somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাটির সাথে দাদা-নানা’র ঘনিষ্টতা ও আমার শৈশব-কৈশোর

১২ ই অক্টোবর, ২০২১ রাত ৮:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার দাদা মারা গেছেন আমার জন্মের বহু আগে । দাদাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি । নানা মারা যান যখন আমি ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ি তখন । দাদা নাকি খুব ডানপিটে মানুষ ছিলেন । দাদা কৃষিকাজ করতেন এমনকি নানাও । জমিজমার সাথে দাদা এবং নানার গভীর ঘনিষ্টতা ছিলো ।

তখন তো এত আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিলোনা‚ তখন জমি চাষ হতো গরুর পিঠে লাঙ্গল-জোয়াল দিয়ে । জমি নিড়ানির জন্য পাচন ব্যবহার করা হতো । দাদা ফজরের নামাজ পরেই মাঠে চলে যেতেন‚ জমি পর্যবেক্ষণ‚ পানি সেচা‚ হাল দেওয়া‚ নিড়ানি দেওয়া সবই করতেন ।

আমার যে বয়সটাতে দাদা-নানার কাছে নানারকম প্রশ্ন করে সেসবের উত্তর জানার কথা সেই বয়সটাতে তাঁদের আমি পাইনি । তাঁদের জীবিকা‚ তাঁদের প্রেম-ভালোবাসা‚ তাঁদের জীবনযাত্রা‚ তাঁদের আনন্দ‚ তাঁদের উৎসব‚ তাঁদের রাজনীতি কোনোকিছুই জানা হয়নি আমার । পৈত্রিকভাবে এবং নিজের পরিশ্রমে দু’জনই ভালো সম্পত্তি রেখে গেছেন ।

পরম্পরায় কৃষিকাজ করেছি বাল্যকাল থেকেই । জমিতে ধান‚ আলু‚ পাট‚ বেগুন‚ মরিচ‚ ফুলকপি‚ কলাসহ নানা পন্য উৎপাদন করেছি । আব্বার সাথে ধান বুনেছি‚ নিড়ানি দিয়েছি‚ ধান কেটেছি‚ ধান ভানতে গেছি এছাড়াও যখন প্রাইমারি-হাইস্কুলে পড়েছি তখন শীতের সকালে ফুলকপি-পাতাকপি কাটতে গিয়ে হাত ঠান্ডায় জমে হীম করেছি । ভোরবেলা ঠান্ডা পানিতে নেমে বিছনের জমি সেচেছি‚ নিড়ানি দিয়েছি ।

এই যে ধারাবাহিকতা চলে আসছে পৃথিবীর কোটি কোটি বছর ধরে । মানুষ ফসল উৎপাদন করছে‚ বিক্রি করছে এটার ধারাবাহিকতা কখন কি শেষ হবে? হবেনা । পৃথিবী যতদিন থাকবে এটা চলতেই থাকবে । মাটির সাথে মানুষের যে আত্নিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে সেটি কিন্তু খুব সাধারণ ব্যাপার নয় । যাঁরা মাটির সাথে বেড়ে ওঠেনি তাঁরা এই মর্মটি কখনও বুঝতে পারবেনা ।

চাঁদকে আমার খুব ছোট্টকাল থেকেই বড় বেশী ভালো লাগে । যখন দাদার বাড়ির সাথে দাদার ভাইয়ের বাড়ির কোনো বাউন্ডারি ছিলোনা‚ বিশাল একটা আঙিনা ছিলো তখন কোনো কারণে বেড়াতে গেলে ঐ আঙিনা থেকে জোছনা দেখতাম । বিশাল আমগাছ আর বড়ই গাছের উপরে জোছনার ছায়া পড়তো । এবং আঙিনার দক্ষিণ সাইডে একটা পুকুর ছিলো(এখনও আছে তবে মৃতপ্রায়) সেখানে জোছনার আলোর বিচ্ছুরণ দেখতাম ।
নানাবাড়িতে মামাতো-ফুফাতো ভাই-বোনেরা হৈ-হুল্লোড় করে জোছনা রাতে পিকনিক করতাম । কখনও দেশী মুরগি দিয়ে পোলাও রাঁধা হতো‚ কখনও ডিম দিয়ে আলুঘাটি । নানী মুরগির ঘড়া থেকে ডিম বের করে দিতেন । আমার সুস্পষ্টভাবে মনে আছে নানাবাড়িতে কোথায় মুরগির ঘর ছিলো ।

একে একে পরিবার তথা আত্নীয়দের সংখ্যা বাড়লো । দাদার বাড়ির সামনে সেই বিশাল আঙিনার মধ্যে বাউন্ডারি হলো‚ নতুন ঘর তৈরি হলো । নানাবাড়িতে পার্টিশন তৈরি হলো‚ মামারা ভাগ হয়ে গেলেন । জীবনের আনন্দগুলো তখন থেকেই ভাঙা শুরু ।

নানা বাড়িতে বড় বড় দুইটা চৌকি । চৌকির আয়ুষ্কাল প্রায় পঞ্চাশের বেশী ছাড়া কম হবেনা আমার যতটা ধারণা । কালো রঙের মজবুত সেই কাঠ । জানিনা কোন গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি । সেই চৌকিতে কত গড়াগড়ি করেছি । আমার নানাবাড়িতে একটা ভালো দিক হলো সেই চৌকিতে শোয়ার একটু সময়ের মধ্যেই আমার ঘুম এসে যেত । নানা-নানীর সেই ঘরে এত প্রশান্তি এরকম প্রশান্তির ঘর আমার ইহজীবনে আর পাইনি ।

বগুড়া থেকে আসার আগে মাঝেমধ্যেই নানীর ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকতাম । আমার খুব গভীর ঘুম চলে আসতো যেন । ভাত খাওয়ার জন্য নানীর সেই আকুতি আমাকে বড় অবাক করে । সে কেন আমাকে এত মায়ায় জড়াতে চায়‚ কেন এত ভালোবাসে ।

আমার মনে পড়ে সেই দিনগুলো । ধুলোমাখা শরীর নিয়ে নানীর বাড়িতে যাওয়া । নানীর আদুরে বকা‚ নানার ক্ষীণ কণ্ঠের ডাক । খুব তাড়াতাড়িই বোধহয় বড় হয়ে গেলাম । যাঁদের ভালোবাসলাম তাঁদের কাছে কাছে রাখতে পারলামনা‚ কেউ মরে গেলো কেউবা দূরে সরে গেলো ।

জীবন ও মৃত্যুর এই বিচ্ছেদগুলো বড় বিদঘুটে মনেহয়‚ বড় বেশী কষ্ট দেয়‚ মানসিকভাবে মানুষের শরীরকে ক্ষত বিক্ষত করে । আমার কেন যেন মনেহয় আমি বোধহয় পরিবারের সবার আগে মারা যাবো । একেবারে অনন্তকালের জন্য চলে যাবো দাদা-নানাদের‚ যাঁদের সাথে সম্পর্ক ছিলো আবার ভেঙ্গেও গেছে তাঁদের থেকে অনেক অনেক দূরে । জীবন থেকে বড্ড পালাতে ইচ্ছে করে আমার...

সাব্বির আহমেদ সাকিল
২৫ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ‚ শরতকাল | ০২ রবিউল আওয়াল ১৪৪৩ হিজরী | ১০ অক্টোবর ২০২১ ইং | রোববার | সন্ধ্যা ০৭ টা ০৭ মিনিট | ময়মনসিংহ

#সাব্বিরসাকিল #জীবনধারা #দাদানানা #জীবিকা #জীবন #জীবনথেকেনেওয়া #জীবনথকে #ময়মনসিংহ
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গুপ্তদের সকল অপকর্মের তদন্ত হোক....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪৮


সময় যত যাচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে অস্বস্তিকর সত্য!
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে- আর অতীতের অনেক ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য ও তথ্য সামনে আসছে-
যেখানে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবির বিরুদ্ধে কবি

লিখেছেন অতন্দ্র সাখাওয়াত, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:১০

হে মৃত্যুহীন কবি,
কোন এক কোমল রাতে
তোমার সাথে পায়ে পায়ে
চলতে চাই হাজার বছর।
তারপর তুমি
মিলিয়ে যাবে তারার মাঝে —
তখন আমি লিখবো
তোমার না-লেখা পঙ্ক্তিমালা
কোন এক পূর্ণিমাতে।

হয়তো প্রথম পঙ্ক্তি হবে —
"সে তোমাকে ভালোবাসতো।"
তারপর সমুদ্রের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষকের মর্যাদা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:২৩


কবিতাটার কথা কি মনে আছে? বাদশাহ আলমগীর একদা প্রভাতে গিয়ে দেখলেন, শাহজাদা এক পাত্র হাতে নিয়ে শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে, আর শিক্ষক নিজ হাতে নিজের পায়ের ধূলি মুছে সাফ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৯

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×