somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সীমান্ত ছাড়িয়ে //(ভালোবাসার গল্প)

৩১ শে জানুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ২:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেশ অনেক সময় ধরেই নীলিমা জি-মেইল ঘাটাঘাটি করছিলো।নতুন কোন ই-মেইল এলো কিনা , নতুন কোন নোটিফিকেশন আছে কিনা-এইসব।আসলে ছুটির দিন, বাড়ীতে বসে একরকম বেকার বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নাই।তাই চোখের সামনে থাকে ল্যাপটপ যেখানে ইউটিউব ,স্কাইপে আর ফেইসবুক সারাক্ষন খোলা ।ইনবক্সের একটা মেসেজ ক্রমাগত উঁকি মারছিলো,
-আপনি কি ব্যস্ত?
সাংঘাতিক ব্যাপার।এতো দূরে থেকেও শুদ্ধ বাংলা।এবার নীলিমা নড়েচড়ে বসলো,
-না,একদম না।আজ আমার ছুটির দিন।
-এর আগেও আপনাকে নক করেছিলাম।মনে হয় খুব ব্যস্ত থাকেন।
-তা না,আসলে ইনবক্সে অপরিচিত কারো সাথে তেমন কথা হয়না।
-কি করেন আপনি?
-তেমন কিছুনা,একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে আছি।একটু ভেবে আবার বলে ,
-আপনার ওখানে এখন কয়টা বাজে?
-রাত একটা।
-এতো রাত জেগে থাকেন,পাশের মানুষের অসুবিধা হয় না।
-আমার পাশে কেউ নেই,আমি একাই থাকি।
-তবে যে দেখলাম ছেলে মেয়ে দিয়ে টাইম লাইন ভরা।
ওপ্রান্তে অনেক্ষন হাসির শব্দ।
নীলিমার মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে,কিন্তু তা আর করা হয় না।কারন কথার শুরুতেইতো আর বলা যায় না-আপনার বউ কোথায়?
এর মধ্যেই হঠাত আরমান তার ফোন নম্বর চায়।দুম করে নিজের নম্বরটা লিখে দেয় ইনবক্সে।
কিছুসময়ের মধ্যেই ফোন ।ওপাশ থেকে কন্ঠটা একদম পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে।নীলিমা আরো বেশি অবাক হয় ,বিদেশে থেকেও এতো ভা্লো বাংলা বলছে কিভাবে মানুষটা।নীলিমার মুগ্ধতা বাড়তে থাকে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে কথার গতি।
দুপুর গড়িয়ে এখন বিকেল চারটা ।ফোন ছেড়ে এখন স্কাইপেতে কথা হচ্ছে, মনেই হচ্ছেনা এরা দু’জন মাত্র পরিচিত হলো।আরমানের পরিপাটি ঘর দেখা যাচ্ছে চার বাক্সের মাঝ দিয়ে ,হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে ,চোখ নীলিমার দিকে স্থির।নিঃসংগ জীবনের সাথে মিতালী পড়াতে এসেছে বহু মানুষ।কেও নীরবে,কেউবা স্বরবে।কিন্তু এভাবে টানেনি কেউ।এই টানটা ওই মানুষের প্রতি নাকি চাকচিক্যময় ওই দেশের জন্যে বুঝতে পারেনা নীলিমা।
নীলিমা এক সময় আরমানকে বলে-আমি ওখানে গেলে অড জব করতে পারবো না।আরমান হেসে উত্তর দেয়, -না,এখানে তোমাকে অড জব করতে হবে না।অনেক কাজ আছে।
-কিন্তু ট্যুরিস্ট ভিসায় গেলে কি কাজের পার্মিশন দেবে?
-না,তা দেবেনা।তবে তোমাকে এখানে আসার পর পি আর এর জন্যে এপ্লাই করতে হবে।আর আমার জানা শোনা অনেক লোক আছে।আগে তুমি আসোতো তাহলেই না দেখা যাবে।
শরতের স্নিগ্ধতা ছাপিয়ে হেমন্তের আভাস ভেসে আসছে বাতাসে।নীলিমা কল্পনার যাদুর স্পর্শে ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে।সারাক্ষন আচ্ছন্ন করে রাখে কোন এক ভালো লাগার ছোঁয়া।প্রতিদিন ঠিক রাত দশটা বাজলেই জমে ওঠে দুজনের ফোনালাপ,সে কথা গড়ায় মধ্যরাত অব্দি।
আরমান অনুনয় করে –তুমি লাল শাড়ী পড়ে আসো,আমি তোমাকে দেখবো।
-দেখে কি হবে?
-কিছু হবেনা ,কেবল দেখতে চাই।শাড়ীটা তুমি আমার সামনেই পড়বে।
মনে হচ্ছে আরমান চোখের সামনেই বসে আছে।নীলিমা বুকের ওপর থেকে একটা একটা করে কাপড় খুলে নিচ্ছে।হঠাত কি মনে হতেই নীলিমা প্রশ্ন করলো-এই,তুমি আবার ভিডিও কোরছো নাতো?
-ওহ,জান।তুমি আমাকে বিশ্বাস করোনা?
-করি করি,অনেক করি।
শুন্যে ধোঁয়া ওঠা ঘুর্নির মতো ঘুরতে থাকে নীলিমা আর আরমানের মধ্যরাতের প্রেম।
সময় যেতে থাকে কথায় কথায়,খুঁনসুটিতে ।হেমন্ত কাটিয়ে পৌষের ছায়া নামে শহরের প্রান্ত ঘেঁষে।ঘর অন্ধকার করে নীলিমা শুয়ে আছে ।আরমান ফোন দেবে-জানতে চাইবে ভিসা হয়েছে কিনা।কিন্তু কিছুতেই এই দুঃসংবাদটা ওকে দিতে ইচ্ছে করছেনা,চিতকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে,নীলিমা তাও পারছেনা।কেবল শুয়ে শুয়ে ভাবছে -সে একা একজন ডিভোর্স মহিলা,যদি আর দেশে ফেরে ,সেই আশংকাতেই ছিলো অফিসার।তাইতো হোল না ভিসা।যাওয়া হোল না আরমানের কাছে।ভেঙ্গে গেলো স্বপ্নের পৃথিবী।
স্কাইপে অন করে কল করে নীলিমা, ওপ্রান্তের উতসুক চাহনী-কি খবর বলো?
-না,তোমাদের সাদা চামড়া আমাকে পছন্দ করেনি।
-হা ,হা হা...
-হেসো না,সত্যি ভিসা হয়নি।
-সত্যি বলছো?কিন্তু কেন?সব কাগজ নিয়েছিলেতো?ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স,স্যালারী স্টেইটমেন্ট?
-সব নিয়েছি,কিন্তু ব্যাটা বলেছে-no need to show.
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে আরমান বললো-বাদ দাও,আমি অন্যভাবে চেষ্টা করবো।
-অন্যভাবে বলতে তো ওয়ার্ক পার্মিশন।ওটা কি আমাকে দিবে?
-দেখি,কি করা যায়।
-এতো দেখা লাগবেনা।আমি যেতে পারবো না,তুমি দেশে আসো।
আরমান চুপ করে থেকে বললো-দেখি।
দেশে আসার মতো তার আদৌ কোন মানসিকতা আছে কিনা তা নীলিমা বুঝতে পারেনা।যখনি দেশের কথা বলে আরমান বলে ,এখানে ওদের কেউ নেই।ভাই-বোন সবাই কানাডায়,বাবা-মাতো কবেই গত হয়েছেন।তারপরো নীলিমা নিজেকে সামাল দেয়-একদিন হয়তো আরমান দেশে ফিরবে ।
মাঘের শীত আচমকা জাকিয়ে বসেছে সমগ্র ঢাকা শহরকে,সেই সাথে বাড়ছে রাজনৈতিক অসহীংসতা।আরমান এখন আর আগের মতো ফোন দেয় না,কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে আগের সম্পর্ক।কিন্তু ভেতরের এক অমি্মাংশিত হাহাকার প্রতিমুহূর্তে টের পায় নীলিমা।বাইরে যাবার চিন্তাটা মাথা থেকে একেবারেই বাদ,এ দেশেই কিছু করতে হবে।এমন ভাবনা থেকে সে একটি এন জি ওর পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে দুঃস্থ শিশুদের সাথে কাজ আরম্ভ করে।প্রায় প্রতিদিনি যেতে হয় শহর থেকে দূরে,অনেক সময় নেটোয়ার্কের বাইরে।তখন হঠাত মনে হয়-ইশ,যদি আরমান ফোন দিয়ে না পায়।তারপর এক অজানা অভিমান তাকে গ্রাশ করে-করলে করুক,যে নিজের দেশ ছেড়ে বাইরে বিলাসী জীবনে ব্যস্ত , তার জন্যে এতো কিসের মায়া।
হাজার হাজার সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে ডাটা তৈরী করতে হয় প্রতিদিন,তা পাঠিয়ে দিতে হয় হেড অফিসে।তাই নীলিমা অনলাইনেই থাকে।এমনি এক দুপুরে কাজ করতে গিয়ে একটি ই-মেইলের দিকে নজর পড়লো নীলিমার,সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা-আই এম ইন ঢাকা।নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না,আরমান কি ফান করছে।স্কাইপেতে প্রশ্ন করে, -তুমি এখন কোথায়?
স্ক্রীনের মধ্য দিয়ে ভেসে আসছে আরমানের ক্লান্ত মুখ।একটু হেসে বললো-আমি তোমার খুব কাছেই আছি।
-কোথায় , প্লীজ বলো।
-বলছি,তার আগে তুমি বলো-আমাকে তুমি বিশ্বাস করোনি ,তাই না।
নীলিমার চোখ বেয়ে তখন টপটপ করে জল ঝড়ছে।
-তুমি আমার কাছে এসো প্লীজ।
-আসছি,কিন্তু জিঞ্জেস করলে না ,কেন এসেছি।
-কেন?
-তোমার জন্যে এসেছি এটা সত্যি,আবার শেষ সময়ে দেশকে কিছু দিতে চাই এটাও সত্যি।
-শেষ সময়ে মানে কি?
-তোমাকে কখোন বলা হয়নি,আমার একটা সমস্যা আছে।খুব বেশি দিন সার্ভাইভ করতে পারবোনা । হাতে সময় অল্প।তাই গুছিয়ে আসতে কিছুটা সময় লাগলো।আমার হাতে যা আছে তা দিয়ে তুমি গরীব বাচ্চাদের ঠিকি ভালো কিছু করে দিতে পারবে।
এই সব শোনার জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না নীলিমা।ওর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মুখের দিকে চেয়ে আরমান বললো-নীলা,আমি তোমার সাথে দেখা করতে আসবো কেবল একবারের জন্যে।আমার কাছে খুব বড় অঙ্কের একটা চেক আছে ,সেটা তোমাকে বুঝিয়ে দেবো।আর শেষ বারের মতো তোমাকে লাল শাড়ীতে দেখবো।কোথায় আসবো আমাকে বলে দাও।দীর্ঘ ২৫ বছরে আমি ঢাকার রাস্তা ভুলে গেছি।
আরমান–নীলিমা দু’জন দু’জনকে ভালোবেসেছিলো।তারা দেশকে ভালোবেসেছিলো,মানুষকে ভালোবেসেছিলো।তাদের এই যৌথ ভালোবাসায় প্রতিষ্ঠা হলো –দি আরমান ট্রাস্ট।নীলিমা নিজেই বেশ কিছু বেকার ছেলে মেয়েদের কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।আর আরমান চলে গেছে সীমান্তের ওইপাড়ে।যে সীমান্ত ইচ্ছে করলেই কেও পেরিয়ে আসতে পারে না কোন দিন।
(এই লেখাটা একটা কম্পিটিশনে দেওয়া হয়েছে।অতএব কোন অবস্থাতেই এটা কপি করা যাবে না।তবে শেয়ার করা যাবে।)

আলকচিত্র ঃ লয়েড তুহিন হালদার।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জানুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ২:১৪
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×