somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সত্যকে স্বীকার করার সাহস কি আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে?

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সত্যকে স্বীকার করার সাহস কি আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে?

আমাদের দেশে এখন অদ্ভুত এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। আপনি কোনো দলের সমালোচনা করলে- আপনি সেই দলের শত্রু।
আপনি কোনো দলের একটি ভালো কাজের কথা বললে- আপনি সেই দলের দালাল! মাঝখানে “সত্য” নামের জিনিসটার যেন কোনো জায়গাই নেই।

সম্প্রতি সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের একটি পোস্ট চোখে পড়ল। সেখানে তিনি তাঁর একটি রিপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে লিখেছেন- সূত্র থেকে তথ্য পাওয়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্ক্রিপ্ট, এরপর ভয়েস, এডিটিং এবং সব মিলিয়ে প্রায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার কথা বলেছেন। এখানে তাঁর রিপোর্ট সত্য না মিথ্যা- সেটা এই পোস্ট দেখে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সাংবাদিকতার জন্য একটি প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ:

তথ্য পাওয়া আর তথ্য যাচাই করা- এই দুটো কি একই জিনিস? চার ঘণ্টায় স্ক্রিপ্ট লেখা সম্ভব। দশ ঘণ্টায় এডিটিংও সম্ভব। ৪৮ ঘণ্টায় একটি রিপোর্ট প্রকাশ করাও সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কত ঘণ্টা ব্যয় হয়েছে তথ্য যাচাইয়ে? কতগুলো স্বাধীন সূত্রে মিলিয়ে দেখা হয়েছে? অভিযোগের বিপরীত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি? প্রাথমিক নথি পরীক্ষা করা হয়েছে কি? সূত্রের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের কোনো অসঙ্গতি ছিল কি না, সেটা খতিয়ে দেখা হয়েছে কি? কারণ দ্রুততম রিপোর্ট আর সবচেয়ে নির্ভুল রিপোর্ট- এক জিনিস নয়।

এবার আসি আমাদের রাজনৈতিক মানসিকতায়। আমি আওয়ামী লীগের কোনো একটি কাজের পক্ষে কথা বললে, অনেকে ধরে নেন- আমি আওয়ামী লীগের লোক। কিন্তু ব্যাপারটা এত সরল নয়। পদ্মা সেতু হয়েছে- এটা একটি বাস্তবতা। ঢাকা মেট্রোরেল চালু হয়েছে-এটাও বাস্তবতা। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ চালু হয়েছে- এটাও বাস্তবতা। বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান তথ্যেও পদ্মা সেতুকে সম্পন্ন, মেট্রোরেলকে অপারেশনাল এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েকে চলমান প্রকল্প হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখন এসব প্রকল্পের ব্যয় কত ছিল, অর্থনৈতিক সুফল কতটা, কোথাও অনিয়ম হয়েছে কি না, জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে- এসব নিয়ে কঠোর সমালোচনা হতেই পারে।

সমালোচনা করুন। তথ্য দিয়ে করুন। হিসাব দিয়ে করুন। প্রমাণ দিয়ে করুন। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে যদি কেউ বলেন- “এগুলো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আওয়ামী লীগের কোনো কৃতিত্ব নেই” তাহলে সেটি আর বাস্তবতার বিশ্লেষণ থাকে না। কারণ কোনো সরকারের কাজের মূল্যায়ন করতে হলে ভালো-মন্দ দুটোই দেখতে হয়।

তাহলে প্রশ্নটা আওয়ামী লীগকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা নিজেদের চরিত্র নিয়ে। আমরা কি এমন জায়গায় চলে যাচ্ছি, যেখানে নিজের পছন্দের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে না মিললে- তাদের কোনো সত্যও আমরা স্বীকার করব না? আমার পছন্দের দল ভুল করলে আমি কি সেটা ভুল বলব না? আমার অপছন্দের দল ভালো কিছু করলে আমি কি সেটা ভালো বলব না?

এই দুই প্রশ্নের উত্তরই আসলে একজন মানুষের রাজনৈতিক সততার পরীক্ষা। কারণ নিজের দলের ভুল স্বীকার করা কঠিন। আর প্রতিপক্ষের ভালো কাজ স্বীকার করা তার চেয়েও কঠিন। কিন্তু সত্যের কোনো দল নেই।

পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের দলীয় সম্পত্তি নয়। মেট্রোরেল আওয়ামী লীগের পারিবারিক সম্পদ নয়। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এগুলো রাষ্ট্রীয় প্রকল্প- জনগণের অর্থ, শ্রম, প্রকৌশল, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সমন্বয়ে তৈরি অবকাঠামো। তাই সরকারকে কৃতিত্ব দিলে সরকারকে অন্ধভাবে সমর্থন করা হয় না। আবার প্রকল্পের সমালোচনা করলেও প্রকল্পটি বাস্তবে আছে- এই সত্যটাকে অস্বীকার করা যায় না। আর এখানেই সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে।

রাজনীতি আপনাকে পক্ষ নিতে বলতে পারে। কিন্তু সত্য আপনাকে পক্ষপাতের বাইরে দাঁড়াতে বাধ্য করে। আপনি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করুন, বিএনপিকে সমর্থন করুন, জামায়াতকে সমর্থন করুন কিংবা কোনো দলকেই সমর্থন না করুন- আপনার রাজনৈতিক অধিকার আছে। আপনার লেখা কোন দলের পক্ষে গেলে আপনি দালার হয়ে যান না। কিংবা আপনার লেখায় কোন রাজনৈতিক দলের নাম না থাকা সত্যেও আপনাকে কেউ কেউ বলছে- অমুক দল আর ফিরে আসবে না। এই স্যামুতেই আছে তারা ঘাপটি মেরে। আপনি সহজেই তাদের আলাদা করতে পারবেন।

কিন্তু সত্যকে দলীয় পরিচয় দিয়ে মাপার অধিকার বাস্তবতাকে বদলে দেয় না। আর তাই আজকের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন- আমরা কি সত্যের পক্ষে, নাকি শুধু নিজের পক্ষের সত্যের পক্ষে? কারণ যে মানুষ নিজের পক্ষের মিথ্যাকে সত্য বানাতে চায়, সে শুধু অন্যকে ঠকায় না- শেষ পর্যন্ত নিজেকেও ঠকায়। রাজনীতি বদলাবে, সরকার বদলাবে, দল বদলাবে। কিন্তু আমরা যদি সত্যকে স্বীকার করার সাহসটাই হারিয়ে ফেলি- তাহলে বদলাবে শুধু ক্ষমতার চেয়ার, বদলাবে না আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যা এখন হচ্ছে। সত্যকে ভালোবাসতে হলে আগে নিজের পক্ষপাতকে একটু হলেও অপছন্দ করতে শিখতে হবে। অথবা নিজেকে ঠকাবেন। পছন্দ আপনার।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৯
৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাস্ততম শহরে এক ছুটির দিন

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১২

নিউ ইয়র্ক দুনিয়ার অন্যতম ব্যাস্ততম শহর। বলা হয় The City that never sleeps! এরই মাঝে এবার মিলে গেলো এক ছুটির দিনে পিকনিকে যাওয়ার সুযোগ। শহরের সীমানা ছেড়ে প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৯

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১৭



সিরাজ ভাই বললেন, টেংরা মাছের ডিম আপনার কাছে কেমন লাগে?
আমি বললাম, ভালোই লাগে। শুধু রুই মাছের ডিম আমার ভালো লাগে না। সিরাজ ভাই বললেন, রুই মাছের ডিম সঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রভাষা নিয়ে জিন্নাহর বক্তব্য। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


জিন্নাহর সেই ভাষণ
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ভাষা আন্দোলন নিয়ে জিন্নাহর একটি বক্তব্য যাতে দাবী করা হচ্ছে তিনি নাকি আমাদের ওপর উর্দু যেভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে এতকাল “প্রচার”... ...বাকিটুকু পড়ুন

গালিব সাহেব, মিথ্যারও তো একটু সামাজিক মর্যাদা আছে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৩



মির্জা গালিব বলেছেন -
“পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলা হয় ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে, যেটা আদালতে। আর সবচেয়ে বেশি সত্য বলা হয় মদ ছুঁয়ে, যেটা পানশালা।”

গালিব সাহেব, আপনার কথায় যুক্তি আছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাউঞ্জ এন্ড ফুড রিভিউ; দ্যা সেন্স

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪২


নিয়মিত-অনিয়মিত গত এক যুগ ধরে ভ্রমণ করছি এবং প্রায়োরিটি পাস দিয়ে বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্টে লাউঞ্জ ব্যবহার করছি প্রায় ৪ বছর ধরে। দীর্ঘ ফ্লাইট, লং ট্রানজিটের মধ্যে এয়ারপোর্টে ফ্রিতে দৃষ্টিনন্দন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×