মায়াদ (معاد) শব্দের উৎপত্তি আউদ (عود) শব্দমূল থেকে যার অর্থ পুনরুত্থান। কেননা রুহকে পুনরায় শরীরে প্রত্যাবর্তিত করা হবে।
মায়াদের (মৃত্যু পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস) বিষয়টি উসূলে দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত এবং তার প্রতি বিশ্বাস রাখা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। বিশ্বাস রাখতে হবে যে প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হবে এবং তার কৃত কর্মের পরিণাম ও ফল ভোগ করবে।
মায়াদের শুরু যেহেতু মৃত্যু, কবর, বারযাখ অত:পর পুনরুত্থান দিবস এবং শেষ হয় বেহেশত অথবা জাহান্নামের মাধ্যমে তাই বিষয়টি পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা অনুধাবন করা সম্ভবপর নয়। যদিও এ বিষয়টিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব যা নিয়ে আমরা পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করব। তবে আমাদেরকে বুঝতে হবে মৃত্যুর পর যে কি ঘটবে তা কারও পক্ষে এমনি এমনি অনুধাবন করা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। এসম্পর্কে জানতে হলে ওহীর শরণাপন্ন হওয়া একান্ত অপরিহার্য। কেননা যে যে পর্যায়ে বা জগতে রয়েছে তার উপলব্ধিও সে পর্যায় ও জগতের সীমার ঊর্দ্ধে নয়। যেমন মাতৃগর্ভে অবস্থানরত শিশুর পক্ষে এই পৃথিবীর বিশালতা, মহাবিশ্বের অসীমতা এবং তাতে যা যা রয়েছে সে সম্পর্কে জানা বা উপলব্ধি করা অসম্ভব ব্যাপার। অনুরূপভাবে যারা পৃথিবীতে বসবাস করছে এবং পার্থিবতার মধ্যে নিমজ্জিত তাদের পক্ষে আধ্যাত্মিক ও পারলৌকিক জগৎ সম্পর্কে জানা অসম্ভব। কেননা তা বস্তুজগতের অন্তরালে রয়েছে এবং তার শুরু এই নশ্বর জগৎ থেকে বিদায় নেওয়ার পর। মোটকথা যারা দুনিয়াতে বসবাস করছে তাদের কাছে পরকালের সকল বৈশিষ্ট্য অদৃশ্য এবং অজানা তাই সে সম্পর্কে জানতে হলে মহান স্রষ্টার বাণীকে মেনে নেওয়া ব্যতীত আমাদের সামনে আর দ্বিতীয় কোন পথই অবশিষ্ট থাকে না।
অতএব যদি কেউ বলে যে মৃত্যুর পর এরূপ হবে বলে আমার বুদ্ধিবৃত্তি মেনে নিতে পারে না তবে তার কথা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা পরকালের বৈশিষ্ট্য বোঝার সাথে বুদ্ধিবৃত্তির কোন সম্পর্কই নেই এবং সকল জ্ঞানী ব্যক্তিরাও যদি একত্রে বসে পরকালের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানার চেষ্টা চালায় তারা কিছুই জানতে পারবে না। সত্য হচ্ছে মাহনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত (আ.) যা বলেছেন এবং আমরা সেটাকেই বিশ্বাস করি। কেননা তাঁরা হচ্ছেন নিষ্পাপ,ভুলের ঊর্ধে এবং মহান স্রষ্টার ওহীর অবতরণ স্থল।
মৃত ব্যক্তি কি কথা বলতে পারে?
এ বর্ণনার মাধ্যমে অজ্ঞরা এ বিষয়ে যে সকল সন্দেহের অবতারণা করে থাকে তা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হল। যেমন তারা বলে থাকেঃ কোন ব্যক্তি মরে গেলে তার শরীর জড়পদার্থে পরিণত হয়ে যায় কাজেই তার আবার প্রশ্নোত্তর কিসের? আমরা যদি মৃতের মুখের মধ্যে কিছু পুরে দেই এবং পরের দিন কবর খুঁড়ে দেখলে দেখব যে তার মুখে যে জিনিসটি পুরে দেয়া হয়েছিল তা সে অবস্থাতেই রয়েছে। (এ সকল প্রশ্নের উত্তর অতিসত্তর আপনাদের জন্য স্পষ্ট হয়ে যাবে)।
এসকল সন্দেহমূলক প্রশ্নের অবতারণা আখেরাত ও সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং অদৃশ্যের প্রতি ঈমান না থাকার কারণেই উত্থাপিত হয়ে থাকে। জ্ঞানের স্বল্পতা ও সঠিক উপলব্ধির অভাবেই তারা এরূপ আশ্চর্যবোধ করে থাকে। তারা মনে করে যে শুধুমাত্র জিহবা দিয়েই কথা বলা সম্ভব, রুহ কথা বলতে পারে না। শুধুমাত্র পশুর ন্যায় পা থাকলেই কেউ চলাচল করতে পারে, রুহ চলাচল করতে পারে না। অথচ প্রতিদিন মানুষ ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখে এবং কত কথা বলে অথচ তার জিহবা ও ঠোঁট মোটেও নড়াচড়া করে না এবং যে তার পাশে জেগে থাকে সেও তার কোন কথা শুনতে পায় না। অনুরূপভাবে সে স্বপ্নের মধ্যে সারা বিশ্বে বিচরণ করে অথচ তার শরীর বিছানায় স্থির হয়ে পড়ে থাকে।
স্বপ্নের গুরুত্ব
হযরত ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.) বলেছেন: সৃষ্টির প্রথম দিকে মানুষ স্বপ্ন দেখত না। পরবর্তীতে আল্লাহ মানুষকে স্বপ্ন দান করেছেন। এর কারণ হল যে, আল্লাহ্ পাক একজন নবীকে (আ.) তাঁর জামানার মানুষের হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করেন। সেই নবীও (আ.) জনগণকে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগির জন্য আহবান জানালেন। তারা বলল,‘আমরা আল্লাহর ইবাদত করলে কি কোন প্রতিদান পাব? অথচ আমরা দেখছি তোমার ধন-সম্পদ আমাদের চেয়ে অধিক নয়।’ সেই নবী (আ.) বললেনঃ যদি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি কর তার প্রতিদান হল বেহেশত আর যদি গুনাহ কর এবং আমার এ আহবানে সাড়া না দাও তাহলে তোমাদের স্থান জাহান্নাম। তারা বলল: বেহেশত্ -দোজখ আবার কি জিনিস? নবী (আ.) তাদের জন্য উভয়েরই বর্ণনা দিলেন এবং ব্যাখ্যা করলেন। তারা বলল: কবে সেখানে পৌঁছাব। নবী বললেন: মৃত্যুর পর। তারা বলল: আমরাতো দেখি আমাদের যারা মারা গেছে তাদের সকলেই পঁচে গলে মাটি হয়ে গেছে এবং আপনি যা বললেন তার কোন খবরই নেই। অতঃপর তারা সেই নবীকে অস্বীকার করল।
আল্লাহতা’লা তখন তাদেরকে (احلام) স্বপ্ন দান করলেন। তারা স্বপ্নে দেখল যে তারা ঘুমের মধ্যে খাচ্ছে, পান করছে, চলাফেরা করছে, কথা বার্তা বলছে, শুনছে এবং আরও কত কি। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে তার কোন অস্তিত্বই দেখতে পেল না। অতঃপর তারা সেই নবীর কাছে গেল এবং তাদের স্বপ্নের কথা বর্ণনা করল। নবী (আ.) বললেন: আল্লাহ তোমাদের জন্য অকাট্য প্রমাণ দেখিয়ে দিয়েছেন। তোমাদের রুহ (আত্মা) এরূপই। মৃত্যুর পর বাহ্যত তোমাদের শরীর পঁচে গেলেও তোমাদের রুহ কিন্তু ঠিকই জীবিত থাকে এবং কর্মফল অনুসারে শাস্তি অথবা শান্তি ভোগ করে থাকে।
মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে অস্বীকার করা মুর্খতার শামিল
সম্ভাবনাকে মেনে নেয়া বুদ্ধিবৃত্তির পরিচায়ক। انما يعرف عقل الرجال بکثرة محتملاته অর্থাৎ যদি কোন বিষয় শোনা হয় এবং তা যদি অসম্ভব কিছু না হয় তাহলে ধারনা করা উচিৎ যে বিষয়টি হয়তো সত্য আর যদি সংবাদ দাতা মাসুম (নিষ্পাপ) হন তাহলে তো তা অবশ্যই সত্য। কম বুদ্ধি সম্পন্ন অথবা মুর্খ হলে বলবেঃ এ আবার কি কথা যে সম্ভাবনাসমূহকে অস্বীকার ব্যক্তির ক্ষুদ্রতা ও ধারণক্ষমতার স্বল্পতাকে প্রমাণ করে। একারণেই এমন ব্যক্তির পক্ষে অলৌকিক ও বস্তুর ঊর্দ্ধের বিষয় মেনে নেয়া দুরূহ ব্যাপার। কিয়ামতকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বা বিশদভাবে বর্ণনার কোন প্রয়োজন নেই। মৃত্যুর প্রথম থেকে শেষ মঞ্জিল সম্পর্কে রাসূল (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত (আ.)হতে যা বর্ণিত হয়েছে তাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


