আমি মোবাইল ফোনে কথা বলছিলাম, আচমকা সেটি ভেঙ্গে দুই টুকরো হয়ে গেল। এক টুকরো আমার হাতে, আরেক অংশ খসে মাটিতে পড়ে গেল। ওই অংশটা কুড়িয়ে তুলে নেয়ার পর দেখলাম লাইনটা তখনও কাটেনি, কিন্তু ডিসপ্লে চলে গেছে।
এই সেটটার প্রতি আমার এক ধরণের মমতা ছিল। আমার দুটির মেয়ের মন খারাপ হলে তারা যে দুটি বস্তু আছাড় মারে তার একটি হলো মোবাইল ফোন, অপরটি টিভি রিমোট। আগে প্রতি সপ্তাহে একটি করে রিমোট কিনতে হতো। এখন মেয়েরা একটু বড়ো হয়েছে, মাসে একটি রিমোটেই বেশ চলে যাচ্ছে। তবে স্যামসংয়ের ওই প্রাচীন আমলের মোবাইল সেটটি পুরাতন ভৃত্যের মতো টিকে ছিল। একটু আধটু আছাড় খেলে ফোনটার কোন ক্ষতি হয় না, এমন একটা অন্ধ বিশ্বাস আমার মধ্যে ছিল। দেখা গেল, বিশ্বাসটা পুরোপুরি সত্যটা নয়, বাহ্যত এর কোন ক্ষতি না হলেও ভেতরে ভেতরে এটির বারোটা বেজে গেছে। তবু এর জীবনী শক্তি অসীম। দুই টুকরো হয়ে যাওয়ার পরও এটিতে ফোন আসতো। মাসের মাঝখানে টাকা পাবো কোথায়, কাজেই আমি উপরের অংশটা পকেটে নিয়ে অফিসে আসতাম। ফোনটোন এলে ডিসপ্লেতে দেখা যেত না কার ফোন এলো , তবে বোঝা যেত বন্ধু কিংবা পাওনাদার কেউই আমাকে ভোলে নাই ...
বেতন পাবার পর, ইশতিয়াককে নিয়ে নোকিয়ার সেন্টারে গেলাম। উদ্দেশ্য হাজার দুয়েক টাকার মধ্যে একটি ভালো সেট কিনবো। তখই চোখে পড়লো নোকিয়ার ই সিক্সটি থ্রি সেটটি। প্রথম দেখাতেই প্রেম, এই ব্যাপারটা কেবল বাংলা সিনেমায় ঘটতো বলে আমার ধারণা। দেখা যাচ্ছে ব্যাপার সত্যি নয়।
অনেক দাম , সাড়ে ষোল হাজার টাকা। ফোন কেনা বাদ দিয়ে টাকা ধার করার অভিযানে নেমে পড়লাম। অফিসের পিয়ন ইয়াসিন ধার দিলো হাজার দেড়েক, এক মামা দিলো কিছু, ইশতিয়াক এক হাজার টাকা ধার দেবে বলে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হলো। যেদিন ফোন কিনবো, ওইদিন টাকাটা চাইলে ও বললো, আপনাকে একটা নাম্বার দিচ্ছি, এই নাম্বারে ফোন দিয়ে মালিবাগের মোড়ে গিয়ে দাঁড়ান, আপনে এক হাজার টাকা পেয়ে যাবেন।
ইশতিয়াক একজনকে টাকা ধার দিয়েছিল। বেচারা ইশতিয়াককে ঘোরাচ্ছে। ঐ দেনাদার আমাকে বড় ভাই হিসেবে জানে । ইশতিয়াক এক ঢিলে তিনটি পাখি মারর চেষ্টা করলো। পাওনা আদায় করা, বয়জেষ্ট দুস্থ বড় ভাইকে ধার দেয়া এবং উভয়ের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে ঐ ছোকরা হালকা চালাক চতুর। ইশতিয়াকরে তিনটি ইচ্ছের কোনটাই সে পালন করতে দিলো না, আমার ফোন কেনা কয়েকদিন পিছিয়ে গেল।
খুব সম্ভবতঃ আর্নেস্ট হেমিংওয়ের এমন একটা গল্প ছিল। এক দরিদ্র ছেলে জনৈক ধনী লোকের কাছে চাকরি চাইলো। লোকটি বললো, তুমি যদি সাঁতার দিয়ে লেকটি পার হতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে চাকরিটা দেবো। ছেলেটার চাকরি দরকার কী করবে? সে ঐ বিশাল লেক সাঁতরে পার হওয়ার সময় ডুবে মারা গেল ।
অন্য লোকজন ঐ ধনী লোককে জিজ্ঞাসা করলো, আপনি তো জানতেন ঐ ছেলেটি লেক সাঁতরে পার হতে পারবে না, তবে তাকে কেন এমন একটা শর্ত দিলেন।
লোকটি উত্তর দিল, আসলে আমার হাতে চাকরি ছিল না ...আমি আবার না বলতে পারি না ...
আসলে ইশতিয়াকের হাতে হয়তো টাকা ছিল না। নিজেই নিজের সাত্বনা খুঁজে নিলাম। .
শেষমেষ ফোনটা কেনা হল। প্যাকেট খুলে দেখি , শুয়োরের বাচ্চারা ডাটাকেবল আর মোবাইল কাভার দেয়নি। ওটা নাকি প্যাকেজের সাথে নেই ( কুকুরের বাচ্চা এবং চো*নির পোলা )
ছোটলোকের হাতে ভালো জিনিস পড়লে যা হয়।
আমি দিনে দশবার করে সেটটা মুছি ... এক সময় মনে হলো , যদি একটি মোবাইল কভার কেনা না যায়, তাহলে এই মানব জনম বৃথা, সেটটাকে ভালো রাখতে হতে অন্নত এটি কেনা জরুরী ...
এইভাবেই একদিন মোবাইল ফেয়ারে গেলাম ... দেখা হল একদল হলুদ তরুণীর সাথে , যাদের কাছে ওয়াইম্যাক্স্রের প্রথম পাঠ নিলাম।
( আগামী পর্বে সমাপ্য )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


