somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মৌ (গল্প)

২৯ শে অক্টোবর, ২০১৪ রাত ৯:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ একটু দেরিতেই অফিস থেকে বের হল মৌ । বেলা প্রায় শেষ । ঘড়িতে ঘন্টার কাটা ৬টা ছুঁই ছুঁই । নীলক্ষেতে এসে রিক্সা থামল । এখন রাস্তার ওপারে গিয়ে বাস ধরতে হবে । এই সময়ে বাসা ওঠা তো রীতিমত সংগ্রাম । আধঘন্টা একঘন্টা চেষ্টা করেও অনেক সময় উঠা যায় না । কী যে বিরক্তকর সেই মূহুর্তটা !

রাস্তা পারাপারে কোন ঝুঁকি নেয় না মৌ । প্রতিদিনের মত আজও সে ওভারব্রিজে পা রাখল । পাঁচটা সিঁড়ি পার হতেই একটা চেনা মুখ তার চোখে পড়ল । অতি চেনা মুখ । নীচের দিকে নেমে আসছে । আরে এটা তো রাহুল ! থমকে দাঁড়াল মৌ । তার চোখে মুখে বিপুল উচ্ছ্বাস । কত দিন পরে রাহুলের সঙ্গে দেখা ! রাহুল আর তার ব্যবধান এই মূহুর্তে মাত্র এক সিঁড়ি । মৌ বলে উঠল— ‘আরে তুমি এইখানে রাহুল !’

রাহুলের চোখে মুখেও ভীষণ বিষ্ময়; সেইসঙ্গে হাসি । দুজন দুজনের মুখে পলকহীন তাকিয়ে আছে । কারও মুখে কোন শব্দ নেই । রাহুল কিছু একটা বলতে গিয়ে আবার থেমে গেল । মলিন হয়ে উঠল রাহুলের মুখ । মৌয়ের মুখে এখনো হাসি লেগে আছে । ‘তুমি কেমন আছ রাহুল ?’ মৌ জিজ্ঞেস করে ।

রাহুল একদম নিঃশ্চুপ । মৌয়ের সুহাস্য মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় রাহুল । একদম অচেনা মানুষের মত আর একটি বাক্যও উচ্চারণ না করে নীচে নেমে যেতে থাকল সে । মৌয়ের মুখে লেগে থাকা হাসি হঠাৎ মুছে গেল । ‘ যেও না রাহুল । প্লিজ দাঁড়াও । প্লিজ দাঁড়াও । আমি জানি আমার জন্য তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ । আমার উপর তোমার রাজ্যের অভিমান । তারপরও একটু দাঁড়াও রাহুল । প্লিজ ।’ মৌ রাহুলের পিছু নিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে থাকল ।

রাহুল থমকে দাঁড়াল । পিছন ফিরে দেখল, নিরীহ দৃষ্টিতে তার দিকে মৌ তাকিয়ে রয়েছে । চোখে অশ্রু টলমল করছে । রাহুল বিশ্বাস করতে পারছে না, এই সেই মৌ । ছয় বছর আগে এমনি এক ক্লান্ত সন্ধ্যাবেলায় যাকে সে শেষবারের মত দেখেছিল । তারপর আর কোনদিন তাকে একটুও দেখতে ইচ্ছে হয় নি । সেদিন মৌ কত কঠিন স্বরে বলছিল— ‘ আমার সঙ্গে এটাই তোমার শেষ দেখা । এতদিন তোমার সঙ্গে আমার যা ছিল, যত তাড়াতাড়ি পারো ভুলে যেও ।’ আজো স্পষ্ট মনে আছে রাহুলের । আহা ! কত কান্নাই না সেদিন রাহুল করেছিল । কত অবুঝ ছিল সে !
আজকের মৌকে দেখে রাহুলের বুকের ভিতরটা কেমন টনটন করে উঠল । মনে হল, যে প্রেমকে সে এতদিন মৃত বলে ভেবেছে, সে যেন আবার প্রাণ ফিরে পেল । কিন্তু সেদিন মৌ এমন আচরণ করল কেন ? সে কেন এভাবে তাকে ছিটকে দিল ? সে কি তাকে বিয়ে করতে বলে ভুল করেছে ? না না, ভুল হবে কেন, সে তো ভালোবেসে বলেই বলেছে । অথচ মৌ তাকে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করল, যেন ভালোবাসার সঙ্গে বিয়ের অহিনুকুল সম্বন্ধ । না না, মৌ তাকে সত্যিকারের ভালোবাসে নি । আর সে জন্যই সে এমনটা করতে পেরেছে ।

‘কী হল রাহুল ! তুমি কি কিছুই বলবে না ? প্লিজ রাহুল আমি হাত জোড় করে বলছি ! চুপ করে থেকো না । অন্তত একটা কিছু বল ।’
রাহুল মুখ খুলল না । একেবারি শব্দহীন দাঁড়িয়ে রইল । মৌ বুঝতে পারল, এতক্ষণ ধরে তার আকুতি মিনতি পুরোটাই বিফলে গেল । রাহুলের জমাট অভিমান একটুও গলে নি । দূরে সরে এসে রাহুলের প্রতি সেদিন কি মৌ সত্যিই বড় অবিচার করেছে ? না না, সে অবিচার করে নি । সে যা করেছে তা তো রাহুলের ভালোর জন্যই । সেদিন যদি মৌ তাকে দূরে ঠেলে না দিত, হয়ত রাহুলের গোটা জীবনটাই অভিশাপে পরিণত হত । কিন্তু রাহুল তা বুঝে নি, বুঝবেও না । কারণ, ভালোবাসা মানুষকে চিরদিনের জন্যই অবুঝ করে রাখে । যতই এখন অভিমানে মুখ বুঝে থাকুক, মৌ তাতে একটুও হতাশ নয় । মৌ এখনো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, রাহুল তাকেই ভালোবাসে— শুধু তাকেই । মুখে কিছু না বললেও, রাহুলের অশান্ত অবুঝ অভিমানী চোখ দুটি তো এ কথাই বলছে ।
‘ ওকে রাহুল, তোমাকে আর বিরক্তি করব না । আমি চললাম । তবে একটা কথা শুনে রেখো, তুমি যে ধারণা পোষণ করে আমার সঙ্গে এখনো অভিমান করে আছো, সেটাই একমাত্র সত্য নয় । তার উপরে আরো একটা সত্য আছে । সেটাকে যেদিন তুমি খুঁজে পাবে, সেদিন তোমাকে এই আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে । আমি তোমার জন্য দুয়ার মেলে বসে রইলাম ।’ এই বলে মৌ রাহুলের হাতে একটা কার্ড সঁপে দিয়ে ওভারব্রিজ দিয়ে দ্রুত রাস্তার ওপারে ছুটে চলল ।

রাহুল পলকহীন সেদিকে চেয়ে থাকল । সন্ধ্যার নৈসর্গিক আলো ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে । সেই সাথে দোকানে , ফুটপাথে, রাস্তায় মোটর গাড়ির বৈদ্যুতিক বাতির কৃত্রিম আলো সমস্ত শহরকে ভরিয়ে তুলতে থাকল । মৌকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না । অগণিত মানুষের ভিড়ে সে মিশে গেছে । রাহুল মৌয়ের দেয়া সেই কার্ডের দিকে দৃষ্টি নত করল । মৌয়ের ঠিকানা, মোবাইল নম্বর সব এখানে দেওয়া আছে । কার্ডটা সযত্নে পকেটে ঢুকিয়ে রাহুল ব্যস্ত ফুটপাথ দিয়ে হাঁটা ধরল । আর খুঁজতে থাকল সত্যের উপরে আরেক সত্যকে ।




সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০১৫ রাত ১:১০
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নিশীথের মুঠোয় - কেয়া ।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪



আমি সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়,
হিমশীতল সকালের ভেতর নত চোখে চেয়ে আছি।
হিমার্ত জানালায় জমে ওঠে নিঃশ্বাসের মেঘ—
আঙুল বুলিয়ে মুছে দিই;,
যদিও জানি, আজ সেখানে তোমার পদচিহ্ন নেই।

শরতের বৃক্ষেরা পত্রমোচনের ভাষা জানে;
আমি কেবল তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেফরি আর্চারের জগৎ বিখ্যাত উপন্যাস ‘A Prisoner of Birth’ এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


ছবিতে আমি, মারুফ জামান এবং লেঃ কর্নেল রাজীব।
জেলে থাকতে জেফরি আর্চারের (Jeffrey Archer) লেখা ‘A Prisoner of Birth’ বইটির পড়ার জন্য বলেছিলেন ক্যাপ্টেন (চাকুরিচ্যুত) খন্দকার রাজীব... বইটি সম্পর্কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কো রুবিও ভারতে কী করছেন?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২


আওয়ামী দোসর নবনীতা আপার মতে, মার্কো রুবিও ভারতে গেছেন শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে। ডিসেম্বর মাসে যাতে শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরতে পারেন, সেই আলোচনা করতেই নাকি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সুন্দর সর্বনাশ

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:২১



সবকিছুই পাওয়া যায় এখন বিপণনের কল্যাণে,
বিপনি বিতানে বিতানে;
চাইলে কিনে নিতে পারো লালনীলহলুদ মনও!

মন চাইলে পোষ মানাতে পারো বনের অবাধ্য পশুও;
শুধু পোষ মানাতে যেও না মানুষ;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×