somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিঃসংগ নীলিমা //

০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ২:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দৃশ্য-১
শহরের বেশ নামকরা ঔষধ কোম্পানী ,কম করে হলেও ৭০-৮০ জন লোক কাজ করছে এক সাথে।নারী কর্মীর সংখ্যা নেহাতি কম, নীলিমাকে নিয়ে মাত্র চারজন।মালিক আবার পর হেজগার মানুষ,দুই বেলাই জামাতে নামাজ পড়েন।ফ্রন্ট ডেস্কে একটা মেয়ে না থাকলেতো ঠিক মানায় না কর্পোরেট অফিসগুলোতে।আর একটা মেয়ে আছে প্রডাকশনে।নীলিমা আর ফারহানা এই দুইজনি এডমিনে।ফারহানার অবশ্য এখানে পাঁচ বছর,নীলিমা জয়েন করেছে মাত্র ছয় মাস।কিন্তু এই ছয় মাস যেন ছয় বছরে পরিনত হয়েছে এই কয় দিনেই।একে্তো ফারহানা কোন কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে না,তার উপর বসের যখন তখন হাঁক ডাক।ওকারনে তার ডেস্কে ইন্টারকম বেজে উঠে-মিস নীলিমা কি ব্যস্ত আছেন?
-না স্যার।
-তাহলে একটু আমার রুমে আসুন।
রিসিভার রেখে নীলিমা খুব বিব্রত হয়,কারন ইতিমধ্যে তার দিকেই ফ্লরের সব কলিগদের চোখ।এটা নতুন না,প্রায় প্রতি দিনি বস তাকে নিজের রুমে ডেকে পাঠায়।তারপর কোন কারন ছাড়াই সামনে বসিয়ে রাখে।এমনিতেই জিঞ্জেস করে-আপনার কোন অসুবিধা হচ্ছে নাতো?
-না,আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না।আর হলে আমি ম্যানেজার স্যারকে জানাবো।
-না না,আপনি সরাসরি আমার রুমে চলে আসবেন।আমি মালিক বলে ভাব্বেন না আমি কর্মচারীদের ভাল মন্দ দেখি না।আপনার যদি এক্সট্রা ফেসিলিটি লাগে তাও আমাকে বলবেন।
এভাবেই চলছে প্রতিদিন।আজো নীলিমা মাথা নীচু করে বসের সামনে বসে আছে,লোকটার বয়স কম করে হলেও ৬৫ হবে,তিন মেয়ে,শুধু ছোটটার বিয়ে হয় নি।কিন্তু কেমন কুকুরের মতো চাহনী দিয়ে সে তাকিয়ে আছে নীলিমার শরীরের দিকে,মনে হচ্ছে এক্ষনী ব্যাটার মাথার উপর বমি করে দিতে,কিন্তু তা সম্ভব না।চাক রী এতো সহজ জিনিষ না।
-শুনলাম,আপনার মাথা ব্যাথা।গতকাল ছুটি নিয়েছিলেন?
-তেমন কিছু না স্যার,একটু মাইগ্রেনে পেইন ছিলো,ঠিক হয়ে গেছে।
-না না,এসব ব্যাপারে একদম অবহেলা করবেন না।আমি সিঙ্গাপুরে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।আপনি কবে যেতে পারবেন বলেন।
নীলিমা পুরো আকাশ থেকে পড়লো-মাথা ব্যাথা ,তাই যাবো সিঙ্গাপুরে?আমার লাগবেনা স্যার।
-সিঙ্গাপুর কিন্তু চমৎকার দেশ ,গেলে ভালোই লাগবে।
লোকটার সামনে থেকে উঠে পড়া দরকার,কি করা যায় ভাবছে নীলিমা।হঠাত যেন কি মনে হলো,চট করে বলে ফেললো-ওহ স্যার,আমিতো ম্যানেজার স্যারকে একটা ফাইল দিতে ভুলেই গেছি।
বলেই সে উঠে যেতে উদ্যত হলো,বৃদ্ধ বস ততোক্ষনে ডান হাত বাড়িয়ে দিয়েছে হ্যান্ডসেক করবে বলে।হতভম্ব হয়ে নীলিমা কিছুক্ষন সময় নিলো,তারপর নিজের হাত বাড়ালো।রুক্ষ সে হাত যেন সজোরে চেপে ধরলো নরম তালু।মনে হলো কুত্তার বাচ্চার গালে স্যান্ডেল খুলে দুইটা বাড়ি লাগাতে-কিন্তু ইচ্ছেটা ইচ্ছের জায়গায় রেখেই নীলিমা ফিরে এলো নিজ ডেস্কে।
ততোক্ষনে পুরো ফ্লোর ফিসফাস হাসিতে ভরে গেছে-এতো অল্প সময়ে ম্যাডাম প্রমোশনটা কনফার্ম করে এলেন।
নীলিমা জানে বসদের সাথে সিঙ্গাপুর গেলে প্রমোশন হয়,স্যালারি বাড়ে,গুলশানে বাড়ি হয়-এইগুলো প্রমানিত সত্য।কিন্তু এই সত্য যে সব জায়গায় খাটে না এটাও প্রমানিত সত্য।
নাহ,অনেক হয়েছে আর না।অনলাইন থেকে একটা রিজাইন লেটার ড্রাফট করে নিজের নামটা নীচে বসিয়ে দিয়ে বিশাল অঙ্কের প্রলোভন থেকে নীরবে বিদায় নিলো নীলিমা।
দৃশ্য-২
দুমাস হতে চললো ,তবু মেয়ের পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছে না নীলিমা।পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়ে গেছে আরো এক মাস আগেই।খুটিয়ে খুটিয়ে পুলিশ জানতে চেয়েছে –মেয়ের বাবা কই?
-আমি জানিনা,আমার সাথে কোন যোগাযোগ নেই।
-পাসপোর্ট পেতে হলে বাবার পার্মিশন লাগবে।
-আরে,যে লোকটা দুই বছর ধরে তার সন্তানের খবর নিচ্ছে না তার কি পারমিশন লাগবে?
-আপনি বললেইতো হবে না,বাবা হিসেবে তারতো একটা অধিকার আছে।
-মেয়ে হিসেবে অধিকার নাই,বাবা হিসেবে আছে।
এভাবে কিছুক্ষন তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে পুলিশ ভাই কি যেন লিখলো লাল অক্ষরে।কাগজটা হাতে দিয়ে বললো-কাল আপনি এস বি অফিসে দেখা করবেন।
-আমার কাছে কিন্তু বেবির কাস্টডি পেপার আছে,নিলিমা বলে।
-ওটা নিয়েই যান।
মালীবাগ ঘুরে ঘুরে এস বি অফিস বের করে নীলিমা,একজন বড় অফিসারকে কাস্টডি পেপার দিয়ে বলে-আমার স্বামীর সাথে দুই বছর আগেই সেপারেশন হয়ে গেছে।এখন ও কই থাকে আমি জানিনা।তাহলে পার্মিশন কিভাবে নেবো বলুন।
লোকটা খুব মনোযোগ দিয়ে পুরো কথা শুনলো,একটা সাদা কাগজ বারিয়ে দিয়ে বললো-এখানে একটা দরখাস্থ লিখুন,মেয়ের বাবা কোন যোগাযোগ না করলেতো আপনার কিছুই করার নেই।আপনি দরখাস্থ নিয়ে সোজা ডিরেক্টর সাহেবের সাথে দেখা করেন।
পাসপোর্ট অফি্সের ডিরেক্টর,সোজা কথা না।চাইলেই যে তার সাথে দেখা করা যাবে তাও না।তবু মোটামোটি তিন ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তার দেখা মিললো।কাস্টডি পেপার হাতে নিয়ে তিনি পড়া মুখস্থ করার মতো পড়লেন,তারপর বললেন-নাহ,আপনার মেয়ের পাসপোর্ট তো হবে না।
-কেন হবে না,এটা তার অধিকার?
-পাসপোর্ট পেলেই আপনি বিদেশে উড়ে যাবেন।
-কি আশ্চর্য ,আমি বিদেশ যাবো নাকি দেশে থাকবো তাতে কার কি।
-যদি মেয়ের বাবা মামলা করে তাহলে আমরা ফেসে যাবো।
-আপনি শেষ লাইন মন দিয়ে পড়ুন,তারা অলরেডী কেস করেছে এবং কোর্ট তা নামঞ্জুর করেছে।
এবার যেন অনেকটা রেগেই গেলেন গোল গাল চেহারার ডিরেক্টর সাহেব।
-আপনি শুধু শুধুই তর্ক করছে,যান উপর থেকে যদি অর্ডার আনতে পারেন তাহলে পাসপোর্ট পাবেন,নইলে না।
উপর বলতে কতোটা উপর তা নীলিমার জানা নেই।একজন পিয়ন তাকে পেছনে নতুন বির্লিং দেখিয়ে দিলো।
বাবার মৃত্যূর পর উপর মহলের সাথে তার তেমন যোগাযোগ নেই।তাই কোথায় যেতে হবে,কার সাথে কথা বললে কাজ হবে জানে না নীলিমা।মেয়ের জন্ম- সনদ,ব্যাঙ্কের রিসিট,কাস্টডি পেপার নিয়ে ঘুরতে থাকে ছ’তলা সাত তলা।জনে জনে হিস্ট্রি বলতে হয়,এরি মধ্যে একজন পরামর্শ দিলো-আপনি আবার পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্যে দরখাস্থ করেন।
আর একজন বুদ্ধিমান পুরুষ ঞ্জান দিলো-আরে,ব্যাটা কোন খবর নেয় না।আপনে যে কারো সাইন বসায় দিলেইতো হয়।
এইসব অদ্ভূত অদ্ভূত বুদ্ধিদাতাদের কথা শুনে বোঝাই যাচ্ছে,এখানে হয়না এমন কাজ নেই।কিন্তু অসততার কোন চিনহ মেয়ের শরীরে পড়তে দেওয়া যাবেনা।একজন বয়স্ক মতোন লোক বললো-আপনি সামনের রুমে যান,বড় সাহেব খুবি ভালো মানুষ।একটু রিকুয়েস্ট করলেই আপনার কাজ হয়ে যাবে।
বিশাল টেবিলের ওইপাশে যিনি বসে আছেন তাকে অত্যন্ত সুভাষী বলেই মনে হচ্ছে।চমতকার তার হাসি,সামনে বসে থাকা সবার ফাইল হাসি মুখেই সাইন করে দিচ্ছেন।এরি ফাঁকে নিলীমাকে বসতে বললেন।
ঘড়ির কাঁটা ততোক্ষনে দুটোর কাছাকাছি,পি এস কে খাবার দিতে বলে নীলিমার পেপারগুলো হাতে নিলেন-এটা নিয়ে কি সমস্যা?
-কি সমস্যা তা আমি জানিনা,তবে ডিরেক্টর বললেন পাসপোর্ট দেওয়া যাবে না।
খুব অবাক হয়ে তিনি ডিরেক্টরকে ফোনে ধরলেন-কি ব্যাপার,এটার পেপারে কি প্রোব্লে্ম?
ওপাশ থেকে যে উত্তরটা এলো তাতে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না।ফোন রেখে একজন দলিল বিশেষঞ্জকে ডাকলেন-দেখোতো,এই দলিলে পাসপোর্ট সম্পর্কে কোন নিষেধাঞ্জা আছে কিনা।
বেলা গড়িয়ে তিনটা ,মাঝে অবশ্য এক কাপ চা ভাগ্যে জুটেছে নীলিমার, ক্ষুধায় পেট চো চো করছে।কিন্তু হাসি মুখে প্রায় ষাটোর্ধ মানুষটার মুখের সামনে বসে আছে-আপনার কি মনে হয় ভাই,কাগজে কোন সমস্যা আছে?
-না,আমিতো তেমন কিছু পাই নি।তবু দেখি ওরা কিছু ধরতে পারে কিনা।
কিছুক্ষন পর পর মোবাইল কানে দিচ্ছেন ভদ্রলোক।একটা ফোন পেয়েতো যেন তিনি গলেই পড়লেন ;এক দৃষ্টিতে নীলিমার বুকের দিকে তাকিয়ে থেকে বলতে লাগলেন-আহ,আমাকেতো একটু রিকুয়েস্ট করতে হবে,এতো সরাসরি কথা বললে কি হয়।একটু নরম করে বলো।
এবার স্বচ্ছ কাঁচের মতোন পরিষ্কার নিলীমা।বেশ গদ গদ হয়ে গেলো মুহূর্তে-ভাইয়া,প্লিজ দেখেন না।কিছু করা যায় কিনা।আপনি চাইলেই আমার পাসপোর্ট পেয়ে যাবে।
-আহা,বললেইতো আর হয় না,যদি কাগজে কোন নিষেধাঙ্গা থেকে থাকে।
-আপনিতো দেখলেন,ওমন কোন কথা লেখা নেই।প্লিজ ভাইয়া ,প্লিজ।
বিকেল চারটা পেরিয়ে যাচ্ছে,কিন্তু নীলিমার মুখ থেকে প্লিজ শেষ হচ্ছে না।যদি ও ভালো করেই জানে এই পাসপোর্ট না দেবার কোন যুক্তিসঙ্গত কারন নেই।তবু অকারনে তাকে বসিয়ে রাখা হচ্ছে আর দুই পাতার কাস্টডি পেপার, পড়ুয়ারা পড়ে শেষ করতে পারছেনা।
অফিসের সময় প্রায় শেষ,ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন-আপনি কাল ঠিক নয়টায় চলে আসুন।আজ আমার মিটিং আছে।দেখি কাল একটা ব্যবস্থা করা যায় কিনা।
হুম,শেষ অব্দি ব্যবস্থা হয়েছিলো।সাংবাদিকদের কাছে ধরনা দিয়েও যখন শেষ রক্ষা হয়নি ,তার জায়গায় আরো দুই দিন অফিস কামাই করে বুকের ওপর থেকে ওড়না সরিয়ে বসে ছিলো নীলিমা।নাহলে ইনভাইটেশন লেটারের মেয়াদ শেষ হয়ে যেতো তবু মেয়ের পাসপোর্টের চেহারা আর দেখতে হতো না এজন্মে।
দৃশ্য-৩
অফিসে কাজের চাপে খুব একটা দেখা দেখি হয়না বন্ধুদের সাথে,আর এই ইন্টারনেটের যুগে পেটের ভেতর যতো কথা আছে তা ফেইনবুক আর টুই্টারেই সেরে নেওয়া যায়।তবু মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে চুটিয়ে আড্ডা দিতে,তাই একটা ছুটির দিন দেখে নিলীমা হাজির হলো সীমার বাসায়।অবশ্য সীমাই ওকে রাতে খেতে যাবার কথা বলেছিলো,দল বেঁধে আরো বন্ধুরা আসবে।নীলিমার নিজের কোন ট্রান্সপোর্ট নেই,ভরসা কেবল সি এন জি।তাই রাত করতে চাইছিলো না একদমি,কিন্তু সবাই এলো রাত দশটার পর।খাওয়া –দাওয়া , হাসাহাসি আর মজার সব ছবির লুটোপুটি অবস্থা।এসব রেখে সহজে নড়া যায় না,এরমধ্যে একবার বিদায় নিতে চাইলে সীমা ধমকে বললো-এতো রাতে কিসের সি এন জি,মামুনের বাসাতো তোর ওখানেই ।তুই ওর সাথে চলে যাবি।
নিলীমা ভাবলো –তাইতো, এ পথে সি এন জি পাওয়া যাবেনা,আর পেলেও জ্যাম ছাড়িয়ে প্রায় বারোটা বেজে যাবে।
এরি মধ্যে কোনার ঘরে জমে উঠেছে সাদা পানির আড্ডা।এটা নীলিমার কাছে নতুন কিছুনা,বন্ধুদের কোন বড় অনুষ্ঠান হলে প্রায়ি এমন আয়জন করে থাকে সবাই।তাই বন্ধুদের সাথে বসে এক পেগ খেয়ে নিলো চুমুক দিয়ে,অবশ্য র খাবার তার অভ্যেস নেই।সমস্যা হচ্ছে,বেশ কয়েকজন এমনভাবে খেতে লাগলো যেন পানি পান করছে।নীলিমা মামুনকে ইশারা দিয়ে বললো-দোস্ত ,তুই একটু কম খা।গাড়ি চালাবিতো।
-অসুবিধা নাই,ড্রাইভার আছে।
এ বয়সে কে কাকে নিষেধ করতে যাবে,কে কার অধীনে।যার যা ইচ্ছা করুক- এই ভেবে নীলিমা হাতের পার্স্টটা নিয়ে মামু্নকে উদ্দেশ্য করে বললো-আমি নীচে নামলাম।
মামুন ওর গাড়ীর নম্বরটা বলে দিয়ে বললো-তুই গাড়ীতে বোস,আমি রাজীবকে নিয়ে আসছি।
ঘড়ির কাটা ১২ টা পেরিয়ে গেছে,নিলীমা বসে আছে প্রায় ২০ মিনিট।মামুনকে ফোন দিতেই সে কেটে দিলো,তারমানে কি সে আসছে নাকি আড্ডায় মশগুল হয়ে গেছে ঠিক বোঝা গেলো না।ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে নিলীমা বললো-আচ্ছা,এখানে কি সি এন জি পাওয়া যাবে?
-না ম্যাডাম,আবাসিক এলাকায় েতো রাতে সি এন জি ঢুকতে দেয় না।
-তাও,কেউ যদি রাতে বাড়ি ফিরে।আপনি একটু আমার ব্যাগটা রাখুন,আমি নেমে দেখছি।
দেখবে কি,কেবল পাহারাদারদের ক্ষনে ক্ষনে বাঁশি বাজানোর শব্দ ছাড়া আর কিছুই নেই।এ্তো রাতে কি করে বাড়ি ফিরবে নীলিমা,ওদিকে মেয়েটাকে খালার বাসায় রেখে এসেছে।যেভাবেই হোক যেতে হবে,ভাবতে ভাবতেই সে গাড়ির দিকে ফিরে এলো।
গাড়ীর ভেতোরে উঁকি দিতেই দেখলো রাজিব ভেতরে বসা,নিলীমা ওকে সরে যেতে বলে নিজে বসে পড়লো।কিন্তু ডানপাশে মামুন উঠতেই ও বললো-তুই ভেতরে যা আমি,সাইডে বসি।
কোন সমস্যা নেই –বলেই মামুন সিটে বসে ড্রাইভারকে গাড়ি ছাড়তে বললো।হঠাত নীলিমা খেয়াল করলো তার কোমর জড়িয়ে আছে রাজিবের হাত।সঙ্গে সঙ্গে ঝামটা দিয়ে উঠলো নীলিমা-কি ব্যাপার।তোর আবার কি হইসে?
-কিছু হয়নাই দোস্ত।আয় প্রেম করি।
-মানে কি?
এই ধরনের ঠাট্টা যে এই প্রথম তা না।রাজিব এমন করেই কথা বলে,কথায় কথায় –তোকে খুব হট লাগছে জাতীয় কথাবার্তা তার মুখে নতুন না।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাজনীতি করতে গিয়েই ওদের পরিচয়,কিন্ত কখনো এক সাথে কোথাও বসা হয়নি।দীর্ঘ পনের বছর পর কোন এক গেট টুগেদারে যখন দেখা হলো তখন পুরোন বুন্ধুত্বটা আবার যেন ঝালাই করার সুযোগ এলো।কিন্তু সে ঝালাই এমন পর্যায়ে কখোন ছিলোনা যে কেউ কা্রো শরীরে অনায়াসে হাত দিতে পারে।ইনফ্যাক্ট নারী-পুরুষের যেকোন শারীরিক সম্পর্কেই দু’জনের সমান মতামত থাকা দরকার।
যাই হোক,গাড়ী ছুটছে প্রচন্ড গতিতে।রাস্তা একদম ফাঁকা,শীতের রাত।একটা ট্রাফিকো চোখে পড়ছে না।রাজিব আবার নীলিমার গায়ে পড়তে লাগলো, নীলিমা ধাক্কা দিলো।একটা সময় প্রচন্ড জোরে ওর ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিলো রাজিব।এর জন্যে কেউ প্রস্তুত ছিলো না,মামুন সাবধান করে দিলো রাজিবকে-এই,তুই গাড়ীর মধ্যে এই সব কি করিস? নীলিমা রাগে দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বললো-আমাকে ক্যান্টন্মেন্টের গেটে নামিয়ে দে,না হলে আমি চিৎকার করবো।
হো হো করে হেসে উঠলো মামুন-তোকে আমরা তোর বাসাই নামিয়ে দেবো,তোর ঐসব আর্মি পুলিশের ভয় আমারে দেখাইসনা।
নীলিমা যথা সাধ্য মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছে,আর ১৫ মিনিট এগুলেই ওর খালার বাসা।এখন যদি সত্যি সে নেমে যায়,বাড়ি তো ফিরতেই পারবেনা,বরং সকাল বেলা নিউজের কভার স্টোরি হতে হবে।সে আবার মামুনকে অনুরোধ করলো-ওরতো কোন সেন্স নাই,তুই মাঝখানে বস,আমাকে সাইডে দে।
মামুন রাজিবকে ধমক দিলো নাকি উসকানি দিলো তা বোঝা গেলো না-খালি বললো,আর এমন করিস না,সামনে ড্রাইভার আছে।
তার মানে কি ড্রাইভার না থাকলে তুই যা খুশি তাই করিস।নীলিমার মাথা কাজ করছে না,কি করা উচিত এখন।ততোক্ষনে রাজিবের হাত ওর জামার ভেতোর দিয়ে উপরের দিকে উঠে আসছে।বার বার দু’হাত দিয়ে ওর হাত নামানোর চেষ্টা করছে আর যতো শক্তি আছে কিল-ঘুষি-থাপ্পড় একটার পর একটা মেড়েই যাচ্ছে নীলিমা।তাতে কোন কাজ হচ্ছে না,রাজিব হেসেই কুটি কুটি।যেন জীবন্ত হরিনীর নরম মাংস খাওয়ার নেশায় সে এখন মত্ত।
কুয়াশার আলো ভেদ করে অবশেষে বাড়ীটা দেখা গেলো, নীলিমা পথের মাঝেই গাড়ি থামিয়ে বললো-আমাকে এখানে নামা,আমি যেতে পারবো।
রাজিব বললো-চল,তোকে বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসি,আমিও সিগারেট কিনতে নামবো।
কোন দরকার নেই –বলেই অন্ধকারে হারিয়ে গেলো নীলিমা
খালাতো ভাইকে ফোন দিয়ে নীচে নামতে বললো,একদন্ড চোখের পাতা বুজতে পারছেনা নীলিমা।কেবল একটা কথাই ভাবছে-ড্রাইভার না থাকলে আজ কি হতো?
সীমার বাড়িতে যে সব বন্ধুদের দাওয়াত ছিলো তা না,কিন্তু বন্ধু মহলে কেউ কারো বাড়িতে গেলে ওটা এখন খুব সহজেই জানাজানি হয়ে যায়।তাই সক্কাল সক্কাল রাত্রির ফোন পেয়ে বেশ চমকে গেলো নীলিমা-কি ব্যাপার,তুই এতো সকালে?
-তোর খবর কি,শুনলাম রাতে সীমার বাসায় ডিনার ছিলো?
-হুম।
-তুই একাই গেসিলি?
-না,অনেকেই ছিলো।ওরা দেরী করে ফিরসে।আমি চলে এসছি।
-কার সাথে ফিরসিস?
নীলিমা চুপ করে থাকে ,বলবে কি বলবে না একটু ইতস্থত করে।তারপর সব বলে দেয়।সব কথা শুনে বেশ বিঞ্জের মতোন রাত্রি বলে-তুই আর মানুষ পাইলিনা,ওরা তো অমনই।আর রাজিবতো মেয়ে মানুষ দেখলেই হইলো।
-না,আমার সাথে আগে এমন ব্যবহার করে নাই।
-চান্স পায় নাই,তাই করে নাই।আর যার বাড়িতে গেসিলি ওইতো একটা মাগী।সবাইরে চান্স দেয়।
-কি বলিস?
-হুম,দেখসনা ওর বাচ্চা হয়না।এতো বেশি এম আর করাইসে যে আর কোন দিন বাচ্চা হবে না।
-কি বলতেসিস?ওরতো ট্রিটমেন্ট চলতেছে,ওষুধ খাইতে খাইতে মোটা হয়ে গেছে।
-আরে বাদ দে,ওইসব ট্রিটমেন্টে কোন কাজ হবে না।
নীলিমা বুঝে ফেললো –আরো একটা ভুল কাজ করে ফেলেছে।যে অনায়াসে নিজের হলের বান্ধবী সম্পর্কে এমন তথ্য দিতে পারে সে তার সম্পর্কে এখন কি নিউজ চালু করবে তা এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার।সে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটি ঘটা শুরু করলো।নীলিমার কাছে ফোনের পর ফোন আসতে লাগলো,সবার এক প্রশ্ন-রাজিব কোন কোন জায়গায় হাত দিয়েছিলো? নীলিমার যন্ত্রনা লাঘব করার কোন অভিপ্রায় তাদের ছিলো কিনা জানিনা,তবে তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জখম করার ইচ্ছা অনেকেরি ছিলো।
এই ঘটনার দুই দিন পর মামুন আর রাজিব ফোনে বেশ সরি টরি বললো।রাজিব প্রথমে একটু হুমকি দিতেও ভুল করলো না-দেখ,তুইযে জনে জনে আমার নাম বলসিস।লোকজন কিন্তু শেষে তোরেই দোষাবে।সবাইতো জানে আমি লাফাঙ্গা।
-কে কি বললো তা জেনে আমার কাজ নেই।আর আমি কাউকে ফোন দেই নি,সবাই আমাকে ফোন দিয়েছে।
-তুই এক কাজ কর।আমি তোর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি,এর পর কেউ ফোন দিলে বলবি-আমাদের ভুল বোঝাবুঝি হইসিলো।
-এটা কেন বলবো,আমিতো তোকে ভুল বুঝি নাই।তুই যা করসিস তা মাত্রার বাইরে ছিলো।
-তোকে কী আমরা বাসায় দিয়া আসি নাই ?
-না,আমি তাতো বলি নাই।তুই অন্যায় করসিস?তোর প্রায়শ্চিত্ত হয়া উচিত।
-দেখ,সবাই বলতেসে আমি অপরাধী আর তুই ভিক্টিম,শুনতে কেমন লাগে বল।
-তাতো আমি জানিনা।তবে আমার চোখে তুই অপরাধী।অন্য কেউ বিষয়টা কিভাবে নিচ্ছে তা জানার ইচ্ছা আমার নাই।
-তুই কি চাস আমাদের সুন্দর বন্ধুত্ব ভেঙ্গে যাক,আর সবাই সে সুযোগটা নিক।
-দেখ,তৃতীয় কারো উপস্থিতিতে আমি বিশ্বাসী না।কেউ রাজনীতি করতে চাইলে বন্ধুত্বে ফাঁটল ধরাতে চাইলে চাক।কিন্তু তোকে আমি বন্ধু হিসেবে চাই না-এটা ফাইনাল।
এইরকম থ্রেড দিয়ে কেউ মাফ চায় কিনা –নীলিমার জানা নেই।তব মনে হলো অতিমাত্রায় মদ্যপান করাতে ওর নিজেরি মনে নাই আসলে সে ওইরাতে কি করেছিলো।কিন্তু যারা সুস্থ,কোন কালেও মদ স্পর্শ করে নাই,এমন উক্ত ডিনারে উপস্থিত ছিলো না তাদের কিছু মন্তব্য শুনেতো নীলিমার চোখে চরগ গাছ।
এক বন্ধু রীতি মতোন তাকে উদ্দশ্য করে জানতে চেয়েছে-১।নীলিমা ঐ রাতে উক্ত গাড়িতে কেন ফিরছিলো?
২।মদ্য পান করে সে নিজেই রাজিবকে জড়িয়ে ধরে নাই-এটা তারা কি ভাবে বিশ্বাস করবে?
৩।নিজেকে এতো মহামূল্যবান ভাবার দরকারটা কি?
এমনসব অবাক করা প্রশ্নবানে ভেসে গেলো নীলিমার সমস্ত আবেগ –অভিমান-জমানো থাকা কষ্ট।
যে বন্ধুর হাত ধরে দীর্ঘ পথ পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া যায়,যে বন্ধুর পাশে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সুখ-দুঃখের গল্প করা যায়,যে বন্ধুর কাছে মনের সব ক্থা খুলে বলা যায় সেই বন্ধু রাতের অন্ধকারে হঠাত হায়েনা হয়ে উঠবে-এ দায়িত্ব কার?সেই নারীর যে কিনা সেই পুরুষ বন্ধুকে বিশ্বাস করেছে ?
তার মানে কি পুরুষ কখোন বন্ধু হবে না,পুরুষ কেবল মাত্র পুরুষই রয়ে যাবে।আর নারীরা মুখ রোচক গল্প ছড়াবে সেই প্রাচীন কালের মতোই?
এমন হাজার হাজার প্রশ্ন প্রতিদিন জমা হয় নীলিমার কাছে।কিন্তু কোনটার কোন সঠিক উত্তর সে পায় না।বুঝতে পারে না –আদৌ কি কাউকে বিশ্বাস করা সম্ভব?জীবন চলার পথে কতো মানুষের সাথে দেখা হয়,কথা হয়।কিন্তু দিনের আলোতে তার রঙ এক,আর অন্ধকারে কি অন্য আর এক?কিজানি হবে হয়তো।
যে লোক বউকে জরিয়ে হাসি হাসি প্রোফাইল পিকচার দেয়,সেই যদি ইনবক্সে লিখে দেয়-লাল শাড়িতে তোমাকে অনেক হট লাগছে তবে তার দায়িত্ব কে নেবে?কে নেবে এই প্রবঞ্চনা?

এই মিথ্যে প্রহসনের খেলা থেকে সে কবেই মুক্তি নিয়েছে কেবল নিজের মতোন করে বাঁচবে বলে।তবু আত্বিয়-বন্ধু সবাই আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে দেয়-তোমার কোন বৈধ সার্টিফিকেট নেই।বাড়ি ফিরতে দেরী হলে তুমি হবে বেশ্যা।আর এলকোহল খেলেতো কথাই নেই-তোমাকে অনায়াসে ছুঁতে পারবে যে কোন পুরুষ।তুমি রাজি থাকো আর নাইবা থাকো তোমাকে যখন তখন ভোগ করার লাইসেন্স আছে তোমার স্বামীর>
মিথ্যের লেবাসে গড়া কাগজের বউ হয়ে কোন দিন থাকতে চায় নি বলে আজ রাজপথে একলাই হেঁটে চলে নিঃসংগ কোন এক নীলিমা।।
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=মনের হিংসা দূর করো রব=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:২৯


তবুও হিংসা এসে যায় কারণে অকারণে;
পারি না সামলাতে মন আমার - ইয়া রব,
নিতে পারি না সহজ করে কিছু
মনের কিনারে ভাঙ্গে হুড়মুড় স্বার্থের কলরব।

স্বচ্ছ মনের মানুষ কী করে হই,
সহজরে করে ফেলি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি প্রবাসীর মৃত্যুদন্ড ও রটানো গুজব

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২

আপনি যে দেশে যাবেন, সেই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাটা আপনার দায়িত্ব।
আমেরিকায় আপনি মদ কিনতে পারবেন। কিন্তু আপনার বয়স অবশ্যই ন্যূনতম ২১ হতে হবে। ইউরোপে হয়তো এই বয়সটা ১৮।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরো...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫২

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরোচ.....

বিপ্লবের লক্ষ্য কী- পরিবর্তন, নাকি প্রদর্শন?
বাংলাদেশে জেন-জি স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে; কিন্তু প্রশ্ন- স্বৈরাচার গেছে, স্বৈরাচারী মানসিকতা কি গেছে?
যে তরুণ প্রজন্ম গণতন্ত্র, অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে রাজপথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

খালিদ বিন ওয়ালিদের জুলুমের বিরুদ্ধে ছিলেন বদর যুদ্ধের সাহাবী হযরত আবু কাতাদাহ আল আনসারী (রা.)

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৫

প্রথমেই বলে নিতে হবে, ইসলামে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের অশেষ সম্মান দেওয়া হয়েছে। মুসলমানদের যখন খুবই খারাপ অবস্থা, তখন এই বদর যুদ্ধে নবীজির নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেন একদল মুষ্টিমেয় সাহাবী। সেই বদর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রম্য: পর্নের সেকাল একাল!

লিখেছেন গেছো দাদা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬

গুরুত্বপূর্ণ একটা টপিক নিয়ে অনেকদিন ধরে লিখব লিখব করছিলাম। সময় হচ্ছিল না। আজ এই গভীর রাতে মনে হলো, লিখেই ফেলি। কেন মনে হলো, সে আলাপে আর না যাই। টপিক হলো:... ...বাকিটুকু পড়ুন

×