
“In every man's heart there is a devil, but we do not know the man as bad until the devil is roused.”
'আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে ?' মানুষের নামের থেকে কাজের ভূমিকা অপরিসীম। কেউ ভালো কাজ করে নাম করে, কেউ খারাপ কাজ করে। বড় হতে কাজ লাগে, ১১ শব্দের নাম লাগে না! বিখ্যাত, অখ্যাত, কুখ্যাত এই তিনটির মধ্যে ‘খ্যাত’ শব্দটি একইরূপ থাকলেও, উপসর্গ তাদের ভিন্নতা দিয়েছে। বিখ্যাত নিয়ে এ পর্যন্ত মেলা পোস্ট দিয়ে ফেলেছি, তাই আজকে একটু ভিন্নতা থাকছে। কুখ্যাত একজন মানুষ আজকের আলোচ্য বিষয়। কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া কোন মানুষ, কিন্তু পাশবিকতার উর্দ্ধে যার কার্যক্রম এখনও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে...তাই সেই ধরণের কোন ব্যাক্তিকে আজকে আমন্ত্রণ জানালে কেমন হয় ?? সুতরাং আজকের পোস্ট এরকমই একজন মানুষের উপর নির্মিত আর্জেন্টাইন একটি সিনেমা এবং তার জীবনবৃত্তান্ত তথা কার্যক্রম নিয়ে।

১৯৬০ সাল, পাট্যাগোনিয়া... একটি আর্জেন্টাইন পরিবারের সাথে একজন জার্মান ডাক্তারের পরিচয় ঘটে তাদের পরিচালিত হোটেলে থাকার সুবাদে। জার্মান ডাক্তারটি নিজের পরিচয় দেয় অ্যালেক্স ব্রেনডেমুহল নামে। পরিবারটি নিজেদের সংসারের সব কিছু এই মরুভূমি বিস্মৃত অঞ্চল থেকে গুটিয়ে গিন্নী ইভার পারিবারিক স্থল বারিলোচ্চেতে এক নতুন জীবন শুরু করার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। গাড়িতে জিনিস উঠানোর সময় পরিবারটির একমাত্র মেয়ে লিলিথের পুতুলটি মাটিতে পড়ে গেলে, জার্মান ডাক্তারটি কিছুটা রহস্যময়তা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে পুতুলটিকে তুলে নেয়... এবং এভাবেই পরিচয় হয় জার্মান ডাক্তার অ্যালেক্স এবং লিলিথের। পুতুলটির নাম অ্যালেক্স জানতে চাইলে লিলিথ বলে যে সে তাকে ওয়াকোল্ডা নামে ডাকে। ডাক্তারটি পুতুলটিকে নিয়ে নিজের মনেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে এবং খেয়াল করে সেটি শুধু ভগ্নদশাতেই নেই, তার ভেতরে কোন যন্ত্রপাতিও নেই, ফাঁপা সেটি এককথায়। ডাক্তারটি এবার লিলিথের দিকে দৃষ্টিপাত করে তাকে তার বয়স জিজ্ঞেস করলে লিলিথ বলে তার বয়স ‘বারো’। কিন্তু বয়সের তুলনায় সে কিছুটা অপরিণত হওয়াতে ডাক্তার অ্যালেক্স নিজের মনেই কিছু একটা বিশ্লেষণ করতে থাকে। এদিকে পরিবারের কর্তা এঞ্জোকে সে বলে, সেও তাদের সাথে ছোট্ট শহরটিতে যাবে কাজের সন্ধানে। বারিলোচ্চেতে পৌঁছানোর প্রারম্ভে ঝড় বৃষ্টির কারণে তাদের একটি গো-শালায় অবস্থান নিতে হয় এবং রাতের বেলায় লিলিথ দেখে ডাক্তারটি তার প্রাণপ্রিয় পুতুলটিকে ঠিক করার কাজে ব্যস্ত...যেন কোন রুগীর চিকিৎসা করছে সে। লিলিথ নিজের অজান্তেই মানুষটিকে নিজের বন্ধু বলে মনে করে। এবং সেখান থেকেই শুরু হয় এক আগন্তুকের উপর গভীর বিশ্বাসের। বারিলোচ্চেতে পৌঁছানোর পর অ্যালেক্স এঞ্জোকে বিদায় দিয়ে নিজের রাস্তায় চলে যায়, কিন্তু লিলিথ নিজের অজান্তেই লোকটিকে খুঁজতে থাকে। এদিকে এঞ্জো এবং ইভা সম্মিলিতভাবে তাদের পারিবারিক পুতুল তৈরির ব্যবসা পুনরায় শুরু করার জন্য নেমে পড়ে। ইভা আর্জেন্টাইন হওয়ার পরেও জার্মান স্কুলে পড়ায় জার্মান ভাষার প্রতি তার কিছুটা দক্ষতা থাকে এবং সে নিজের বড় ছেলে এবং মেয়েকেও সেই একই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। স্কুলে লিলিথকে নিয়ে তার সমবয়সীরা কটু কথা বলতে থাকে, ‘বামন’ বলে খোঁচা দেয় তাকে। কিছুদিন পরে অ্যালেক্স আবার তাদের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকার জন্য চলে আসে। এঞ্জো অপরিচিত এই ব্যাক্তিটিকে ভালো চোখে না দেখার পরেও, তাকে তাদের বাড়িতে আশ্রয় দেয়। অ্যালেক্স বলে সে একজন চিকিৎসক এবং স্থানীয় গরুদের উপর এক ধরণের রিসার্চের দায়িত্ব তার উপর বর্তেছে। এভাবে একদিন লিলিথ তার কর্মস্থলে তাকে অনুসরণ করলে সে লিলিথকে মানুষের রক্তের নমুনা দেখানোর নাম করে- লিলিথের রক্তের নমুনা, এক্স-রে, মাথা থেকে কাঁধের দূরত্ব, এক হাত থেকে অপর হাতের প্রশস্ততা সব কিছু পরিমাপ করে তার সব সময়ের সঙ্গী একটি ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করে রাখে এবং তাকে চিহ্নিত করে দেয় ‘Sonnenmenschen’ নামে...লিলিথের কাছে ব্যাপারটি অদ্ভুত ঠেকলে সে লাইব্রেরীতে গিয়ে শব্দটির মানে খোঁজার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে... সাহায্যে এগিয়ে আসে স্কুলেরই এক ইন্সট্রাক্টর নোরা। সে তাকে এমন একটি বই বের করে দেয়, যা থেকে লিলিথ জানতে পারে এটির মানে ‘Super human’ ধরণের কোন কিছু। এদিকে অ্যালেক্স ঘটনাক্রমে জানতে পারে লিলিথের মা ইভার কাছে যে, লিলিথ ৭ মাসে জন্মগ্রহণ করেছিল বিধায় সে প্রিম্যাচিউর। অ্যালেক্স ইভাকে বলে সে লিলিথকে দেখে যতটুকু বুঝেছে, তার উপর গ্রোথ হরমোনের প্রয়োগ করলে আর দশটা সাধারণ মানুষের মত তাকেও বদলে ফেলা সম্ভব। ইভা এঞ্জোর সাথে কথা বললে সে প্রথমে ব্যাপারটি নাকচ করে দেয় কিন্তু ইভার পীড়াপীড়িতে অবশেষে লিলিথের উপর গ্রোথ হরমোনের টেস্ট করাতে রাজি হয়ে যায়। এর পাশাপাশি অ্যালেক্স, গর্ভবতী ইভার অনাগত সন্তানের সুস্থতার জন্য কিছু ভিটামিন এবং আয়রনের ট্যাবলেটও তাকে এনে দেয়। কি হয় শেষ পর্যন্ত লিলিথের সাথে? কি হয় ইভার অনাগত সন্তানদের? অ্যালেক্সের উদ্দেশ্য কি? অ্যালেক্সরুপী এই আগন্তুককে কি তারা চিনতে পারবে? সে কি শুভাকাঙ্ক্ষী না মৃত্যুদূত?টানটান উত্তেজনা...প্রথম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি স্নায়ুর উপর চাপ ফেলবে। সিনেমার মূল চরিত্রটির গুপ্তদিক শুরুর দিকে কিছুটা বুঝিয়ে দেয়া হবে যখন অ্যালেক্স ছদ্মবেশে থাকা ডাক্তার জোসেফ মেনগেলির ডায়েরীর অংশগুলো দেখানো হবে... মানুষের জীবনের এবং দেহের অংশের বিভিন্ন পর্যায়ের ছবি, যেন কোন ‘Human Engineer’ এর ডিজাইনের খাতা! ডাক্তার জোসেফ মেনগেলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের এক বিভীষিকার নাম... তাকে বলা হত ‘Angel of Death’...কেন?? তার পরিচয়পর্বে সেটা উন্মোচন করব। ইতিহাসের কুখ্যাত এই মানুষটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দক্ষিণ আমেরিকাতে পালিয়ে গিয়েছিল, গা ঢাকা দেয়ার উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেয় সে... কখনও আর্জেন্টিনায়, কখনও প্যারাগুয়েতে আবার কখনও ব্রাজিলে। ছদ্মবেশে একের অধিক নাম গ্রহণ করেছিল এবং আর্জেন্টিনায় থাকাকালীন সময়ের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে সিনেমাটি তৈরি। সিনেমাটিতে এই ভয়ঙ্কর মানুষটির এক অন্যদিক তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমার পরিচালক লুসিয়া পুয়েঞ্জো সিনেমাটিকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন এক কথায় অনন্য সাধারণ। ইতিপূর্বে ডাক্তার জোসেফ মেনগেলিকে নিয়ে আরও কিছু সিনেমা হয়ে গেছে যার মধ্যে গ্রেগরী পেকের ‘The Boys from Brazil (1978)’ উল্লেখযোগ্য। তবে আর্জেন্টাইন এই সিনেমা একটা সেই মাপের সিনেমা...A spellbound Argentinian movie which depicts the most profound psychopath in world history.

The German Doctor 2013 (Original Title: Wakolda)
IMDb rating: 6.8/10
Genre: Drama/ History/ Thriller
Cast: Àlex Brendemühl, Diego Peretti, Guillermo Pfening
Country of Origin: Argentina

কে এই জোসেফ মেনগেলি ????????
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জোসেফ জার্মান SS (Schutzstaffel) অফিসার ছিল এবং অস্কউইটজ কন্সেট্রেশন ক্যাম্পের চিকিৎসক। মেনগেলি ১৬ মার্চ, ১৯১১ সালে কার্ল এবং ওয়ালবার্গা মেনগেলির ঘরে তৃতীয় সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিল। তার বাবার ফার্মিং মেশিনারী তৈরির একটি কোম্পানি ছিল, কার্ল মেশিনারি এন্ড সন্স। আগাগোড়ায় পড়াশুনায় অনেক মেধাবী ছিল সে এবং তার আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে সঙ্গীত, আর্ট এবং স্কি অন্যতম ছিল। হাই স্কুল সম্পন্ন হওয়ার পরে সে ফ্রাঙ্কফুর্টের গ্যেটে ইউনিভার্সিটিতে মেডিসিনের উপর অধ্যয়নের জন্য ১৯৩০ সালে ভর্তি হয়েছিল এবং ইউনিভার্সিটি অফ মিউনিখে দর্শনশাস্ত্রে। মিউনিখ তৎকালীন সময়ে নাৎসিদের প্রাণকেন্দ্র ছিল এবং ১৯৩১ সালে মেনগেলি তাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে। ১৯৩৫ সালে সে ইউনিভার্সিটি অফ মিউনিখ থেকেই নৃতত্ত্বে পিএইচডি সম্পন্ন করেছিলেন এবং ১৯৩৭ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টের ইন্সটিটিউট ফর হেরেডেটারি বায়োলজি অ্যান্ড রেসিয়াল হাইজিনে সে ড. অটমার ফ্রেইহার ভন ভার্সচুইয়েরের সহকারী হিসেবে জেনেটিক রিসার্চ শুরু করেছিলেন বিশেষত যমজ বাচ্চাদের উপরে। ভন ভার্সচুইয়েরের সহকারী হিসেবে তিনি জিনতত্ত্বের সেই বিষয়গুলোকে নিয়েও গবেষণা শুরু করেছিলেন যার জন্য ঠোঁট কাটা, তালু কাটা, বিকৃত মুখ দায়ী। ১৯৩৮ সালে তার থিসিসের জন্য তিনি ডক্টরেট ডিগ্রী পান মেডিসিনে।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মেনগেলি

নাৎসিদের অ্যান্টি সেমিটিজম, রেসিয়াল হাইজিন এবং ইউজিন তত্ত্বের আলোকে তারা তাদের ভবিষ্যৎ জার্মান প্রজন্মকে আরও বেশি সর্বোৎকৃষ্ট করে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। তারা জার্মান জাতিকে মেধায়, ক্ষমতায় সব থেকে আধুনিকতর করতে চেয়েছিল এবং তারা তাদের এসব চিন্তার কারণে জার্মানিকে পরিব্যপ্ত করতে পোল্যান্ড এবং সোভিয়েত দখলে নেমে পড়েছিল শুধু এই অভিপ্রায়ে যে ইহুদী এবং স্লাভদের নিধনের মাধ্যমে তারা সেরা জাতিটি তৈরি করে নিবে। মেনগেলি ১৯৩৭ সালে এই চিন্তার অংশীদার হিসেবে নাৎসি গোষ্ঠীতে নিজের নাম পাকাপাকিভাবে লিখিয়েছিল এবং ১৯৩৮ সালে SS (Schutzstaffel; protection squadron) এর সদস্য হয়। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস পরে, তাকে মেডিক্যালে তত্ত্বাবধানের কাজে পাঠিয়ে দেয়া হয়, যেখানে সে SS- Untersturmführer (Second Lieutenant) পদে অভিষিক্ত হয়েছিল । ১৯৪৩ সালে ভন ভার্সচুইয়েরের আগ্রহে সে অস্কউইটজ কন্সেট্রেশন ক্যাম্পে বদলি নিয়ে চলে যায় তার জেনেটিক রিসার্চের সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষায়। চিফ মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে অস্কউইটজে এবং চিফ ফিজিসিয়ান হিসেবে রোমানি ক্যাম্পে (বার্কেনাউ এর সাব ক্যাম্প) তাকে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৪১ সালের শেষের দিকে বার্কেনাউ থেকে কিছু কিছু বন্দীকে গৃহসেবক হিসেবে নিয়োগ করা হত। তাদের এই সিলেকশন প্রক্রিয়ার সদস্য মেনগেলি ও ছিল। যেসব বন্দী সুস্থ সবল থাকত তাদের বিভিন্ন কাজে কর্মে নিয়োগ করে দেয়া হত, কিছু বন্দীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হত এবং বাকিদের অন্তিম জায়গা হত গ্যাস চেম্বার। যেসব মানুষদের মৃত্যুমুখে পতিত করার জন্য নির্ধারণ করা হত তাদের মধ্যে বেশিরভাগ হত বাচ্চা, ছোট বাচ্চার সাথে দুস্থ মহিলা, গর্ভবতী মহিলা, বয়স্ক মানুষ এবং আরও এরকম ধরণের মানুষ যারা তাদের মেডিক্যাল পরীক্ষাতে সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে পারত না। মেনগেলি তার এই কাজের মধ্যে নিজের গবেষণার জিনিস খুঁজে বের করেছিল, সিলেকশনের এই গ্রুপে তার থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সেটাই। তার মূল লক্ষ্য ছিল, যমজ বাচ্চা খুঁজে বের করা। অন্যান্য ডাক্তারদের কাছে সিলেকশনের এই কাজ দুর্বিষহ লাগলেও, মেনগেলি সেটি অত্যন্ত আগ্রহচিত্তে করত।
যমজ বাচ্চা সিলেকশনের একাংশ

মেনগেলি এবং অন্যান্য SS ডাক্তার এই বন্দীদের চিকিৎসা কখনই করত না, বরং তারা এই দায়িত্ব অর্পণ করে দিয়েছিল অন্যান্য সহকারী ডাক্তারদের উপর। সে শুধু সপ্তাহান্তরে এসে একবার রুগীর অবস্থা দেখত এবং যেসব রুগীর মধ্যে দুই সপ্তাহের অধিক সময়েও সুস্থতার লক্ষণ দেখা যেত না বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে দিত সে। সে বার্কেনাউতে বন্দী ইহুদিদের সায়ানাইড পেস্টিসাইড দিয়ে নিধন করার গ্রুপের সদস্যও ছিল। ১৯৪৩ সালে যখন রোমানি ক্যাম্পে নোমা (মুখে এবং ত্বকে হওয়া একধরণের ব্যাকটেরিয়াল গ্যাংগ্রেনাস অসুখ) দেখা দেয়, মেনগেলি সেটার কারণ এবং প্রতিকার খোঁজার জন্য আবারও এক্সপেরিমেন্ট শুরু করে। সে একজন বন্দী ইহুদী শিশু চিকিৎসক ড. বার্থহোল্ড এপ্সটাইনের একটা তত্ত্ব এই ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিল। মেনগেল নোমাতে আক্রান্ত অনেক বন্দীকে একটি ব্যারাকে আটকিয়ে রেখেছিল যাদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল শিশু এবং তাদের মেরে ফেলে কাটা মাথা এবং অন্যান্য অঙ্গসমূহ SS গ্রাজ অ্যাকাডেমিতে গবেষণা করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেই গবেষণা আজও প্রক্রিয়াধীন... ঘটনা ১৯৪৪ সালে সংগঠিত হওয়ার পরেও!
মেনগেলির এক্সপেরিমেন্ট

মেনগেলি অস্কউইটজ ক্যাম্পটিকে তার নৃতাত্ত্বিক এবং বংশগতবিদ্যার গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল। এখন প্রশ্ন আসবে সেও তো মানুষ ছিল তাহলে, অন্য মানুষের প্রতি অন্য (!!!) ধরণের আগ্রহ তার কিভাবে এসেছিল?? ১৯২৬ সালে মেনগিলের বয়স যখন মাত্র ১৫, তখন সে অষ্টিওমাইলেটিসে আক্রান্ত হয়েছিল এবং তার পর থেকেই তার মধ্যে মানুষের দেহ নিয়ে বিশ্লেষণ করার আগ্রহ প্রবলভাবে জন্মায়। তার এই বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা যাদের উপর করত সে, তারা সুস্থ থাকবে নাকি মারা যাবে তা নিয়ে নুন্যতম মাথাব্যথা ছিল না তার। তার আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে অন্যতম ছিল আইডেন্টিক্যাল টুইন, হেটারোক্রোমিয়া ইরিডিয়ামে আক্রান্ত ব্যাক্তি (যাদের দুই চোখের রঙ দুই রকমের হয়), বামন এবং যারা শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ। মেনগিলের টুইন রিসার্চ শুধু এই তত্ত্ব উপস্থাপনের জন্য করা হয়েছিল যে, পরিবেশের উপর বংশগতির এই ধারা তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব বহন করবে এবং এর মাধ্যমে নাৎসিদের আর্য গোত্রের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠত্ব লাভও সম্ভব। পরবর্তীতে এই গবেষণার মাধ্যমে জার্মানদের মধ্যে যমজ সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়াটিকেও ত্বরান্বিত করার রীতি চলতে থাকে যাতে তাদের গোত্রের মানুষ নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি অনুপাতে বাড়ে এবং সেরা গোত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মেনগেলির এই গবেষণার কাজের জন্য শুধুই যে কারাগার এবং গ্যাস চেম্বারকে কাজে লাগিয়েছিলেন তা নয়, সে রোমানি বাচ্চাদের উপর গবেষণার জন্য একটি কিন্ডারগার্টেনও তৈরি করিয়েছিলেন যেখানে বন্দীশিবিরের ছয় বছরের নিচের বাচ্চাগুলোকে নিয়ে আসা হত। ভালো খাবার এমনকি থাকার ব্যবস্থাও ভালোভাবে করা হয়েছিল তাদের...মানুষরূপী গিনিপিগ ছিল তারা মেনগেলির! ক্যাম্পের অন্যান্য অংশের তুলনায় তারা অনেক বেশি ভালো থাকত। তারা মেনগেলিকে ডাকত ‘আঙ্কেল মেনগেলি’ বলে এবং তাদের সে চকলেট দিয়ে নিজের অনুগ্রাহী বানিয়ে ফেলত সহজেই... তাদের নিস্পাপ চিন্তাতেও কখনও এসেছিল না, তাদের সাথে তাদের এই প্রিয় মানুষটি কি করতে চলেছিল! এই বাচ্চাগুলোকে পরীক্ষণের কাজে কখনও সে মরণঘাতী ইনজেকশন দিয়ে, কখনও গুলি করে, কখনও ক্রমাগত প্রহার করতে করতে মৃত্যুমুখে পতিত করত এবং সবকিছুই তার গবেষণার অংশস্বরূপ। মেনগেলি যমজ বাচ্চাদের বিশেষত আইডেন্টিক্যাল টুইনদের প্রতি অতিমাত্রায় অবসেশড ছিল। সে তাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পছন্দ করত এবং অনেককে তার এই পাশবিকতার কারণে মৃত্যুমুখে পতিতও হতে হয়েছিল। একবার মেনগিলের সহকারী এক রাতে ১৪ জোড়া জিপসি যমজ বাচ্চা ধরে এনেছিল। মেনগেলি তাদের সবাইকে তার ব্যবচ্ছেদ করার টেবিলে শুইয়ে দিয়ে সিরিঞ্জের মাধ্যমে তাদের হৃদযন্ত্রে ক্লোরোফর্ম চালনা করে তাদের মৃত্যুর পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাদের দেহের বিভিন্ন অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করে তার পরীক্ষার কার্য সম্পাদন করেছিল! যুদ্ধের চল্লিশ বছর পরে, তার পৈশাচিকতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া হাতে গোনা কিছু যমজ বাচ্চা বেঁচে ছিল। যাদের মধ্যে একজন নিজের স্মৃতিচারণ করেছিল এভাবে-
“ড. মেনগেলি আমার যমজ ভাই টিবির প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাত। আমি জানতাম না ঠিক কেন- হয়ত এই কারণে, যে সে আমাদের দুইজনের মধ্যে বড় ছিল। মেনগেলি টিবির উপর অনেকবার অস্ত্রোপচার করেছিল। একটা অস্ত্রোপচার সে করেছিল টিবির মেরুদণ্ডে যার ফলে সে আর কখনও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারত না, অথর্ব হয়ে গিয়েছিল। সে হাঁটতে পারত না আর কখনও। এরপর তারা টিবির যৌনাঙ্গ পরীক্ষার জন্য অস্ত্রোপচার করে কেটে ফেলেছিল। চতুর্থ অস্ত্রোপচারের পরে, আমি আর কখনই টিবিকে দেখিনি। আমি আপনাদের বলতে পারব না কেমন বোধ হয়েছিল আমার। সবকিছু শব্দে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়ে উঠে না। তারা প্রথমে আমার বাবা, মা, আমার বড় দুই ভাই, এবং সবশেষে আমার যমজ ভাইটিকে চিরদিনের মত আমার কাছ থেকে বিছিন্ন করে দেয়-”
ক্যাম্পের সেই দুর্ভাগ্যবান শিশুগুলো

যমজ বাচ্চাদের সে প্রত্যেক সপ্তাহে পরীক্ষার কাজে ব্যবহার করত, সে না পারলেও তার সহকারীরা এসে করত... পরীক্ষাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তাদের হাত কেটে ফেলা, দুইজনের একজনের মধ্যে টাইফাসের জীবাণু প্রবেশ করিয়ে দেয়া এবং একজনের রক্ত অন্যজনের দেহে প্রবেশ করানো কোন কারণ ছাড়ায়—এগুলো সবই তার গবেষণার অংশ হিসেবে! অনেক বাচ্চা তাদের উপর চলতে থাকা এই পাশবিক প্রক্রিয়ার সময়েই ক্যাম্পে মারা যেত। আর যারা বেঁচে থাকত এগুলো কাজ শেষ হয়ে গেলে মেনগেলি বাচ্চাগুলোকে নির্দ্বিধায় মেরে ফেলত এবং তাদের দেহ ব্যবচ্ছেদ করত। যদি কোন যমজ বাচ্চার একজন রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যেত, সে আরেকজনকেও মেরে ফেলত, তাদের সমসাময়িক ময়ানাতদন্তের রিপোর্টের জন্য। ভেরা অ্যালেক্সান্ডার নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী তার একটি পাশবিক ঘটনা ব্যাখ্যা করেছিল এভাবে, যে সে একটি কঞ্জোয়েনড টুইন তৈরির আশায় দুইটি রোমানি আইডেন্টিক্যাল টুইনকে সেলাই করে দিয়েছিল একে অপরের সাথে। বাচ্চা দুইটি অবশেষে গ্যাংগ্রিন হয়ে মারা গিয়েছিল।

যমজ বাচ্চা ছাড়াও সে ভিন্ন রঙের চোখ বিশিষ্ট মানুষের উপর নিজের এক্সপেরিমেন্ট করত এবং তাদের চোখে একধরণের কেমিক্যাল পুশ করত। ভিন্ন রঙা দুই চোখ বিশিষ্ট মানুষকে এভাবেই মারত সে এবং মেরে ফেলার পর তাদের চোখ নমুনা হিসেবে বার্লিনে পাঠিয়ে দিত। এগুলো বাদেও বামন এবং বিকলাঙ্গ মানুষদের উচ্চতা মেপে, রক্ত নিয়ে, দাঁত তুলে, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করে তাদের এক্স-রে করত। এরপর পর্যবেক্ষণ চলত দুই সপ্তাহব্যাপী, পরে সেই সব মানুষকে কোন কারণ ছাড়াই সে গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে দিত মৃত্যুর প্রয়োজনে এবং তাদের কঙ্কাল এরপরের ধাপে সে পাঠাত বার্লিনে আবারও সেই গবেষণার অংশ হিসেবে ! গ্যাস চেম্বারে পাঠানোর পূর্ব মুহূর্তে সে গর্ভবতী মহিলাদের উপরও নিজের এক্সপেরিমেন্ট চালাত। মেনগিলের একমাত্র ছেলে রোলফের ভাষ্যমতে, তার বাবার যুদ্ধের সময়কার কার্যক্রমের জন্য মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কোন ধরণের অনুতাপ ছিল না। এবং যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে গা ঢাকা দিতে সে পালিয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকাতে। বিভিন্ন ছদ্মবেশে থাকত সে। ব্রাজিলে ১৯৭৯ সালে পানিতে ডুবে মারা যায় সে অবশেষে এবং তাকে সেখানেই একটি ভিন্ন নামে দাফন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে তার দেহের অবশিষ্টাংশ বের করে ফরেনসিকের শরণাপন্ন হলে তার মৃত্যুর যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছিল।

নেটে এই ভিত্তিক যে ছবিগুলো রয়েছে, সেগুলো আর শেয়ার করলাম না। Too much violent. ওর এক্সপেরিমেন্টের নমুনা ভয়াবহ।
আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে---
https://www.youtube.com/watch?v=syhXomxP5uI
https://www.youtube.com/watch?v=wyzw3xc0Nww
https://www.youtube.com/watch?v=9b4HeA4EVV8
তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া
**** এই লেখা সম্পূর্ণ রূপে আমার… পূর্বের কোন লেখার সাথে মিলে গেলে তা একান্তই co-incidence….no resemblance. আশা করি পোস্টটি ভালো লাগবে !!!!
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


