
আমার জীবনের প্রথম ভ্রমন। সমুদ্র ভ্রমন। (পর্ব-১)
আমার জীবনের প্রথম ভ্রমন। সমুদ্র ভ্রমন। (পর্বঃ ২)
আমার জীবনের প্রথম ভ্রমন। সমুদ্র ভ্রমন। (পর্বঃ ৩)
আমার জীবনের প্রথম ভ্রমন। সমুদ্র ভ্রমন। (পর্বঃ ৪)
অবশেষে আমরা হোটেল কক্স টুডে এসে পৌছালাম সন্ধ্যায়। সেখানে দেখলাম দরজার দুই পাশে দুজন ইয়া লম্বা হাত নিয়া আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানাতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ডানের জনের ছবি তুললাম, তার চেহারা বেশিই কিউট

Hotel The Cox Today Entry Gate
ভেতরে ঢুকে যে যার মত লবিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলো, ওরা সাথে সাথে আদর আপ্যায়ন আর আপনা মানুষের মত সবার জন্য ট্যাঙের শরবত খাওয়াতে লাগলো ।

ঢোকার পর যে যার মত অপেক্ষা করছে লবিতে।

সব কিছু দেখলাম সুন্দর ভাবে সাজানো গোছানো, ছোট হলেও একটা সুইমিং পুল ও আছে

হোটেল কক্স টুডের সুইমিং পুল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর রিসিপসন থেকে সবাইকে যার যার চাবি বুঝিয়ে দেলা হলেও এবারো হোটেল অবকাশের মতই এন্ট্রি ক্যাচাল লাগলো, ঠিক হয়েছিলো কক্স টুডে আমি ইরা আপু এক রুমে ম্যাডাম ছন্ধা অন্য রুমে বাকীরা যে যার ফ্যামিলির সাথে, সিঙ্গেল ছেলেরা দুজন দুজন করে একেক রুমে থাকবে।
সবই সেইভাবেই হল রিসিপসন থেকে যার যার চাবি বুঝিয়ে দেয়ার পর যে যার মত যার যার রুমে চলে গেলো, কিন্তু ট্র্যাজেডির শুরু হল এই ভাবে আমি ইরা আপু চাবি পেলাম না রিসিপসন থেকে বলা হল চাবি লাগেজ নিয়ে আগেই নাকি হোটেল বয় আমরা যেই রুমের সেই রুমে চলে গেছে; সেকেন্ড ফ্লোর রুম নম্বর ২০০৩।
রুমের সামনে যেয়ে দেখলাম ভেতর থেকে দরজা লক। ইরা আপু মিষ্টি গলায় ভেতরে কে ভেতরে কে বলতে বলতে নক করতে লাগলো একসময় আমাদের কলিগ এমারত ভাই গায়ে একটা তোয়ালে জড়িয়ে দরজা খুলে দিলো সে ইতিমধ্যে রুমটাকে তাঁর ব্যক্তিগত সংসার বানিয়ে ফেলছে, বেডে দেখলাম কে না কে যেন শুয়ে আছে লেপ মুড়ি দিয়ে সাথে অস্বাভাবিক রকম কেঁপে কেঁপে উঠছে।
সেদিকে খেয়াল করার সময় নেই, আমার রাগ দেখে এমারত ভাই কি করবে না করবে বুঝতে না পেরে মিহি সুরে বলতে লাগলো মাথা ঠাণ্ডা মাথা ঠাণ্ডা এত রাগ করলে চলে!! তারপর রুম থেকে বেরিয়ে গেলো; ভেতরে ঢুকলো; আবার বেরিয়ে গেলো; আবার ঢুকলো; এই করতে করতে একসময় দরজা অটো লক হয়ে গেলো।
এবার দরজা খোলার জন্য সে রিসিপশনে ফোন করতে থাকলো, ভেতরে অসুস্থ একজন দরজা অটো লক হয়ে গেছে এই কথা সে বার বার বলতে থাকলো তারও পনেরো মিনিট পর হোটেল বয় এসে লক খুলে দিলো। শেষে এক ভাইয়া এলো যার উপর এই ট্রিপ ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব।
সে আসার পর খুব অল্প সময়ে আমাদের রুম দখলে চলে এলো এবং তারপরই সবার নজর গেলো বিছানায় লেপ মুড়ি দিয়ে পড়ে থাকা অস্বাভাবিক কাঁপুনি রোগীর দিকে।
আমি ভাবলাম এটা ওই ছেলেটা যে অফিসে আমার দুই টেবিল সামনে বসে, এ’র সম্পর্কে একটা কৌতুক এক ভাইয়া প্রায়ই বলে, মানুষ দেশ থেকে পড়ালেখা করে বিদেশে যায় চাকরী করতে আর আমাদের ছোট ভাই লন্ডন থেকে লেখাপড়া কইরা আসছে ইউনাইটেডে চাকরি করতে।
ইনি সবাই যখন নামাযে যায় তখন প্রায়ই আমার টেবিলের পাশে যে বিশাল জানালা আছে সেটার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর জি’এফকে ফোন করে সরি বেবি ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড বেবি, প্লিজ বেবি ওকে বেবি বলে ১৫/২০ মিনিট আর্জেন্ট টক করে। প্রতিবার তার বেবির সাথে আর্জেন্ট টক শেষ করে টেবিলে টোকা দিয়ে আমার খোঁজখবর নেয়!

আমার টেবিলের পাশে বিশাল জানালা।
কখনো তার প্রশ্ন থাকে আমি আমার টেবিলে রাখা প্লান্টে পানি দিছি কিনা! সিওসিতে নতুন যে থ্রপস আসছে আইস থ্রপস দেখছি কিনা! টেবিলে গোল মতন ওইটা কি আয়না! কলম কয়টা ইউজ করি! আমার জুতাটা সুন্দর ইত্যাদি!
একদিন তার বেবির সাথে তুমুল ঝগড়া হচ্ছে তার বেবি কিছুতেই প্রবলেম আন্ডারস্ট্যান্ড করার ট্রাই করতেছেনা সেই মুহূর্তে সে বার বার বলতে থাকলো দেখো আমি কিন্তু চৌদ্দতলার উপর থেকে ঝাপ দিয়ে পড়ে মারা যাবো! এক্ষুনি এই এক্ষন!!
আমি কাজ করতে করতে মনকে গুছিয়ে নিচ্ছি যখনি সে ঝাপ দেবে আমি কীভাবে স্পট থেকে সরে কিছুই জানিনা অভিনয় করব!
ঝগড়া বাড়তেছে বাড়তে বাড়তে একসময় চুপ, তার কয়েক সেকেন্ড পর টোকার আওয়াজ! হতাশায় পেছনে ঘুরতেই সে বলল আপনার একটা বোতলে শ্যাওলা পড়েছে এটার পানি খাবেননা প্লিজ অসুস্থ হয়ে যাবেন! আমি তার পরামর্শে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরার আনন্দে আহ্লাদিত হয়ে বললাম ওটা আমার গাছে পানি দেয়ার বোতল, পানি খাবার বোতল ওইটা, ওই যে বেগুনীটা।
অফিসে কাজ করলে অনেক উৎকট ঝামেলা সহ্য করতে হয় মেয়েদের, এটা সবারই জানা কিন্তু আমি এই বিষয়ে সাধারণ বোকা মেয়ে বলে ডিপার্টমেন্টে স্যারের কাছে বিচার দিয়ে দিয়ে নিজের ইমেজ ক্ষুণ্ণ করেই যাচ্ছি স্যার কখনো আমাকে অবুঝ বাচ্চার মত বুঝিয়ে শান্ত করে, কখনো সাথে সাথে অ্যাকশানে যায়।
একবার আমাকে এক সিও তার সাথে কাজ করতে করতে এক ফাঁকে কথায় কথায় তুই বলে ফেলেছিল!
আমি দেখলাম উনি ওখানকার নতুন পুরাতন বয়স্ক কম বয়স্ক পুরুষ মহিলা সবাইকেই তুমুল আনন্দে তুই তোকারি করছে!তাদেরকে বললাম আপনাদের সিও সবাইকে তুই তোকারি করে??!তারা সবাই খুশি হয়েই উত্তর দিলো হ্যাঁ!
স্যারকে বিচার দিলাম! কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই লোক প্রচণ্ড ঝারি খেলো!
ওই ঘটনার পর সে আমাকে অনেকদিন অতিরিক্ত আপনি আপনি আর ম্যাডাম ম্যাডাম করতে করতেই একদিন অভ্যাসবশত ভুলে বলে ফেললো ইতিইইইই তু আগায়াআআ আজাআ আজা ইধার আজাআআ।
সেইদিন অফিসে সবাইকে বললাম যে সেই লোক আবার আমাকে তুই বলছে! সবাই উৎসুক হয়ে শুনতে চাইলো ঘটনা বললাম বলছে ইতি তু আগায়া আজা আজা ইধার আজা।
সবাই ব্যাপারটার প্রতিবাদ করলো এবং স্যার এর কাছে যেন তক্ষুনি বিচার দেই সেই ব্যাপারে সৎ পরামর্শ দিতে থাকলো, সমস্যা একটাই স্যার হিন্দি বোঝেনা আমি সেই জন্য মনে মনে বাংলা সাজিয়ে রেখেছি ‘ইতি তুই এসেছিস আয় আয় এদিকে আয়!”
হোটেল কক্স টু ডে ফিরে আসি
অস্বাভাবিক কাঁপুনি দেখে আমার ওই ছেলের সম্পর্কে কুটিল চিন্তা এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে ধারনা হল সি বীচে নিশ্চয়ই মদ গাজা কিছু ভক্ষন করেছে এটা ওসবের রি’অ্যাকশান!
কিন্তু মুখের উপর থেকে লেপ সরাবার পর দেখা গেলো ছেলেটি অন্য আরেকজন। অতিরিক্ত কাঁপুনি দিয়ে জ্বর সাথে বমি তাকে ইমারজেন্সি ডাক্তারের কাছে নেয়া হল।
অদ্ভুত ব্যাপার ওই রাতে আমাদের পঁচিশজন আক্রান্ত হল এই রোগে! যার ভেতর আমিও ছিলাম। ঢাকায় আমাদের পুরো অফিসে গুজব ছড়ালো হেডঅফিসের যারা বেড়াতে গিয়েছিলো তারা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে সাত আটজনের প্রান এখন যায় তখন যায় অবস্থা!!
অসুস্থতার কারন হিসেবে পাওয়া গেলো ইউনাইটেড ল্যান্ডপোর্ট থেকে আমাদের জন্য আনা ডাবের পানি, সাথে মিশিয়ে ছিল লেবুর রস, ভিট লবন অতিরিক্ত টেস্টের জন্য, আর পানীয়টা বানিয়েছিল সকালে, ফ্রিজে রেখেছিলো সারাদিন, আমরা খেয়েছিলাম সন্ধ্যায়, সম্ভবত এত লং টাইমের কারনে লেবু ডাবের পানি মিক্সড হয়ে পয়জন হয়ে গিয়েছিলো। যার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় এই অসুস্থতা।
দুর্বলতা কেটে সোজা হয়ে দাঁড়াতে অনেকদিন সময় লেগেছে, ঢাকা আসার পর ও, এমনকি যখন আমি আমার জীবনের প্রথম ভ্রমন সমুদ্র ভ্রমন প্রথম পর্ব লিখেছি তখনো কি বোর্ড প্রেস করার মত যথেষ্ট শক্তি ছিলনা।
ফেরার আগের দিন সন্ধ্যায় ওখানকার বার্মিজ মার্কেটে যাওয়ার জন্য বের হল সবাই, তখন এক কাণ্ড হল; বের হতে হতে দূর থেকে দেখলাম সবার সব অটো স্টার্ট দিয়ে ছেড়ে গেলেও ম্যাডামকে বাচ্চাদেরকে আর এক ভাইয়াকে নিয়ে একটা অটো স্টার্ট দিচ্ছেনা। কারন অটোওয়ালা নাকি সারাদিন আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে তার অটোতে নেবেনা।
ম্যাডাম সহ সবাই নেমে এলো অন্য অটোতে বসলো কিছু বললে আমি রাগ করতে পারি ভেবেই হয়ত তারা ব্যাপারটা চেপে গেলো।
চিনলাম লম্বা, শ্যামলা, রোগা, চোখ বড় বড় অটোওয়ালাকে যার অটোতে একবার হাণ্ডিতে গিয়েছিলাম আর একবার সুগন্ধা সি বীচে গিয়ে দূর থেকে সমুদ্র দেখে ফিরে এসেছি নামিনি কেননা অসুস্থতায় শরীরে তেমন এনার্জি ছিলনা।

দূর থেকে দেখা সমুদ্র
আর একবার আইসক্রিমের দোকানে গিয়েছি, শেষবার ইরা আপুর জন্য ডাচ বুথে গিয়েছি, এইভাবে প্রতিবার আমি তার অটোতেই চরেছি হয়তো।
বার্মিজ মার্কেটে পৌঁছে তাকে বিদায় দিলাম ভাড়া নেবেনা, চলেও যাচ্ছেনা, বলছে এখানে তার সব চেনাজানা, সব!। আমি তাকে ইরা আপুকে হেল্প করতে বলে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
কম বেশি সব মানুষের মন সরলতাকে আকৃষ্ট করে, অটোওয়ালার ওরকম আচরনের কারন এটাই মনে হয়েছে, তার চোখে মুখে খারাপ কিছু আমার নজরে আসেনি।
যাই হোক এই ছিল আমার সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, এত কিছুর পরও ভালোলেগেছে সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার, ছেড়া দ্বীপ, ভাললেগেছে হোটেল কক্স টুডে, ভাললেগেছে সমুদ্র, ভাললেগেছে ওখানকার মানুষজন।

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



