এদেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের বিবেচনায় ৪২৬ জন মুক্তিযোদ্ধকে বীরপ্রতীক খেতাব দেয়া হয়। বীরপ্রতীক প্রাপ্তদের তালিকায় ৪২৫ নম্বর নামটি যার, তিনিই বঙ্গবন্ধুর 'বীর বিচ্ছু' শহীদুল ইসলাম_ সর্বকনিষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। ডাক নাম লালু। যুদ্ধের সময় যার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর! টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌর এলাকার সুতিপলাশ গ্রামের লালু যুদ্ধ করেছেন বীরউত্তম কাদের সিদ্দিকীর অধীনে। মুক্তিযোদ্ধারা টাঙ্গাইলের গোপালপুর যে থানা দখল করেছিলেন, বলতে গেলে সেই থানা দখলের কৃতিত্বের পুরোটাই লালুর।
যুদ্ধের সময় লালু মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন পাহাড়ির দলে যোগ দেন। এতো ছোট ছেলে যুদ্ধ করবে কি করে! তাই লালুকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ফাইফরমাশ খাটা ও অস্ত্রশস্ত্র পরিষ্কারের কাজ দেয়া হয়। এরপর সদলবলে সীমান্ত পাড়ি দেন। মেঘালয়ের তুরাতে ট্রেনিং ক্যাম্পে লালুর কাজ ছিল ভোরে উঠে হুইসেল বাজিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্যারেডের জন্য ডাকা। এরপর জাতীয় পতাকা টাঙানো আর জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া। তার সঙ্গী ছিল সমবয়সী আরেক কিশোর ভুলু। দু'জনকেই বিচ্ছু বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ট্রেনাররা তাদের শেখান কিভাবে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হয়, অস্ত্র চালাতে হয়, গ্রেনেড ছুড়তে হয়, শত্রুর গতিবিধির খবর নিতে হয়। ২৫ দিনের ট্রেনিং শেষ করে কাদের সিদ্দিকীর দলে যোগদেন। যুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে গ্রুপ কমান্ডার পাহাড়ি তাকে নির্দেশ দেন গোপালপুর থানা রেকি করে আসতে। লালু সেখানে গিয়ে তার এক দূর সম্পর্কের ভাই সিরাজের দেখা পান। সিরাজ পাকসেনাদের দালালি করছে, সে লালুকেও একই কাজ করার প্রস্তাব দেয়। লালু কৌশলে নিজের পরিচয় গোপন করে রাজি হয়ে যান। পরে পরিকল্পনামাফিক তিনটি গ্রেনেড নিয়ে থানায় হাজির হয়। অল্পবয়স বলে তাকে চেক করা হয় না। পুরো পুলিশ স্টেশন একবার চক্কর মেরে এসে এক বাংকারে প্রথম গ্রেনেড ছুড়লেন লালু। ভীত ও হতভম্ব পাকিস্তানিরা আন্দাজে গুলি ছুড়তে শুরু করে লক্ষ্যহীনভাবে। শুয়ে লালু দ্বিতীয় গ্রেনেডটি ছোড়েন, কিন্তু এটা ফাটেনি। তারপর তৃতীয় গ্রেনেডটি সশব্দে ফাটে আরেকটি বাংকারে। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারাও গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসতে থাকে। গোলাগুলির একপর্যায়ে পাকিস্তানিরা পালায়, কিছু ধরা পড়ে, মারা যায় অনেক। বলতে গেলে শহীদুল ইসলাম লালুর প্রায় একক কৃতিত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে নেন গোপালপুর থানা। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কাদেরিয়া বাহিনীর সব মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা দিচ্ছিলেন, তখন শহীদুল ইসলাম লালুও তার স্টেনগানটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেয়। বঙ্গবন্ধু অবাক হয়ে শহীদুল ইসলাম লালুর পিঠ থাপড়ে বলেছিলেন, 'সাব্বাস বাংলার দামাল ছেলে।' যখন সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে লালুর বাংকার ধ্বংসের কথা শুনলেন তখন বঙ্গবন্ধু তাকে আদর করে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, 'বীর বিচ্ছু'। মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করলেও জীবনযুদ্ধে ছিলেন পরাজিত। এ বীর মুক্তিযোদ্ধা সারাজীবনই কাটিয়েছেন চরম দরিদ্র অবস্থায়। জীবিকার তাগিদে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়ের চাকরি নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পর পরই। দরিদ্রতাকে সঙ্গি করে কখনও রেলস্টেশনে কুলির কাজ করেছেন, হোটেলের বাসন মেজেছেন আবার কখনও হয়েছেন পাচক। শেষদিকে এসে ঠেলাগাড়িতে করে চা বিক্রি করেছেন। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তিনি যে বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছেন সে কথা নিজেও জানতেন না। জেনেছেন বহু পরে, ১৯৯৬ সালে। অভাব ও দারিদ্র্যকে সঙ্গি করে বঙ্গবন্ধুর 'বীর বিচ্ছু' ও দেশের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক লালু ২০০৯ সালের ২৫ মে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ব্লাইন্ড স্পট

ঘন কুয়াশার চাদর আর আঁকাবাঁকা সড়কের আড়ালে ‘পদ্মাডাঙা’ গ্রামটা দেখতে আর দশটা নীরব, নিরুপদ্রব পল্লীর মতোই। কিন্তু সাইবার অপরাধের মানচিত্রে এই জায়গার পরিচয় ভিন্ন। ফিশিং, ব্যাংক... ...বাকিটুকু পড়ুন
কাতুকুতু'র কাহিনীনামা
কাতুর সাথে কুতু দিয়ে হচ্ছো পগারপাড়,
ফের যদি আসো কাছে বলবো- 'খবরদার!'
একটু হেসে, কাছে এসে, দিচ্ছো বুঝি কাশি,
ঝুলিয়ে দাড়ি, যাচ্ছো বাড়ি, যেথায় আছেন মাসি।
তোমার সাথে, দুধে-ভাতে, গপ্প করছি কত,
তবু কেন, ঘন... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাঙালিয়ানা ভোজ ও রুপালি ইলিশের স্বাদ

প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য

ভূমিকা
সকল নবি ও রাসুল প্রতি সালাম ও দুরুদ পর
দাউদের সুরে, মূসার পথে, ঈসার প্রেমের বাণী
মুহাম্মদের মরু পেরিয়ে শুনেছি যুগের ধ্বনি
কৃষ্ণের বাঁশি, বুদ্ধের ধ্যান, সুফির অন্তর সন্ধান
যোগীর তপে, মরমীর গানে খুঁজেছি... ...বাকিটুকু পড়ুন
আওমীলীগকে সম্পর্কে কি আপনার মনে এখন কোনো পজিটিভ চিন্তা উঁকি দেয়?

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।