সব সময় টাকা বাঁচানোর চিন্তা না করাই ভালো। মাঝে মাঝে একটু বেশী খচর হলেও তাতে সময় আর আরাম দুটোই মেলে, উপরি এড়ানো যেতে পারে, অযথা ঝামেলা ও বিতৃষ্ণার যাত্রা। কি রকম? বলছি...
ঘটনা একঃ
কোন এক কাজে সৈনিক ক্লাব হয়ে মিরপুর ফিরছিলাম। সিএনজির জন্য অপেক্ষা করতে করতে পায়ের শক্তি প্রায় শেষ। তাই কচুখেত পর্যন্ত এলাম অন্য সিএনজিতে। কচুখেত থেকে আবার আর একটায় মিরপুর ১৪। মিরপুর ১৪ থেকে ১০ রিক্সায় আসবো না লেগুনায় উঠবো সেই চিন্তা করতে করতে দেখি একটি বাহন পরিবহনের বাস ঘুরে দাড়িয়েই ডাকাডাকি শুরু করলো।
চিন্তা করলাম নাহ, বাসেই যাই ২ টাকায় হয়ে যাবে! রিক্সায় যেখানে লাগবে ২০ টাকা আর লেগুনায় গেলে ৫ টাকা! বেশ হেলে দুলে উঠলাম বিশাল আকৃতির বাহন পরিবহনের বাহনে। আরে আমি গাধা এটা কেন ভেবে দেখলাম না যে যে বিশাল বাস, এটা তো আর আমাকে একাকে নিয়ে চলে যাবেনা! আরও মানুষ উঠবে, সিট ফিলাপ হবে, লোকজন দাঁড়াবে, ড্রাইভারকে কয়েকবার গালটাল দেবে। ড্রাইভার-হেল্পার আর বাইরের বন্ধুদের সাথে চা-পান-বিড়ি-সিগারেট উপভোগ করবে, তারপর মাইর খাবার ঠিক আগ মুহূর্তে ছাড়বে!
বসে রইলাম তো বসেই রইলাম, বাস আর ছাড়েনা! কি করি? নেমে যাবো? না থাক আর কিছুক্ষণ দেখি!
বেশ এই আর কিছুক্ষণ দেখতে দেখতে প্রায় ২০ মিনিট পেরিয়ে গেছে! অথচ দুরত্ত মাত্র তিন কিলো! ঠিক আছে এতক্ষণ যেহেতু বসেই থাকলাম, আর একটু বসিনা কেন, কানে হেডফোন লাগিয়ে? তাতে অন্তত অন্য যাত্রীদের গালাগাল আর ওদের আজাইরা চিল্লাপাল্লা থেকে কানকে রেহাই দেয়া যাবে! সেটাই করলাম। এভাবে কেটে গেল আরও প্রায় ২০ মিনিট! অথচ বাস ছাড়ার কোন লক্ষণই নেই! তবে কি নেমে যাবো? এতক্ষণ বসে থেকে! নাকি আরও একটুক্ষণ দেখবো?
আরে গাধা হেটে গেলেও এতক্ষণে মিরপুর-১০ না, মিরপুর-২ চলে যেতে পারতি! হয়তো বাসায়ও চলে যাওয়া যেত! নাহ বসেই রইলাম। জেদ চেপে গেল! নিজের কাছে নিজেরই পরাজয় মেনে নেয়ার ব্যাক্তিগত লজ্জা! তাই না উঠে বসেই রইলাম। হাঁয় সেই বাস ছাড়লো আরও প্রায় ১৫ মিনিট পরে। অবশেষে তিন কিলো রাস্তায় মোট ১৫ বার যাত্রা বিরতি দিয়ে এবং আরও প্রায় ৩০ মিনিট লাগিয়ে বাহন পরিবহনের দ্রুতগামী! ভীষণ দ্রুতগামী বাসটি মিরপুর-১০ এ এসে আমাকে ধন্য করে চিরঋণী করে রাখলেন!
রাগে-ক্ষোভে আর দুঃখে গজরাতে গজরাতে মনে হচ্ছিল, নিজের হাতের মাংস নিজেই কামড়ে ছিরে ফেলি! নিজের গালেই নিজে দুইটা কসে থাপ্পড় লাগাই! মাথার চুল গুলো দুই হাত দিয়ে উপরে ফেলি! শেষ পর্যন্ত কিছুই করতে না পেরে, ড্রাইভারকে অত্যন্ত নরম গলায় জিজ্ঞাসা করলাম...
“ভাই আপনার বাড়ি কি বরিশাল?”
ড্রাইভার মুখের কাছে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আর পায়ের কাছে পানের পিক ফেলে, দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বললেন না...! এবং জিজ্ঞাসা করলেন কেন?
বললাম, না আপনি যেভাবে বাস চালাইলেন ভাবলাম আপনার বাড়ি বরিশাল!
মানে কি, বাস চালানোর সাথে বাড়ি বরিশাল হবার মিল ক্যামনে পাইলেন আপনি?
না মানে, বরিশালে তো সব জায়গায় বাস চলেনা, নৌকাই বেশী চলে তো... আপনি মনে হয় আগে নৌকা, মানে ডিঙ্গি নৌকা চালাইতেন, তাও উজানে, মানে ধীরে... ধীরে... ধীরে... ধীরে...... নৌকার তো ইঞ্জিন থাকেনা...
তাই মনে হইলো যে আপনি আগের অভ্যাস ভুলতে পারেন নাই! বাসটাকে আপনার আগের ডিঙ্গি নৌকা মনে করে চালাইছেন...!!!
এইবার মামা ড্রাইভার এমনই ক্ষেপা খেপলেন যে ওনার সাঙ্গ-পাংগ ডাকা শুরু করলেন, আমাকে কোনটা বাস আর কোনটা নৌকা সেটা বোঝাবার জন্য!
আমি পরে মরে কোন মতে বাসের জানালার কাঁচ দিয়ে নামার জন্য লাফ দিতে রেডি, কারণ ইতিমধ্যেই বাসের হেল্পার নামার দরজায় এসে বল্ক করে দাঁড়িয়েছে, যেন নামতে না পারি!
লাফ দেবার পরে পারলে পুরা গাড়ি গাঁয়ের উপরে তুলে দেয় ইচ্ছা করে! কোন মতে জান হাতে করে ১০ নাম্বার গোল চত্বর পেরোলাম! তবে কানে ভেসে আসছিল, ড্রাইভারের ভাণ্ডারেরে সকল গালির শ্রুতিমধুর স্টক একে একে......!
আর প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর যাইহোক কোনদিন বাহন পরিবহণে আর উঠবোনা আর জানা সত্তে কাউকে উঠতেও দেবনা!
ঘটনা দুইঃ
কোন একটা বাংলা একাডেমী গিয়েছিলাম। বাসায় ফিরবো, এমন সময় বাসার ফোন আর একটা কাজে যেতে হবে মতিঝিল। তখন মধ্য দুপুর। ঠিক আছে, কি আর করার। শাহবাগ মোড়ে রাস্তা পার হলাম। বেশ কয়েকটা গাড়ি দাড়িয়ে আছে। যেতে হবে তাড়াতাড়ি তাই সামনে যেটা পেলাম সেটাতেই উঠে পরলাম হুড়মুড় করে! ডানে-বায়ে, আগে-পিছে না তাকিয়েই! অথচ সামনে গাড়ি আছে আর পিছনে তো আছেই! তবে আমি কেন ওদিকে গেলামনা? ভাবলাম এটা ভরা গাড়ি, তাড়াতাড়ি যাবে, ওগুলো তো খালি, যাত্রী উঠবে তারপর ছাড়বে। তাই এটাই বেশ। কিন্তু কপাল যে আমার এমন হবে সে কি ভেবেছিলাম? কি সেটা? চলুন শুনি......
গাড়িতে ওঠা মাত্রই, ভাই পিছে যান, গেট ছাইড়া খারান! মাঝে ফাঁকা আছে, একটু পরে ফাঁকা হবে, তখন সিটে বসবেন, ইত্যাদে। ঠিক আছে চলে গেলাম প্রায় পিছনে। যেতে যেতেই দেখলাম সামনের আর পিছনের গাড়ি গুলো সব একে একে দ্রুত গতিতে চলে গেল, শাহবাগ ছাড়িয়ে। আর আমার গাড়ি? সে ঠায় দাড়িয়ে!
কেন ঘটনা কি? একটু এদিক সেদিক করে বুঝতে পারলাম আমি ঠিক গাড়িতে উঠিনি। তখনো জানিনা যে আমি কোন গাড়িতে উঠেছি। ভাবলাম, ঠিক আছে সামনে মৎস ভবন গেলেই তো ফাঁকা হবে, তখন সিটে বসবো। কিন্তু না কোন রকমে ঠেলা গাড়ির মত করে পৌছালো মৎস ভবন, কিন্তু বসার যায়গা আর হলনা! ভাবলাম প্রেসক্লাব গেলেতো ফাঁকা হবেই! সুতরাং আর একটু। কিন্তু প্রেসক্লাব গিয়ে থামতে না থামতেই দেখলাম, লোক নামার চেয়ে, উঠছে বেশী! এখন আগের চেয়ে আরও বেশী যাত্রী ঠেসে ঠেসে তুলছে! এবার আমার তো মাথাই নষ্ট!
একে ওকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম যে এই গাড়ি আসলে মতিঝিল-খিলগাঁও হয়ে তালতলা যায়, তাই এটাতে যে কোন জায়গায় লোক নামার চেয়ে, ওঠে অনেক অনেক বেশী! এই গাড়িতে সিট পাবার সম্ভাবনা মাসের ১৫ তারিখে বেতন পাবার সম্ভাবনার সমতুল্য! হায়, হাঁয় বলে কি? ভাই এই গাড়ির নাম কি আর কোত্থেকে আসে? এইবার আমার মাথায় বাজ পরার মত করে শুনলাম যে এটা সেই বাহন পরিবহন! শুনে বাজ পরে যেমন কান বন্ধ হয়ে যায়, বা দম ধরে থেকে কিছুক্ষণ, ঠিক আমারও সেই দশা হয়েছিল!
এরপর... প্রেসক্লাব থেকে, জ্যাম-যাত্রা বিরতি-ইঞ্জিনে পানি দেয়া, ঝগড়া-মারামারি-বাসের সাথে বাসের লাগিয়ে দেয়া, গ্লাস ভাঙা, রাস্তা বন্ধ করে গাড়ি যেতে না দেয়া, ইত্যাদি ইত্যাদির পরে যখন তিনটায় মতিঝিল পৌছালো তখন গাড়িতে আর তিল ধারনের ঠাই নেই, আর মতিঝিলে নামারও কেউ নেই, যে কারণে চরম ভিড় ঠেলে-ঠুলে আমাকে গেটের কাছে যেতে যেতে বাস চলে গেল কমলাপুরে...!!!
মনের দুঃখে, শোকে, পাথর হয়ে আবার ৩০ টাকা রিক্সা ভাড়া করে মতিঝিলের পথ ধরলাম! আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, না আর উঠবোনা তা নয়। এবারের প্রতিজ্ঞা শালা একদিন সময় করে পর্যাপ্ত পানি আর শুকনা খাবার সাথে ফুল চার্জ মোবাইল, নেট সংযোগ আর গানের সম্ভার নিয়ে সকালে উঠবো বাহন পরিবহণে মিরপুর-১৪ থেকে আর নামবো গিয়ে সেই তালতলা!
আর যাই হোক না হোক পুরো ঢাকা তো দেখা হয়ে যাবে এক জার্নিতে...... সাথে যদি সঙ্গী থাকে কেউ তো কথাই নাই আর।
গল্পে-কথায় আর আড্ডায় কেটে যাবে সেই দিন! কবে আসবে সেই দিন? আমি সেই দিনের অপেক্ষায়.........!

সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৩:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




