নিশ্চই সালাফিদের এইসব টিভি প্রোগ্রাম বাংলা হিন্দি উর্দু এবং বিশেষ করে ইংরেজিতে দেখে আমরা অভ্যস্ত, আবু হানিফাকে আমি দেয়ালে ছুড়ে মারলাম। মালিক, শাফিয়িকে দেয়ালে ছুঁড়ে মারলাম... এই দেয়ালে ছুড়ে মারার দেয়ালের ওপাশের ইতিহাস নিয়ে অতি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা-
ইমাম আবু হানিফা রা. (৮০-১৫০ হি.)-
সবচে বড় জনবিস্তৃত মাজহাবের ইমাম, বর্তমান পৃথিবীতেও জীবিত ৩১% মুসলিমের সরাসরি ইমাম, স্বয়ং তাবিয়ি, ২৭ সাহাবার ছাত্র এবং ৩,৫০০ তাবিয়ির ছাত্র। হাদীস শাস্ত্রের সবচে বড় ইমাম (দ্র. ড. তাহির উল ক্বাদরীর প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার বই বাংলায় অনূদিত সাঞ্জারী পাবলিকেশন্স)। রাসূলে খোদা দ.'র প্রতি যে আক্বিদা রাখতেন, তার প্রমাণ ক্বাসিদায়ে নু'মান এ লিখেছেন, 'হে আল্লাহর রাসূল দ.! আপনি ছাড়া এই সৃষ্টিজগতে আমার আর কেউ নেই।' ইনি আহলে বাইতে রাসূলিল্লাহ দ.'র (নবী দ. পরিবার) এমন অনুরক্ত ছিলেন, যে পরপর তিন পুরুষের আনুগত্য করে শিক্ষা লাভ করেছেন একই পরিবারের এবং ইমাম জাফর আস সাদিক রা.'র দুই বছর আনুগত্য ও ছাত্রত্ব করার পর বলেছেন, 'রাসূল দ.'র সন্তান মহান জাফরের মত কোন জ্ঞানী আমি ভূপৃষ্ঠে দেখিনি। জাতির সর্বাধিক জ্ঞানী তিনিই। আমি নু'মান ধ্বংস হয়ে যেতাম, যদি না আপন শাইখ ও ইমাম জাফরের বাসায় দুই বছর ছাত্রত্ব করতাম।'
নবী পরিবার দ. গণকে খলিফা নামধারী রাজা প্রবঞ্চনা করছিলেন, ইমাম আবু হানিফা রা.'র তখন শেষ বয়স। তিনি খলিফার সাথে রাষ্ট্রীয় সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং বারংবার একাধিক খলিফার রাজকীয় দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানান। আহলে বাইত রা. গণের আনুগত্যের কারণে তাঁকে কারাবন্দী করা হয়, সেখানে অন্তরীণ অবস্থায় বিষয় প্রয়োগ করা হয় এবং শহীদ করা হয়।
ইমাম মালিক ইবনে আনাস রা. (৮০-১৮৯ হি.)-
২৫% মুসলিমের সরাসরি ইমাম, মালিকি মাজহাবের দিকনির্দেশক, হাদীসের ইমাম, মদিনায় জন্মগ্রহণকারী এই মহামানবকে শাসকগোষ্ঠী বশে আনতে না পেরে পথে হিঁচড়ে নিয়ে যায় এবং সবার সামনে চাবুক মারে। তাঁর সম্পত্তি ক্রোক করা হয়। তাঁরও দোষ ওই একটা, তিনিও আহলে বাইতে রাসূলিল্লাহ দ.'র প্রতি সর্বতো সমর্পিত ছিলেন।
তিনিও ছিলেন মহানবী দ.'র মহান সন্তান জাফর রা.'র ছাত্র ও অনুগত। তৎকালে রাসূল দ.'র বংশধরদের ইবনে রাসূল বা রাসূল দ.'র সন্তান নামে সম্বোধন করা হতো যেহেতু রাসূল দ. হাসান ও হুসাইন রা.কে নিজ দৌহিত্র না বলে বারংবার পুত্র সম্বোধন করেছেন।
অথচ আব্বাসীয় খলিফারা ইমাম মালিককে হাদীস শাস্ত্রে এত সুউচ্চে জ্ঞান করতেন যে, ভূপৃষ্ঠে ইমাম মালিকের হাদীসের গ্রন্থের মত বিশুদ্ধ কুরআন ছাড়া আর দ্বিতীয় গ্রন্থ নেই- একথা পুরো মুসলিম জাতিতে প্রবাদপ্রতীম ছিল।
ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদ্রিস আশ শাফিয়ি রা. (১৫০-১৯৮)-
হিজাজ (মক্কা মদিনার মূল ভূমি) তে জন্মে তাঁর মাজহাবের বিকাশস্থল হয় মিসরে। ১৬% মুসলিমের ইমাম বিষয়ে কোন কথা বলব না। শুধু তাঁর লেখা থেকে এইটুকু-
ﻳﺎ اهل ﺑﻴﺖ ﺭﺳﻮﻝ ﻟﻠﻪ ﷺ ﺣﺒﻜﻢ
ﻓﺮﺽ ﻣﻦ ﻟﻠﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥ ﺍﻧﺰﻟﻪ
ﻳﻜﻔﻲ ﻛﻢ ﻣﻦ ﻋﻆﻴﻢ ﺍﻟﻔﺨﺮ ﻋﻨﻜﻢ
ﻣﻦ ﻟﻢ ﻳﺼﻞ ﻋﻠﻴﻜﻢ ﻟﺎ ﺻﻠﺎ ت له
হে নবী ﷺ এর বংশধররা,আপনাদের ভালোবাসা
আল্লাহ কুরআনে আয়াত নাযিল করে ফরয করেছেন।
আপনাদের মর্যাদা বোঝার জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে
কারো নামায হবে না যদি আপনাদের উপর দরুদ না পড়ে।
তাঁকেও আহলে বাইতে রাসূলিল্লাহ ﷺ র পথে শহীদ করা হয়।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রা. (১৬৪-২৪১ হি.)-
সালাফি/আহলে হাদীস এরা এটা ভয়ংকর বাজে কথা বলে বেড়ায়, যেটুকু তারা অনুসরণ করার, মহান হাম্বলী মাজহাব অনুসরণ করে। এরচে বাজে উক্তি আর হতে পারে না। হাদীসশাস্ত্র ও ফিকাহর মহান ইমাম, হাম্বলি মাজহাবের ইমাম এজিদ সম্পর্কে কী বলছেন শুধু সেটুকুই সংক্ষেপে দেখি-
ইমাম আহমদ রা.'র সূত্রে উল্লেখ করেছেন আল-বরযানজি র. নিজ ‘আল-আশআত’ পুস্তকে এবং আল-হায়তামী তাঁর ‘আস্ সাওয়াইক্ক’ গ্রন্থে এই মর্মে যে, ইমাম আহমদ রা.-এর পুত্র আবদুল্লাহ তাঁকে অভিশপ্ত পিশাচ এজিদের প্রতি লা’নত (অভিশাপ) দেয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। ইমাম সাহেব বলেন, ‘তার প্রতি লা’নত দেয়া যাবে না কেন, যেখানে স্বয়ং আল্লাহতা’লা-ই কুরআন মজীদে তাকে লা’নত দিয়েছেন?’
আবদুল্লাহ আবার প্রশ্ন করেন, ‘কিতাবুল্লাহর ওই আয়াতটি তেলাওয়াত করুন যাতে আমি জানতে পারি কীভাবে এই পিশাচের প্রতি লা’নত দেয়া হলো?’
‘তবে কি তোমোদের এ লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে যে তোমরা শাসনক্ষমতা লাভ করলে পৃথিবীতে বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং আপন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরা হচ্ছে ওই সব লোক যাদের প্রতি আল্লাহতা’লা অভিসম্পাত (লা’নত) দিয়েছেন...’ (আল-কুরআন, ৪৭:২২-২৩)।
এরপর তিনি বলেন, ‘এয়াযীদ যা করেছে তার থেকে বড় বিপর্যয় আর কী হতে পারে’?” [আল্লামা আলূসী কৃত ’তাফসীরে রূহুল মা’আনী’ গ্রন্থের ৯ম খণ্ড, আল-কুরআন ৪৭:২২-২৩-এর ব্যাখ্যায়]
এই পর্বে শুধু চার মাজহাবের ইমামের কথাই থাক।
এবার দেখা যাক শুধু দুইটা ফ্যাক্ট, সালাফি/ওয়াহাবি/আহলে হাদিস নামে পরিচিত মতবাদের উৎস গোত্র বনু তামিম কারবালায় কী করেছিল,
১. তারা রাসূল দ.'র পরিবারের ১৫ জন সদস্যের কর্তিত মস্তক বর্শায় বিদ্ধ করে নিয়ে গিয়েছিল এজিদের প্রতি।
২. যুদ্ধের প্রথম দিকে বনু তামিম গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনু হাউজা নামের এক পিশাচ ঘোড়ায় চড়ে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে খুঁজতে এসে
- ও হুসাইন! ও হুসাইন বলে চিৎকার করছিল। বলছিল, দোযখের সুসংবাদ নাও।
ইমাম হুসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বললেন: আমি তো দয়ালু প্রতিপালক ও বাধ্য শাফায়াতকারীর কাছে যাচ্ছি।
পরে ইমাম বলেন,লোকটি কে?
সঙ্গীরা বললেন: ইবনু হাউজা।
ইমাম অভিশাপ দিয়ে বললেন: হে আমার প্রতিপালক তাকে দোযখে স্থানান্তরিত করুন।
বর্ণনাকারী বলেন- অভিশপ্ত পিশাচটার ঘোড়া সাথে সাথে তাকে নিয়ে খালের মধ্যে পড়ে গেলে সে ছিটকে পড়ে। বাম পা রেকাবিতে আটকে রয়। ঘোড়া দৌড়াতে থাকে। অভিশপ্তর মাথা পাথরের মধ্যে বার বার
ধাক্কা খেতে খেতে যুদ্ধের শুরুতেই
পিশাচ তার নিজ ঠিকানা জাহান্নামে চলে যায়।
(তাবারি, পঞ্চম খণ্ড, ২৫৫ পৃষ্টা)
আর সালাফি আহলে হাদিস নামে পরিচিত মতধারার মূল গোত্র বনু তামিমের পূর্বপুরুষ যতই চেষ্টা করত, সমস্ত জান্নাতের একচ্ছত্র সম্রাট ও নেতৃস্থানীয় ইমাম হাসান হুসাইন ও তাদের মাতাকে জাহান্নামে পাঠাতে পারতো না। মস্তিষ্কে চীনা বাদাম প্রতিস্থাপিত হয় দেখেই কারো পক্ষে বলা সম্ভব যে জান্নাতের একাধিপতি জাহান্নামে যাবেন।
সন্ত্রাসবাদের মূল তো এখানেই। সত্য মনে করে সালাফিজমকে আঁকড়ে ধরার আগে আমাদের ঠিক করা উচিত ঠিকানা কোথায় হবে এবং কোথায় যাব। আন্দাজে উত্তর দেয়ার আগে, হুসাইন কে এবং তার পরিবার কারা এটা জানার চেষ্টা করা, ভুল না করে জেনে ঠিক করাই উচিত। এবং এই টার্ম- সালাফি/আহলে হাদীস/ওয়াহাবী/আইএস/আল ক্বায়েদা'র সাথে সাথে খারেজি, বনু উমাইয়ার এজিদ ও পরবর্তী প্রজন্ম কী সেটা সার্চ করাটা জরুরি।।কেননা., একটা মতবাদ আমাকে মানুষ হত্যায় উদ্বুদ্ধ করবে, আর আমি সেটার গোড়া জানব না, তাতো হয় না।
সবশেষে জাকির নায়িক বিষয়ক দুটা কথা-
১. জাকির নায়িক কেন সকল মাজহাবের ইমামদের বই অত্যন্ত অসম্মানের সাথে দেয়ালে ছুড়ে ফেলতে চায়?
২. সে কেন এজিদের নামের সাথে রাদ্বিআল্লাহু আনহু বলে?
নিজের মনের ভিতরে দেয়া সঠিক উত্তরের পুরস্কার হিসাবে ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী আমরা পাবো অক্ষয় ঈমান এবং ভুল উত্তরের জন্য আমৃততু উত্তর সঠিক করার সুযোগ। কেননা, মতবাদের ভিন্নতার জন্য হত্যা, হামলা, ধর্ষণ করার কোন সুযোগ নেই। মতবাদের ভিণ্নতার দোষে দুষ্ট করে সন্ত্রাসবাদ করার সুযোগ নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই নভেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



