
'এই শুনছো? এই!'
আনিস ধড়ফড় করে জেগে উঠলো। রেনুর কণ্ঠ। পাশ ফিরে তাকালো ও। রেনু নেই পাশে। থাকার কথা না। দুবছর আগে মারা গেছে ও। আনিস নিজ হাতে ওকে খুন করেছে। রেনু অসুস্থ ছিল। প্রায়ই বলতো আনিসের মতো কেউ একজন ওর কাছে আসে। জড়িয়ে ধরে। আনিস বিশ্বাস করতো না। সব মনের ভুল। সাইকিয়াট্রিস্ট দেখিয়েছে। কাজ হয় নি।
রেনু বলতো, "এই ফ্ল্যাটে দুইটা তুমি আছো।"
"তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে রেণু।"
"তাই মনে হয় আনিস। অবিকল তোমাকে দেখি। যখন তুমি থাকো না।"
"তোমার ডাক্তার দেখানো উচিত।" আনিস বলতো।
একদিন রাতে আনিস উঠে দেখে রেনু পাশে নেই। অন্ধকারে জানলার ধারে দুটো মানব-মানবীর আবছায়া দেখতে পায়। প্রথম ভেবেছিল ভুল দেখছে। কিন্তু এর পরেও বেশ কয়েক রাত ঐ লোকটির সাথে রেনুকে দেখেছে। রেনু বলতো, ওটা নাকি আনিস নিজেই। আনিস বিশ্বাস করে নি। বিশ্বাস করার কথা না। পরপুরুষের সাথে যে রেনু জড়িয়ে গেছে এটা বুঝতে পারে আনিস।
একরাতে রান্নাঘরে আবিষ্কার করে রেনুকে। অন্ধকারে। সেই লোকটি দ্রুত বেরিয়ে যায়। আনিস রান্নাঘরের বটিটা হাতে নেয়।
"তোমাকে আর বিশ্বাস করি না রেণু। তুমি আমাকে ঠকিয়েছো!"
প্রচন্ড রাগে রান্নার বটি দিয়ে রেনুকে কুপিয়ে হত্যা করে।
গত দু'বছর হলো এই ফ্ল্যাটে ও একাই থাকে এখন।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। খুব বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে বজ্রপাত।আনিস জানলা বন্ধ করে দিল। রাত কয়টা বাজে? হাতঘড়িতে লাইট নেই। অন্ধকারে অনুমান করা যাচ্ছে না। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকার। কারেন্ট নেই। থাকার কথা না। একটু বৃষ্টি হলেই কারেন্ট থাকে না। এখন তো বজ্রসহ বৃষ্টি।
আনিসের পানি খেতে ইচ্ছে করছে। টি-টেবিলের পানির ফ্লাস্ক রাখা। পানি নেই ওটাতে। হঠাৎ করে রেনুর কথা মনে পড়লো। রেনু থাকলে পানি এগিয়ে দিয়ে বলতো, "দুঃস্বপ্ন দেখেছো নাকি?"
রেনু নেই। একথা কেউ আর বলবে না। কোনদিন না।
আনিস উঠে দাঁড়ালো। রান্নাঘর থেকে রিনরিনে শব্দ আসছে। কারো হাতের চুড়ির শব্দ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সেই আলোতে আনিস রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। মোবাইলটা বন্ধ হয়ে গেছে। চার্জ নেই।
"কে ওখানে? কে?" আনিস কাঁপাগলায় বললো। কোনো প্রতিউত্তর নেই। আনিস রান্নাঘরের দরজার কাছে এলো। রান্নাঘরটা বড়। ভালোই বড়। ডাইনিংটা ছোট। রেনুর পছন্দ ছিল এই ফ্ল্যাট।
রান্নাঘরের গ্যাসের চুলায় শো শো শব্দ হচ্ছে। কেউ গ্যাস খুলে দিয়েছে। আগুন জ্বলছে না। বিদ্যুৎ চমকালো এমন সময়। একটা ছায়ামূর্তিকে দেখতে পেল। অবিকল রেনুর মতো। আনিসের গলা শুকিয়ে এলো। পা ভারী হয়ে গেছে। ছুটে পালাতে চাইছে। পারছে না। অদ্ভুত এক আকর্ষণ কাজ করছে। আনিস কাপা শরীর নিয়ে ছায়ামূর্তির দিকে এগিয়ে গেল। কাছাকাছি আসতেই রেনুকে দেখে আঁতকে উঠলো। ওর হাতে রান্নাঘরের বটি!
★
রেণুর মাথায় রক্ত উঠে গেছে। চোখ-মুখ বিস্ফোরিত। ভয়ংকরভাবে বিস্ফোরিত। নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। নিজের হাতে আনিসকে খুন করেছে। বটি দিয়ে কুপিয়ে। রক্তাক্ত শরীর রান্নাঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। তাজা রক্ত। রেনুর শরীর ঘিনঘিন করে উঠলো। এতোক্ষনে ঘোরের মধ্যে ছিল। তবে সে আরাম পাচ্ছে। বেশ আরাম পাচ্ছে।
আনিস বলতো ওর একটা রোগ আছে। অবিকল রেনুর মতো কাউকে নাকি দেখতে পায়। রেনু বিশ্বাস করতো না। আনিস বলতো, "এই ফ্ল্যাটে দুইটা তুমি আছো।"
"তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে আনিস।"
"তাই মনে হয় রেণু। অবিকল তোমাকে দেখি। যখন তুমি থাকো না।"
"তোমার ডাক্তার দেখানো উচিত।" রেনু বলতো। একদিন সত্যি সত্যি ডাক্তার দেখালো। কাজ হয় নি। একদিন বাইরে থেকে রেনু এসে দেখে, বিছানায় আরেকটি মেয়ের সাথে আনিস শুয়ে আছে। হাসছে ওরা। রেনুকে দেখতে পেয়ে লাফিয়ে ওঠে। মেয়েটি এলোমেলো কাপড় জড়িয়ে ধরে বেরিয়ে যায়। মুখ দেখতে পায় নি। সেদিন খুব ঝগড়া হয় ওদের।
আনিস নাছোড়বান্দা। মেয়েটি রেনুই ছিল। রেনু বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করার কথা না।
এরপরেও রেণু ঐ মেয়েসহ আনিসকে দেখেছে। কিন্তু মেয়েটির মুখ দেখে নি কোনবার।
এরপরেই সিদ্ধান্ত নেয় সে আনিসকে খুন করবে। ভালোবাসা বড় কঠিন জিনিস। কেউ ভাগাভাগি করতে চায় না। রেনুও না।
★
রেণু রক্তাক্ত হাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ডাইনিংএর বেসিনে হাত ধোয়। বেসিনের আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকে। হঠাৎ মনে পড়ে, অন্ধকারে তো আয়নায় নিজেকে দেখতে পাওয়ার কথা না! তখনই অদ্ভুত ঘটনাটি ঘটে। অবিকল আনিসের মতো একজনকে সে আয়নায় দেখতে পায়। ওর ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে। রেণু ঘুরে দাড়ায়।
আনিসের শরীর কাপছে। কাঁপাগলায় বললো, "তোমাকে বিশ্বাস করি না রেনু! তুমি আমাকে ঠকিয়েছো!"
রেনু ভয়ে আঁতকে ওঠে। এই মাত্র তাহলে সে কাকে খুন করেছে?
আনিসের হাত উপরের দিকে ওঠে। খুব সন্তর্পনে। ওর হাতে রান্নাঘরের সেই বটিটা!
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




