এরচে বাজে উক্তি আর হতে পারে না। হাদীসশাস্ত্র ও ফিকাহর মহান ইমাম, হাম্বলি মাজহাবের ইমাম এজিদ সম্পর্কে কী বলছেন শুধু সেটুকুই সংক্ষেপে দেখি-
ইমাম আহমদ রা.'র সূত্রে উল্লেখ করেছেন আল-বরযানজি র. নিজ ‘আল-আশআত’ পুস্তকে এবং আল-হায়তামী তাঁর ‘আস্ সাওয়াইক্ক’ গ্রন্থে এই মর্মে যে, ইমাম আহমদ রা.-এর পুত্র আবদুল্লাহ তাঁকে অভিশপ্ত পিশাচ এজিদের প্রতি লা’নত (অভিশাপ) দেয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। ইমাম সাহেব বলেন, ‘তার প্রতি লা’নত দেয়া যাবে না কেন, যেখানে স্বয়ং আল্লাহতা’লা-ই কুরআন মজীদে তাকে লা’নত দিয়েছেন?’
আবদুল্লাহ আবার প্রশ্ন করেন, ‘কিতাবুল্লাহর ওই আয়াতটি তেলাওয়াত করুন যাতে আমি জানতে পারি কীভাবে এই পিশাচের প্রতি লা’নত দেয়া হলো?’
‘তবে কি তোমোদের এ লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে যে তোমরা শাসনক্ষমতা লাভ করলে পৃথিবীতে বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং আপন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরা হচ্ছে ওই সব লোক যাদের প্রতি আল্লাহতা’লা অভিসম্পাত (লা’নত) দিয়েছেন...’ (আল-কুরআন, ৪৭:২২-২৩)।
এরপর তিনি বলেন, ‘এয়াযীদ যা করেছে তার থেকে বড় বিপর্যয় আর কী হতে পারে’?” [আল্লামা আলূসী কৃত ’তাফসীরে রূহুল মা’আনী’ গ্রন্থের ৯ম খণ্ড, আল-কুরআন ৪৭:২২-২৩-এর ব্যাখ্যায়]

এই পর্বে শুধু চার মাজহাবের ইমামের কথাই থাক।

এবার দেখা যাক শুধু দুইটা ফ্যাক্ট, সালাফি/ওয়াহাবি/আহলে হাদিস নামে পরিচিত মতবাদের উৎস গোত্র বনু তামিম কারবালায় কী করেছিল,

১. তারা রাসূল দ.'র পরিবারের ১৫ জন সদস্যের কর্তিত মস্তক বর্শায় বিদ্ধ করে নিয়ে গিয়েছিল এজিদের প্রতি।

২. যুদ্ধের প্রথম দিকে বনু তামিম গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনু হাউজা নামের এক পিশাচ ঘোড়ায় চড়ে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে খুঁজতে এসে
- ও হুসাইন! ও হুসাইন বলে চিৎকার করছিল। বলছিল, দোযখের সুসংবাদ নাও।
ইমাম হুসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বললেন: আমি তো দয়ালু প্রতিপালক ও বাধ্য শাফায়াতকারীর কাছে যাচ্ছি।
পরে ইমাম বলেন,লোকটি কে?
সঙ্গীরা বললেন: ইবনু হাউজা।
ইমাম অভিশাপ দিয়ে বললেন: হে আমার প্রতিপালক তাকে দোযখে স্থানান্তরিত করুন।
বর্ণনাকারী বলেন- অভিশপ্ত পিশাচটার ঘোড়া সাথে সাথে তাকে নিয়ে খালের মধ্যে পড়ে গেলে সে ছিটকে পড়ে। বাম পা রেকাবিতে আটকে রয়। ঘোড়া দৌড়াতে থাকে। অভিশপ্তর মাথা পাথরের মধ্যে বার বার
ধাক্কা খেতে খেতে যুদ্ধের শুরুতেই
পিশাচ তার নিজ ঠিকানা জাহান্নামে চলে যায়।
(তাবারি, পঞ্চম খণ্ড, ২৫৫ পৃষ্টা)

আর সালাফি আহলে হাদিস নামে পরিচিত মতধারার মূল গোত্র বনু তামিমের পূর্বপুরুষ যতই চেষ্টা করত, সমস্ত জান্নাতের একচ্ছত্র সম্রাট ও নেতৃস্থানীয় ইমাম হাসান হুসাইন ও তাদের মাতাকে জাহান্নামে পাঠাতে পারতো না। মস্তিষ্কে চীনা বাদাম প্রতিস্থাপিত হয় দেখেই কারো পক্ষে বলা সম্ভব যে জান্নাতের একাধিপতি জাহান্নামে যাবেন।

সন্ত্রাসবাদের মূল তো এখানেই। সত্য মনে করে সালাফিজমকে আঁকড়ে ধরার আগে আমাদের ঠিক করা উচিত ঠিকানা কোথায় হবে এবং কোথায় যাব। আন্দাজে উত্তর দেয়ার আগে, হুসাইন কে এবং তার পরিবার কারা এটা জানার চেষ্টা করা, ভুল না করে জেনে ঠিক করাই উচিত। এবং এই টার্ম- সালাফি/আহলে হাদীস/ওয়াহাবী/আইএস/আল ক্বায়েদা'র সাথে সাথে খারেজি, বনু উমাইয়ার এজিদ ও পরবর্তী প্রজন্ম কী সেটা সার্চ করাটা জরুরি।।কেননা., একটা মতবাদ আমাকে মানুষ হত্যায় উদ্বুদ্ধ করবে, আর আমি সেটার গোড়া জানব না, তাতো হয় না।

সবশেষে জাকির নায়িক বিষয়ক দুটা কথা-

১. জাকির নায়িক কেন সকল মাজহাবের ইমামদের বই অত্যন্ত অসম্মানের সাথে দেয়ালে ছুড়ে ফেলতে চায়?
২. সে কেন এজিদের নামের সাথে রাদ্বিআল্লাহু আনহু বলে?

নিজের মনের ভিতরে দেয়া সঠিক উত্তরের পুরস্কার হিসাবে ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী আমরা পাবো অক্ষয় ঈমান এবং ভুল উত্তরের জন্য আমৃততু উত্তর সঠিক করার সুযোগ। কেননা, মতবাদের ভিন্নতার জন্য হত্যা, হামলা, ধর্ষণ করার কোন সুযোগ নেই। মতবাদের ভিণ্নতার দোষে দুষ্ট করে সন্ত্রাসবাদ করার সুযোগ নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই নভেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:১০
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝর্ণা জল

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:২১


আমি ব্যস্তবতা দেখি
পানকৌড়ির সাঁতার-
কল্পনায় শুধু স্বপ্ন আঁকি,
মধ্যবিকাল ঢেউ তোলা সাগর
হতাশা ডিঙিয়ে যায়- নিরিবিলি
রাত দুপুরের বাসর।

উড়ে ধোয়া, নিঃশ্বাসে সাদা বক,
খেলা করে যে, প্রণয়ের চক-
নীল মেঘ ভীর জমায়, বর্ষা কাঁদাময়,
ভোরের ক্লান্তি দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিশীথের মুঠোয় - কেয়া ।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪



আমি সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়,
হিমশীতল সকালের ভেতর নত চোখে চেয়ে আছি।
হিমার্ত জানালায় জমে ওঠে নিঃশ্বাসের মেঘ—
আঙুল বুলিয়ে মুছে দিই;,
যদিও জানি, আজ সেখানে তোমার পদচিহ্ন নেই।

শরতের বৃক্ষেরা পত্রমোচনের ভাষা জানে;
আমি কেবল তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কো রুবিও ভারতে কী করছেন?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২


আওয়ামী দোসর নবনীতা আপার মতে, মার্কো রুবিও ভারতে গেছেন শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে। ডিসেম্বর মাসে যাতে শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরতে পারেন, সেই আলোচনা করতেই নাকি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×