
টুকটুকে লাল শাড়ি আর গা ভর্তি নানা গহনা নিয়ে সুন্দর একটা অল্প বয়সী ফর্সা মেয়ে, রিকশা থেকে ছটফটিয়ে নামতে গিয়ে রিকশার কোনায় বেঁধে তার শাড়ীটা ঘ্যাঁচ করে ছিড়ে গেল।
দ্রুত বেগে রিকশা থেকে নেমে এসে রাগত স্বরে আব্বা মেয়েটিকে বললেন,
- এটা কি হলো? এটা কি হলো?
মেয়েটিও জোরে জোরে বলে উঠলো,
- হায় আল্লাহ তাই তো এইটা কেমনে হইলো? এইডা কি হইলো?এখন কি হইবো,হায় হায়! আমার শাড়ী। আমার বিয়ার শাড়ী।
মেয়েটি যে মহা বিব্রত তা তার চোখ মুখ দেখলেই বেশ বোঝা যাচ্ছে।
আব্বা কিছুক্ষণ কটমট করে তাকিয়ে রইলো লাল শাড়ী পরা মেয়েটির দিকে। এরপর ঝট করে ঘুরে হম্বিতম্বি শুরু করলেন রিকশাওয়ালার প্রতি। তাঁর যত রাগ গিয়ে পড়লো যেন রিকশাওয়ালারই উপর।
- রাস্তায় কী সব রিকশা নামাও,চেক করে নামাতে পারো না। ভাংঙড়ি রিকশা জোগাড় করে আনছে কোথেকে।শাড়ীটা কত টাকা দামের তুমি কি জানো? তোমার একমাসের ইনকামেও কিনতে পারবে না এমন একটা শাড়ী।
রিকশাওয়ালা প্রতিবাদ করে,
-আমারে বকেন কেন?আমি কি করলাম? উনিই তো নামতে যাইয়া..
-চুপ বেয়াদব একদম মুখ চালাবে না, মুখ বন্ধ রাখো আর এই নাও ভাড়া, শাড়ী ছিড়েছে এজন্য তুমি অর্ধেক ভাড়া পাবে। ব্যস।
- এইডা কি কন স্যার আমি তো হের শাড়ী ছিড়ি নাই, আমারে দায়ী করেন কেন?
-ওই হলো, তুমি ছিড়ো নাই তোমার রিকশার কারণে ছিড়েছে তাই তোমার কাছ থেকে কিছুটা ক্ষতি পূরন নিলাম।
- এমন অবিচার কইরেন না।গরীব মানুষ মইরা যামু।
- আমি দয়ালু মানুষ তাই অর্ধেক ভাড়া পেলে, অন্য কেউ হলে এক পয়সাও পেতে না। যাও হটো।
রিকশাওয়ালা বেচারা নিতান্ত গোবেচারা তাই হয়তো কথা বাড়ালো না। তবে মনে যে কষ্ট পেয়েছে সেটা তার চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে মনে মনে কি যেন বকতে বকতে চলে গেল।
রাস্তার উপর আমরা ক'বন্ধু মিলে ক্রিকেট খেলা করছিলাম। ঘটনা প্রবাহ দেখে আমি ও আমার খেলার সাথীরা সবাই কম বেশি হতবাক। বড় বড় গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছি।
আমাদের সবার আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু ওই লাল শাড়ী মেয়েটি। কে ও?
হঠাৎ আব্বা আমাকে দেখতে পেয়ে, স্বভাব সুলভ বজ্র কঠিন কন্ঠে হাঁক দিলেন।
-অপু......
-জ্বী আব্বা?
-এদিকে আয়।
-জ্বী আব্বা বলেন।
-এই যে তোর নতুন মা, শায়মা। ওকে সালাম কর।
-আমার তো মা আছে নতুন মা দিয়ে আমি কি করবো?
-কথা না বাড়িয়ে সালাম কর।
-না,একদম না। সরে আয় অপু সরে আয় বলছি এক্ষুনি।
মায়ের চিল চিৎকারে আমি থমকে দাড়ালাম।মা কখন যেন বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমার শিশু মনেও অপরাধবোধ এসে ভীড় করলো। একে সালাম করলে নিশ্চয় সমস্যা আছে।আমি সালাম না করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
আব্বা আবার তাগাদা দিলেন,
-কি হলো সালাম করতে দেরি হচ্ছে কেন?
- খবরদার ওকে ছুঁবি না অপু, ওকে ছুঁলে কিন্তু সোজা বঠি দিয়ে কেটে ফেলবো তোকে। ওই ডাইনির কাছ থেকে সরে আয় বলছি।
ভয়ে আমি থরথর করে কাঁপতে লাগলাম।
শুরু হয়ে গেল দমদমাদম ঝগড়া । সাড়া পাড়ার লোক চক্ষের নিমেষে চলে এলো ঝগড়া শুনতে।
মায়ের প্রশ্ন,
-এই মেয়ে কে?
-তোমার সহকারী আনলাম। একা একা কাজ করতে তোমার কষ্ট হয়ে যায়।
-তোমাকে কখনো বলছি, একা কাজ করতে আমার কষ্ট হয়ে যায় ?
-সেদিনই তো বললে কাজের লোকের কথা।
-কাজের লোকের কথা বলেছি।বউ আনতে বলিনি।
-রাস্তার উপর এসব কি কর? সরে যাও ,পরে কথা বলছি,পাড়ার লোকজন দেখছে।
-দেখুক, দেখুক তোমার কীর্তিকলাপ।
এবার মা লাল শাড়ির দিকে ফিরে শুরু করলো।
-এই ছেমড়ি বিয়ে করার আর লোক পাও নাই, এই মাঝবয়সী বুড়োর গলায় ঝুলে পড়লে। এর যে বউ বাচ্চা আছে সেই খোঁজ নেবার প্রয়োজন বোধ করলে না। ছিঃ ছিঃ ছিঃ
-মরিয়ম?
-একদম চোখ পাকাবে না,লুচ্চা বেটা। বুড়া বয়সে ভীমরতি। আজ তোর এই বাড়িতে কোন জায়গা নাই।
- জায়গা নাই মানে কী?
-জায়গা নাই মানে জায়গা নাই। খাওয়াও বন্ধ।
-আমার বাড়ি আমার ঘর আর আমারে কস জায়গা নাই। খাওয়া বন্ধ। তোর আজ কপাল পুড়াইছি।
-বলেছি তো জায়গা নাই।
-তুই অহন ই বাইর হ মাগী আমার বাড়ির তন,তোরে আর আমার লাগবো না।
-উ কইলেই হইলো তুই বাইর হ।
এর পরের ঘটনা সমূহ আমার শিশু মনে প্রবল রেখাপাত করলো। আমি অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম আমার আব্বা ও মায়ের মধ্যে
হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল রাস্তার উপর।
এমনিতে মায়ের সাথে আব্বার বনিবনা নেই অনেকদিন। আব্বা প্রায় হুমকি দিতো আরেকটা বিয়ে করার। আমরা মা ছেলে ভাবতাম এসব কথার কথা। কিন্তু আজ রূঢ় বাস্তব আমাদের সামনে।
বেশ খানিক পরে এক ফাঁকে মেয়েটি ঢুকে পড়লো বাড়ির ভিতরে। আব্বাও ঢুকে গেলেন সুযোগ মত।আব্বা এলাকায় বেশ প্রভাবশালী নেতা গোছের লোক তাই সবাই দুর থেকেই সমস্ত ঘটনা দেখতে লাগলো আর মজা নিলো।কাছে কেউ এগিয়ে এলো না বাদানুবাদ থামাতে বা আচার বিচার করতে।
এত হুলুস্থুলের মধ্যে মেয়েটি স্বাভাবিক ভাবে ঘরে গিয়ে কাপড় বদলে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ ঘুর ঘুর করে বেশ আন্তরিকতার সাথে বলল,
- আপা রাইতের রান্না খাওনের কি ব্যবস্থা?
মা কিছু বলল না তবে কটমট করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। মা খানিকটা নিস্তেজ হয়ে গেছে এখন , বিরতিহীন ঝগড়ায় সে খানিকটা ক্লান্ত।
আমি হতবিহ্বল দৃষ্টিতে দেখতে লাগলাম আব্বার সহযোগিতায় আমার মায়ের এতদিনে সাজানো সংসার বেদখল হয়ে গেল কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে।
সেই রাতে আমাদের জায়গা হলো বাড়ির বারান্দায়। মা সারারাত ঘুমালেন না। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
আমি মাকে নিয়ে নির্ঘুম জেগে রইলাম সারারাত। আমাদের প্রিয় ঘরটার বন্ধ দরজার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে একেকটি প্রহর পার করতে লাগলাম দুজনে ৷
কত সহজে কত কিছু বদলে যায় চোখের পলকে।
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ১২:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




