somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জসীম উদদীন লিখলেন গল্প, তা রম্য অল্প স্বল্প

১১ ই মার্চ, ২০২০ রাত ৯:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
========
২৩ - কে বড়
========



বা-ই-শ মন পালোয়ান। ইয়া বড় তার হাত-পা। নিজ বুকে যখন থাপ্পর মারে, যেন পাহাড়ের গায়ে পাহাড় এসে পড়ে। এমনই তার অবস্থা।

এই পালোয়ানের নাম-ডাক দেশের সুদূর প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়েছিলো। একবার এক বুনো হাতি জঙ্গল ছেঁড়ে লোকালয়ে খুব উৎপাত করতে লাগলো। দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে বাইশ মন পালোয়ানকে খবর দিতেই সে হাতির লেজ ধরে চড়কির মতো বনবন করে মাথার উপর ঘুরাতে লাগলো। তারপর, সেটাকে দশ মাইল দূরে সুন্দরবনে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।

একদিন হলো কি, পালোয়ান রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে। হঠাৎ ভিনদেশী এক লোক তার পথ আগলে বললো- 'ওহে বাইশ-মন-পালোয়ান! খুব যে তেজ দেখিয়ে চলেছো! আমার দেশের তেইশ-মন-পালোয়ানের নাম শুনেছ? পারলে তার সাথে লড়াই করে জিতে আসতে পারলে বুঝবো যে তুমি অনেক বড় পালোয়ান।'

শুনে তো পালোয়ান রেগে অস্থির। সে তখুনি সেই ভিনদেশী'র কাছে থেকে তেইশ-মন-পালোয়ানের নাম-ঠিকানা জোগাড় করে তার খোঁজে বেড়িয়ে পড়লো।

বাইশ-মন-পালোয়ান পথ চলছে তো চলছেই। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল, তবু তার থামার লক্ষণ নেই। একসময়ে পালোয়ানের অনেক তেষ্টা পেয়ে গেলো। পাশেই একটি ছোট পুকুর ছিলো। সেই পুকুরটিতে নেমে সে পানির পিপাসা মিটাতে যাবে, ওকি!, পুকুর এত্তো ছোট! মাঝ পুকুরে নেমেও পুকুরের পানি পালোয়ানের হাঁটু অবধি গিয়ে ঠেকে! যদি পানি বুক অবধি পাওয়া যেতো, তাহলে হয়তো একটু শান্তিতে বসে খাওয়া যেতো!

যাহোক, যা পাওয়া গেছে তা-ই সই। পালোয়ান দুই হাতে ধরে পানি পান করতে লাগলো- ঘপ-ঘপ, ঘপ-ঘপ, ঘপ-ঘপ। এক সময়ে সেই পুকুরে আর এক বিন্দু খাওয়ার মতো পানি অবশিষ্ট থাকলো না। ওদিকে পালোয়ানের পিপাসার মাত্র অর্ধেক মাত্র পূর্ণ হয়েছে।

কি আর করা! আবার সে পথ চলা শুরু করলো। রাত যায়, সকাল হয়ে এলো। তখন, পালোয়ান একটি বিরাট বট গাছ দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে উঠলো। সে এক হাতে পুরো বটগাছ উপড়ে সেটা দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে আবার পথ চলতে লাগলো।

এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে সে তেইশ-মন-পালোয়ানের ঘরে পৌঁছে যেতেই, একটি ছোট্ট খুকি দরজা মেলে ধরে বিরক্ত স্বরে জানতে চায়- 'তুমি কে হে? 'তেইশ-মন-পালোয়ান' 'তেইশ-মন-পালোয়ান' বলে এতো চেঁচামেচি করছো কেন!'

তা শুনে, পালোয়ানের গা-জ্বালা করতে লাগলো। বললো- 'বলি, তেইশ-মন-পালোয়ান কি বাড়ি আছে?'

'তাকে দিয়ে তোমার কাজ কি?' খুকি আবার প্রশ্ন করে।

'আমি বাইশ-মন-পালোয়ান। তার সাথে লড়াই করতে এসেছি। তুমি কে?'

ছোট খুকিটি তাচ্ছিল্যের স্বরে উত্তর দেয়- 'আমি তার মেয়ে। তোমার হাতে ওটা কি?'

বাইশ-মন-পালোয়ান গর্ব ভরে উত্তর দেয়- 'এটা বটগাছ। আমি এটা দিয়ে দাঁত মেজেছি।'

'ও! এটা করেই তোমার এতো গর্ব! আমার বাবা তো বটগাছ দিয়ে দাঁত খিলাল করেন।' এই বলে খিলখিল করে হাঁসতে হাঁসতে লাগলো মেয়েটি। তারপর, পালোয়ানের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো।

অপমানে সেই জায়গা ছেঁড়ে অনেকক্ষণ নড়লো না পালোয়ান। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ তার বুকে যেন শেলের মতো বিধলো।

এতো দিনে একজন মনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়া গিয়েছিলো। এতো কাছে এসেও তার দেখা না পেয়ে সে খুব হতাশই হলো। বনের বাঘ-ভালুক খালি হাতে মারতে মারতে সে হতাশই হয়ে উঠেছিলো। সেই জন্যেই তেইশ-মন-পালোয়ানের খোঁজে এতো দূর আসা।

কি আর করা! পালোয়ান বাড়ি ফিরে যাওয়া শুরু করবে, এমন সময় মাটি কাঁপিয়ে সেইখানে তেইশ-মন-পালোয়ানের আগমন। মালকোঁচা বেন্ধে বাইশ-মন-পালোয়ান তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

'তুমি কে?' তেইশ-মনী জিজ্ঞাসা করে।

'আমার নাম শুনোনি? আমি বাইশ-মন-পালোয়ান। তোমার সাথে লড়তে এসেছি।'



ব্যস! লড়াই শুরু হয়ে গেলো। এদিক হতে বাইশ-মন-পালোয়ান তেইশ-মন-পালোয়ানের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে, অন্যদিক দিয়ে তেইশ-মনী বাইশ-মনের ঘাড়ে আছড়ে পড়ে। এ যেন পাহাড়ে-পাহাড়ে লড়াই। তাদের ঠেলা-ঠেলির চোটে মাটি থড়থড় করে কাঁপতে লাগলো। হিমগিরির তিনটা চূড়া ভেঙ্গে পড়লো।

ওদিকে হলো কি, এক বুড়ি মাঠে তার সোয়া লক্ষ ছাগল চড়াতে এসেছিলো। দু পালোয়ানের মারামারিতে ছাগলগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। তিন-চারটা পালোয়ানদের পায়ের তলায় পড়ে একদম চিড়ে-চ্যাপ্টা। বুড়ি তাড়াতাড়ি করে সেই সোয়া লক্ষ ছাগল একটি একটি করে নিজের ঝুলিতে ঢুকিয়ে ফেললো।

তারপরে, বাইশ-মন-পালোয়ানকে নিজের ডান কাঁধে তুলে নিলো, আর অন্য কাঁধে তেইশ-মন-পালোয়ানকে উঠিয়ে বাড়ির পথে হেঁটে চললো। সেই কাঁধে দাঁড়িয়েই দুই পালোয়ানের মারামারি চলতে লাগলো। সে এক ভীষন ব্যাপার!

ওদিকে, একটি চিলের বুড়ির ছাগলগুলোর উপর নজর ছিলো অনেক আগে থেকেই। সে করলো কি, ছোঁ মেরে সেই এক লক্ষ ছাগল আর দুই পালোয়ানসমেত বুড়িকে নিজের ঠোঁটে উঠিয়ে আকাশে উড়ে গেলো। তবুও পালোয়ানদের লড়াই থামে না।

কাছেই কোথাও এক রাজকন্যা গোসল করে বেড়িয়ে রোদে নিজের চুল শুকাচ্ছিলো। হঠাৎ করেই চিলের মুখ থেকে সবাই গিয়ে রাজকন্যা'র চোখের ভিতর গিয়ে পড়লো।

'চোখে কি গেলো', 'চোখে কি গেলো' বলে সুন্দরী রাজকন্যা চিৎকার দিতেই, রাজ্যের সবাই তার কাছে ছুটে এলো। রাজা এলেন, মন্ত্রী এলেন, কোটাল এলেন, সবার শেষে এলেন রাজবৈদ্য। তিনি একশো নিরানব্বইটি দূরবীণ ব্যবহার করেও রাজকন্যার চোখে কিছু খুঁজে পেলেন না।

শেষে সবাই মিলে ঠিক করলেন যে, রাজ্যের সবচেয়ে বড় জেলে জলধরকে ডেকে আনা হবে। সে তার জাল ছুঁড়ে কিছু যদি রাজকন্যার চোখে খুঁজে পায় তাহলেও রক্ষে!

রাজ্যের কোটাল তার সাঙ্গ-পাঙ্গসহ জেলে পাড়ায় গিয়ে জলধরকে খুঁজতে লাগলেন। জেলেদের ঘর ভেঙ্গে, চাল উড়িয়ে, জাল ছিঁড়ে দিয়ে সব কিছু তছনছ করে দেওয়া হলো। তবু, সেই জেলেকে খুঁজে পাওয়া গেলো না।




অনেকক্ষণ লুকিয়ে থাকার পরে যখন জলধর বুঝতে পারলো যে, সে যদি বের না হয় তাহলে জেলেপাড়া আজ গুড়িয়ে দেওয়া হবে, তখন সে বের হয়ে এলো। তাকে নিয়ে কোতোয়াল রাজ প্রাসাদে ফিরে এলেন।

জলধর অবশেষে তার আড়াই লক্ষ নাতি-পুতিসহ রাজকন্যার চোখে জাল ফেললো। তবু, কিছু পাওয়া গেলো না। সাত দিন, সাত রাত তন্ন তন্ন করে খুঁজে সে যখন হয়রান, তখন রাজকন্যার চোখের কোণে কি যে একটা ঠেকলো।

জাল টেনে লক্ষ লক্ষ দূরবীণ দিয়ে খোঁজ করে অবশেষে দেখা গেলো, জালের এক কোণে একটি বুড়ি তার ঝোলায় সোয়া লক্ষ ছাগলসহ আটকা পড়ে আছে। আর, সেই বুড়ির ঘাড়ে বাইশ-মন-পালোয়ান আর তেইশ-মন-পালোয়ান সমানে লড়াই করে যাচ্ছে।

চোখের কোণ থেকে কুটোটা বের হয়ে যাওয়ার রাজকন্যা হেসে ফেললো।

এখন, বলুন তো, কে সবচেয়ে বড় - দুই পালোয়ান, নাকি বুড়ি, নাকি চিল না অন্য কেউ?


======
অনুলেখন
======





















































সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০২০ রাত ৯:৪৮
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পঁই পঁই করে হিসাব রাখতে হবে, নতুবা বিপদে!

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩৪

আমরা ক'জনা বেশ কিছুদিন আগে ব্যবসা শুরু করেছি। প্রথমেই একজনকে হিসাবের সব দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি নিয়েছিলাম মার্কেটিং ও টেকনিক্যাল সাইড গুলির দ্বায়িত্ব। সৌদীতে অনেক POS রেডিমেড পাওয়া গেলেও আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে কোন 'জঙ্গী' নেই

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:২৫

'জং' শব্দটার অর্থ 'যুদ্ধ'। এভাবে, জঙ্গী কথাটার অর্থ দাঁড়ায় - যোদ্ধা বা যুদ্ধ করেন। যে কোন যুদ্ধই প্রাণহানি ডেকে আনে। আগের কালে, রাজারা যুদ্ধ করে দেশ জয় করতেন। তাঁদের অণ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই প্রথম খাল বাবার পলিটিক্যাল ম্যাচুরিটির নিদর্শন পেলাম

লিখেছেন অপলক , ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪

২০১০ সালে ফেব্রুয়ারীর ২২ তারিখ। মেয়েলি ব্যাপার বলি, প্রতিহিংসার ব্যপার বলি অথবা পলিটিক্যাল ইমম্যাচুরিটির কথা বলি, বাংলাদেশ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নতুন করে আকীকা দিয়ে নাম রাখা হয়েছিল হযরত শাহজালাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাষণময়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১


বিশ্বাসগুলো হাবুডুবু খাচ্ছে
ভাগ্যের কম দোষটার হাত
ঝাঁকনি কম নেই তো- তাহলে
বিশ্বাসগুলো মরে যাচ্ছে এই;
মাটির আনন্দটা শুধু ফুল গন্ধ
নাকের সুসংবাদ যে দৌড়াচ্ছে
রাতের ঘুমটা যেনো স্বপ্নবিরল কষ্ট
ভোরের শিশির গড়ে না আর শক্ত;
তবু নিশ্বাসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

।।মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনার রাস্ট্রীয় জঙ্গীবাদ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮


মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনা ভারতের প্রযোজনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে দিয়ে জঙ্গী জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ করতো। বহিবিশ্বকে বোঝাতো দেশে ইসলামী জঙ্গী দিয়ে ভরে গেছে এবং সেই জঙ্গীরা ইউরোপ আমেরিকার ভয়াবহ ক্ষতি করবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×