পৃথিবীতে আমরা প্রতিদিন জীবের জন্ম মৃত্যু দেখে অভ্যস্ত। প্রতিটি জীবের মৃত্যু হবে এটাই স্বাভাবিক। আপনি যে দৃষ্টিকোন থেকেই লক্ষ্য করেন না কেন, এটা বলতে বাধ্য হবেন যে জীবের মৃত্যু ঘটে। জীববিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত জীবের জন্ম, মৃত্যু, জৈবিক ক্রিয়া প্রভৃতি বিষয় নিয়ে ব্যাখা প্রদান করছেন। পৃথিবীর শুরুতে ঠিক যে সকল জীব ছিল তার অধিকাংশ আজ নেই। ইতিহাস বলে অনেক জীব সম্প্রদায় প্রাকৃতিক কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার এমন অনেক জীবের অস্তিত্ব দেখতে পায় যা পূর্বে ছিল না। বিশাল এই জৈববৈচিত্র থেকে এটা স্পষ্ট যে অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে। তাহলে কি একদিন পৃথিবীর সকল জীব বিলুপ্ত হবে? অনেক গবেষক এই বিষয়ে জোড় সমর্থন দিয়েছেন। তাদের মতে নিশ্চিতভাবে পৃথিবীর সকল জীবের বিলুপ্তি ঘটবে। তবে এমনটি কতদিনে বা কিভাবে ঘটবে? জীবাশ্ম তথ্য অনুযায়ী এই পৃথিবীতে কমপক্ষে ৩.৫ বিলিয়ন বছর ধরে জীব অবস্থান করছে। এই দীর্ঘ সময়ে পৃথিবীতে অনেকগুলো সভ্যতা অতিক্রম করেছে। ফলে জীবের অবস্থান ও বৈচিত্রে অনেক পরিবর্তন দেখা গেছে। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে জীব অভিযোজিত হয়েছে। আর প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে না পেরে বিলুপ্ত হয়েছে অসংখ্য প্রজাতি। পৃথিবীর ইতিহাস অনুসন্ধান করলে আমরা বরফ যুগ, শিলার আস্তরণ, ভয়ংকর বিষক্রিয়া, অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাব এমন অসংখ্য ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারি। এমন পরিস্থিতিতে টিকতে না পেরে বিলুপ্ত হয়েছে এমন কিছু জীব যারা একসময় পৃথিবীতে দাপটের সাথে টিকে ছিল। বর্তমানে হয়তো অতীতের এই ঘটনাগুলো গল্প মনে হবে। তবে এটা চরম সত্য। হয়তোবা চলতি সময়ের জীবের পরিবর্তন দেখে মনে হতে পারে আমরা আজীবন পৃথিবীতে টিকে থাকবো। কিন্তু না। কারণ বিজ্ঞানীরা এমন কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন যার প্রভাবে পৃথিবী থেকে সকল জীব বিলুপ্ত হবে। তাদের গবেষণায় প্রমাণিত এমন সব ঘটনা সত্যিকারভাবে সংঘটিত হলে পৃথিবীতে কোনো জীবের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন কিছু ঘটনার বিস্তারিত আলোচনায় হবে এই লেখনীর মূল্য বিষয়।
আগ্নেয়গিরিয় বিস্ফোরন
পৃথিবীতে যে পরিমাণ আগেন্য়গিরি রয়েছে তার অগ্ন্যুৎপাত ঘটলে বিলুপ্ত হতে পারে জীবের অস্তিত্ব। আর বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এমনটি ঘটার সময়কাল ০-১০০ মিলিয়ন বছর। পৃথিবীর সকল জীবকে বিলুপ্ত করার মত সক্ষমতা রয়েছে এসকল আগ্নেয়গিরির। তবে এটি অস্বাভাকি কোনো ঘটনা নয়। কারণ পৃথিবী ইতিপূর্বে এমন ধ্বংসযজ্ঞের সম্মুখীন হয়েছে। ২৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পৃথিবীতে হয়েছিল এক মহা ধ্বংসযজ্ঞ। আর এর মাধ্যমে পারমিয়ান পিরিয়ডের বিশাল জীব বিলুপ্তি ঘটে। এই অগ্ন্যুৎপাতের ফলে স্থলেভাগের ৮৫ ভাগ এবং জলভাগের ৯৫ ভাগ জীবের বিলুপ্তি ঘটেছিল। কেউ ধারণা করতে পারে না যে ঠিক কি মাত্রার বা কি এমন ঘটেছিল। তবে গবেষকদের গবেষণায় উঠে এসেছে সেই ধ্বংসের মাত্রা। বর্তমানে আমরা এই আগ্নেয়গিরি নিয়ে সত্যি চিন্তিত। কারণ এমন বিশাল কিছু আগ্নেয়গিরি ে এই পুথিবীতে রয়েছে, যাদের বিস্ফোরণে নিমিষেই শেষ হয়ে যেতে পারে পৃথিবীর সকল জীব। এটাও ঠিক পৃথিবীর সকল আগ্নেয়গিরির শক্তি ২৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া আগ্নেয়গিরিয় বিস্ফোরণের কাছে হয়তোবা কিছুই না। ইতিহাস বলে, সাইবেরিয়ায় ঘটে যাওয়া এই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে যে লাভা উদগিরণ হয় তা চারটি যুক্তরাজ্যের সমান। এমন মাত্রায় অগ্ন্যুৎপাত ইতিহাসে একবার মাত্র ঘটেছে, তবে এমনটির যে পুনরাবৃতি হবে না তার নিশ্চয়তা কি।
নরওয়ের অসলো ইউনিভার্সিটির হেনরিক স্ভেনেসেন বলেন, “পারমিয়ার যুগের মত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঠিক কখন ঘটবে তা আমরা কেউ জানি না। অনেকটা এমন ঘটনা ঘটেছে ২০০ মিলিয়ন, ১৮০ মিলিয়ন ও ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে। তাই ধারণা করা যায় আগামীতে এমন কোনো ঘটনা ঘটবে, তবে ঠিক কখন ঘটবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।”
স্ভেনেসেনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে ভূ-স্থরের ঠিক কোন স্থানে অগ্ন্যুৎপাতের চাপ পড়বে তার উপর বিপর্যয়ের মাত্রা নির্ভর করছে। কারণ সাইবেরিয়ায় ২৫০ বিলিয়ন বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া জীব বিলুপ্তির কারণ শুধুমাত্র আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নয়। মূল প্রজাতির ঘাতক হিসেবে কাজ করেছে লবণ। সাইবেরিয়ায় প্রচুর পরিমাণ লবণের মজুদ রয়েছে। স্ভনেসেনে মনে করনে, যখন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে, তখন বিপুল পরিমাণ ওজন গ্যাস বিধ্বংসী রাসায়নিক উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পরিবেশের ওজন তথা ওজন স্থর হ্রাস পায়। ফলে সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর রশ্মি ওজন স্তর ভেদ করে পৃথিবীতে আপতিত হয়। আর এই রশ্মির প্রতিক্রিয়ায় জীবিত থাকার ক্ষমতা অধিকাংশ জীবের নেই। ফল হিসেবে অধিকাংশ জীবের বিলুপ্তি ঘটে। আতঙ্কের বিষয় হল, পৃথিবীতে প্রচুর পরিমাণ লবণের মজুদ রয়েছে। স্ভেনেসেনের মতে, লবণের বিশাল মজুদ হিসেবে পূর্ব সাইবেরিয়া অন্যতম।
যদি এসকল অঞ্চলে একটি বড় আকারের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে তাহলে অধিকাংশ প্রজাতির মৃত্যু ঘটবে। একইভাবে জীবের বিলপ্তি ঘটবে। লক্ষ্যনীয় যে, পারমিয়ান পিরিয়ডে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটলেও একক কোষবিশিষ্ট এক প্রকার ব্যাকটেরিয়ার কোনো ক্ষতি হয় নি।
উল্কা বিস্ফোরণ
উল্কা বিস্ফোরণের কারণে পৃথিবীবর জীব বিলুপ্তির সময় হিসেবে ধরা হয়েছে ৪৫০ মিলিয়ন বছর। অর্থাৎ উল্কা বিস্ফোরণের কারণে আগামী ৪৫০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে পৃথিবী থেকে সকল জীব বিলুপ্তি হবে। পৃথিবীর যুগ বিভাগের ইতিহাস প্রমাণ করে যে ডাইনোসোর বিলুপ্তির প্রধান কারণ উল্কা বিস্ফোরণ। যদিও পৃথিবী থেকে ডাইনোসোর বিলুপ্তির কারণ হিসেবে ভিন্ন মত রয়েছে। তবে কারণ হিসেবে উল্কা বিস্ফোরণ অধিক বিবেচিত। তাহলে একটি প্রশ্ন এসেই যায়, আর তা হল,যদি পৃথিবী থেকে বিশাল দৈত্যাকার ডাইনোসোর উল্কার কারণে বিলুপ্ত হতে পারে, তাহলে এই উল্কা বিস্ফোরণে বর্তমান পৃথিবীর সকল জীব কি বিলুপ্ত হতে পারে না?
পৃথিবীতে এমন অনেক রহস্যময় গর্ত আছে যা দেখে উল্কাপিন্ডের প্রভাব অনুধাবন করা যায়। কানাডায় ম্যানিকগান গর্ত নামে এমন একটি গর্ত রয়েছে। ধারণা করা হয়, ২১৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে কোনো ধ্বংসাত্বক উল্কা ক্রিয়ার ফলে এই গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এর ফসিল থেকে প্রমাণতি যে এটি কোনো ডাইনোসোর জাতীয় জীব বিলুপ্তি ঘটাতে সক্ষম নয়। ভূ-অভ্যন্তরের কোনো স্ফটিকাকার শিলার কারণে এমন গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রচুর পরিমাণ উদ্বায়ী পাললিক শিলা সমৃদ্ধ এলাকায় গর্তের সৃষ্টি হলে পরিবেশে এক বিশেষ ধরণের গ্যাস নির্গত হয়। কারণ উদ্বায়ী বৈশিষ্ট্যের জন্য বৃহদাকার উল্কা ছিটকে পড়লে ভূ-স্তরের আকস্মাৎ পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয় যা ব্যাপক মাত্রায় জীব বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। আশার খবর হল, ডাইনোসোর বিল্প্তু করার মত উল্কা বিস্ফোরণের ঘটনা হাতেগোনা কয়েকটি। গবেষকদের মতে পৃথিবীতে গড়ে ৫০০ মিলিয়ন বছরে একবার এমন উল্কা বিস্ফোরণ হতে পারে। কিন্তু যদি সত্যি এমন কিছু ঘটে তাহলে পৃথিবীতে ব্যাপক হারে জীবের বিলুপ্তি ঘটবে। একমাত্র তখনই এমন ধ্¦ংসযজ্ঞ ঘটবে, যদি পৃথিবীতে উল্কাপিন্ডের মত বড় কিছু যেমন গ্রহ আছড়ে পড়ে।
তবে মহাবিশে^ এমন ঘটনার নজির আছে। অনেক গবেষক মনে করেন, পৃথিবীর গঠনের ঠিক পরেই অন্য কোনো গ্রহের সাথে সংঘর্ষ হয়। ফলে এর কিছু অংশে ছিটকে পড়ে এবং এর মাধ্যমে আমাদের একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ সৃষ্টি হয়।
পৃথিবীর ঘনীভূত কেন্দ্র
২০০৩ সালের একটি জনপ্রিয় মুভি দ্য কোর নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সিনেমাটিতে দেখা যায় পৃথিবীর কেন্দ্রের ঘূর্ণন থেমে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা পৃথিবীর কেন্দ্র ছিদ্র করে পুনরায় ঘূর্ণনের ব্যবস্থা করবে। কারণ একটি সক্রিয় কেন্দ্র না থাকলে পৃথিবী তার চৌম্বক ক্রিয়া হারাবে, ফলে পৃথিবীতে আমাদের টিকে থাকা অসম্ভব হবে। যদিও এই সিনেমা বিজ্ঞানীমহলে বেশ সমালোচিত হয়েছে, তবে কিছু সংখ্যক গবেষক মনে করেন, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র সূর্য থেকে আসা আয়নিত কণার মধ্যে বিনিময় ঘটায়। এর ফলে পৃথিবীর আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকে। যদি চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকতো তাহলে তাহলে পৃথিবীর এই আবহাওয়া স্তর থাকতো না, ফলে সকল জীবের মৃত্যু ঘটত। এটি অনেকটা মঙ্গলগ্রহের বর্তমান চিত্রের মত। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে একসময় মঙ্গল গ্রহে জীবের অস্তিত্ব ছিল। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক জোসেফ কিরসভিঙ্ক ও তার দল মঙ্গলগ্রহ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছে। ১৯৯৭ সালে তাদের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হতে জানা যায় যে মঙ্গল গ্রহে একসময় চৌম্বকক্ষেত্র ছিল যা বর্তমানে নেই। কিরসভিঙ্কের মতে, আনুমানিক ৩.৭ বিলিয়ন বছরে পূর্বে মঙ্গল গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র বিনষ্ট হয়।
পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র দিন দিন দুর্বল হচ্ছে বলে অনেক সময় সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে এতে শংকিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের দিক পরিবর্তন হচ্ছে, চৌম্বকক্ষেত্র হারিয়ে যাচ্ছে এমনটি নয়। যুক্তরাজ্যের লিভারপুল ইউনিভার্সিটির রিচার্ড হলমি বলেন, “দিক পরিবর্তনের অর্থ চৌম্বকক্ষেত্র হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। তবে দিক পরিবর্তনের ফলে চৌম্বকক্ষেত্রের জন্য শুভ সংবাদ নয়, তবে এই ক্রিয়া জীবের উপর কোনো বড় প্রভাব ফেলবে না”।
তাহলে কি স্থায়ীভাবে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র অদৃশ্য হতে পারে? যুক্তরাজ্যের ক্যাম্ব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের রচার্ড হ্যারিসন বলেন, ”হঠাৎ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে এমনটি ঘটবে না”। চৌম্বক ক্ষেত্র অদৃশ্য তখনই হবে যখন পৃথিবীর কেন্দ্রভাগের সম্পূর্ণ অংশ কঠিন আকার ধারণ করবে। বর্তমানে পৃথিবী কেন্দ্রের অভ্যন্তর ভাগ কঠিন কিন্তু বাহ্যিক স্তর তরল। হ্যারিসন বলেন, “পৃথিবী কেন্দ্রের অভ্যন্তরভাগ প্রতি বছরে এক মিলিমিটার বৃদ্ধি পায় এবং বাইরের তরল স্তরের পুরুত্ব ২৩০০ কিলোমিটার”।
গামা রশ্মির বিচ্ছুরণ
এই মহাবিশ্বে কি আমরা একক জীব হিসেবে অবস্থান করছি? যদি উত্তর “না” হয়, তাহলে কেন আমরা সেই এলিয়েন সভ্যতার সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না? এর কারণ হিসেবে আমরা বিধ্বংসি কোনো স্তর বা রশ্মিকে দায়ী করতে পারি। গবেষকদের মতে, এমন এক প্রকার রশ্মি হল গামা রে বার্সট (এজই) যার মারাত্মক বিকিরণ ক্ষমতা রয়েছে। মহাবিশ্বের তীব্র কোনো বিস্ফোরণ ঘটলে এই এজই রশ্মি নির্গত হয়। দুইটি দানবীয় তারকার মধ্যে সংঘর্ষ বা দুইটি তারকা একত্রিত হয়ে দানবীয় তারকা তৈরী হওয়ার সময় এই রশ্মি নির্গত হয়। এই রশ্মির স্থায়ীত্ব ক্ষুদ্র সেকেন্ড থেকে শুরু করে কয়েক মিনিট হতে পারে। লং জিআরবি সূত্র অনুযায়ী, এ রশ্মি ওজোনস্তর বিনষ্ট করতে পারে, ফলে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি সরাসরি ভূ-স্তরে আপতিত হয়। আর যার ফলশ্রুতিত পৃথিবীর জীবের মৃত্যুর কারণ ঘটে। এই রশ্মির উপস্থিতির ফলে মহাবিশ্বের অনেক অংশে কোনোভাবেই জীবের বাসস্থান সম্ভব নয়। ২০১৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব বার্সেলোনার রাউল জিমেনেয ও হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের টিসভি পিরানের যৌথ গবেষণায় এমন তথ্য জানা যায়। সাধারণত গ্যালাক্সির কেন্দ্রে নিকটবর্তী অঞ্চল বা যে সকল অঞ্চলে তারকার ঘনত্ব অনেক বেশি সেখানে এই রশ্মির আধিক্য দেখা যায়। পৃথিবী গ্র্রহ এমন অঞ্চল থেকে বহুদুরে অবস্থিত। ফলে এই রশ্মি থেকে আমরা নিরাপদ বলা যেতে পারে।
জিমেনেয বলেন, “পৃথিবীতে জীব টিকে থাকা একারণেই সম্ভব হয়েছে যে পৃথিবী ক্ষতিকর গামা রে বার্সট থেকে মুক্ত যা খুব সহজে জীবের অস্তিত্ব বিলীন করতে পারে”। যদি কোনো প্রভাবকের ফলে পৃথিবী এই রশ্মি প্রবণ এলাকার নিটক চলে আসে, তাহলে পৃথিবীতে জীবের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না”। তবে এমনটি যে ঘটে নি তা নয়। জীবাশ^ নিয়ে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে আজ থেকে ৪৪০ মিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবী থেকে অসংখ্য জীব বিলুপ্তির জন্য দায়ী এই গামা রে বার্সট। অনেক গবেষকদের মতে অবশ্যই এই রশ্মির ফলে পৃথিবীর সকল জীব বিলুপ্ত হবে। তবে খুশির সংবাদ হল গামা রে বার্সটের উৎপাদন হার দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। জেমস আন্নিস নামক একজন গবেষকের মতে, প্রতি বিলিয়ন বছরে গড়ে প্রতি গ্যালাক্সি ৫ থেকে ৫০ টি গামা রে বার্সট উৎপন্ন করে। যেহেতু মিল্কি গ্যালাক্সি বিশাল আকৃতির, ফলে এই রশ্মির তার স্তর ভেদ করে পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
জেমস আন্নির মতে, “যদি সত্যিকারভাবেই জিআরবি পৃথিবীতে আপতিত হয় তাহলে পৃথিবীর সকল জীবের উপর প্রভাব পড়বে না। কারণ সমুদ্রের পানির বিকিরণ ক্ষমতা প্রবল। এটা বিশ^াস করা কঠিন যে জিআরবি সমুদ্রের সকল বায়োম নিশ্চিহ্ন করতে পারবে। আমার মতে, জিআরবি সমুদ্রের অধিকাংশ মাছের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এটা সত্য জিআরবি স্থলভাগের ও সমুদ্রের উপরের স্তরের জীব সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করবে। তবে এটা নিশ্চিত অন্যান্য কিছু জীবের কোনো ক্ষতি না হলের মানব সম্প্রদায় বিলুপ্ত হবে।
ভ্রাম্যমাণ তারকা
বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে আমাদের সোলার সিস্টেমের গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে সুশৃঙ্খলভাবে গ্রহগুলো ঘুর্ণায়মান। নিশ্চয় বিভিন্ন সময় আমরা এই ঘূর্ণায়মান গ্রহের ছবি বা ভিডিও ফুটেজ দেখেছি। কত সুন্দরভাবে নির্দিষ্ট গতিতে গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদিক্ষন করছে। যদি হঠাৎ করে বাইরে থেকে কোনো তারকা হঠাৎ করে সোলার সিস্টেমের মধ্যে ঢুকে পড়ে? অনেকটা সারিবদ্ধভাবে দাড়ানো কোনো শিক্ষার্থীদের সারিতে আচমকা দানবীয় কোনো প্রাণী ঢুকে পড়ার মত। যদিও এমন ধারণা কল্পনা করা যায় না। তবে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নিউইয়র্কের রোসেষ্টার বিশ^বিদ্যালয়ের এরিক মামাজেক বলেন, “এমন ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেছে এবং তা খুব বেশি দিনের ঘটনা নয়”। মাত্র ৭০,০০০ হাজার বছর আগের ঘটনা। এটি এমন এক সময় যখন বর্তমান মানুষ প্রজাতি আফ্রিকা ছেড়ে অন্য স্থানে গমন শুরু করেছে। স্কোলজ স্টার নামে লাল বামনীয় তারকা সোলার সিস্টেমের খুব নিকট দিয়ে অতিক্রম করে। গ্রহের বাইরে অবস্থিত ঘন বরফাকৃতির বিক্ষিপ্ত পুঞ্জীভূত অংশ যা ওর্ট ক্লাউড নামক অঞ্চল দিয়ে এটি গমন করে। এমন ঘটনা সৃষ্টিকারী স্কোলজ স্টার প্রথম তারকা নয় বা এমনটি নয় যে এই ঘটনায় শেষ। বিজ্ঞানীরা আগামী কয়েক মিলিয়ন বছরে সোলার সিস্টেমের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে পারে এমন তারকা সনাক্ত করেছেন। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মানীর হাইডেলবার্গে অবস্থিত ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এস্ট্রোনমির করিন বেইলার জোনস এমন জটিলতা সৃষ্টিকারী দুইটি তারকা চিহ্নিত করেছেন। এর একটি আমাদের প্রতিবেশী হিপ ৮৫৬০৫ যা ২৪০০০০ থেকে ৪৭০০০০ বছরের মধ্যে আমাদের সোলার সিস্টেমের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে পারি। অন্যটি জিএল ৭১০ যা ১.৩ মিলিয়ন বছরের মধ্যে অতিক্রম করতে পারে। মামাজেক বলেন, “জিএল ৭১০ স্কোলজ স্টার থেকে অনেক বড়”। তাহলে কি জিএল ৭১০ বা হিপ ৮৫৬০৫ আমাদের পৃথিবীর জীবের জন্য হুমকির কারণ হতে পারে? অনেক বিজ্ঞানীদের কাছে এর উত্তর “না”। বেইলার জোনস বলেন, “ওর্ট ক্লাউডকে উত্তেজিত করার অর্থ এই নয় যে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি হবে”। হয়তো পৃথিবীর সাথে সংঘর্ষে কিছু উপাদান পৃথিবীতের প্রবেশ করতে পারে, তবে তা পৃথিবীর জীবের বিলুপ্তি ঘটাবে না। তত্ত্ব মতে যদি কোনো সুপারনোভা ওর্ট ক্লাউড দিয়ে অতিক্রম করে তাহলে সোলার সিস্টেমের অভ্যন্তরে কিছু মাত্রায় গামা রশ্মি নির্গত হয়। সুপারনোভা যত নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে গামা রশ্মি নিগর্মনের মাত্রা তত বেশি হবে। বেইলার জোনস বলেন, “১০ গুণ নিকট দিয়ে অতিক্রম করার ফলে ১০০ গুণ বেশি মাত্রায় গামা রশ্মি নির্গত হয়, এর ফলে ভয়ংকর ক্ষতি হওয়া সম্ভব। তবে এমন ঘটনা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ”।
এমন দানবীয় তারকা সোলার সিস্টেমের অভ্যন্তর ভাগ দিয়ে অতিক্রম করলে আরো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। সোলার সিস্টেমের অভ্যন্তরভাগে বিভিন্ন গ্রহ অবস্থান করে। তবে এমনটি ঘটবেই তা বলা যায় না। বেইলার জোনস বলেন, “সকল তারকার ক্ষেত্রে বিস্তারিত তথ্য না থাকলেও কোনো তারকার সোলার সিস্টেমের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার ক্ষমতা অতি নগণ্য”। পৃথিবী থেকে সূর্যের দুরত্বের তুলনায় পৃথিবী থেকে ওর্ট ক্লাউডের শীর্ষ বিন্দুর দুরত্ব ৫০০০০ গুণ বেশি। তাই গবেষকরা অনুমান করছেন যে পৃথিবীতে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রিকায় বলা হয়েছে যে, এরচেয়ে আমাদের গ্যালাক্সির ডার্ক ম্যাটার নিয়ে অধিক বেশি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। যদিও আমরা সেটা করছি না বলে মামাজেক মন্তব্য করেন। তার মতে, “ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে আমাদের খুব সামান্য ধারণা আছে। ডার্ক ম্যাটার কণা সম্পর্কে আমরা জানি না, এমনকি এর ধ্বংসের ফলে কিভাবে শক্তি উৎপন্ন হয় তা আমরা জানি না”। মূলত গবেষণায় সোলার সিস্টেমের বাইরে পৃথিবী ধ্বংসের যে মাধ্যমের কথা বলা হচ্ছে আগামী কয়েক বিলিয়ন বছরের মধ্যে তার কোনো সম্ভাবনা নেই। মামাজেকের মতে, “ এটা নিশ্চিত যে পৃথিবীতে কিছু জীব আছে যা এমন বিপর্যয় হলেও বেঁচে থাকবে”।
জীবের নাশক জীব
পৃথিবী থেকে জীব বিলুপ্তির শক্তিশালী মাধ্যম রয়েছে। আর এর মাধ্যমে আগামী ৫০০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে পৃথিবী থেকে জীব বিলুপ্ত হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের পিটার ওয়ার্ড বলেন, “জীবের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি তার স্বজাতির মধ্যেই রয়েছে”। তিনি ম্যডিয়া হাইপোথিসিসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ম্যাডিয়া হল একটি গ্রীক পুরাকথা। পুরান অনুযায়ী নিজ সন্তান হত্যাকারীদের উল্লেখ করে ম্যাডিয়া কথাটি প্রচলিত। পিটার ওয়ার্ড এর মতে, পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিলুপ্তির কারণ হিসেবে জীব দায়ী। উদাহরণ স্বরূপ, ২.৩ বিলিয়ন বছর পূর্বে ফটোসিনথেটিক জীবের উপস্থিতিতে পরিবেশে প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন নির্গত হয়। পূর্বে কখনো এই মাত্রায় মুক্ত অক্সিজেন ছিল না। পৃথিবীতে বিদ্যমান অসংখ্য মাইক্রোবস এই অতিরিক্ত অক্সিজেন সহ্য করতে না পারার কারণে বিলুপ্ত হয়। এরপর বলা যেতে পারে উদ্ভিদ প্রজাতির কথা। ৪৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবীতে প্রথম উদ্ভিদের আবির্ভাব ঘটে। উদ্ভিদের শিকড় শিলা ভেঙে মাটিতে রূপান্তর করে, খনিজ পদার্থের মধ্যে রাসায়নিক ক্রিয়া ত্বরান্বিত করে এবং পরিবেশে বিপুল পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। ফলে পরিবেশে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায় যা পৃথিবীর গ্রীন হাউজ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে মরণঘাতি বরফ যুগের আবির্ভাব ঘটে।
ওয়ার্ড বলেন, “আগামীতে এমন ঘটনা পৃথিবীরে স্বাভাবিক পরিবেশকে বিঘিœত করবে। সূর্য দিন দিন আরো বেশি উত্তপ্ত হচ্ছে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে শিলা এবং পরিবেশের মধ্যকার রাসায়নিক ক্রিয়া বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। আর উদ্ভিদের মূল এই ক্রিয়ার গতিকে ত্বরান্বিত করে। এর ফলে পরিবেশের কার্বন-ডাই-অক্সাইড অধিক হারে বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবে। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের অভাবে উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ ক্রিয়া ঘটাতে পারবে না। সকল উদ্ভিদের মৃত্যু ঘটবে, এমনকি প্রাণীদের দীর্ঘদিন টিকে থাকা কষ্টসাধ্য হবে। ওয়ার্ড বলেন, “এমন ঘটনা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটবে, আনুমানিক ৫০০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে”। হয়তো কিছু অনুজীব (মাইক্রোবস) টিকে থাকবে, তবে তাদের জীবন ক্রিয়া বাধার সম্মুখীন হবে। যখন পরিবেশে অসংখ্য অনুজীব থাকে কিন্তু তাদের উপযোগী বাস্তুতন্ত্র থাকে না তখন স্বাভাবিকভাবে অনুজীবের পরিণতি হয় মৃত্যু অথবা নিষ্ক্রিয়তা।
প্রসারমান সূর্য
আমাদের সোলার সিস্টেমের কেন্দ্র সূর্য প্রতিনিয়ত আমাদের আলো দেয় যা পৃথিবীতে বিদ্যমান অধিকাংশ জীবের প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে। তবে এই সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আজীবন থাকবে না। ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি যে সূর্য প্রতিনিয়ত উত্তপ্ত হচ্ছে। এই উত্তপ্ত হওয়ার মাত্রা এত বৃদ্ধি পাবে যার ফলে পৃথিবীর সকল সমুদ্রের পানি বাষ্পীভূত হবে। ধারণা করা হচ্ছে আগামী এক বিলিয়ন বছরের মধ্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং পৃথিবীর সকল জীব বিলুপ্ত হবে। আজ থেকে পাঁচ বিলিয়ন বছর পর পৃথিবীর আকার পরিবর্তন হবে। সম্পূর্ণ স্ফীত হয়ে সূর্য হবে লাল দানব। আগামী ৭.৫ বিলিয়ন বছরের মধ্যে এর কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথ অতিক্রম করবে। ফলে সূর্য আমাদের এই পৃথিবী নামক সুন্দর গ্রহকে গ্রাস করে ফেলবে। একথা বলতে দ্বিধা নেই যে পৃথিবীর কোনো জীবের অস্তিত্ব থাকবে না। যদি তা সত্য হয় তাহলে আমরা এই পৃথিবীতে থাকতে পারবো না। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বেশ জোড় দিয়ে বলেছেন অবশ্যই আমাদের এই পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো গ্রহে বাসস্থান খুঁজতে হবে। যদি কোনো মানুষ টিকে থাকতে চাই তাহলে তাকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি মাধ্যমে নিরাপদ কোনো গ্রহে পালাতে হবে। কারণ এই পৃথিবী গ্রহে জীব টিকে থাকতে পারবে আর মাত্র ৭.৫ বিলিয়ন বছর।


সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুন, ২০২০ রাত ৮:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


