আজকে দেয়া হলো এর শেষ কিস্তি। কেউ প্রথম এবং দ্বিতীয় কিস্তি পড়তে চাইলে এই লিঙ্কে যেতে পারেন।
দ্বিতীয় কিস্তি
প্রথম কিস্তি
পাবলিক টেলিফোনঃ

আজ আবালবৃদ্ধবনিতা সবার হাতে এক বা একাধিক মোবাইল সেট শোভা পায়। অথচ গত দেড় দশক আগেও এমন দৃশ্য কল্পনার বাইরে ছিল। তখন মানুষ কথা বলত ল্যান্ডফোনে। ধনীদের অনেকের বাড়িতে নিজস্ব ল্যান্ডফোন ছিল। এমন একটা সময় ছিল যখন বাড়িতে ল্যান্ডফোনের সংযোগ নিতে একাধিক মন্ত্রী বা সচিবের সুপারিশেও কাজ হত না। সুপারিশের পাশাপাশি নগদ নারায়ণ ঢাললে তবেই মিলত সংযোগ। ল্যান্ডফোনের সেই রমরমা অবস্থা অবশ্য এখন আর নেই। ল্যান্ডফোনের মালিকগণ নিজ নিজ বাসায় গদি আটা সোফায় গা এলিয়ে আয়েশ করে কথা বলতে পারলেও আমাদের মত সাধারণ মানুষের ভাগ্য ততটা সুপ্রসন্ন ছিল না। তাদের একমাত্র ভরসা ছিল পাবলিক টেলিফোন। হোটেল লবিতে, রেলওয়ে স্টেশন, কোন জনবহুল মার্কেটের নিকট ইত্যাদি স্থানে পাবলিক টেলিফোন ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। সেখান থেকে মানুষ তার প্রয়োজনীয় কথা বলত। ৩/৫ মিনিটের লোকাল কলের রেট ছিল ৫টাকা। সিরিয়াল দিয়ে কথা বলতে হত। প্রথমবার লাইনে দাঁড়িয়ে কল দিয়ে দেখলেন যাকে ফোন করেছেন সে ‘ইয়ে করতে গেছে’। তার মানে আপনার ৫টাকা নস্ট। আবার লাইনে দাঁড়ান, আবার ৫টাকা গুণেন। হাহাহা। ও হ্যা, এনডব্লিউডি বা আইএসডি কলের জন্য আলাদা রেট। স্বাভাবিকভাবেই অত্যধিক ব্যবহারের ফলে এই ফোনগুলো প্রায়ই নস্ট থাকত।
আমি প্রথম পাবলিক টেলিফোন ব্যবহার করি ঢাকা নিউ মার্কেটের দক্ষিণ গেটের সামনে অবস্থিত পাবলিক টেলিফোনে। আমার এক কাজিনের কন্ঠটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর। ওর কন্ঠ শোনার জন্য মাঝে মাঝে টেলিফোন করতাম। হাহাহা।
যোগাযোগ ব্যবস্থার নানান যুগান্তকারী আবিস্কারের ফলে পাবলিক টেলিফোন এখন শুধুই ভুলে যাওয়া এক স্মৃতির নাম। তবে ল্যান্ডফোন এখনো টিকে আছে বেশ ভালভাবেই।
কয়েন টেলিফোন বক্স:

আরেক তেলেসমাতি কারবারের নাম কয়েন টেলিফোন বক্স। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট তুমুল জনপ্রিয় ছিল এটি। এগুলো মূলত আউটগোয়িং। আমি অগণিত বার এটি ব্যবহার করেছি। এ নিয়ে অনেক অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা আছে। যাইহোক, এর মাধ্যমে কল করতে পচিশ পয়সার চারটি, অথবা পঞ্চাশ পয়সার দুটি কয়েন প্রয়োজন পড়ত। কয়েন উপরের দিকে এক জায়গা দিয়ে ঢুকানো হত। ৫০ পয়সার এক কয়েনে ৩ মিনিটের মত কথা বলা যেত। আমার এক ফ্রেন্ড প্রথমবার কয়েন বক্সে টেলিফোন করতে গিয়ে নীচের দিকে পয়সা রেখে এমন এক শরমের মধ্যে পরেছিল তা মনে করে এখনো মাঝে মাঝে হাসি। এখানেও লাইন দিতে হত। বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলাপাইন ত বহুত পাকনা। বেশী পাকনারা আবার সেই কয়েন বক্সেও প্রেমালাপ চালাত। আর লাইনে থাকা অন্যান্যরা বিড়বিড় করে তার গুস্টি উদ্ধার করত। যাইহোক, হলে মাসে একবার টিএন্ডটির স্টাফ এসে কয়েন সংগ্রহ করতেন। তবে হলের গেট থেকেই গ্রাহকরা খুচরা পয়সা কিনে নিতেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই কয়েন বক্স মাসের অর্ধেক দিনই খারাপ থাকতো। এটিও হারিয়ে গেছে চিরতরে।
কার্ড ফোন:

কয়েন টেলিফোন বক্সের পরের সংস্করণ হলো কার্ড ফোন সিস্টেম। এখানে ইউনিট হিসাবে কার্ড কিনতে পাওয়া যেত। কার্ডটি দেখতে অনেকটা ইদানিংকালের ক্রেডিট কার্ড-র অনুরুপ ছিল। কার্ড Insert করে কথা বলতে হত। আমি নিয়মিত এটি ব্যবহার করতাম। স্বভাবতই অধিক ব্যবহারের ফলে এটিও বেশীরভাগ সময়েই নস্ট থাকত। এখন আর চোখে পড়ে না এটি। মনে পড়ে আমার এক বন্ধু ৫০ ইউনিটের একটি কার্ড নিয়ে লন্ডনস্থ তার এক ভাইয়ের কাছে ফোন করতে কার্ড Insert করলো। বুঝলাম রিং হচ্ছে, এক সময় ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করা হলো। আমার বন্ধু শুধু বলল, ‘ভাইজান নি….’ সাথে সাথে লাইন কেটে গেল। পরে দেখলাম ৪৬ ইউনিট নাই। আমার বন্ধুর বিষন্ন বদনটি এখনো মনে পড়ে। হাহাহা। ও হ্যা, লোকাল কলের ক্ষেত্রে ১ ইউনিটে ৩ মিনিটের মত কথা বলা যেত।
কার্ড ফোন পদ্ধতি এক সময় তুমুল জনপ্রিয় ছিলো সাধারণ মানুষের কাছে। যাদের বাড়ীতে টিএন্ডটি’র ফোন ছিল না বা যারা নিত্য প্রয়োজনে পথে-ঘাটে ফোন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তাদের জন্য কার্ড ফোন পদ্ধতি ছিলো আশীর্বাদসরূপ।
কার্ড ফোন এখন কেবলই স্মৃতি। কোথাও কার্ড ফোন দেখে থাকলে আমাকে জানাবেন, জাদুঘর ব্যতিত।
ফ্লপি ডিস্কঃ

গত শতকের আশি এবং নব্বইয়ের দশকে তথ্য জমা রাখতে এর কোন বিকল্প ছিল না৷ ভিন্ন ভিন্ন সাইজের ভিন্ন ভিন্ন ধারণ ক্ষমতার ফ্লপি ডিস্কের প্রচলন ছিল। এটি এক ধরনের হাল্কা ও বহনযোগ্য ডাটা সংরক্ষণ ডিভাইস যা একটি প্লাস্টিক এর আবরণের ভেতর থাকে। ফ্লপি ডিস্কে ডাটা সংরক্ষণ ও তা ব্যবহার করতে হলে ফ্লপি ডিস্ক ড্রাইভ প্রয়োজন হতো। সফটওয়্যার বা ডাটা ট্রান্সফার, তথ্যের ব্যাক-আপ তৈরি করা এবং কোন তথ্য সংরক্ষণের জন্য ফ্লপি ডিস্ক ব্যবহার করা হয়। হার্ডডিস্ক সহজলভ্য হওয়ার আগে ফ্লপি ডিস্কের স্পেস দিয়ে কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম চালানো হতো। ডাটা ট্রান্সফারের সহজ মাধ্যম হিসেবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এর জনপ্রিয়তা।
আমার উপরের ছবির মত একটা ফ্লপি ছিল। তথ্য আদান-প্রদান, এসাইনমেন্ট তৈরী করে নীলক্ষেতে গিয়ে প্রিন্ট করা ইত্যাদি কাজে এটি বেশ কাজে লাগত। কোন সাময়িকীতে লেখা জমা দেয়ার সময় এর একটা সফট কপি ফ্লপিসহ জমা দিতে হত। তবে মাঝে মাঝে এই ফ্লপি কম্পিউটারে ভাইরাস আমদানিতে সহায়ক ছিল।
বর্তমানে সিডি, ডিভিডি আর বহনযোগ্য বিভিন্ন ফ্লাশ ড্রাইভের কল্যাণে তথ্য পারাপার আরও সহজ হয়েছে। আর তাই জায়গা ছেড়ে দিতে হচ্ছে পথপ্রদর্শক ফ্লপি ডিস্ককে! বিদায় ফ্লপি ডিস্ক!
টেলিগ্রাম যন্ত্রঃ

‘মাদার ইজ ইল, কাম শার্প’’।
একসময়ের বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় একটি ক্ষুদে বার্তা। আর এটি ব্যবহৃত হত টেলিগ্রাম নামক এক যোগাযোগ মাধ্যমে। আজকের টেলেক্স অথবা ফ্যাক্স মেশিনের পথিকৃতই ছিল এই টেলিগ্রাফ যন্ত্র। মিলিটারি, শিপিং অপারেটর এবং সাধারণ মানুষের দ্রত যোগাযোগের ক্ষেত্রে সেই আমলে এটাই ছিল অন্ধের যষ্টি। তবে আজকাল এর দেখা মেলাই ভার। ১৮৩২ ইতালীয় লাগরিক এফ. বি. মোর্স-এর আবিস্কৃত টেলিগ্রাম একসময় প্রচন্ড জনপ্রিয় একটি যোগাযোগ মাধ্যম ছিল। ১৬০ বছরের পুরনো টেলিগ্রামের যুগ প্রায় শেষ হয়েছে। নিভু নিভু অবস্থায় এখনো আমাদের দেশে এটি টিকে আছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে টেলিগ্রাম কখনো ব্যবহার করিনি। এটি আর কোথাও ব্যবহৃত হয় কি না জানা নেই।
ওয়াকম্যানঃ

৮০ দশকে গান শোনার অভ্যাসকেই পাল্টে দিয়েছিল সনির ওয়াকম্যান নামের যন্ত্রটি। ওয়াকম্যানের ক্ষেত্রে ‘এলাম দেখলাম এবং জয় করলাম’ কথাটি একদম মানানসই। কয়েক বছর আগে যেমন ‘আইফোন বিপ্লব’ হয়েছিল তেমনি গানের জগতে ৮০র দশকে মানুষ ‘ওয়াকম্যান বিপ্লব’ দেখেছিল। একটা সময় পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় একটি গ্যাজেট হিসেবেই স্বীকৃত ছিল এই ওয়াকম্যান। হাঁটতে চলতে, বাসে ট্রেনে, মানে যত্রতত্র ক্যাসেট থেকে গান শোনা যেতো ওয়াকম্যান দিয়ে। একে বলা যায় ‘সচল সঙ্গীত’ ব্যবস্থা।
তবে প্রযুক্তির ক্রমবিবর্তনের সাথে সাথে একটা সময়ে এসে ব্রাত্য হয়ে পড়ে এই যন্ত্রটি। পার্সোনাল কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, এমপিথ্রি প্লেয়ার প্রভৃতি ডিভাইসের আবির্ভাবে ক্রমেই পুরোনো হয়ে পড়ে ওয়াকম্যান। অবশেষে এর ক্যাসেটভিত্তিক উত্পাদন বন্ধও করে দেয় সনি। তবে ওয়াকম্যানের প্রতি সনির ভালোবাসা ফুরোয়নি। আর সে কারণেই ডিজিটাল রূপ দিয়ে পুনরায় তারা বাজারে আনতে যাচ্ছে ওয়াকম্যানকে। গান শোনার ডিজিটাল ডিভাইস হিসেবে অ্যাপলের আইপড এক নতুন যুগের সূচনা করে। সনির নতুন রূপে নিয়ে আসা ওয়াকম্যানও মূলত অ্যাপলের আইপডের টাচ সংস্করণের মতোই হবে।
হ্যাজাক লাইটঃ

তখন স্কুলে পড়ি। দাদার বাড়িতে একটা শালিস বসেছে। শালিসের বিষয় ‘নারীঘটিত’। গ্রামের সকল মাথা-মুরুব্বী (গ্রামীণ ভাষা)মজলিশে হাজির। আমাদের মত পোলাপাইনের এখানে বসার ব্যাপারে কঠিন নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। কিন্তু চারদিকে বেশ অন্ধকার। মজলিশের মধ্যিখানে বসে টিমটিম করে জ্বলা হারিকেনের আলোতে ‘চোখের পাওয়ার কমে যাওয়া’ মুরুব্বীদের ফাঁকি দেয়া বিশেষ কস্টসাধ্য কাজ নয়। আমরা কয়েক ছোকরা সেটা অবলীলায় করে যাচ্ছি। হঠাৎ আলোকস্বল্পতায় বিচারকার্য বানচাল হবার উপক্রম দেখে কোন এক বেরসিক মুরুব্বি বলে উঠলো, “এই অমুকের হ্যাজাক বাতিডা লিয়া আয় তো কেউ”। অবশেষে হ্যাজাক বাতি আসল। চারিদিক ফকফকা হয়ে গেল। আমরা মনে মনে কইলাম, “কি বাত্তি জ্বালাইলিরে মানিক”।
ছবি দেখুন। ইটাই সেই হ্যাজাক বাতি। গ্রামাঞ্চলের ঐতিহ্য হ্যাজাক লাইট। সভা, সমাবেশ, বিয়ে, আকিকা, মিলাদ মাহফিল, ওরশসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এক সময় এই লাইটের দারুণ চাহিদা ছিল। বৃটিশ আমল থেকে এই লাইটের ব্যবহার। ওই সময় জমিদাররা তাদের বাড়ি আলোকিত করতে হ্যাজাক লাইট ব্যবহার করতেন। যেসব এলাকায় এখনো ইলেক্ট্রিসিটি যায়নি সেসব এলাকাতে এখনো মাঝে মাঝে হ্যাজাক বাতির ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। গ্রামাঞ্চলে মাঝে মাঝে হাসপাতালের অপারেশনেও এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। কাজেই টিম টিম করে হলেও হ্যাজাক বাতির আলো এখনো জ্বলছে কোথাও কোথাও।
কয়লার ইস্ত্রিঃ

আর একটি অভিজাত ও সৌখিন পণ্য। আমাদের বাড়িতে একটা ছিল। আমি অবশ্য দেখিনি। আব্বা চাকরী করতেন বিধায় জামা-কাপড় ইস্ত্রি করতে হত। এটা ওজনে বেশ ভারী ছিল। হাতলের সাথে ঢাকনার মুখ খুলে জ্বলন্ত অঙ্গার দিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে ইস্ত্রির কাজ চলত। বলাই বাহুল্য, এর প্রয়োজনীয়তা বেশ ছিল। নিচের ছবিটি দেখুন। লাস্ট কবে এমন একটা কয়লার ইস্ত্রি দেখেছেন?
বিটিভিঃ

বিলুপ্ত প্রযুক্তির লিস্টে বিটিভি-র নাম দেখে হয়ত অনেকেই হয়ত আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাচ্ছেন। বিটিভি বিলুপ্ত হয়ে গেছে-এমন দাবী আমিও করছি না। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, গত এক সপ্তাহে কয়জন, কয় মিনিট বিটিভি দেখেছেন? যেটা কেউ দেখে না তাকে বিলুপ্ত বললে কি খুব বেশী বলা হবে? অথচ কি সুসময়ই না ছিল এই বিটিভির!! সারা দেশের মানুষের বিনোদনের একমাত্র ভরসা ছিল বিটিভি। প্রতি শুক্রবারে বেলা তিনটার পরে সিনেমা, সেই সিনেমা অসহ্য যন্ত্রণার বিজ্ঞাপনের জ্বালায় শেষ হতে হতে সন্ধ্যা ৬টা সাড়ে ৬টা বেজে যাওয়া; খবর দেখা, প্রতি সপ্তাহে একটি খন্ড নাটক, ধারাবাহিক নাটক, মাসে একবার ছায়াছন্দ দেখা, ‘ইত্যাদি’ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে মাসের পর মাস অপেক্ষা করা (এটি এখনো দেখা হয়)। মনে আছে ‘সংশপ্তক’, ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, 'ভাঙনের শব্দ শুনি', ‘রুপনগর’সহ আরো অনেক কালজয়ী ধারাবাহিক নাটকগুলোর কথা? তবে এর সবচেয়ে চমক ছিল বাংলায় ডাবিং করা বিদেশী প্রোগ্রামগুলো, টিপু সুলতানের সেই যুদ্ধ যাত্রার সুর এখনো কানে বাজে, ম্যাকগাইভারের সব অসাধারণ কারিকুরি, সিন্দাবাদের দুঃসাহসিক সমুদ্রযাত্রা, রবিনহুডের সেই নিখুত তীর ছোড়া, সুপার-ডুপার হিট আলিফ লায়লা, রোবোকপ, এক্স ফাইলস, হারকিউলিস, আকবর দ্যা গ্রেট আরও অনেক। এসব প্রোগ্রাম যখন শুরু হত তখন ছেলে-বুড়ো সবাই ছুটে যেত টিভিরুমে। সাত দিনের প্রোগ্রাম আমাদের একদম মুখস্থ ছিল। কাজেই কোন প্রোগ্রামই মিস হত না। সে সময় ক্যাবল টিভি বা বেসরকারী টিভির লাইসেন্স ছিল না বিধায় বিটিভিই ছিল সাধারণ মানুষের বিনোদনের অন্যতম উৎস।
টিভি চালানোর অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল এন্টেনা। এটা ছাড়া টিভি চলত না। বিশাল এক বাঁশ বা এ জাতীয় জিনিসের মাথায় রশি দিয়ে কষে বেঁধে এন্টেনা লাগানো হত। ছবি ঝিরঝিরে আসলে এন্টেনা বিভিন্ন দিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এডজাস্ট করা হত।বড়ই ঝামেলার কাজ ছিল এটি।
আর আজ? বিটিভি সম্প্রতি অর্ধশতক পূর্তি (১৯৬৪-২০১৪) উৎসব করল গেল বছরের ২৫ ডিসেম্বর। সরকারের ভুল নীতি, ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগপদ্ধতি এবং অযৌক্তিক পদোন্নতি একটি প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিতে পারে, তার প্রমাণ রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। সম্প্রচার জগতের নন্দিত ও শক্তিশালী এই প্রতিষ্ঠান আশির দশক থেকে বিভিন্ন সরকারের অবহেলায় আজকের এই বাজে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। বিটিভির খবর ও অনুষ্ঠানের মান নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ও সমালোচনা আছে। বাংলাদেশের টিভি অনুষ্ঠানের মেরুদণ্ড শক্ত হয়েছে বিটিভির মাধ্যমে। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই চ্যানেলটি ঐতিহ্য হারিয়েছে। এখন নিম্নমানের অনুষ্ঠান প্রচারের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিটিভির নাম আসে। ফলে দর্শক পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে চ্যানেলটির পর্দা থেকে।
শেষ হইয়াও হইলো না শেষঃ
এবার থামতে হবে। আরো হয়ত অনেক বিষয় ছিল যেগুলো চোখ এড়িয়ে গেছে। যাইহোক, ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব মিস করি গুগল, উইকিপিডিয়া, ফেসবুক, ক্যাবল টিভিহীন আমাদের সেই হিরন্ময় বাল্য ও কৈশোরকাল। সময়ের পরিক্রমায় হয়ত চিরতরে হারিয়ে গেছে বা যাবে একদা প্রিয় জিনিসগুলো। তবে এ নিয়ে হাপিত্যেশ করে সময় নস্ট করার অবকাশ নেই। কারণ নিত্য নতুন প্রযুক্তি এসে সৃষ্টি করেছে নতুন একধরনের সামাজিক বাস্তবতা। সময়ের প্রয়োজনে অনাগত দিনের তথ্য প্রযুক্তিকেও আমাদের বরণ করে নিতে হবে। এটাই জীবন। এটাই সময়ের দাবী। এভাবেই এগিয়ে চলবে সময়ের গাড়ি। সব সময় এভাবেই চলতেই সে অভ্যস্ত। কারণ সময় তো আসলেই পাগলা ঘোড়া। একে বাগ মানানো যায় না। বরং মানুষকেই সময়ের ধারা অনুযায়ী চলতে হবে।
লেখা শেষ করবো আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি-র একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে, তাহলোঃ ‘Change is the law of life. And those who look only to the past or present are certain to miss the future’.
সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ লেখাটি তৈরী করতে বাংলাপিডিয়া, বেশ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা এবং ইন্টারনেটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আরো বেশ কিছু লেখা থেকে সাহায্য নেয়া হয়েছে। আমি সবার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করবেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ১০:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





