সীতানাথ রোডের মোড়ের বাড়িতেই থাকতেন কবির বন্ধু কন্ঠশিল্পী নলিনীকান্ত সরকার । সেখানে এসেই আমি আর শিরাজী সাহেব দুজনে দুদিকে চলে গেলাম । সিরাজগঞ্জে নিখিলবঙ্গ যুব সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল এই দিনটির দিন- দশেক পরে—১৯৩২ সালের ৫ই এবং ৬ই নভেম্বর । কবির ওখানেই স্থির হয়েছিল তাঁর সাথে কলকাতা থেকে কে কে সিরাজগঞ্জে যাবেন । তাঁদের মধ্যে আমিও একজন ।
যথানির্ধারিত দিনে আমি আমার পার্কসার্কাসের বাসভবন থেকে গাড়ী ছাড়বার মিনিট ১৫ পূর্বে শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে পৌঁছলাম । সাথে সাথে কবিকে নিয়ে শিরাজী সাহেবও হাজির হলেন । তাঁদের সাথে রয়েছেন বন্ধুবর সুরশিল্পী আব্বাসউদ্দীন এবং মোমেনশাহী জেলার জামালপুরের একজন প্রাক্তন মন্ত্রী মরহুম জনাম গিয়াসউদ্দীন সাহেব । তিনি তখন বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন ।
গাড়ী যথাসময় স্টেশন ছেড়ে ছুটে চললো । এই সুদীর্ঘ রাস্তায় কবির অপূর্ব রসালাপের মধ্যে কি করে যে সময় কেটে গেলো, টেরও পেলাম না । একসময় নানান কথার মাঝে কবি বলে উঠলেনঃ পাঁঠা কেটে ভাগ দিন্ – পাঁঠা কেটে ভাগ দিন্ – পাঁঠা কেটে ভাগ দিন্ ! গিয়াসউদ্দীন সাহেব তখন বললেন—বুঝলাম না । আব্বাস সাহেব বললেন—বুঝবেন কি করে ? আমাদের ত আর কবির কান নয়, কাজীদার কানে ট্রেন চলার আওয়াজ এই নাকি শোনায় ! এবার ট্রেন চলার তালে তালে আব্বাস সাহেবও তাঁর সুরেলা কন্ঠে কয়েকবার আওড়ালেন—পাঁঠা কেটে ভাগ দিন্ –পাঁঠা কেটে ভাগ দিন্ ।
যথাসময়ে ট্রেন সিরাজগঞ্জ স্টেশনে এসে পৌছলো । আগে থেকে কয়েক সহস্র জনতা বিশেষ করে ছাত্র এবং যুবক কবিকে সম্বর্ধনা জানাবার জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছিল । গাড়ীর গতি স্টেশনে এসে স্তিমিত হয়ে আসতেই সহস্র কন্ঠের বারকয়েক ‘আল্লাহু-আকবার’, ‘কবি নজরুল ইসলাম জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে চারদিকের আকাশ-বাতাস আলোড়িত করে তুললো । কবি নামলেন । আমরাও সাথে সাথে নেমে পড়লাম । কবিকে মালা পরানো হলো । বয়স্করা করমর্দন করলেন, দুবাহু সম্প্রসারিত করে বুকে টেনে নিলেন । যুবক এবং ছাত্ররা করলো প্রণাম । এ অভূতপূর্ব সম্বর্ধনার দৃশ্য দেখে আমার দু’চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়লো ।
মিছিল করে জনতা কবিকে নিয়ে চললো নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থানে মুহু-র্মুহুঃ ‘বিদ্রোহী কবি জিন্দাবাদ’ আওয়াজ ধ্বনিত হতে লাগলো, আর সহস্র কন্ঠের সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে আশেপাশের, দূরদুরান্তের আলো-বাতাস সব কিছুকেই উজ্জীবিত করে তুললো । সে দিনে মিছিল-মত্ত বাংলার সিরাজগঞ্জ যেন পারস্য প্রতিভার মহান গৌরবে মহিমান্বিত সেই শিরাজ-নগরে ঐতিহাসিক মর্যাদায় মহীয়ান হয়ে উঠেছিল—তার আশা তার প্রাণের-ভাষা জাতির প্রিয় কবিকে স্বঃস্ফূর্ত প্রাণবন্যায় সেদিন অভিষিক্ত করে ধন্য হয়েছিল । (ক্রমশঃ)

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে নভেম্বর, ২০২০ রাত ৯:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



