সন্ধার আগ পর্যন্ত আমার মনেই ছিলনা যে আজ শবে বরাত! কি জানি একটা কাজে হলের ক্যান্টিনের কাছে গিয়ে দেখি ক্যান্টিন বন্ধ, জানলাম শবে বরাত উপলক্ষেই এই অবস্থা। রুমে এসে বসতেই লোকজনের বিশেষ প্রস্তুতি লক্ষ্য করলাম। এর পরতো শুরু হলো পুরোদমে ডাকাডাকি, 'এই তোরা এখনো প্রস্তুত হস নাই!', 'কখন যাবি নামায পরতে!! আরে দেরি হয়ে যাচ্ছেতো!!!..। অথচ তখনও অন্তত আধা ঘণ্টা বাকি এশা'র নামাযের!
এই সময় পরিষ্কার-ধোয়া সদ্য ভাজ ভাঙা কাপড় পরে উপস্থিত হলো বন্ধু সুমন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র সুমন খুবই ভাল এবং মেধাবী। ওর সামনেই চট্রগ্রাম থেকে বন্ধু সাজ্জাদ'র ফোন এলো। ফোনে কথা শেষ হবার পর সুমন বলল; আচ্ছা তুমি একটু আগে শবে বরাতের ব্যাপারে কি জানি বললা ফোনে? বললাম শবে বরাত বলে আসলে বিশেষ কোন কিছুই নাই ইসলামে। সুমন বলল, এইটা তুমি কি বল? এত বছর ধরে যতো জায়গায় গিয়েছি, যতো হুজুরের সাথে কথা বলেছি কেউ তো এরকম কোন কথা কখনো বলেনি? আমার আগেই বন্ধু আসিফ বলে উঠল "ওদের তো চলতে হয় সমাজের চাহিদা অনুযায়ি, সমাজ যা চায় তা যদি না পায় তাহলে ত আর ওদের চলবেনা!"
ভেবে দেখলাম আসলে এই পেটের দায়ই হলো যতোসব ভিত্তিহীন বিশেষ দিবসের 'ভিত্তি'। আর ওই পরজীবি ধর্মজীবিদের হাতেই এদের জন্ম ও ক্রমবিকাশ!
আমি জেনেছি এবং বিশ্বাস করি, যে কেউ যে কোন সময় যে কোন ভাল কাজ করতেই পারে এবং এর প্রতিদানও সুনিশ্চিত। কিন্তু কোন ভাল কাজকে কোন নির্দেশনা অথবা প্রমান ছাড়াই একটা দিনের সাথে সম্পৃক্ত করা অন্যায়। এতে মানুষ ভুল আর কুসংস্কারে বিশ্বাসি হয়ে উঠে। নির্ভেজাল বিশ্বাস আর জীবন ধারা এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
এটা খুবই আনন্দের বিষয়, যে লোকজন একটা দিন সবাই একসাথে মিলে ইবাদাত-বন্দেগি করবে রাতভর। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যারা এই বিশেষ দিবসে বিশেষ বিশেষ ইবাদাত করেন তাদের একটা ভাগ দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের নির্দেশনা অনুসরন করার প্রয়োজনিয়তাও অনুভব করে্ননা। প্রশ্ন হলো কেনো এই বৈপরীত্য? একদিন সারা রাত মসজিদে কাটিয়ে দিলাম, এর পর কয়েক মাস ওদিকে ফিরেও তাকালাম না! দুর্নীতি, আনাচার, অবিচার সবই আমরা করি অনায়াসে।
পারিবারিক ভাবেই কুসংস্কার বৈরী পরিবেশে বেড়ে উঠার সুবাদে বিষয় গুলো আমাকে খুব ভাবায়। এইযে লোকজন কত আয়োজন করে প্রস্তুতি নিয়ে ইবাদাত করতে বেরহচ্ছে অথচ মনের ভেতর পুষছে একগাদা ভুল বিশ্বাস আর মিথ্যা আশা। শবে বরাত কে নিয়ে যে সব অলীক কল্পনা যুগযুগ ধরে পরজীবি ধর্মজীবিরা লোকজনের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে তা যে সহজেই বের হবার নয় এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।
এমনিতেই কতো উদ্ভট সংস্কারে ভরা আমদের সমাজ, সেখানে আবার দিন দিন এই শবে বরাত কেন্দ্রিক ভুল ধারনা গুলো জমাট বেধে যাচ্ছে।
এই পরজীবিরাই ইসলামকে মানুষের কাছে একটা দুরবোধ্য এবং দুরভেদ্য বিষয় বানিয়ে ছেড়েছে। গতানুগতিক একটা 'ধর্মে' রূপান্তরিত করেছে মনবতার সবচেয়ে সুন্দর ও সুষম জীবনধারাকে। ইসলামের মৌলিক উৎস থেকে সমাজকে রেখেছে নিরাপদ দূরত্বে, যাতে মধ্যসত্ত ভোগি হিসেবে তারা টিকে থাকতে পারে চিরকাল।
বছরের পর বছর ধরে ছেলে-মেয়েদের কে আরবি পড়তে শেখায়, কিন্তু বুঝতে শিখায়না! কেন! হয়ত এরা নিজেরাই বুঝেনা, অথবা বুঝানোটাকে প্রয়োজনই মনে করেনা।
আসলে এই সব কিছুই আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রতিবিম্ব। যেখানে সততা, ন্যায়পরায়নতা আর মূল্যবোধের অস্তিত্ব প্রায়ই যাদুঘরে ঢুকতে বসেছে সেখানে তো সেই শতাব্দিকাল ধরে চলে আসা আমাদের কুসংস্কার প্রবনতা টিকে থাকেবে এটাই তো স্বাভাবিক তাইনা!
তবুও সময় এগিয়ে যাচ্ছে, সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে জীবনধারা! তাই উন্নয়ন আর প্রগতির পথে যেতে যেতে শুধরে নিতে হবে আমাদের বিশ্বাস আর মুল্যবোধ ব্যবস্থা, সুন্দর আর যৌক্তিক পথে পরিচালিত করতে হবে আমাদের কর্মধারা।
শবে বরাত বিষয়ক প্রামান্য আলোচনা জানতে নিচের লিংকগুলো দেখতে পারেন, ওখানে বেশকিছু গবেষনামুলক নিবন্ধ এবং প্রশ্নোত্তর প্রমান সহ দেয়া আছে!
View this link] http://www.islamhouse.com/s/9739
View this link
View this link
View this link
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ রাত ১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





