ক্রমাগত আশাহত হয়ে নিজেদের আমরা বড়ই দুর্ভাগা হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। বঞ্চনার পর বঞ্চনা প্রতি নিয়ত আমাদের নিরাশার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। আমারা বিশ্বাস ‘করতাম’ সময় একদিন বদলাবেই, তবে বিরাজমান দৃশ্য আমাদের এখন আবার ভেবে দেখেতে প্ররোচিত করছে। সময় হয়ত বদলেছে, কিন্তু চরিত্রগুলো থেকে গেছে স্থবির। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদি শক্তি থেকে পাকিস্থানি স্বৈরশাসন হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা পর্যন্ত সাধারন জনতা ক্রমাগত স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় কাতরালেও আমাদের কথিত জননেতারা কখনও ফিরে দেখার সুযোগই পাননি, এবং কেউ জনসাধারনের কথা বলিষ্ঠ কন্ঠে বলুক সেটাও তাঁরা মেনেনিতে পারেননি। তাই নতুন কোন জনতাবাদি নেতার আবির্ভাবকেও উনারা মেনে নিতে পারবেননা এটাই স্বাভাবিক। এভাবেই ধারাবাহিক ভাবে দেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলো পরপর বিভিন্ন জোট মহাজোটের মাধ্যমে ক্ষমতার স্বাদ উপভোগ করলেও তাদের কেউই ডাকসু’র বেচে থাকাকে মেনে নিতে পারেননি। যখন দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলো, ঠিক তখন থেকেই দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়’র ছাত্র সংসদগুলোকে গলাটিপে হত্যা করাটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য যে সত্যিই অনেক লজ্জার সেটা যে আমাদের জনবিচ্ছিন্ন জননেতারা অনুভব করবেননা এটা মানুষ বুঝে। কিন্তু আমাদের সর্বজন শ্রদ্বেয় শিক্ষক মহলও যে গড্ডালিকায় এভাবে গা ভাসাবেন এটা আমাদের বুঝতে সময় লেগেছে দীর্ঘ ২২ বছর। তাই আমাদের এই শ্রদ্বেয় শিক্ষক মহল যখন লাল-নীল দলে বিভক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন আমরা অত্যন্ত কষ্ট পেলেও খুব বেশি অবাক হইনা। আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী’ সকল শ্রেণী’র শ্রেণী স্বার্থ রক্ষার্থে প্রতিটা সমিতির নির্বাচন নিয়মতান্ত্রিক ভাবে হয়ে আসলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ডিঙ্গিয়ে ছাত্রছাত্রী সংসদগুলোকে বরাবরই রাখা হয়েছে মৃত। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়তো ওই ধরনের সংবিধান রাখারও প্রয়োজন মনে করেনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’র সর্বোচ্চ সিনেট থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী সমিতি পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে প্রতি বৎসর নির্বাচন হয় মহা সমারোহে। কিন্তু যাদের কেন্দ্র করে এই বিদ্যাপীঠ, যারা আগামীর পথগামী তাদেরই কোন কার্যকরী অবস্থান রাখার প্রয়োজন অনুভব করেননা এখনকার কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবী’র একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখান থেকে একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের সকল উপাদান সরবরাহ করা হয়েছে সাফল্যের সাথে। এটা কেবলমাত্র একটা প্রতিষ্ঠান নয়, এটা একটা জীবন্ত ইতিহাস, একটা জাতিসত্ত্বার আঁতুড় ঘর। ৪৭’র দেশ ভাগের অব্যবহিত পরে শুরু হওয়া ভাষা ও জাতিসত্ত্বা কেন্দ্রিক গণজাগরণ থেকে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা ও ৬৯’র গণ অভ্যুত্থান হয়ে ৭১’র স্বাধীনতা প্রাপ্তি, প্রতিটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও কার্যকরী বাস্তবায়নের পেছনে রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি অবদান। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতাত্তোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সমান ভাবেই ভূমিকা রেখে আসছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ৯০’র স্বৈরাশাসন বিরোধী গণঅভ্যুত্থান সহ সর্বশেষ সামরিক শক্তি প্রভাবিত অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিরোধী আন্দলনেও এই প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রেখেছে উদার ও বলিষ্ঠ ভাবে। ডাকসু ছিলো এ সকল কিছুরই কেন্দ্রবিন্দু, যার ফসল ভোগ করেছে এদেশেরই সাধারণ জনতা, কৃষক-শ্রমিক-দিনমজুর। প্রতিদানে এই প্রতিষ্ঠান পেয়েছে চরম উপেক্ষা আর বঞ্চনা। দুর্নীতির ভয়াল ছোবল মুক্ত রাখা যায়নি জাতীয় গর্বের প্রতীক বিশ্ব মানের এই শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিকে। উত্তরোত্তর উন্নয়নের বিপরীতে আমাদের দেখতে হয়েছে লজ্জা জনক অধোমুখী যাত্রা। আর ভয়ঙ্কর সংকীর্ণ স্বার্থ কেন্দ্রিক সংঘাত আমাদের টেনে নিয়ে গিয়েছে নিরাশার চোরাবালিতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও কৌশলগত অবস্থান এমন একটা জায়গায় পৌছেছে, যেখান থেকে স্বাভাবিক ভাবেই সারা দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও শিল্প-সাহিত্যিক মানদণ্ড তৈরি করে দেয়া যায় অনায়াসেই। তাই সামগ্রিক শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলনের সূচনা এখান থেকেই আশা করে আসছে জনতা। সেই আশা থেকেই সাধারণ মানুষ যুগ যুগ ধরে পোষণ করে আসছে অগাধ আস্থা ও সম্মান। এখন প্রতিটা আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রীই অনুভব করে জনতার সেই সম্মানের ঘাটতি আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। মানুষ আর কতো স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্ট সহ্য করবে? দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের কাছ থেকে তো মানুষ একটু বেশি কিছু আশা করতেই পারে, অপ্রাপ্তির যন্ত্রণায় অভিমানও করতে পারে, এটা তাদের মজ্জাগত অধিকার।
বিচারের বাণী এখন আর নিভৃতেও কাঁদেনা, লজ্জায় মুখ লুকায়। ওই দিন হাই কোর্টের রিট আবেদনের শুনানি থেকে আমাদের সম্মানিত এটর্নি জেনারেল সাহেবের নির্লজ্জ পলায়নের ফলে পবিত্র আদালত প্রাঙ্গণেই কঠিন স্লোগানে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিল করতে হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের ক্ষেত্রে যদিও আদালত তার নিজ গতিতে এগিয়ে যাবে, তবে আমরা দেখতে চাই আমাদের উপাচার্য ও কর্তৃপক্ষ মহোদয় মহামান্য আদালতে দেয়ার মতো কি কি যুক্তি তৈরি করে রেখেছেন। দীর্ঘ বাইশটি বছর ধরে জনতাকে অসংখ্য তেজদ্দিপ্ত, আশাবাদী ও স্বপ্নদর্শী নবীন নেতৃত্ব বঞ্চিত রাখার কালো জাদু’র গল্পটা আমরা করতৃপক্ষ’র মুখেই শুনতে চাই।
বিশ্ববিদ্যালয়’র মান্যবর শিক্ষকগণের প্রতি যথাযথ সম্মান নিয়েই সবিনয়ে বলতে চাই, আমারা হয়তো আপনাদের জন্য ধিক্কার স্তম্ব স্থাপন করতে পারবোনা, তবে যে আওয়াজ আমরা তুলেছি এই বাইশটি বছর পর, সে আওয়াজের তীব্রতা হয়তো একদিন আপনাদের সহ্যের সীমানা ছাড়িয়ে যাবেই। আপনার যে সন্তানটির জন্ম আজ থেকে বাইশ বৎসর আগে, সে কি এখনও আপনার সকল অযৌক্তিক দাবী বা কর্মকাণ্ড নিরবেই মেনে নেয়? একটু ভেবে দেখবেন আশা করি। দেশ ও জাতির প্রতি এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের যে দায়বদ্ধতা সে তো শিক্ষক-ছাত্র উভয়ের কাঁধে বর্তায় সম্মিলিত ভাবেই। আমাদের বিশ্বাস, ডাকসু’র স্বাভাবিক ও যথার্থ পুনঃরোভ্যুত্থান দেশময় সকল সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সহ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জাগরণের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
সবশেষে একটি কথা, “সময়” বড়ই গতিময় ও নিষ্ঠুর, ওর কাছে রাজা-প্রজা, ছোট-বড়ো, ধনী-গরিব সব একাকার। যারা সময়ের পরিবর্তন মেনে নিতে পারেনা, সময় তাদের একটুও ছাড় না দিয়ে এগিয়ে যায়, পশ্চাদপদ আর জরাগ্রস্থদের পেছনে ফেলেই। আর কোন আত্মমর্যাদাশীল আধুনিক নাগরিক কক্ষনো পিছিয়ে যেতে চায়না। তাই এখনো আমারা বিশ্বাস করি, কোন শিক্ষক কখনো ছাত্রদের এগিয়ে যাওয়ার গতি শ্লথ করে দিতে পারেননা। তাঁরা চাইবেন তাদের ছেলেরা ঘর থেকে বেরিয়ে বাহিরের পৃথিবীটাও জয় করুক। উপরোন্তু, সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এই বাইশ বছরে বুঝে গিয়েছে খুব সহজেই তাদের এই মৌলিক অধিকার প্রাপ্য নয়। আর অধিকার আদায়ের সব পথও তাদের বহু বছরের পরিচিত।
ডাকসু হচ্ছে বাংলার পুনরজাগরন নামক আগ্নেয়গিরির "জ্বালামুখ", দেশের সকল স্বৈরাচারী ও অনাচারী অপশক্তির যমদূত। ডাকসুর পথ ধরে দেশময় নতুন প্রজন্মের উত্থান বয়ে আনবে উত্ত্বপ্ত ও জ্বলন্ত লাভার বিধ্বংসী স্রোত, যাতে একযোগে ভেসে যাবে সমাজের স্থবিরতার যত কালিমা, ভেসে যাবে সাম্রাজ্যবাদি ও তাঁদের পদলেহি উচ্ছিষ্টভোগী পতিত অপশক্তি। আমরা তাই খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারি ডাকসু সহ সারা দেশের ছাত্রছাত্রী সংসদগুলো অকার্যকর পড়ে থাকার পেছনে কারা কলকাঠি নাড়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে যারা পড়ে, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে ভাবার বিষয় দূরে থাক, তাঁদের নিজেদের অধিকার নিয়ে চিন্তা করারও সুযোগ দিতে নারাজ ওই অপশক্তি। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছি; সরকারি বেসরকারি নাম দিয়ে নতুন প্রজন্মের জাগরণ আটকে রাখা যাবেনা, ইতিবাচক ও উদ্যমী রাজনীতিকদের পথ বন্ধ করা যাবেনা, তবে কুটিল ষড়যন্ত্রের কারনে একটু আমাদের যাত্রা একটু প্রলম্বিত হতে পারে মাত্র!
আমরা বিশ্বাস করি, ডাকসু কখনই ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের একক বিষয় ছিলোনা, বরং সর্বাত্মক ও সর্বজনীন জাগরণের উৎপত্তিস্থল হিসেবেই কাজ করে এসেছে যুগ যুগ ধরে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে এপ্রিল, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





