অনেক দিন ধরেই ইচ্ছা ছিলো ব্লগ লিখব। কারণ আমি জানতে চাই, শিখতে চাই যুক্তির সীমারেখা, ভালো খারাপের প্যারামিটার । নানা ব্যস্ততায় লিখার সময় পাইনি এই ১৮ বছরের জীবনে। এইচএসসি এর পর ভর্তি পরীক্ষা নামক প্রহশনের পর অবশেষে একটু সময় পেলাম (!!!), নিজেকে দেয়ার জন্য তাই লিখতে বসলাম এই সন্ধ্যার অসময়ে!!
ভেবেছিলাম ভর্তি পরীক্ষার পর হয়তো অখণ্ড অবসর পাবো। কিন্তু তা আর কোথায় পেলামবন্ধুদের সাথে ঘুরছি, একা একা ঘুরছি, আবার হেঁটে হেঁটে ফিরে আসছি। গতদিনগুলোর কথা ভাবছি। কতকিছু করছি। ধারাবাহিকভাবেই মাথায় কিছু না কিছু থাকছে। মূলত ব্লগে আসা হলো কিছু জানতে চাওয়ার আশায়, নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হবার আশায়। জানি না কতদিন থাকবে এই ইচ্ছা। আমার কোনো ইচ্ছাই তো বেশিদিনের আয়ু পায় না কেন জানি। গুছানো ভাবে কিছুই লিখতে পারছি না। কে পড়বে কে জানে! এই ব্লগে কত জ্ঞানী মানুষরা লিখেন, তাদের তুলনায় আমি কিছুই জানি না। নিতান্তই সাধারণ এক ছেলে, সদ্য টিনএজ পার করা এই মন নিয়ে আমার জীবন।
এখন মাথায় যা আসছে তা হলো বিগত দিনগুলোর কথা। কত ভয়ানক দিন কাটলো। কোচিং এ যাচ্ছি, বাসায় আসছি, ডেইলি এক্সাম, উইক্লি এক্সাম, মান্থলি এক্সাম কত কিছু। এত চেষ্টার পর ও কেউ কেউ ফল পাচ্ছে না। আমি নিজেও পাই নি। এইচএসসি এর পর যখন বাবা জানতে চাইলো কি হতে চাই আমি বলেছিলাম "অর্থনীতিবিদ বা আইনজীবী"। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার আমার বাবা যেন আকাশ থেকে পড়ল। যেন এই জগতে সবাই কে ডাক্তারই হতে হবে বা ইঞ্জিনিয়ারই হতে হবে (এবং অবশ্যই বুয়েটে পড়তে হবে) ।
একসময় এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। বাবা-মা বাসার সবার প্রেশারে ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং এই ভর্তি হলাম। দুরদান্ত ছাত্র না হলেও মোটামুটি ভালো ছাত্রই ছিলাম। দেশসেরা কলেজে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। কোচিং এর দিন গুলো পার করতে খুব একটা কষ্ট হলো না। জানতাম দূরদান্ত কিছু ভাইয়ার সান্নিধ্য পাবো। পেলাম ও। তাদের চিন্তা ভাবনা, এটিকেট ইত্যাদি সব কিছু দ্বারাই প্রভাবিত হলাম। এই টিনএজে তো প্রভাবিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। লাইফলেস কিছু দিন পার করলাম। মনে হচ্ছিল যে কেবল বেঁচে থাকার আশাতেই সবকিছু করছি। যেকোনো কিছুতে প্রাণ খোঁজার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এসময় টা সবার প্রাণশক্তি নিয়ে নেয়। যাস্ট করার জন্যই কাজগুলো করতাম। ভাবতে এখন অবাক লাগে এই দিনগুলো কিভাবে সারভাইব করলাম।
ভর্তি পরীক্ষা এলো। প্রেক্টিস এর জন্য বাবা মা আহসানউল্লাহ তে পরীক্ষা দেয়ালো। ভালোই রেঙ্ক আসলো। তার কিছু দিন পরই ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা। জানি না কি হলো। আমি দেখলাম কিভাবে মানুষ ভেঙ্গে পড়ে মুহূর্তের ব্যবধানে। নিজেকে দিয়েই দেখলাম। আগে যখন স্কুল-কলেজের ছাত্র ছিলাম তখন যখন কেউ বলত ভর্তি পরীক্ষা খারাপ হয়েছে কারণ নার্ভাস হয়ে গেছি, তখন ভাবতাম সে অজুহাত দিচ্ছে। কিন্তু আল্লাহ আমাকে শিক্ষা দিলেন। নিজেকে দিয়েই শিক্ষা দেয়ালেন। সিট পড়েছিলো আইবিএ বিল্ডিং এ। আমি দেখলাম হুট করে কিভাবে আমার মাথা খালি হয়ে গেলো। আমি বিশ মিনিট যাবত কিছু চিন্তাও করতে পারছিলাম না। কোনোরকমে পাশ করলাম। হয়তো আমার আসলে প্রিপারেশনেই ঘাটতি ছিলো, হু নো'জ।
সেই এক পরীক্ষা দেবার পর যে কনফিডেন্স কমে গেলো তা আর ফিরে পাই নি । এক এক করে পরীক্ষা দিয়ে গেছি জাহাঙ্গীর নগরেই নানারকম ইউনিটে। সেম কেইস। মাথা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষার তখন ৪ দিন বাকি। হঠাত মনে হলো এই পরীক্ষা টা দিই । আল্লাহ হয়তো মহাকাব্যই লিখে রেখেছিলেন কে জানে। পরীক্ষা দিলাম। নিজেকে ফিরে পেলাম। পত্রিকা পড়ার অভ্যাশ আমার অনেকদিনের। ইংরেজি, বাংলা উচ্চ মাধ্যমিকেই মোটামুটি ভালো ভাবে পড়া ছিলো। তো চান্স পেয়ে গেলাম। ৩২৭ তম। এরপর যখন একটু স্বস্থি পেলাম কি যে শান্তি লাগছিলো বলার বাইরে।
এরপর বাবা মাকে বললাম আইনেই পড়ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলাদেশের জণ্মস্থানে। তারা রাজি না। এদিকে চাচা,মামা,খালা,ফুপু জীবনে না দেখা আত্মীয় সবাই ফোন দিয়ে উতপাত করছিলো। নানা রকম কটুক্তি শুনে শুনে মনে হত কি দরকার আর বেঁচে থেকে যখন জানিই যে কাউকে প্লিজ করতে পারবো না কখনো। আমি দেখেছি ভর্তি পরীক্ষাগুলো কিভাবে মানুষ চেনায়। আমি দেখেছি যখন কোথাও চান্স হয় না তখন সেই নিরঘুম রাতগুলো কেমন স্যাঁতস্যাতে আর বিষাক্ত মনে হয়। তখন আর বন্ধু-বান্ধব, প্রেমিকাদের সাথে সাথে বাবা মাও তাদের হাত তোমার কাঁধ থেকে উঠিয়ে নেয়। জগত টা যে কিরকম লাগে তা যে চান্স পায়নি সেই জানে।
তারপর ও একে একে পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়েছে কুয়েটে,আইইউটি, বুয়েটে। কুয়েট, আইইউটিতে চান্স পেলাম। আইইউটি তে মোটামুটি সব সাব্জেক্টই পাবো হয়তো। বুয়েট পরীক্ষার একদিন আগে ছিলো আইইউটির পরীক্ষা। ক্যাম্পাস দূরদান্ত। কিন্তু তাও আমার মন যে বাংলাদেশের জণ্মস্থানেই পড়ে থাকে। আমার খালি মনে হতো কবে ছুটি হবে। মনে হতো এক ঘণ্টা অখন্ড অবসরের জন্য সবকিছু দিয়ে দিতেই রাজি আমি। যাই হোক বুয়েট পরীক্ষা হলো ২২ তারিখ। ঐদিনই মুক্তি পেলাম। চান্স পাবো কিনা কে জানে। এ পর্যন্ত যা করলাম তা হলো বাবা মা কে রাজি করাতে পারছি আইন পড়তে দেয়ার জন্য। বুয়েটে চান্স পেলেও আইন নিয়েই পড়ব।
এই এত গুলো ভয়ানক দিনের পর আমার মনে হয় আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম। এখানে কলমের একটা স্লিপ অব পেনের জন্যই সদ্য টিনএজ পার হওয়া কোনো ছেলে মেয়ে কে চরম মূল্য দিতে হয়। কেউ দেখে না পরীক্ষার সময় সে নার্ভাস হয়ে গেছিলো কিনা, সে শারীরিক ভাবে ফিট ছিলো কিনা। আল্লাহ আমাকে সবকিছুই দেখালেন। আমি কৃতজ্ঞ। সামনে হয়তো আরও অনেক কিছুই দেখতে হবে। ঐদিন এক প্রিয় মানুষ বলছিলো , "জীবনে এই সময় টার অনেক প্রয়োজন। তোমাকে খোঁটা দেয়ার, তোমার কনফিডেন্স ভেঙ্গে দেয়ার মানুষের কোনো অভাব হবে না এই সময়ে। অভাব হবে একজন উতসাহদাতার। অভাব হবে কাঁধে একটা হাতের । " আমি জানি যদি কোনো একদিন সাক্সেসফুল কোনো মানুষ হয়ে যাই তাহলে হয়তো ঐ কনফিডেন্স ভেঙ্গে দেওয়া মানুষগুলোয় বলবে, "আমি জানতাম এই ছেলে একদিন অনেক বড় হবে"
আপাতত ব্লগে লিখব হয়তো। শিখতে চাই বড়-ছোট সব ভাইয়া আপুদের কাছ থেকে। জানতে চাই সবকিছু। ভালো খারাপ। ভালো খারাপের সীমারেখা। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


