somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বোকা বকে, বুদ্ধিমান বলে

০৯ ই অক্টোবর, ২০১১ বিকাল ৩:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাঙলায় একটি সুন্দর শব্দ আছে, বাকসর্বস্ব-যে কাজে অদক্ষ কিন্তু কথায় ওস্তাদ অথবা বলা যায়, কাজে ঠনঠন, করে ভনভন। আমাদের দেশে বাকসর্বস্ব মানুষের সংখ্যা বেশি। কেউ হয়তো আপত্তি করতে পারেন, তবে স্বজাতির বিরুদ্ধে এ কোন অপবাদ দিচ্ছি না। কথা নয় কাজ, এ মন্ত্রে আমাদের বিশ্বাস নেই চর্চাও নেই। কম কথায় কোন উপকার না হলেও ক্ষতি ডেকে আনে না, এমন প্রবাদ পুরোনো, তবুও সর্বত্র যেন সবার মুখে খই ফুটছে। অবশ্য কথা ছাড়া কি কাজ হয়, এমন প্রচারও জোড়ালো। কিন্তু তাই বলে অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে কি বিরত থাকা যায় না? র্নিবোধের মুখ চলে আগে, মাথা পরে কাজ করে আর বুদ্ধিমানের মুখের আগে মাথা চলে। চিন্তা করে কথা বলতে হয়, বলে চিন্তা করে কি কাজ হয়। রাজনীতিকের চারিত্রিক ও কর্ম বৈশিষ্ট্যের সাথে, বেশি কথার সার্বজনীন সমপর্ক আছে কিনা সেটা অনুপুঙ্খ ও বিস্তর আলোচনা। তবে আমাদের দেশের রাজনীতিকদের, কথা না বলে থাকাটাই ওদের অসুস্থতার কারণ হয়ে উঠে। হাটে-বাজারে, মাঠে-প্রান্তরে, উপাসনালয়ে, শিক্ষাঙ্গণে কারণে অকারণে সত্য-মিথ্যার যে বুলি আওড়াচ্ছে তাতে তাঁদের নেতৃত্বের বলিষ্ঠতার একটি প্রকাশও যেন তাঁরা খুঁজে পায়। প্রতিটি বক্তৃতার মঞ্চকে গেটিসবার্গ ভাষণ কিংবা সাতই মার্চের রেইসকোর্স ময়দানের ভাষণে রূপ দিতে মরিয়া হয়ে উঠে। এহেন চর্চা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রত্যেকে নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের স্তুতি করতে গিয়ে দেব-দেবতা তুল্য করে। দেশে নব্য গজানো ওমুক-সেনা ও তোমুক-সেনারা নিজের দলের ও দলপতিদের স্তুতি করতে ওস্তাদ, ভিন্ন মতাদর্শীদের পারলে হাবিয়া দোজখে পাঠায়। শিং না গজাতেই ঢুঁ মারার প্রবণতা প্রবল। মোদ্দাকথা, আমাদের রাজনীতি এখন বাকসর্বস্ব রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। মঞ্চ কাঁপিয়ে, শরীর নাচিয়ে উচ্চ স্বরে সুরে সুরে বক্তৃতা না দিতে না পারলে যেন নেতাই হওয়া যায়না। র্নিবোধ উচ্চ স্বরে শব্দ দূষণ করতে পারে, তাতে বাকপটু কিংবা বাগ্মী হওয়া যায় না। আমাদেরও সতর্ক থাকা উচিত, যেন মঞ্চে সবাই সুযোগ না পায়। আমরা বুঝতে চাই না, অযোগ্যের মঞ্চে যোগ্য ধীরে ধীরে কোণঠাসা এবং বেমানান হয়ে পড়ে।



আমাদের কতিপয় মহামান্য মন্ত্রীগণ সামপ্রতিক সময়ে কথার বোমা ফাটাচ্ছেন। এ এক ধারাবহিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে। অতীতেও এ চর্চা হয়েছে, বর্তমানেও অব্যাহত আছে। ইলেকট্রনিক প্রচার মাধ্যমের যুগে, তাঁরা বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে নিজেদের সংবরণ করতে পারেন না। জোট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ' আল্লার মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে ' বলেই বিদায় নিয়েছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি একজন শত্রু খোঁজায় এত ব্যাস্ত ছিলেন যে, চিরুনি অভিযান দিয়েও দেশের আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন নি। কিন্তু ক্যামেরার সামনে যেভাবে “উই আর লুকিং ফর শত্রুজ” বলে উঠতেন, মনে হত শত্রু শিবিরে যেন মুহূর্তে কাঁপুনি উঠে গেল। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ত্রাসীদের দমনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন কিন্তু নিজের দলের সুযোগ্য ছেলেদের দমন করতেই হাঁফিয়ে উঠছেন এবং অবশেষে বুঝলেন যে ছাত্রলীগে ছাত্রশিবির ঢুকে পরেছে! যোগাযোগ মন্ত্রী ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রীতো দেশের যোগাযোগ ব্যাবস্থাকে এমন করে দিচ্ছেন যে, এ দেশের ইতিহাসে একবিংশ শতকের শের শাহ হয়ে থাকবেন। তাঁদের বাকি অভিযান, দেশে কয়েক লক্ষ অবৈধ লাইসেন্স দিয়ে বিশ্ব চালক সমিতিতে নিজেদের আজীবন সদস্যপদ বহাল রাখা। চালকেরা একটি কুকুরও মারতে চান না বলে মন্তব্য করে চালকদের মানবিক বোধের সনদও দিয়ে দিলেন।একটি দেশের মন্ত্রী কত নিবোর্ধ ও অপরিণামদর্শী হতে পারে ভাবলেই গা শিউরে উঠে। যাদের চিন্তাই এমন আত্মঘাতী (সঠিক করে বললে, মানবঘাতী) তাঁদের কাজ কতটুকু সুফল বয়ে আনবে সেটা আমাদের প্রধানমন্ত্রীও যখন বুঝেননা, তখন অভিভাবক হিসেবে তাঁর ভূমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠে। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভাল কিংবা বেয়াদপির চেয়ে গড়হাজির উত্তম, এমন প্রবাদ যেন তিনি ভুলে গেছেন। এদিকে আমাদের অ্যাটর্ণি জেনারেল নোবেল শান্তি পুস্কারের মনোনয়ন দিয়ে বেড়াচ্ছেন। ইংরেজ নাট্যকার ও কবি Ben Jonson এর একটি সুপ্রচলিত উক্তি আছে, To speak and to speak well are two things. A fool may talk, but a wise man speaks..”- অনুবাদের সারঅর্থ দাঁড়ায়- বোকা বকে, বুদ্ধিমান বলে। আমরাও আছি র্নিবোধ নেতাদের রাজ্যে, তাই তাদের বকবক শুনে ঘুমিয়ে পড়ি, বকবক শুনে জাগি। এ দেশ কি তবে বাগাড়ম্বরের রাজ্যে পরিণত হল!

সমপ্রতি আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ধর্মমতে মুসলমানদের কোন অকালমৃত্যু নেই। সমাজে মানুষের যে গিনিপিগের মত মৃত্যু হচ্ছে, এই উক্তি দিয়ে কি তিনি সেই দায় থেকে বাঁচতে চান? ধর্মে মানুষের মৃত্যুর কাল নির্দিষ্ট করে বলেও দেয়া হয়নি, তাই মানুষ বাঁচতে চায়, বাঁচাতে চায়। মানুষের মৃত্যু সত্য, তাই বলে মৃত্যু রোধের চেষ্টা অধর্ম নয়। দায়িত্বে অবহেলাকারীদের জন্য যে ধর্মে কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ আছে, মন্ত্রীমহোদয় কি সেটা বুঝেন না? এ দেশের মানুষের চাওয়া কত ন্যূনতম পর্যায়ে পৌছঁলে মানুষ “স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই” বলে স্লোগান দিতে পারে তা কি আমাদের সুযোগ্য দেশ পরিচালকগণ ভেবে দেখেছেন। মৃত্যুর এত বিভীষিকাময় রূপ আর কোন দেশে আছে কিনা জানা নেই। হে মহামান্য মন্ত্রীগণ, বিশুদ্ধতার সনদ যুক্ত খাবার খেয়ে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়ে, বিলাসী বাড়িতে রাত্রি যাপন করে আর রাষ্ট্রীয় খরচে বিশ্ব ভ্রমণ করে যা ইচ্ছা তাই বলে বেড়াবেন না। আপনাদের কাছে আমাদের এ বিনীত অনুরোধ। আমরা অনেক সহিষ্ণু ও সভ্য বলেই, যখন তখন আমাদের প্রতিবাদের শত-সহস্র হাত ধেয়ে আসে না আপনাদের মুখের দিকে।



রউফুল আলম

vestra skogen, 19 sep, 2011

লেখাটি প্রকাশিত: দৈনিক সমকাল, ০৮ অক্টোবার, ২০১১
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ১২:২১
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×