somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ কলুষ

১৪ ই নভেম্বর, ২০২১ সকাল ৯:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেশ কিছু দিন আগে কলেজ পাড়ার মোড়ের মাথায় আমি একটা পুরাতন বই পত্র পত্রিকা বেচাকেনার দোকান দিয়েছি।সত্যি কথা বলতে কি লেখাপড়া বেশি না জানলেও আমি ভীষণ বই পড়ুয়া।যেখানে যা পাই গোগ্রাসে গিলি, এর সবই অবশ্য আউট বই।টেক্সট বইতে আমার তেমন কোন আগ্রহ নেই।
নতুন বই কেনার সাধ্য নেই তাই রথ দেখা ও কলা বেচা দুটোই হবে এই আশায় দোকান দেয়া আর কি। তাছাড়া বাড়ি থেকে কিছু করার তাগাদাও ছিল। প্রথম প্রথম খরিদদার তেমন একটা হচ্ছিল না। কিছু গাইড বই কিনতে কালে ভদ্রে কেউ কেউ আসতো। দাম দর শেষে মূল্য যা দিতো বই প্রতি লাভ খুব একটা থাকতো না। যা হোক বইয়ের প্রতি ভালোবাসার কারণে নানা প্রতিকুলতার মাঝে দোকান টিকিয়ে রাখলাম। মন্দের ভালো দোকান মালিককে মাসিক ভাড়া দিয়ে অল্প কিছু টাকা বাঁচতো প্রতি মাসে। মুফতে আমার কিছু বই পড়া হতো।
এর কিছুদিন বাদে এক সুহৃদের উৎসাহে ফেসবুকে বই বেচা কেনার গ্রুপ খুলে ফেললাম । অন্য দিকে বেশ কয়েকটি বড় বই বেচা বিক্রি গ্রুপে বই বেচার পোস্ট দিলাম। তাতে ভালো সাড়া দেখে স্বাভাবিকভাবে আমার উৎসাহ দ্বিগুণ হয়ে গেল।বেচা বিক্রি বাড়তে আমি বেশ খোশমেজাজে ব্যবসা চালিয়ে যেতে লাগলাম।
ইদানিং কিছু আমারই মত বই পড়ুয়া লোকজন আমার দোকানে ভীড় করে নিয়মিত।বয়স যা ই হোক না কেন, সমমনা বলে কথা বলে আরাম পাওয়া যায় তাদের সাথে। সবচেয়ে বড় কথা বই পত্র পত্রিকা সংক্রান্ত অনেক খোঁজ খবরও মেলে, এটাও আরেকটা ভালো দিক ব্যবসার জন্য ।সম্প্রতি আমার মত এক বই পড়ুয়া প্রৌঢ় মানুষের সাথে আমার পরিচয় হলো।পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা। তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে আমার দোকানে এসে অনেকটা সময় কাটাতে লাগলেন । স্বাভাবিক ভাবে সামাজিক ,অর্থনৈতিক, রাজনীতি এমনকি পারিবারিক আলাপ আলোচনাও চলতে লাগলো সুযোগ মত । তবে ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে তিনি কেমন যেন বিব্রত হতেন,এটা বুঝতে পারতাম।নিজের কথা খুব একটা কিছু বলতে চাইতেন না।
কথায় কথায় যে টুকু জানা হলো, তিনি একজন সাধারণ চাকুরে ছিলেন।এখন রিটায়ার্ড । স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে বছর দুয়েক। নিঃসন্তান জীবনে একাকীত্ব কাটানের প্রধান সঙ্গী এখন বই আর আমার সঙ্গে বই সংক্রান্ত আলোচনা তার ভালো লাগে ত্ই তিনি অবসর সময় কাটাতে আমার কাছে আসেন।
উনার মিষ্টি ব্যবহারের কারণে তাঁর প্রতি আমার এক ধরনের আত্নিক টান তৈরি হলো খুব স্বাভাবিকভাবে। একাকী থাকেন,কি খান না খান এই ভাবনায় বাসায় কিছু ভালো মন্দ হলে বিশেষ করে শুকনো খাবার আমি তাঁর জন্য বয়ে আনতাম প্রায়। তিনি প্রথম প্রথম খেতে না চাইলেও পরের দিকে আগ্রহ নিয়ে খেতেন। শেষে এমন হলো কোন কারনে তিনি একদিন না এলে আমার কেমন যেন খালি খালি লাগতে লাগলো, মন বসতো না কাজে।
তবে একটা ব্যপার একটু খারাপ লাগতো তাঁর কাছে বাসার ঠিকানা বা মোবাইল নাম্বার চাইলে তিনি কেমন যেন বিব্রত বোধ করতো। একদিন জানালেন তিনি মোবাইল ব্যবহার করেন না। ব্যক্তিগত আলাপেও তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না।
এর মধ্যে একদিন হল কি তিনি হঠাৎ পর পর কয়েক দিন অনুপস্থিত। আমি ও নতুন বিবাহের কারণে এ ব্যপারটা বাধ্য হয়ে একপ্রকার আন্তরিক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নজর দিতে পারি নি।
কয়েকদিন পরে, পাশের দোকানী বন্ধু মুনির আমি দোকান খুলতেই প্রায় ছুটে এসে জানালো,
- দোস্ত তোমার লগে একখান কথা।
- কি কথা?
- তোমার এইহানে আইতো ওই যে সাদা পাঞ্জাবিওয়ালা বুইড়া।
-জামান সাহেব?
- হ।
- তো কি হইছে?
- হের খবর কি জানো?
- হ কয়দিন এদিকে আহে নাইক্কা।
- হেই তো মইরা গেছে।
- কি! কি কস তুই ?
- মইরা না, ভুল হইলো, হেরে মাইরা ফালাইছে।
আমি তো শুনে আকাশ থেকে পড়লাম
- কেডায় এমুন কাম করলো? কার বাড়া ভাতে ছাই দিছিলো হেতে? আহারে!
- আরে আসল কাহিনী তো অন্য খানে।
- কি কাহিনী? খুইল্ল্যা ক তাড়াতাড়ি।
-হের পোলা মাইয়ারা তাঁরে মাইরা ফালাইছে।
- কি? কি কস? আমি বিশ্বাস যাই না। হেতে তো নিঃসন্তান আছিলো। পোলা মাইয়া আইলো কই তন?
- মিছা কথা,হেতে মিছা কথা কইছে। আমি খোঁজ খবর নিছি। হের দুই পোলা আর দুই মাইয়া। বনিবনা আছিল না তারে কেউ দেখতো না।
- ক্যাঁ? দেখতো না ক্যাঁ?
- অত কিছু কইবার পারমু না। তয় তাজমহল রোডে হের বাড়ি আছে। হেই সব লইয়া নাকি গ্যাঞ্জাম। পোলা মাইয়ারা সম্পত্তি বেচবার চাইছিল হের বউ মরনের পর থাইকা। হেতে দেয় নাই। হেরে কইছিল না- কি বৃদ্ধশ্রমে দিবো। বুইড়া ফাইট দিছে বহুত, লেকিন শেষ ঠেকাইতে পারে নাইক্কা।
অনেক কশ্ট পেলাম কিন্তু কিছু করার নেই। সমাজটা কেমন যেন দিন দিন পঁচনের শেষ সীমায় পৌছে যাচ্ছে। দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে বললাম
- লোকটা ভালো আছিল রে মুনির। অনেক জ্ঞানী আছিল।পোলা মাইয়া উপরে ত্যাক্ত হইয়া মনে লয় কইতো নিঃসন্তান। হায়রে খোদা। সম্পত্তি কারও কারও লাইগ্যা এমন শত্রু হইয়া দাড়ায়। কি জমানায় আইলাম রে দোস্ত!
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০২২ সকাল ৮:৫৯
১১টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যে শহরে বৃষ্টি নেই

লিখেছেন রিয়াজ দ্বীন নূর, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৩০



শহরটা নিচে। অনেক নিচে। রিকশার টুংটাং, বাসের হর্ন, কারো হাসির শব্দ, কারো ঝগড়ার শব্দ — সব মিলিয়ে একটা জীবন্ত শহর। কিন্তু রিয়াজের কাছে এই সব শব্দ এখন অনেক দূরের।... ...বাকিটুকু পড়ুন

Dual Currency Card Needed for Meta Monetization. Urgent National Interest.

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬

ছবি

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি প্রায় চল্লিশ মিনিট। এক জায়গায় এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে সাধারণত দুই ধরনের সন্দেহ হয়- এক, লোকটা কিছু করতে এসেছে। দুই, লোকটার করার কিছু নেই। আমি কোনোটাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

’দেশ বিক্রির অভিযোগ, কাঠগড়ায় ইউনূস–জামাত–বিএনপি–এনসিপি”

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:১৩

’দেশ বিক্রির অভিযোগ, কাঠগড়ায় ইউনূস–জামাত–বিএনপি–এনসিপি”
==========================================
চুক্তি মানেই তো স্বার্থের ভারসাম্য। কিন্তু সেই ভারসাম্য যখন দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করে, তখন সেটি আর চুক্তি থাকে না প্রশ্নবিদ্ধ সমঝোতায় পরিণত হয়। ইউনূসের শেষ সময়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুপ্তদের সকল অপকর্মের তদন্ত হোক....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪৮


সময় যত যাচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে অস্বস্তিকর সত্য!
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে- আর অতীতের অনেক ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য ও তথ্য সামনে আসছে-
যেখানে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত ইব্রাহীমের (আ.) কুরাইশ আহলে বাইতের মধ্যে হযরত আলীর (রা.) মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের সময় সবচেয়ে কম

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৫৯



সূরাঃ ২ বাকারা, ১২৪ নং আয়াতের অনুবাদ-
১২৪। আর যখন তোমার প্রতিপালক ইব্রাহীমকে কয়েকটি বাক্য (কালিমাত) দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন, পরে সে তা পূর্ণ করেছিল; তিনি বললেন নিশ্চয়ই আমি তোমাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×