somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বুদ্ধি তো হয়েছে, বেড়ে উঠবো কবে?

১৪ ই মার্চ, ২০১৭ সকাল ১১:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




খুব ছোট্টবেলা থেকেই আমি এমন কিছু বন্ধুর সাথে বড় হয়েছি যারা আসলে কখনোই শিশু ছিল না। এদের ছোট্ট শরীর এর মধ্যে বসবাস করতো ভীষণ বুদ্ধিমান এবং ম্যাচিওরড একজন মানুষ। এরা সব কিছু বুঝত , বুঝত যে ক্লাস বাঙ্ক মারতে হয় না , সন্ধ্যে হলেই পড়তে বসতে হয় ,পরীক্ষার আগেই সব পড়া শেষ করে ফেলতে হয় , পরীক্ষায় সব প্রশ্নের উত্তর লিখে আসতে হয় ,বাসার টিচারের পড়া কখনো ফেলে রাখতে হয় না । এরা জানতো পড়ার বই এর ভিতর গল্পের বই রেখে পড়তে হয় না , স্কুলের পড়া শেষে তারপর পড়তে হয় । আরেকটু বড় হবার সাথে সাথে এরা বুঝে যেত ইন্টারমিডিয়েট শেষ করার আগে প্রেমে পড়া যাবে না , সন্ধ্যার পর আড্ডা দেওয়া যাবে না । ভীষণ ভালো ছিলো আমার বন্ধুগুলো। ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে এদের কোন অসুবিধে হতো না । আমার বন্ধুরা সবাইই লাইফে আমরা যাকে বলি "শাইন" করা সেটা করেছে। দেখুননা স্কুলের ৭ জন বন্ধুর মধ্যে ১জন ঝরে পড়েছিলো কলেজে উঠার আগেই...বাকি ছয়জনে দু'জন বুয়েটে, ১ জন বুটেক্সে, ১ জন, চুয়েটে, ১ জন রুয়েটে। আর আমার কপালে কোন 'ET' ঝুটেনি । আমি সাধারন ভাবেই আছি ।

আমি কখনোই যে আমার এই বন্ধুদের মত ছিলাম না, বিষয়টা এমন না। কিন্তু বরাবরই আমি অন্যরকম হতে চাইতাম। একটু ভিন্ন...অনেকটা সতন্ত্র! স্কুলে ফাঁকি খুব কম দিয়েছি কিন্তু স্যার এর পড়া করিনি দিনের পর দিন। গভীর রাতে পড়ার ভান ধরে বই পড়েছি...গল্পের বই। পেকে গিয়েছিলাম দ্রুতই। জাফর ইকবার স্যারের বই ছেড়ে সুনীল ধরেছি ক্লাস নাইনেই। শেকসপিয়ারের ২৯টা নাটকের বাংলা অনুবাদের পার্টটাও সেই ক্লাস নাইনেই শেষ করা! তারপর প্রেম, ক্রাশ, দুঃখ...তারপর হাসি। হা হা হা ।
কোথায় যেন পড়েছিলাম - কবিতা প্রেমী মানুষেরা যদি খারাপও হয় তবে সেই খারাপের একটা নির্দিষ্ট সীমা থাকে। সেই থেকেই কবিতা প্রেমী! ভালো মানুষ হতে চাইতাম খুব...আমার কাছে পৃথিবীর দুইটি ভালোমানুষের উদাহরন ছিলো আমার আব্বা আর বড় ভাই :) । কিন্তু আমি আজও ভালো মানুষ হয়ে উঠতে পারনি। যেটুকু দেখা যায় সেটুকুও যেন ভান ধরা!

আমি জানিনা আমার ফিউচারটা ব্রাইট কিনা। এই নিয়ে অবশ্য খুব একটা চিন্তা অথবা আক্ষেপ নেই। কেননা আমি কখনোই ভালো ছেলেমেয়েদের মত টিপিক্যাল হতে চাইনি। কারণ এটা না যে , ওরা বোরিং । আমি ওদের মত হতে চাইনি কারণ আমি আলাদাকরে ভাবতে পছন্দ করি। আমি খুব ছোটবেলা থেকেই আর পাঁচটা বাচ্চা থেকে অনেক বেশি অন্যরকম ছিলাম, এমন একটা শিশু যে ভিন্ন কোন স্বপ্ন ধারণ করার ক্ষমতা রাখত , ভীষণ রোম্যান্টিক এবং অনুভূতিপ্রবণ একটা মন ছিল আমার । যে পরিমান পটেনশিয়ালিটি নিয়ে আমি আমার জীবনটা শুরু করেছিলাম সে পরিমান স্কিল অর্জন করতে পারিনি কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে আমার জীবনটা নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই।

আমার প্রচুর বন্ধুবান্ধব। একজন বন্ধুর জন্যে আমি কি করতে পারি তা কেবল আমিই জানি। আমার কাছের বন্ধুরাও জানে। জীবনে প্রচুর বন্ধু জুটেছে আমার। একজন/দুজন না। গড় হিসেবে তিন-চারশো ক্রস করবে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আমার খুব স্পেশাল।
আমার মনে আছে একবার স্কুলের বার্ষিক ট্যুরে আমার যাওয়ার অনুমতি মিলছিলো না। ঢাকা থেকে জাস্ট মুন্সিগঞ্জ যাবো-এটুকুতেও পরিবারে বাঁধা! আসলে...ছোট বলে ভয় পাচ্ছিলো বাসার সবাই। সেদিন স্কুলের প্রায় ২০/২৫ জন বন্ধু আমার বাসায় চলে গিয়েছিলো আম্মা-আব্বা ও ভাইয়াকে কনভিন্স করতে। বাসার ভিতর এতো জনের জায়গাও হচ্ছিলো না...তাই কেউ কেউ বাইরের সিড়িতে অপেক্ষা করছিলো। এতোজন বন্ধুকে একসাথে দেখে আম্মা অবশ্য ভাবনার পরিবর্তন করেছিলো- এই ছেলে একা না! ও যেতে পারে। আজও স্কুলের সেই ট্যুর আমার জীবনের প্রথম সেরা ট্যুর!

খুব একটা মেধাবী ছিলাম না কখনোই। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে 'গাধা-ই' ছিলাম। পড়াশোনা খুব কম-ই ঢুকতো মাথায়। কিন্তু বাসার বড়রা আমাকে না বুঝেই ঠিক ঐ আদর্শ বাচ্চাগুলোর মত করে আমাকে বড় করে তুলতে চেয়েছেন। সেটা করেছেন আমার ভালর জন্যই কিন্তু তাতে শুধু তাদের কষ্টের - পরিশ্রমের অপব্যবহার ছাড়া কিছু হয়নি । ওনারা চাইতেই বন্ধুদের মত আমাকে মেধাবী ভাবতে কিন্তু আমিতো ছিলাম মেধাশুন্য! তাই, তাদের এই প্রবল চেষ্টার কারণে আমি যা হতে পারতাম সেটাও হতে পারিনি। আমি আজও তাদের খুশি হওয়ার মত কোন উপলক্ষ দিতে পারিনি, তারাও পারেননি আমার শ্রেষ্ঠ দিকগুলোকে বুঝতে । এভাবে ভাবলে আমাদের দুই প্রজন্মকেই দুর্ভাগা মনে হয় হয়তো কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে আমি তাদের কাছে ভীষণভাবে ঋণী । প্রথমত নিজের ভুলকে শুধরে নিয়ে কিভাবে নতুন করে শুরু করতে হয় এটা আমি আমার বড় ভাইয়ার কাছে শিখেছি। আমাকে বড় হতে , স্বপ্নবান হতে শিখিয়েছেন আমার এই আদর্শের মানুষটি। একটা মানুষ কতোটা নিঃস্বার্থ হতে পারে ভাইয়াকে না দেখলে শিখতাম না। একটা মানুষ কতোটা নরম আর মায়াময় হতে পারে তা আব্বাকে দেখে শিখেছি।

আমার মা ছিলেন অন্যরকম। স্কুলের কারো সাথে ঝামেলা বাঁধিয়ে আসলে আম্মাকে বলার সাহস পেতাম না। কেননা দোষ যারই হোকনা ক্যানো আম্মা আমাকে শাসাতেন। যেন -সব দোষই আমার। কিন্তু অগোচরে ঠিকই সে বন্ধুকে শাসিয়ে আসতেন। আমাকে সেই বন্ধুর সামনে কখনোই শাসাতেন না কেননা আমি ২য় দিন মারামারি করার সাহস না করে ফেলি আবার! আম্মা চাইতেন সব সময় যেন সেরা কিছু হই। বাচ্চাদের কাব স্কাউটে আমার নামটা আম্মাই লিপিবন্ধ করে দিয়েছিলেন। সফলও হয়েছিলাম তখন- আর আম্মা হয়েছিলেন বেশ খুশি!

আমি এখন যদিও বেশ বড় হয়েছি তবুও বাসার সকলের কাছেই ছোট-ই রয়ে গেছি। কোনভাবেই বাসায় 'বড় হয়েছি' ভাব নিতে পারিনা। তবে আমি ছোট-ই থাকতে চাই।
ছোট থেকে ছোটদের নিয়ে কাজ করতে চাই। মানুষকে ভালোবাসতে চাই।
রাস্তায় কোন জির্ণ-শীর্ণ শিশুকে দেখলে আমার খুব খারাপ লাগে। আমি জানি একটা শিশুর মন কতটুকু সংবেদনশীল হতে পারে, আমি তাদের কল্পনার জগতটাকে আরেকটু কাছে এনে দিতে চাই। জানি এই যুগে এইটা কতোটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। কেননা ওরা তো জন্ম থেকে বড় হয়ে জন্মাচ্ছে-
গোল্ডেন এ+, ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার এই টার্মগুলো ওদের জন্মের পর থেকেই ফিক্সড করে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো ওদের মস্তিষ্কে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে এরা নিজেদের ভুলেই গেছে । এরা খেলতে চায় না , বই পড়তে চায় না, ফাঁকি দিতে চায় না , সব রোবট যেন একেকটা। আমি ছাত্র অনেক দেখি কিন্তু শিশু দেখি না , কিশোর কিশোরী দেখি না । মাঝে মধ্যে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হয় , খুব বেশিই সৌভাগ্যবান! আমি অন্তত নিজেকে হারিয়ে ফেলিনি ভীড়ের একজন হওয়ার চেষ্টা করতে করতে।
আমি বাচ্চাগুলোকেও সৌভাগ্যবান করতে চাই এবং এইটাই আমার স্বপ্ন :)

-- আহমেদ সাঈফ মুনতাসীর
রুম # ৩১৩, আহসানউল্লাহ হল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়!
(২০১৫ সালে হলে বসে লেখা)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মার্চ, ২০১৭ সকাল ১১:২৮
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৫

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছ- সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×